গাঁজাখোরের সত্ত্বাতত্ত্ব ও পরিচিতির রাজনীতি

হাসান মাহমুদ

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক হাসান মাহমুদের  ‘Drug addiction and identity politics: the spiritual use of ganja in Bangladesh’ শীর্ষক নিবন্ধটি পড়ে শেষ করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্বের অভিসন্দর্ভ প্রস্তুতকরণের উদ্দেশ্যে তিনি এই গবেষণাটি করেছিলেন ২০০৩-০৪ সালের দিকে। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের মতো সময়কাল পার করে এসেও নানা দিক থেকে গবেষণাটি গুরুত্ব হারায়নি। প্রকাশক Routledge এর ব্যানারে Contemporary Justice Review, Vol. 11, No. 4, December 2008 জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে লেখাটি পড়ার সুযোগ হয়েছে।

পরিচিতির রাজনীতি অনুসন্ধানে দুটি মূল উদ্দেশ্য সামনে রেখে গবেষণাকর্মটি সম্পাদিত হয়েছিল। এখানে সত্যের বহুধা বিভাজিত ভিন্ন প্রকৃতি অনুসন্ধানের নিমিত্তে গাঁজাখোরদের স্বভাবের পাশাপাশি তাদের আচরণের নানামুখী বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোন বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে গাঁজাখোর হিসেবে তাদের সামাজিক পরিচয় গড়ে উঠছে তারও ময়নাতদন্তের চেষ্টা করেছেন গবেষক। তাই শক্তিশালী সামাজিক অবকাঠামো ও অধিপতিশীল ডিসকোর্সের অধীনে পরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা কিভাবে প্রান্তিক হয়ে ওঠে এ গবেষণায় তার স্পষ্ট হয়েছে। আধ্যাত্মিক বিষয়কে যুক্ত করে গাঁজাখোরদের গাঁজাসেবনকে বৈধ করে তোলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমাজে অধিপতিশীল ডিসকোর্সের যে দ্বৈততা পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে গবেষক তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন।

বিভিন্ন মাজার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নানা স্থানে গাঁজার ব্যবহার নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। গবেষণাটিতে স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহারকে একটা সহজবোধ্য ও স্বাভাবিক সামাজিক সমস্যা হিসেবে পরিচিতি দেয়া হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইনে সব ধরনের মাদকদ্রব্যবহন নিষিদ্ধ। অন্যদিকে এসব মাদকের ব্যবহারকারী, ব্যবহারের প্রকৃতিগত রকমফের, ব্যবহারের কারণ, ফলাফল কিংবা আনুসাঙ্গিক সবকিছু অভিন্ন।

ব্যবহারিক আঙ্গিক হতে তেমন কোন পার্থক্য না থাকায় দেশের মাদকবিরোধী আইনও করা হয়েছে ঠিক এভাবেই। এখানে উদ্দেশ্য ও ব্যবহার যাই হোক যেকোন মাদকদ্রব্য বহন, সেবন ও সংরক্ষণ বে-আইনী এবং অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখানে প্রায় প্রতিটি মাদকদ্রব্য ও তার ব্যবহারকারীকে স্থান-কাল-পাত্রভেদে অভিন্ন মনে করা হয়। মূলত সিংহভাগ মাদকের ক্ষতিকর ব্যবহারের শারীরিক ও সামাজিক প্রেক্ষিতে যে অশুভ পরিণতি তা দেখে ধরে নেওয়া হয় সব ধরনের মাদকদ্রব্য ক্ষতিকর। এর সঙ্গে জড়িত কর্মকাণ্ডকে রুখে দেয়াটা তখন যেমন নৈতিক দায়িত্ব মনে হয়, তেমনি মাদকাসক্তের কার্যকলাপ দেখে তাদের সবাইকে এবং সব ধরণের কর্মকাণ্ডকে অসামাজিক বলে চিহ্নিত করা হয়।

দেশের প্রচলিত আইন, সমাজের প্রথা ও ধর্মীয় বিধি বিধানে মাদকদ্রব্য যেমন ক্ষতিকর উপাদান হিসেব চিহ্নিত তেমনি প্রত্যেক মাদকসেবী নিজে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষগুলোরও ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। ফলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিকতায় সমস্ত মাদক নিষিদ্ধ ও মাদকসেবীদের প্রতিহতকরণ অনেকটা নৈতিক দায়িত্ব হয়ে যায়। সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির উদ্দেশ্য হিসেবে মাদকসেবীদের পথে আনতে নানা ধরণের চেষ্টা চলে। তাদের মানসিকভাবে নিরস্ত্র করা, প্রয়োজনে মারপিট ও জেল-জরিমানা অবধি হয়ে যায়। এখানে স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ও উহ্য থেকে যায়।

গাঁজার গাছ

পুরাণ, বেদ ও উপনিষদের গল্প থেকে শুরু করে লোকসাহিত্য বাংলার স্থানীয় নেশাদ্রব্য হিসেবে বহুল প্রচলিত হচ্ছ গাঁজা। দেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় প্রকাশ্য বাজারে বিক্রি না হলেও বিভিন্ন মাজারে এই গাঁজা বহুল আলোচিত, সমালোচিত, অনুসৃত ও ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তিবিশেষের কাছে পরম আরাধ্যও বটে। গবেষক এই মাজারকে গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করেছেন। সেখানে তিনি প্রাথমিক সূত্র থেকে গবেষণার চেষ্টা করেছেন। উপযুক্ত পদ্ধতি ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে গবেষক দেখিয়েছেন প্রাচ্য ও পশ্চিমের দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতিগত গল্পগুলোতে যেমন  পরিচিতি সংকট রয়েছে গাঁজাখোরদের মধ্যেও তা নিবর্তনমূলকভাবে প্রবল ও অধিপতিশীল। আর সে হিসেবে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও অনুশীলনগত প্রেক্ষিতে পরিচয়গত সংকটের স্বরূপ সন্ধানে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ।

(Visited 113 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *