কেরালার হাতিহত্যা, কালাভাই ফ্লয়েড এবং…

গরুর লেজের সঙ্গে টিন কিংবা ইঁট বেঁধে দেওয়া, মুরগিকে ঢিল মারা, রাজহাঁস দেখলে তাকে কঞ্চি দিয়ে মারা কিংবা কুকুরের পুচ্ছদেশে স্পিরিট ঢেলে দেওয়া আবহমান বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। আমরা তিন ভাই সেই শৈশব থেকে বাড়ির ছাগলগুলোকে অনেকটা পরিবারের সদস্যদের মতো আদর যত্নে পালন করি। আমাদের মোরগগুলোকে বেশিরভাগ সময় ছেড়ে রাখা হয় ওরা চান্স পেলে লাফ দিয়ে ঘাড়ে পর্যন্ত ওঠে।

খেয়াল করে দেখেছি অতি সচেতন প্রতিবেশীদের এটা সহ্য হয় না। তারা চান্স পেলে আমাদের মোরগগুলোকে ঢিল মারে। ছাগলের কানে লেবু-বরই-বেলের কাঁটা ফুটিয়ে দেয়। কারণ মানুষ দেখে ভয় না পাওয়া ছাগলের কান ধরা খুব কঠিন কিছু না। অপছন্দনীয় যেকোনো ঘটনায় মাথা গরম করা আমার শৈশব থেকে লালিত বদভ্যাসের একটি। আর সবথেকে বেশিবার আমার এই মাথা গরমের শিকার হয়েছে পাখি শিকারীরা।

আমরা সবাই জানি যে পাখি শিকার হিংস্রতা। কেউ সুন্দর সুললিত কণ্ঠে ভোর থেকে কুহতান তোলা কোকিলকে যদি গুলি করে মেরে ফেলে তবে তাকে মানুষ না বলে হায়েনা বলাটা অন্যায় নয়। কেউ ছোট্ট পলকা একটা দোয়েলকে যদি তার নামমাত্র মাংসের জন্য গণহারে হত্যা করে সে নিকৃষ্ট নেকড়ের অধম। একইভাবে আমার বাড়ির আঙ্গিনায় মোরগ-মুরগিদের সঙ্গে একইরকম যত্নে লালিত শালিক-চড়ুই-ঘুঘুদের কেউ যদি এয়ারগান দিয়ে গুলি করে তবে তাকে হত্যা করাও আমার কাছে অপরাধ মনে না হওয়াটা অনেকাংশে স্বাভাবিক বটে।

পাখিদের প্রতি মায়া দেখানো ভাল। কিন্তু পাখি শিকারীদের সোজা করতে গিয়ে আমি নিজেই কি কাজটা খুব ভাল করেছি। শুধু মাত্র এয়ারগান দিয়ে গুলি করে একটা শালিকের পাখনা ভাঙ্গার শাস্তি হিসেবে টানা এক ঘণ্টার মতো পিঁপড়ার গর্তের উপর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখাটাও তো হিংস্রতা। একই ভাবে শিকার করা চড়ুই কেড়ে নিয়ে হা করিয়ে ‍মুখে ভরে দেয়াটাও অবশ্যই কোনো সভ্য মানুষের কাজ নয়। কিংবা ঘুঘুর দিকে বন্দুক তাক করার শাস্তি হিসেবে গণগনে কয়লার উপর ঠেসে বসিয়ে দেয়াটাও জিঘাংসার চরম বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে পানকৌড়ি হত্যাকারীর শাস্তি হিসেবে তাকের সুপারি গাছের সঙ্গে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে জামার মধ্যে টিকটিকি-তেলাপোকা ছেড়ে দেওয়াটাও নিঃসন্দেহে ভয়াবহরকম হিংস্রতা।

কিন্ত সমস্যা কোথায় জানেন যেই অমানুষগুলো অহেতুক পাখি হত্যা করত আত্মতৃপ্তির জন্য তারা কখনই নিজেদের দোষ স্বীকার করবে না। তারা বলবে সামান্য পাখি হত্যার জন্য তাদের পশ্চাৎদেশে আগুণের ছেঁকা দেওয়াটা অন্যায়। মুখের মধ্যে মরা পাখি ঠুসে দেয়াটা পাশবিক কিংবা ভয়ানক লাল পিঁপড়ার গর্তের উপর দাঁড় করিয়ে রাখা অমানুষের কাজ। কিংবা তারা আরও বলবে কোনো মানুষ কাউকে বেঁধে জামার মধ্যে টিকটিকি তেলাপোকা ছেড়ে দিতে পারে?

আমার শিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম Shahnawaz Akm স্যারের দরজায় ঢুকতেই দেখা যেত হাড্ডিসার একটা কুকুর সারাদিন বসে থাকে। স্যার বাইরে কোথাও বেড়াতে বের হরে কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে স্যারের পেছন পেছন যেত। একইভাবে ঐ রোগা পটকা কুকুরটা শ্রদ্ধাভাজন খালেদ হোসাইন স্যারের পরিবারের সবার কাছে অনেক প্রিয় ছিল। এক জঘন্য সকালে এই দুই পরিবার আবিষ্কার করলেন ঐ কুকুরটাকে কারা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। আমার কাছে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কারণটা এখনও অজানা।

জয়দেবপুরে আমার বাসার নিচে তিনটা ক্যাবলাকান্ত টাইপের কুকুর বসে থাকে, আমি ওদের লালু, কালু এবং ভুলু ডাকি। এর মধ্যে লালু নামের কুকুরটা একটু বেশি আহ্লাদী টাইপের। সে সামনের পা তুলে অদ্ভুতভাবে আমি, আমার ছোট ভাই কিংবা ছোট চাচার কাছে খাবার চায়। অল্প দিনে তারা আমাদের পোষা প্রাণির মতো হয়ে গেছে। একদিন খেয়াল করলাম ঐ লালুকেই কোন তস্কর দা দিয়ে কোপ করে মাথার খুলি বের করে দিয়েছে। আমি অনেক চেষ্টা করলাম কে এই কাজটা করেছে তাকে খুঁজে বের করতে। হয়তো তাকে খুঁজে পেলে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কিংবা সহকারী অধ্যাপক পদবী ভুলে গিয়ে সোজা সাপ্টা তার ঘাড়ে এমনি একটা বাড়ি মেরে দিতাম ভারী কিছু দিয়ে। আদতে হিংস্রতায় আমরা কেউ কি কারও থেকে কম? আসলে পুরোটাই সাপেক্ষিক।

কেরালায় হাতি শিকার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রর কালাভাই জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর আমরা কেউ কেঁদে কেটে বালিশ ভিজিয়ে প্রতিদিন সকালে আবেগের রোদ্দুরে শুকিয়ে নিচ্ছি। কিন্ত প্রতিদিন এমনি কত হাতিঘোড়া হত্যার হিংস্রতা হৃদয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াই সেটা কি কেউচিন্তা করেছি। আসলে মানুষ যা দেখে আদতে তার উল্টোটা ঘটে বাস্তবতায়। কারণ আয়নায় তাকালে মানুষ দেখে তার বিপরীত অবস্থান তথা প্রতিবিম্ব। আর সব সংকটের শুরুটা সেখানেই।

আজ স্বামীর প্রতি সবসময় সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মেয়েটা তার পাশের বাসার ছাদে কসরৎ করতে থাকা হোঁৎকামুখো পেশীবহুল লোকটার শরীর নিয়ে অশুভ কল্পনা করে ঠিকই। সারাদিন বাবু খাইছো বলে মাতম তোলা ঢঙ্গী মেয়েটাও সানি লিওনি উর্বশী রাউতেলা কিংবা নোরা ফাতেহির ফেসবুক পেইজ লাইক দেয়ার অপরাধে তার কথিত বাবুর সঙ্গে ব্রেকআপ করে। কিন্ত গভীর পর্যবেক্ষণে বোঝাবে ঐ ঢঙ্গী নারী লেপ মুড়ি দিয়ে জন আব্রাহাম, জেসন মমোয়া কিংবা জাস্টিন ট্রুডোর ছবি দেখে উহ আহ করে।

তাইতো সমস্যার বীজটা অনেক গহিনে গ্রোথিত। আমরা বিয়ে করতে গেলে সব সময় নিজে তিনফুট নাকি চারফুট সেটা না দেখে লম্বা মেয়ে খুঁজতে যাই। নিজে জর্জ ফ্লয়েডের আপন বড় ভাই হয়েও বিয়ে করতে গেলে মারিয়া শারাপোভা না হোক নিদেনপক্ষে সানিয়া মির্জা খুঁজে বেড়াই। তারপর একবার বিয়ে হয়ে গেলে নিজে জনি ভাই স্টাইলে ঘোরার পরেও চাওয়া পাওয়া থাকে নিজের বউ হবে এ আর রহমানের কন্যা খাতিজা রহমানের মতো। ঠিক তার বিপরীতে বারো পুরুষের পাত থেকে ভাত খাওয়া নারীও নিজের স্বামী হিসেবে অলি আউলিয়া লেভেলের কাউকে চাইবেন।

বর্ণবাদ, সহিংসতার থেকে বড় হিংস্রতা যে আমাদের দ্বিচরিতা এটা আমরা কেউ বুঝতে চাইনি, বুঝি না হয়তো বুঝবোও না। ফলে আমরা নিজেদের জায়গা থেকে অকাজ করে যাবে। আমরা বর্ণবাদী আচরণও বাদ দেবো না। কিন্ত বেলা শেষে জর্জ ফ্লয়েডের গলায় হাঁটু ধরা আমেরিকাকে ধুয়ে দিয়ে নিজের সব পাপের শাপমুক্তি খুঁজবো কিংবা কেরালার হাতিহত্যায় গোত্তা মেরে নিজের সব হিংস্রতাকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টাও চালিয়ে যেতে থাকব অবলীলায়। আল্লাহ আমাদের সবাই এ ধরণের মুনাফেকি চিন্তা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন, আমীন।

(Visited 112 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *