আপদের নাম সাহিত্য সম্পাদক

সাহিত্য সম্পাদক নামের আজব-গজব প্রাণিদের নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনেক তিক্ত। তাদের রুমে কোনো নারী কিংবা গাড়িঅলা এনজিওকর্মী কিংবা মালদার ব্যবসায়ীর পুত্র-কন্যা-পুত্রবধু-জামাতা প্রবেশ করলে তাদের মুখাবয়বের ভূগোল বদলে যেতে দেখেছি। অন্যদিকে নতুন লেখক, কবি ও ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে নেড়িকুত্তার মতো আচরণ করতে এদের জুড়ি নাই। নিজে জীবনে দুই কলম লিখছে কি না জানা নাই, কিন্ত পত্রিকার সাহিত্য পাতার দায়িত্ব লাভের পর থেকে এরা এক একজন এত বড় কাবিল হয়ে যায় যে,তারা সময় বুঝে রবীন্দ্রনাথকে ধরে কাতুকুতু দেয়, নজরুলের গুহ্যদ্বারে মধ্যাঙ্গুলি প্রবেশ করিয়ে ঘ্রাণ নিতে থাকে, শরৎ চাটুজ্জের চুলে বিলি কাটে কিংবা চান্স পেয়ে পাওলো কোয়েলহো, মার্কেজ, নেরুদা, এমিলি ডিকিনসন, লর্ড টেনিসনদের নিয়ে ডাঙ্গুলি খেলে।

লজ্জার বিষয় স্বীকার করতে দ্বিধা নাই এসব খাটাশদের খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। পুরোদস্তুর ইতিহাস প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে লেখা শুরু করার আগে আমি গল্প-উপন্যাস লিখতাম। স্কুলজীবন থেকে পত্রিকার পাতায় নিয়মিত লেখা ছাপা হতে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর সেটা নিয়ে তেমন ভাবতে হয়নি। তবে যখন ছোটদের পাতা ছেড়ে গল্প-উপন্যাস লিখে বড়দের পাতায় জাতে উঠতে চেষ্টা করেছি তখনি বিপত্তিগুলো চোখে এসে ধরা দেয়। বুঝতে পারি সব পত্রিকাই কাজী আনোয়ার হোসেন তথা সেবা প্রকাশনীর রহস্য পত্রিকা নয়। সেগুলোকে লেখা ছাপার জন্য দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও লিখনশৈলীর থেকে দালাল ও চাটুকারদের পাশাপাশি Financial or Physical Capital গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় শ্রেণির লেখক ও তার থেকেও নিম্নশ্রেণির এক সম্পাদকের অধীনে থাকা সাহিত্য পত্রিকায় ছাপার জন্য প্রথম বর্ষে থাকতে তিনবারে তিনতি লেখা পাঠালাম। প্রথমবারের উপন্যাস সেই দামড়া ছাপে নাই। উপরন্ত চারমাস পর দেখি সেই গল্পের থিম মেরে দিয়ে ঐ লোকই গল্প লিখছে আরেকটা। শুধু কি তাই সেই থিম থেকে পরে একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত লেখা হয়েছে। আমি বরাবরই খ্যাচোড়দের জন্য জিরো টলারেন্সে থাকা লোক। তার ঘাড় টিপে ধরতে দেরি করিনি, সে ধরার পর বললো মানোত্তীর্ণ ছিল না আমার ঐ লেখাটা, তাই ছাপেনি।

এরপর রাগে রাগে আমি ফিরে এলাম। পরে চান্সে একটা ই-বুক থেকে শীর্ষেন্দুর লেখার অংশবিশেষ কপি করে আগে পিছে দুই এক লাইন লিখে তারে দিলাম। হারামি কিছুদিন পর কয় এই লেখাও আগেরটার মতোই মানসম্মত নয়। আমি তারে কৈলাম শীর্ষেন্দুর মতো লেখকের লেখার যদি মান না থাকে, তুই বেটা নেংটি ইঁদুর এইসব গল্প উপন্যাসের কি বুঝিস। রাস্তায় তোর সান্ডার তেল বেচার কথা, এই চেয়ার ছাইড়া দিয়া নিজের জায়গায় গিয়া বস। শুধু কি তাই হাউকাউ করার এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে ঐ পত্রিকার সম্পাদক পর্যন্ত কাহিনী গড়ায়।

সম্পাদক অনেক গুণী মানুষ ছিলেন। এই ঘটনার পর থেকে আমার যেকোনো লেখা উনি নিয়মিত ছেপেছেন। পেয়ারি কিংবা রইজ উদ্দিন সাহেবের কবিতা ছাপা হওয়া কিংবা পুরষ্কার পাওয়া নিয়ে কথা বলার আগে ভেবে দেখা দরকার এই দুষ্টচক্রের শেকড়টা কোথায়। মাহফুজুর রহমানের গান গাওয়া নিয়ে ট্রল করার আগেও তাই ভাবা দরকার কারা তাকে সঙ্গীতাঙ্গনের গুহ্যদ্বার ছিন্নভিন্ন করার অশুভ চক্রান্তে এখানে এনেছে। তবে দেশে শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সংকটগুলো স্পষ্ট হবে। অপরাধের প্রকৃতি ও গভীরতা বিচারে আমি, আপনি কিংবা ঐসব তথাকথিত পাতার সম্পাদক এ বিপদের দায় এড়াতে পারে না।

#পাদটীকা: সাদাত হোসাইন বিখ্যাত হওয়ার আগে তাঁর দুইটা বইয়ের রিভিউ লিখে ছাপার জন্য দিয়েছিলাম দুটো পত্রিকায়। ছাগলের পাল সেটা ছাপে নাই, তারা রিভিউ করছে ‘ভূত এসে পুত করে গেল’ টাইপের কোনো বইয়ে রিভিউ। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এরাই এখন সাদাত হোসাইনের পেছনে লেজ নাড়তে নাড়তে দৌড়াদৌড়ি করে। আমি বাংলাদেশের তিনজন লেখক এবং দুইজন কবিকে খুব গুরুত্ব দেই এজন্য যে কোনো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের সনদ না নিয়ে তাঁরা চেষ্টা করেছেন মানুষের জীবনঘনিষ্ট হতে। তাদের জন্য শুভকামনা।

(Visited 18 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *