গাবের বিচি, লক্ষণসেন এবং লটকন

১.
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবর্ষে ভর্তির অল্পদিন পর আমাদের প্রথম গ্রীষ্মের ছুটি। সবাই মনের আনন্দে বাড়ি চলে গেল। আমি আর বন্ধু তুষার বাড়ি যাইনি। আমরা গেলাম হাতে কলমে প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠকর্ম শেখার জন্য নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর। এখনকার মতো এমন আম-জাম-কাঠাল কলা পাকা প্রচণ্ড গরম পড়ছিল তখনও।
আদি ঐতিহাসিক যুগের প্রাচীন নিদর্শন, ঐতিহাসিক এক অজ্ঞাতনামা ইটের স্থাপত্য কিংবা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার নিয়ে উয়ারী-বটেশ্বরের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তখন ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রত্নতত্ত্ব বলতে গেলে উয়ারী-বটেশ্বর অদ্বিতীয় এক নাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সঙ্গে না ফুটেছে উয়ারীর স্কুল শিক্ষক হাবিবুল্লাহ পাঠান সাহেবের।
গাব

২.

আমরা স্যারের নির্দেশ মতো প্রত্নতাত্ত্বিক খনন স্থান থেকে প্রাপ্ত মাটি চালানি দিয়ে চেলে সেটার মধ্যে থেকে ক্ষুদ্র প্রত্নবস্তু উদ্ধারের চেষ্টা করছি। এই কাজ দেখে নানাবিধ মন্তব্য করে আমাদের উৎসাহ দিয়ে গেলে হাবিবুল্লাহ পাঠান। বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মিজানুর রহমান জামি তখন আমাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে মাটি পরীক্ষা করছেন; উদ্দেশ্য কোনো ধরণের প্রত্ন-উদ্ভিজ উপাদান সেখান থেকে উদ্ধার করা যায় কি না।
যাই হোক ঘণ্টা খানেক চালুনি দিয়ে চালা এবং ধোয়ার পরেও কোনো ধরণের প্রত্ন-উদ্ভিজ উপাদান পাওয়া সম্ভব হয়নি। একটা পর্যায়ে আমার এক বন্ধু চিৎকার দিয়ে ওঠে  ‘ঐ শ্লা পাইছি রে..’ তার চিৎকার শুনে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয়া হাবিবুল্লাহ পাঠানও চলে এসেছেন ঘটনাস্থলে যা আমার বন্ধু খেয়াল করে নাই, এমনকি আমিও খেয়াল করি যে আমার পেছনেই খোদ হাবিবুল্লাহ পাঠান দাঁড়িয়ে।
আমি প্রশ্ন করলাম কি পাইছিস তুই? বলে আমি পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে পড়লাম, ঠিক তখন আমার পেছনে দাঁড়ানো পাঠান সাহেব দৃশ্যপটে এলেন। আমার বন্ধুর মুখ থেকে উত্তরটা তখনই এল ‘শালার পাঠানের দুই বিচির একটা, আরেকটা তার জায়গামতোই আছে নাকি দেখতো’।
পাঠান সাহেব মনের দুঃখে চলে গেলেন মাথা নিচু করে। আমি ধপ করে মাটির মধ্যে ঠেসে বসে পড়লাম। জামি ভাই উপর দিকে চাইলেন, তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়নি। আমি একটু এগিয়ে গিযে দেখলাম আমার বন্ধু চালুনির মধ্যে একটা পানিতে ধোয়া দেশী গাবের বিচি নিয়ে চরম লজ্জায় হা করে সবার দিকে চেয়ে আছে।
লটকন

৩.

লটকন এবং নরসিংদী জেলা অনেকাংশে সমার্থক। আমরা যখন উয়ারী-বটেশ্বরে কাজ করছি তখন লটকনের ভরা মৌসুম। হাবিবুল্লাহ পাঠান এবং গাবের বিচিকাণ্ডের পর অন্য কেউ হলে থমকে যাওয়ার কথা। তবে আমার বন্ধু ছিল অন্য ধরণের জিনিস, আর নিজের কথাও নতুন করে বলার নাই। যাই হোক স্যারের কঠোর নির্দেশ ছিল ফিল্ডে সিগারেট খাওয়া যাবে না। একদিন দেখা গেল আমার বন্ধু ছবি তোলার জন্য রাখা মইয়ের এক্কেবারে মাথায় বসে সিগারেট টানছে। স্যার সরাসরি দেখে বললেন এটা কি? ফিল্ডে সিগারেট টানা নিষেধ করেছি আমি। সে উত্তরে বলল স্যার এজন্যই তো আমি মইয়ের মাথায় উঠে সিগারেট টানছি।
সেদিনেরই ঘটনা। জনৈক ব্যক্তি আমাদের দুজনের কাছে লটকন সম্পর্কে জানতে চাইছেন।সে দাঁত কেলিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেয়। বলে ইতিহাসের কিছু জানতে হলে ওর থেকে জানেন। আমি লটকনের গুরুত্ব, মাটির গঠনের সঙ্গে এর চাষাবাদসহ নানা বিষয় বলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্ত আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার বন্ধুই বলতে শুরু করে। ‘সেন রাজা লক্ষণ সেন উয়ারী বটেশ্বর আক্রমণ করেছিল। সে সময় এখাকার দুর্গের অধিবাসীরা টেরাকোটা মিসাইল আর তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। প্রবল যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি তার একটি বিচি হারিয়েছিলেন যা দেখতে অনেকটা এই লটকনের মতো। লক্ষ্মণ সেনের বিচি হারানোর পর এই অঞ্চলে লটকন ফলনের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই লক্ষ্মণ সেনের নামের সঙ্গে মিল রেখে এই ফলটার নামকরণ হয়েছে লটকন।’ আমি কিছুক্ষণ হা করে থাকলাম.. বুঝতে পারিনি এই ইতিহাস ছেলেটা কোথা থেকে বলল?
লক্ষ্মণ সেন, বখতিয়ারের ছেলে ইখতিয়ারের নদীয়া জয় কিংবা এ ধরণের কিছু গল্প আমরা জানি। তাই বলে লটকন এবং লক্ষ্মণ সেন. এটা কখনও ভাবতেও পারিনি।
(Visited 80 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *