মহামারীর মিথ ও মিথষ্ক্রিয়ায় করোনাক্রান্তিকাল

গণকবর

আধুনিক রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও মহামারী বিস্তারের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি করোনা সংক্রমণে নুয়ে পড়া ইতালির অতীত অনেক মহামারীর চিহ্ন বহন করছে। এই ধরণের নানা রোগ থেকে নাগরিকদের নিরাপদে রাখতে পনেরো শতকের দিকে ইতালির সিটি স্টেট ‘বোর্ড অব হেলথ’ গঠন করেছিল।  তারা প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই এই বোর্ড গঠন করে বলে অনেকের অনুমান। এরপর উনিশ শতকের কলেরা ছড়িয়ে পড়ার পরেও একইভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়া হয়। আক্রান্ত মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সবার জন্য টিকা ও ভ্যাক্সিন নিশ্চিত করা হয়। রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পর্যন্ত পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু তাদের এ পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করে থাকতে পারে।

ঘনবসতির পাশাপাশি জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সংক্রামক রোগ আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত বাদে এর প্রাদুর্ভাব অতটা প্রকট হতে পারে না। ফলে কোনো সংক্রামক রোগ মহামারীতে রূপ নিতে গেলে ঐ অঞ্চলে ঘনবসতি ও প্রচুর জনসংখ্যার পাশাপশি তাদের সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত থাকা লাগে। যেমন, সম্প্রতি ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ দিয়ে এটার সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যায়। চীনের উহান থেকে অন্য প্রদেশে যে যাতায়াত তার মাধ্যমেই করোনা ভাইরাস পুরো চীনকে আক্রান্ত করেছে। এরপর বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে চীনের যে যোগাযোগ তার মাধ্যমে এই সংক্রামক রোগ রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক মহামারীতে। ইউরোপের নানা দেশ যেমন ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে গিয়ে এর ভয়াবহতা আঁচ করা গেছে চূড়ান্তভাবে। একইদিক থেকে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রকে সংক্রমিত করার পর এই রোগের ভয়াবহতা সব সীমানা অতিক্রম করেছে। এক্ষেত্রে  চীনের সঙ্গে ওইসব দেশের যোগাযোগ না থাকলে এই রোগ কোনোভাবেই সেখানে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হরণ করতে পারতো না।

ভুতুড়ে চিকিৎসা

মানুষের স্থায়ী আবাসন তৈরির পর সভ্যতার ইতিহাসে যখন তারা প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্য শুরু করেছিল তখন থেকেই এই ধরনের রোগের বিস্তার। এক দেশের মানুষ বাণিজ্যিক কারণে অন্যদেশে গিয়েছে। তখন তাদের বাণিজ্যিক উপকরণের পাশাপাশি রোগের জীবাণু ও সংক্রমণও স্থানান্তরিত হয়েছে। সংক্রামক রোগের টিকে থাকার জন্য বাহকের প্রয়োজন হয় যেখানে একজন মানুষ থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমণের মাধ্যমে তা টিকে থাকে। কিন্তু একজন সংক্রমিত মানুষ যদি আরেকজন সুস্থ মানুষের সংস্পশে না আসেন, তবে সেখানেই এর কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিটি যদি মারা যান কিংবা তার শরীরে প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি হয় দুইভাবেই রোগের নির্মূল ঘটতে পারে। যেমন, গুঁটিবসন্ত এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশ্বের নানা দেশের মানুষের জন্য এখনও ভয়াবহ মরণব্যাধি। তাদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধের উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। এমনকি উপযুক্ত টিকা ও ভ্যাক্সিন দেয়ার পরেও সেখানে এই দুটি রোগের তাণ্ডবলীলা কমেনি। একইভাবে ১৪ শতকের দিকে বিশ্বের নানা দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে প্লেগ বিস্তারের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ১৮ শতকের শিল্পায়নের যুগে ইউরোপের জনবহুল শহরগুলো হয়ে ওঠে যক্ষ্মা ছড়িয়ে পড়ার প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের নানা দেশে এইডস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে এক দেশ থেকে অন্যদেশে মানুষের যাতায়াতকে দায়ী করা হয়। আরেকদফা ইতিহাসের পাতা পেছন দিক থেকে উল্টালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা স্মরণ করতে হয়। তখন বিশ্বের নানা দেশে মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১৯১৮ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর বৈশ্বিক সংক্রমণ।

বিশ্বের নানা দেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ যার মাধ্যমে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গমন করে। এবার মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই সেটা নিয়ে লিখেছেন, মানুষকে সতর্ক করেছেন। তারপরেও মানুষ এগুলো থেকে সতর্ক না হয়ে বারংবার অনেকটা একইভাবে মহামারী ছড়িয়ে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের প্রাণহরণের স্বাক্ষী হয়েছে। মহামারীর প্রত্যক্ষদর্শী, রবার্ট লুই স্টিভেনসন কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো সাহিত্যিক, কবি, স্মৃতি লেখক, রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তি, আমলা, সাংবাদিক, ইতিহাস গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানী রোগতত্ত্ববিদ মহামারী বিষয়ে তাদের বিশ্লেষণ লিখে মানুষকে সতর্ক করেছেন। তারা মহামারীর প্রাদুর্ভাব থেকে এর বিস্তৃতির নানা কারণ নথিভুক্ত করলেও সেগুলো থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়নি। এমনকি অনেক ধর্ম প্রচারক মহামারীর ব্যাপারে তার অনুসারীদের সতর্ক করেছেন। তারপরেও মানুষ নিয়ম না মেনে একের পর এক মানব সভ্যতার জন্য বিপদ ডেকে এনেছে।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিশ্বের নানা দেশের মানুষকে তাদের জৈবিক দারিদ্র্যরেখার উপরে টেনে তুলেছে। তারপরেও বিশ্বের নানা স্থানের দুভিক্ষপীড়িত নিতান্ত কম নয়। গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এই দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের ঘটনা যতটা না প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটে, তার থেকে ঢের দায়ী স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টা। সংক্রামক রোগ থেকে সময়ের আবর্তে বৈশ্বিক মহামারী সৃষ্টির পেছনেও অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দায়ী। একজন মানুষ যেমন তার চাকরি হারালেই না খেয়ে মরে যায় না, তেমনি একটি স্থানে কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে  তা রাতারাতি কোনো কারণ ছাড়া মহামারীতে রূপ নেয় না। একজন চাকরিচ্যুত মানুষ তার বাঁচার অবলম্বন হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লাইফ ইন্সুরেন্স, স্কিম ও বীমা থেকে সাহায্য নিতে পারেন। কিন্তু সমন্বিতভাবে একটি দেশের প্রেক্ষিতে চিন্তা করতে গেলে পুরো পরিস্থিতিই বিপরীত।

আমরা আফ্রিকার প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। যে দেশে মূল্যবান ধাতুর খনির সংখ্যা বেশি, সেখানেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রায় সমানুপাতিক হারে বিরাজমান। অপেক্ষাকৃত অনুর্বর কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর এসব দেশের মানুষের যাই হোক অন্তত অনাহারে মরার কোনো কারণ নেই। তারপরেও তারা দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য তাদের কাছেই হাত পাতে যারা আদতে ওই দেশটি থেকে মূল্যবান সম্পদ যুগের পর যুগ ধরে লুটে নিচ্ছে। এইসব দেশে একবার খরা কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে তার থেকেও ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করে ব্যবসায়ীরা। তাদের সামান্য চেষ্টাতেই খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করে, বাজার থেকে গায়েব হয়ে যায় ওষুধ কিংবা প্রায় সব নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খুঁজতে গিয়ে বিপন্ন করে তোলে লাখো মানুষের জীবন। তাদের স্বার্থসিদ্ধির বলি হতে হয় অগণিত নিষ্পাপ নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুকে।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ কীভাবে একটি জাতিকে বিপন্ন করে তোলে উপযুক্ত উদাহরণ হতে পারে যুদ্ধরত বিভিন্ন দেশ, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি আক্রান্ত এলাকা কিংবা ঝড়ের কবলে পড়া জনপদ। সেখানে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কারণে যে দুর্যোগ তার থেকে উত্তরণ ঘটাতে বিশ্ববাসীর ত্রাণ তৎপরতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। এতে করে কিছু মানুষ প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষুধা আর অনাহার হয়ে ওঠে বেশিরভাগ মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই ক্ষুধা আর অনাহারের কারণ দায়িত্বে থাকা কিছু মানুষের সীমাহীন ক্ষুধা আর দখলদার মনোভাব। এরা সবকিছুই লুঠতরাজের মাধ্যমে নিজের করে নিতে চায়। আফ্রিকার একটি দেশে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা দেশে অনেক দেশের শিশুরা তাদের টিফিনের খরচ থেকে বাঁচিয়ে ত্রাণ পাঠায়। আর সেই ত্রাণ মেরে দিতে দেখা যায় সেখানকার কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা পাতিনেতাকে। ভয়াবহ শীতের তাণ্ডব থেকে অসহায় শিশুদের বাঁচাতে যে কম্বল বিশ্ববাসী বিপণ্ণ দেশগুলোতে পাঠায় একটা সময় সেগুলো গিয়ে শোভা পায় ওইসব দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বসার ঘরের কার্পেট হিসেবে। অনেকে গোশালা  কিংবা আস্তাবলে পশুকে রাখার স্থানেও ওই কম্বল বিছিয়ে রাখার প্রবণতা দেখায়।

তাই দুর্যোগে না হোক, তার থেকে সুযোগ নিতে চেষ্টাকারীদের অপতৎপরতার বলি হয়ে প্রাণ দিতে হয় অনেক অসহায়কে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো যেকোনো সংক্রামক রোগ ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরের বাস্তবতাও অভিন্ন। মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর কাউকে যেমন প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় লিপ্ত থাকতে দেখা যায়, অনেকে মানুষের এই দুর্বলতাকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে নিতে চায়। রোগ বিস্তারের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা যেমন প্রকট হয়, কেউ কেউ এর আড়ালে ওষুধ, টিকা ও ভ্যাক্সিনের বাণিজ্য বিস্তারের সম্ভাবনা খুঁজে ফেরে। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারী মানুষের জন্য যতটা না প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল তার থেকে স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টা এখানে শতসহস্র গুণ দায়ী। এই বিষয়টি থেকে শিক্ষা নিলে করোনা মহামারীর সময়ে রোগ প্রতিরোধ ও বিস্তার  থেকে মুক্তিচেষ্টার পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী স্বার্থান্বেষী মহলকে প্রতিহত করাটাও জরুরি। মোদ্দাকথায় বলতে গেলে, রোগ নিরুপণ, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন-ভেন্টিলেশনের পাশাপাশি ত্রাণের চাল, ডাল, গম, আটা, তেল ও লবণ চোরদের শক্তহাতে দমন করতে হবে। অন্যদিকে মজুদদারদের খপ্পর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের চাহিদা অনুযায়ী জোগান নিশ্চিত করতে হবে। কেবল রোগ প্রতিকার ও বিস্তাররোধের চেষ্টায় নিয়োজিত থেকে এই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব না দিলে করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্তি মিললেও মিলতে পারে, তবে দরজায় কড়া নাড়তে থাকা দুর্ভিক্ষ এড়ানোর পথ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে আমাদের জন্য।

(Visited 89 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *