হাজার বছরের ‘গল্পগাথায়’ ইতিহাস ও সংস্কৃতি কোথায়?

১.
নাম যখন প্রতিষ্ঠানের থেকে বড় হয়ে যায়, ব্যক্তি যখন কোনো যুগপর্বের প্রতিনিধিত্ব করেন তখন লেখক পরিচিতি সম্পর্কে বলার কিছুই থাকে না। তাই সুলেখক গোলাম মুরশিদের ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ শীর্ষক গ্রন্থটির পাঠ অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই চার কথা বলতে গেলে লেখককে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নাই। ভাষার উপর অভিনব দখলের সঙ্গে উপযুক্ত উপস্থাপনশৈলী একটি বৈষয়িক আলোচনায় শ্রোতাদের যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে বৈষয়েক আলোচার বাইরে নীরব শ্রোতা বানিয়ে রাখে। তেমনি লিখনশৈলীর মুন্সিয়ানা ক্ষেত্রবিশেষে পাঠকদের বিমুগ্ধ নীরবতার ফাঁদে আটকে সত্যাসত্য যাচাইয়ের সরল পথ থেকে যোজন যোজন দূরে ঠেলে দিতে সক্ষম।

তবে বিষয় যখন ইতিহাস, তখন তথ্যসূত্রের উপস্থাপনজনিত জটিলতা আর ব্যাখ্যাদানের বিচ্যুতি কিংবা দুর্বোধ্যতার নিরীখে যাচাই করতে গেলে সরল মুগ্ধতার থেকে গরল সমালোচনা প্রবল হয়ে উঠতে পারে। সেখানে একজন অর্বাচীন গবেষকের অপেক্ষাকৃত প্রবীন, বর্ষীয়ান ও প্রবল ক্ষমতায় মহীয়ান লেখক-গবেষকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক হলেও দুই একটি কথা না বললেই নয়। বইটি প্রথম যখন প্রকাশ হয় তখন ইতিহাস বিষয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। ফলে পড়ার জন্য বইটি হাতে আসতে আরও বছর পাঁচেক লেগে যায়।

একই প্রকাশনী থেকে আমার বই ‘ইতিহাস ও ঐতিহাসিক’ প্রকাশের সময় বইটির উচ্চকিত প্রশংসা শুনে হাতে নিয়ে বাসায় ফিরি। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বইটি পড়ে শেষ করেছিলাম। স্নাতক পর্বের শিক্ষার্থী হিসেবে এই গ্রন্থটি পাঠের অভিজ্ঞতা বেশ স্বস্তিদায়ক। অদ্ভুতভাবে এর ঠিক সাত বছর পর সাত সতেরো না ভেবে ২০১৭ সালে বইটি আবার পড়ি। এবার দীর্ঘ পাঠাভ্যাসের গুণে নাকি হাতের কাছে একটা সুন্দর হাইলাইটার পেন থাকার কুপ্রভাবে পুরো বইটিতে মাকড়শার জালের মতো অবয়ব তৈরি হয়। তবে আত্মবিশ্বাসের প্রবল অভাব এই বই নিয়ে কোনো ধরণের কথা বলা থেকে আমাকে বিরত রেখেছিল।

করোনাকালীন ছুটিতে সব ধরণের কাজ থেকে বিরত থাকা সময়ে গ্রামের বাড়ি দিয়ে এই হাইলাইট করা বইটি হাতে নিয়ে হাইফাইভ দেয়ার মতো কিছু ভাবতে পারিনি। বরঞ্চ ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্ত, বিব্রত ও বীতশ্রদ্ধ হতে হয়েছে বর্ষীয়ান দক্ষ লেখকের অদ্ভুত সুন্দর ভাষাশৈলীর মধ্যেও অদ্ভুতুড়ে সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও তথ্যপ্রমাণ হাজিরের দুর্বলতায়।

২.

ইতিহাস থেকে সংস্কৃতি কি নেই এখানে? এই প্রশ্নটাকে এবার ঘুরিয়ে করার চেষ্টা করি পদ্ধতিগত ধারণা ও প্রপঞ্চের বিচারমূলক নিবৃতি থেকে। যদি বলি কি আছে এখানে? ‘বইটি মূলত ইতিহাস, এটা সংস্কৃতির ইতিহাস, এবং এই সংস্কৃতি লেখকের ভাষায় বাঙালি সংস্কৃতি’। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ‘বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি’ যেভাবে বাইনারি অপোজিশন তথা বিপরীত জোড় হিসেবে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে হাজির-নাজির হয় সেখানে শুরু থেকেই সতর্ক পাঠ জরুরি। মুসলিম লেখকদের বিচারে ‘মুসলমান’ এবং ‘বাঙালি মুসলমান’ দুটো আলাদা জিনিস।

তাদের বিচারে মুসলমান যদি হয় আশরাফ ‘বাঙালি মুসলমান’ এরা তো অধস্তন ‘আতরাফ’। একইভাবে যারা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতির হর্তা-কর্তা-বিধাতা মনে করেন সেই অংশীজনেরা ‘বাঙালি মুসলমানকে’ ‘বাঙালি সংস্কৃতির’ স্বজন মানতে নারাজ। ধানের মধ্যে প্রচুর চিটা থাকলে সেটা থেকে চাল বের করা যেমন কষ্টসাধ্য, গোলাম মুরশিদের তথ্য সূত্রের ভারে ভারাক্রান্ত ‘হাজার বছরের বাঙালি’ সংস্কৃতি শীর্ষক গ্রন্থে ‘ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে’  খুঁজতে গিয়ে তাই হাজারটা বার থমকে যেতে হয়েছে।

শুরুতে তত্ত্ব ও প্রপঞ্চগত দিক থেকে পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ এখানে মূখ্য যার কালানুক্রমিক কাঠামো লেখকের ভাষ্যে হাজার বছর। প্রথাগত সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করার কোনো চেষ্টা পুরো বইটি পড়ার পরেও অনুপস্থিত দেখেছি। প্রক্রিয়াবাদী ধারণার পর থেকে মানুষের সংস্কৃতি যেটাকে ‘হিউম্যান কালচার’ হিসেবে ধরা হয় সেটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায় যাকে আমরা বলি ‘কালচারাল প্রসেস’। আর এখানে সাংস্কৃতিক অবয়ব তৈরি হয় কোনো পূর্বানুমান তো নয়ই, উপরন্তু পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের মাধ্যমে। অদ্ভুতভাবে লেখক ‘বাঙালি সংস্কৃতির জন্মলগ্ন’ শিরোনামে কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করার আগেই নিজ দায়মুক্তি খুঁজেছেন নন্দিত ইতিহাস গবেষক নীহাররঞ্জন রায়কে এক হাত নেয়ার মধ্য দিয়ে।

নাকানি চুবানির শুরু পাণিনির ব্যকরণ দিয়ে, তারপর ঐতরেয় আরণ্যক, রঘুবংশম, সমুদ্রগুপ্তের মন্ত্রী হরিষেণের এলাহাবাদ প্রশস্তি, বাৎসায়নের কামাসূত্র আর কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ছেড়েছেন। কিন্তু এসব বর্ণনায় ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ অনেক দূরে কথা ‘বাংলা’ ও ‘বাঙালির’ দেখা মেলা ভার। তিনি দেখলেন এসব প্রাচীন গ্রন্থাদি ঘাঁটাঘাঁটি কেমন একঘেঁয়ে লাগে। তাই একলাফে চলে গিয়েছেন চর্যাপদের ভুষুকপাদের কাছে। সেখানেও ভাল না লাগাতে কোনো বিশ্লেষণ ছাড়াই একে একে পাতা ভরেছেন মুকুন্দরামের চণ্ডিমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল আর বাকপতির ছন্দে ছন্দে। আমরা সেখানে অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানের কোনো প্রচেষ্টা আবিষ্কারে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি।

বইটিতে তিনি বাংলা ভাষাকে বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি জেনে উদ্দিষ্ট উন্মেষকালকে বাঙালি সংস্কৃতির শুরু বলে দাবি জানিয়েছেন। কিন্ত তার আলোচনায় দেখছি ভৌগলিক সীমানায় বাংলা তথা বঙ্গ, জাতি হিসেবে বাঙালি আর তাদের ভাষা হিসেবে বাংলার উদ্ভব ও উন্মেষকাল ১৫ শতক থেকে ১৮ শতকের মধ্যে। তাহলে তিনি যখন শুরুতেই নীহাররঞ্জন রায়ের গোষ্ঠী নিপাত করেছেন সেখানে কোন হিসেবে বাঙালি সংস্কৃতির বয়স এক হাজার বছর ধরেছেন সেটা আজগুবি একটা ব্যাপার যা অবশ্য তিনি সুন্দরভাবে বলেও দিয়েছেন (পৃষ্ঠা ১৮)।

৩.

অর্বাচীন পাঠক হিসেবে নিজেকে বিপন্ন মনে হয় যখন দেখি লেখক নিজেই যে কথা বলেছেন একটু পর পুরোপুরি উল্টাপাল্টা কিছু তুলে ধরতে দেখলে। মধ্য এশিয়ায় ইসলাম প্রচারের যে ‘তলোয়ারতত্ত্ব’ মর্মমূলে ধারণ করে বাংলার ইতিহাস লেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায় সেখানে শুরুতে লেখক শুনিয়েছেন একটু অন্যরকম কথা। আশাবাদী হলাম (পৃষ্ঠা ২৭)  ক্ষমতাশীর্ষের মুসলিম জনগোষ্ঠীর পেটে থেকে  হিন্দুরাজাদের প্রত্যক্ষ শাসনে দেশ পরিচালিত হওয়ার গল্প শুনে। ফকির মিসকীন মুসলিম জনগোষ্ঠী ধর্মপ্রচার নয়, এসেছেন দেশ দখল করে বড়লোক হতে (পৃ-২৯)। এই একই জিনিস নিয়ে লেখক ঘেমে নেয়ে একাকার সুলতানি বাংলার ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রেও(পৃ-৩৭)। একটা পর্যায়ে চমকে উঠেছি  স্বাধীন সুলতানি বাংলার হিন্দু রাজাদের ভূমিকা আগের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার বিপরীতে তরবারি দিয়ে ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরিত করার অনুমান দেখে (পৃ-৬৪)। একই পাতায় নিজের শ্রী শ্রী চণ্ডিচরণ পরায়ণস্য নাম নিয়ে রাজা গণেশের উত্থাপর্বকে সুন্দরভাবে আড়াল করে লেখক পিণ্ডি চটকে দিয়েছেন সুফি নূর কুতুব আলমের। উনার কথা মেনে নিলে সুলতানদের হয়ে হিন্দু রাজাদেরই তো হিন্দু নিধনে তরবারি ধরার কথা। যুগপর্বের নামকরণেও বিপদজনক পরিস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে। মোগল শাসনপূর্ব সময়কাল তাঁর হিসেবে ‘ইন্দো-মুসলিম’ আমল। তারপর কোনো কাঠামোগত ধারণার উপযুক্ত উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ বাদে মোগল আমলে এসে তিনি বাংলায় উপনিবেশিক শাসনের শুরু বলে দাবি করেছেন।

‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ গ্রন্থে তিনি যাদের স্থানীয় বলে দাবি করেছেন তাদের আদি নিবাস ভারতের কর্ণাটক। ফলে বৌদ্ধ থেকে হিন্দু তারপর মুসলিম শাসনে স্থানীয় করণের যে প্রকল্প সেখানে উপযুক্ত ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। অন্তত পাল শাসকরা সরাসরি বরেন্দ্রকে ‘জনকভু’ বলে দাবি করেছেন যা তাদের স্থানীয়তার প্রমাণ। পুরো বই পড়ে কোথাও পালদের এই স্থানীয় দাবিকরণের সূত্রটিকে খুঁজে পাইনি। পরের অধ্যায়ে প্রাচীন বাংলার সমাজ ও ধর্মের ইতিহাস আলোচনায় তিনি এই একই রকম জটিলতার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছেন।

সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ নিয়ে এই গ্রন্থের পর্যালোচনা উপর্যুপরি বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে। বহিরাগতদের সাথে বাংলার আদিবাসীদের সমন্বয় ঘটাতে তিনি আলোচনায় যতগুলো তথ্য ব্যবহার করেছেন, তার সবগুলোই হয় বৌদ্ধ থেকে হিন্দু ধর্মে (মৌর্য যুগের শেষাংশ থেকে গুপ্ত যুগ) বা হিন্দু থেকে বৌদ্ধ ধর্মে (পাল যুগে), আবার বৌদ্ধ থেকে হিন্দু ধর্মে (সেন যুগে) এবং সর্বশেষে ইসলাম ধর্মে (সুলতানি যুগে) পরিবর্তনের কথা। এখানে আদিতে  যারা ছিলেন তারা ভোজবাজির মতো গায়েব হয়ে গিয়েছেন। বানভট্টের হর্ষচরিত এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণনা থেকে গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের কপালে বৌদ্ধ দলনের যে কলঙ্ক তিলক উঠেছে তা ধীরে ধীরে আরও প্রকট হয়েছে এ গ্রন্থ থেকে(পৃ-৫২)। তবে বৌদ্ধ থেকে হিন্দু কিংবা হিন্দু থেকে বৌদ্ধ ধর্মের রূপান্তর ও ধর্মান্তরকরণে তুলনামূলকভাবে নীরব থেকে বেলা শেষে সাপের মতো ফণা তুলেছেন তিনি, বলেছেন ‘বাংলায় ইসলামধর্মের বিস্তার জবরদস্তিমূলক’। কিন্তু ভাবলে অবাক হতে হয় তিনিই বলেছেন মুসলমানরা বাংলায় ইসলাম প্রচারের জন্য আসেনি।

যাই হোক নামকরণের বিচারে একটি কথা না বললেই নয় বইটির নাম হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। কিন্ত লেখক বাঙালি সংস্কৃতির সূচনাপর্ব হিসেবে ধরছেন সেন শাসনামল থেকে (পৃ-৫৮)। যদিও কর্ণাটক থেকে আগত সংস্কৃত ভাষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক (পৃ-৫৯) সেনরা কিভাবে বাঙালি এবং তাঁর ভাষ্যে ‘স্থানীয়’ এই ব্যাখ্যা অনুপস্থিত রয়ে গেছে অজ্ঞাত কারণে। আগের পৃষ্ঠায় তিনি বললেন সেনরা নিঃশব্দে এসেছেন, মুসলমানরা এসেছে চকিতে (পৃ-৬২)। খেই হারিয়ে পরের পাতাতেই তিনি বলছেন পূর্ববঙ্গ-সহ পুরো বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে ধীরে ধীরে ইসলামের ছড়িয়ে পড়ার গল্প (পৃ-৬৩)। পাঠক হিসেবে এ দুই পাতার কোন কথাটি গ্রহণ করতে পারি তা নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তার দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছি।

হাজার বছরের সংস্কৃতির মজার অংশটি খেয়াল করি বাংলায় ইসলাম প্রসারের চারটি মতবাদের কথা উল্লেখের মধ্য দিয়ে। রাজশক্তি, সাম্যবাদী চিন্তার প্রভাব, বাইরে থেকে মুসলমানদের দলে দলে বাংলায় আগমন, এবং সুফিদের ব্যাপক ধর্মান্তর। তাঁর বর্ণনার ক্ষেত্রে সূত্র অনুপস্থিত থাকলেও রিচার্ড ইটন (১৯৯৩) কিংবা অসীম রায়ের বর্ণনায় এগুলো ঘুরে ফিরে এসেছে। এই গ্রন্থে লেখক প্রতিটি বিষয় বর্ণনায় কোনো কাঠামোবদ্ধ চিন্তা ও তথ্যসূত্রনির্ভরতার ধার না ধেরে নিজের মত আলোচনাকেন্দ্রিক যথেচ্ছাচারে পূর্বানুমানগুলোকে বাতিল করেছেন। আর সেখানে মুসলমান শাসকদেরকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হিন্দু-নিপীড়ক হিসেবে দেখানো অনেকটা তার জন্য বাধ্যতামূলক পূর্বানুমান হয়ে দেখা দেয়। জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অধিকৃত এলাকায় মন্দির তৈরি না-হওয়া (পৃ-৬৪), পরাজিতদের ইসলাম গ্রহণের শর্তে মুক্তিদান (পৃ-৬৮), স্থানীয় মেয়েদেরকে ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক বিয়ের (পৃ-৬৯) মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। ফলে একই গ্রন্থে লেখক তলোয়ার তথা রাজশক্তির জোরে জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তর’ মতবাদকে গ্রহণ ও বর্জন করছেন নিজের পছন্দ ও প্রয়োজন সামনে রেখে’।

সুফিদের হাত ধরে বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে তত্ত্বায়ন সেটার সঙ্গে মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস গবেষক মাত্র জেনে থাকবেন রিচার্ড ইটনের (Richard Maxwell Eaton) নাম। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে (The rise of Islam and the Bengal frontier, 1204-1760) তিনি বাংলায় ইসলাম প্রচারের এই ধারণাটির বিশ্লেষণের প্রয়াস নিয়েছেন। গবেষণা কিংবা প্রকাশনায় একটা স্বীকৃত রীতি হলেও লেখক এ গ্রন্থে কোথাও রেফারেন্স হিসেবে সেই কথাটি উল্লেখ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা কিভাবে বেড়ে গিয়েছিল তা ব্যাখ্যা করার জন্য ঐতিহাসিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সুনির্দিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন ইটন। অজ্ঞাতকারণে লেখক এই গ্রন্থে গবেষণামূলক সেই অংশকে বাদ দিয়েছেন কোনোরকম খণ্ডণ ও যুক্তিতর্কের উপস্থাপন বাদেই। (পৃষ্ঠা 68)।

এখানে ‘Mass Conversion to Islam: Theories and Protagonists ’ শীর্ষক অধ্যায়ের উপসংহারে ইটন লিখেছেন ‘ If large numbers of rural Muslims were not observed until as late as the end of the sixteenth century or afterward, we face a paradox—namely, that mass Islamization occurred under a regime, the Mughals, that as a matter of policy showed no interest in proselytizing on behalf of the Islamic faith. Ruling over a vast empire built upon a bottom-heavy agrarian base, Mughal officials were primarily interested in enhancing agricultural productivity by extracting as much of the surplus wealth of the land as they could, and in using that wealth to the political end of creating loyal clients at every level of administration. Although there were always conservative ‘ulamā who insisted on the emperors’ “duty” to convert the Hindu “infidels” to Islam, such a policy was not in fact implemented in Bengal, even during the reign of the conservative emperor Aurangzeb (1658–1707). Our attention must therefore turn to the Mughal period in Bengal. Was it merely coincidence that the bulk of the delta’s peasant Muslim population emerged after the advent of Mughal rule, or did deeper forces link these two phenomena?’ আর এই অংশটি পুরোপুরি এই বইতে ব্যবহৃত হলেও কোনো রেফারেন্স আমরা পাই না।

শুরুতেই ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ প্রপঞ্চের উত্থাপন যে হেজিমনি সামনে রেখে করা হয়েছিল সেটা থেকে বের হওয়ার কোনো প্রবণতা পুরো বইতে চোখে পড়েনি। খুব সম্ভবত, লেখক  ‘বাংলাকে অখণ্ড এবং আবহমান কাল ধরে রূপান্তরের ধারায় চিত্রিত করতে চেয়েছেন’। তাই বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ও তাঁর কাছে বাংলা বিজয়, ইসলাম খানের ঢাকা জয়ও বাংলা জয় আর পলাশী যুদ্ধ এক অর্থে বাংলা ও বাঙালির যুদ্ধ। আর এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়তো ইচ্ছে করেই তিনি ইটন (Richard Maxwell Eaton) প্রদত্ত বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান সমাজের উদ্ভবের প্রক্রিয়াটা এড়িয়ে গেছেন। বইয়ের পরবর্তী অংশে লেখক যখন বাংলার রেনেসাঁ, বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ এবং দেশবিভাগের আলোচনা করেছেন সেখানেও তাই পূর্ব বাংলার সমাজ সংস্কৃতি যেখানে উপেক্ষিত তার বিপরীতে পশ্চিম বাংলা এবং কলকাতা প্রখর জ্যোত্যি নিয়ে জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের রূপ ধারণ করে। তার বর্ণনায় পূর্ববঙ্গকে অনেকটা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে বারংবার খুঁজতে হয় আলোচনার ছিঁটেফোঁটায় যুক্ত থাকার সুবাদে।

প্রেম ভালবাসা, প্রণয় থেকে পরিণয় আর পরিবার প্রতিটি ক্ষেত্রে  লেখক যে আলোচনা হাজির করেছেন সেখানেও পূর্ববঙ্গ অনেকটা ভোজবাজির মতো গায়েব। আর পূর্ববঙ্গের আলোচনায় কুশীলব থেকে কলাকুশলী সবটাই ওপারের তথা কলকাতাকেন্দ্রিক। ভাষা হিসেবে বাংলার প্রতি অগাধ আবেগী অবস্থানকে তাঁর হিসেবে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট রচনা করেছে(পৃ-১৮৯)। পশ্চিমবঙ্গের বর্ণহিন্দু বাঙালিদের পূর্ববঙ্গের মুসলমান জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালি বলে স্বীকার না করার কথাটি কিন্তু তিনিই বলেছেন। পাশাপাশি নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের কাছেও পূর্ববঙ্গের সাধারণ মুসলমানদের বাঙালি মনে না করার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। এই যুক্তিপ্রমাণক আরো শক্ত করা যেতে পারে বিভিন্ন বিদেশী পর্যটকের বিবরণে। এখানে ‘বাঙালি মুসলিম’ সত্তাকে বাঙালি হিন্দু এবং অভিজাত মুসলমানদের থেকে আলাদা সত্তা হিসেবেই আবিষ্কার করা যায়। তাই কোন তথ্যের ভিত্তিতে লেখক অখণ্ড বাঙলার কথিত ‘হাজার বছরের বাঙালি’ কে খুঁজে নিয়েছেন সেটার ব্যাখ্যা তিনি বইয়ের কোথাও উত্থাপন করেননি।

 

 

বইয়ের নাম ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ কিন্তু লেখক অদ্ভুতভাবে বাঙালি সত্তার অন্বেষা শুরু করেছেন সেন আমল থেকে। বাংলার ইতিহাস ও জাতিসত্তার বিকাশ থেকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আমরা দেখি লেখকবর্ণিত স্থানীয় সেন যাদের তিনি আদি বাঙালি হিসেবে উত্থাপন করতে ইনিয়ে বিনিয়ে চেষ্টা করেছেন তাদের আদি নিবাস ভারতের কর্ণাটক। অন্যদিকে যে পালরা সত্য মিথ্যা যেই হোক বরেন্দ্রকে ‘জনকভু’ তথা পিতৃভূমি দাবি করেছেন সে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ এখানে অদ্ভুতভাবে অনুপস্থিত। তিনি বাঙালি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে সমন্বয়ধর্মিতার (পৃ- ৫০২) কথা দাবি করলেও বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিয়ের অগ্রহণযোগ্যতার বর্ণনা দিয়ে নিজেই নিজের বর্ণনাকে খারিজ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে যাপিত জীবনে ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহার, আত্মীয়-সম্বোধনে নানা বৈপরিত্য থেকে শুরু করে সামাজিক আচারানুষ্ঠানের ভিন্নতা (পৃ-৫১৬) তাঁর সাংস্কৃতিক পূর্বানুমানকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে শুধু পাশাপাশি থাকার মধ্যেই।

প্রত্নতত্ত্ব, নৃ-বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক ধারণা তো বটেই আশির দশক থেকেই সংস্কৃতিকে পরিবেশের সাপেক্ষে মানুষের অভিযোজনের অর্জন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। লেখক পুরো গ্রন্থের শুরু কিংবা শেষে এই কথাটিকে এড়িয়ে গিয়ে দাবি করলেন ‘সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রদান দুরূহ’। তিনি সাহসে ভর করে পাঠের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি কি তা পাঠকের উপলব্ধিতে আনার ঘোষণা দিয়ে লেখা শুরু করলেও হয়তো মাঝপথে গিয়ে ভুলে গিয়েছেন। এক্ষেত্রে অস্পষ্ট আলোচনায় স্ববিরোধী যুক্তি উত্থাপন, লভ্য তথ্যসূত্রের খেয়ালখুশি ব্যাখ্যাদান থেকে শুরু করে বক্তব্যকে তথ্যপ্রমাণের বাইরে ফেলে নিজের মতামতকে চাপিয়ে দেয়ার যে প্রবণতা তা সংস্কৃতি বিষয়ক উপলব্ধিকে স্পষ্ট করার বদলে বিমূর্ত করে তুলেছে।

তথ্যসূত্রের ভারে ভারাক্রান্ত গ্রন্থটির এক একটি অধ্যায় লেখক নিজের যেখানে খুশি শুরু এবং শেষ করেছেন। অন্যদিকে কোনো অধ্যায়ের শেষাংশে সংক্ষিপ্ত উপসংহার না থাকায় ঐ অধ্যায়ে তিনি আদতে কি বক্তব্য উপস্থাপন করলেন সেটা উদ্ধার করাও অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। তিনি নিজেই মুসলিম শাসনের সময় হিন্দুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানের কথা বলে পরক্ষণে আবার লিখেছেন হিন্দুদের উপর বহিরাগত আক্রমণকারী হিসেবে মুসলমানদের ভয়ানক ভূমিকার কথা। রিচার্ড ইটনের তত্ত্বকে অনেকটা নিরর্বতনমূলক ব্যবহারের চেষ্টা করলেও সহায়ক সূত্র হিসেবে গ্রন্থটির নামের অনুপস্থিতি সার্বিকভাবে হতাশাজনক। বিশাল তথ্যস্তূপ নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ক্লান্ত লেখক হঠাৎ বইটি শেষ করার তাড়না অনুভব করেছেন। ফলে তিনি তাঁর সার্বিক বক্তব্যকে উত্থাপনের চেষ্টায় যে উপসংহার টেনেছেন তা অনেকাংশে প্রচণ্ড গতিতে চলতে থাকা গাড়ির হঠাৎ ব্রেক কষার শামিল। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে পরিচিত, জননন্দিত, অবস্থানগত শক্তিমত্তা বিচারে অনন্য ও সর্বজনবিদিত গবেষকের সংস্কৃতিপাঠ ও ইতিহাসবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে যে সুবিশাল পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয় একজন অর্বাচীন গবেষক হিসেবে তা আমার নিতান্ত সীমিত। তাই ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ শীর্ষক গ্রন্থে বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভব, উন্মেষ ও বিকাশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় ব্যাখাদানের যে ব্যার্থতা সেগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছি। তাই পাঠপর্বে লেখকের বয়ানের যে স্ববিরোধীতাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি তার কাঠামোগত উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। এজন্য প্রাজ্ঞ লেখক, তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক এবং বিজ্ঞ সুধীজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। পাশাপাশি ‘বাঙালি সংস্কৃতিকে জানার ক্ষেত্রে এই বইটাকে অসম্পূর্ণ এবং অপরিপক্ব’ বলার মতো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি না। তবে এই বই পাঠের ক্ষেত্রে একজন গবেষকের অবশ্যই সতর্ক থাকাটাকে জরুরি মনে করছি।

(Visited 304 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *