বালের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব

ব্রোঞ্জনির্মিত বালমূর্তি

“বাল” শব্দটা বাংলায় গালি অর্থে ব্যবহৃত হয়! যেমন, তুই আমার বাল ছিড়বি! অন্যদিকে উর্দু এবং হিন্দিতে চুলকে বাল হয়! যা আমাদের সবার কমবেশি জানা। যেমন, ব্যাহড়ে, সালে কামিনে, তু মেরা এক বাল ভি বাকা নেহি কার সাকে’।

প্রিয় পাঠক খেয়াল করুন বাল ( হিব্রু בַּעַל / בָּעַל, আরবী بعل) একটি সেমিটিক শব্দ। আমরা এর সাধারণ করতে পারি প্রভু, শাসক, মালিক (পুরুষ), রক্ষক, স্বামী প্রভৃতি। আল মাগরেব থেকে শুরু করে এক সময়ের সেমিটিক এলাকায় বৃষ্টির দেবতাকে বাল বলে ডাকা হতো।

হিবরুতে আবার এই বাল শব্দের অর্থ স্বামী বা মালিক। হিবরু ব্যকরনে ক্রিয়াপদ হিসেবে এই বিশেষ পদবন্ধকে দেখা হয়। অন্যদিকে হিবরু বাগধারায় যতবার বাল শব্দটির ব্যবহার রয়েছে আমরা বাঙালিরা অতটা গালিও দেইনা। তবে হিবরুতে সিলসিলা কিংবা ধারার অনুক্রম বোঝাতে বাল শব্দটির উল্লেখ করা হয়। মজার ব্যাপার হিবরু এবং আরবিতে বালেরও জেন্ডার আছে। এর স্ত্রী রূপ হিসেবে বলা হয়ে বালা।

Encyclopaedia Britannica বলছে,

কেনান থেকে প্রাপ্ত বাল দেবতার প্রতিকৃতি

in many ancient Middle Eastern communities, especially among the Canaanites, who apparently considered him a fertility deity and one of the most important gods in the pantheon.

বাল-গণপতি (সংস্কৃত: बाल-गणपति) হলেন হিন্দু প্রজ্ঞা ও সৌভাগ্য দেবতা গণেশের (গণপতি) একটি বিশেষ রূপ। বাল-গণপতি হলেন গণেশের শৈশবাবস্থার রূপ। শ্রী-তত্ত্বনিধি গ্রন্থে উল্লিখিত গণেশের ৩২টি রূপের প্রথমটি বাল-গণপতি। গণেশের অন্যান্য রূপের মতো তিনিও গজানন। অল্প কয়েকটি প্রতিকৃতিতে দেখা যায়, শিশু গণেশকে তার পিতা শিব ও মাতা পার্বতী আদর করছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় বাল-গণপতিকে পার্বতীর কোলে বা কাঁধে ধৃত অবস্থাতেও দেখা যায়। পক্ষান্তরে বাল বহ্মচারী (হিন্দি) যার অর্থ, যে পিচ্চিকাল থেকেই বহ্মচর্য শুরু করেছে।

Pratima Kosha: Descriptive Glossary of Indian Iconography। IBH Prakashana বইটির ১৪৫ নং পৃষ্ঠায় আমরা এ সম্পর্কে জানতে পারি। বিশেষত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রাপ্ত বাল-গণপতির একক মূর্তিতে তাকে উপবিষ্ট অবস্থায় বেশি দেখা যায়। তবে অনেকক্ষেত্রে তাকে হামাগুড়ি দিতেও দেখা যায়। দক্ষিণ ভারত থেকে প্রাপ্ত একটি ব্রোঞ্জ মূর্তিতে তাকে উবু হয়ে হামাগুড়ি দিতে দেখা গিয়েছে যেখানে তার হাত চারটি।

প্রিয় পাঠক, খেয়াল করুন এত অবাক হওয়ার কিছু নাই পবিত্র কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে ’বাআল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ সূরা বাকারার ২২৮, সূরা নিসার ১২৭, সূরা হূদের ৭২ এবং সূরা নূরের ৩১ আয়াতসমূহ। বিশেষত, সুরা সাফফাতের ১২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে হযরত ইলিয়াস (আ.) কে তার লোকদেরকে বাআল এর পূজা পরিত্যাগ করে সত্যিকারের সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করার উপদেশ দিয়েছেন। তোমরা কি বাআলকে ডাকো এবং পরিত্যাগ করো শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহকে।

প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক Serge Lancel এর বই Carthage: a History থেকে আমরা জানতে পারি ইহুদধর্মে তথা বনী ইসরাইলের কাছে বালের গুরুত্বপূর্ণ কতটুকু। বাইবেলের বর্ণনা মতে মূসার প্রথম খলিফা ইউশা বিন নূনের ইন্তেকালের পরপরই বনী ইসরাঈলের মধ্যে এ নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। তারা মূসা তথা মসেসের দেখানো পথ ছেড়ে বালের পূজা শুরু করেছিল।

Baʿal Hammon কার্থেজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেবতায় পরিণত হন। আমরা ফার্স্ট বুক অব কিং এর ভাষ্যে যে বালের কথা জানতে পেরেছি তা মূলত Baʿal Hammon এর বিপরীত। তাকে ফিনিশীয় বিশ্বাসে আরাধনা করা হয় Baalshamin ( Baʿal Šāmēm) হিসেবে।

সিরিয়ার পালমিরা থেকে প্রাপ্ত বালপ্রতিকৃতি (মাঝে)। দুপাশে আগলিবোল আর মালাকবেল।

আমি লিপিবিদ্যার তুলনামূলক অধ্যয়ন করতে গিয়ে প্রখ্যাত গবেষক James B. Pritchard, এর লেখা Ancient Near Eastern Texts Relating to the Old Testament বইটি উল্টে পাল্টে দেখেছি। চিন্তা করা যায় Princeton University Press.থেকে এই বইটির ৫৩৪ পাতাতে বালের আলাপ পাড়তে দেখা গেছে। সরাসরি উদ্ধৃত করছি— (“May Baal-sameme, Baal-malage, and Baal-saphon raise an evil wind against your ships, to undo their moorings, tear out their mooring pole, may a strong wave sink them in the sea, a violent tide [. . .] against you.)

আমরা John F Healey এর বিখ্যাত বই The Religion of the Nabataeans: A Conspectus. এর ১২৪ পৃষ্ঠাতেও বাল নিয়ে বকতে দেখি। সেখান থেকে পাচ্ছি একটা পর্যায়ে বনী-ইসরাইলিদের মধ্যে বাআল পূজার এত বেশি প্রচলন হয়ে পড়েছিল যে, বাইবেলের বর্ণনা মতে তাদের একটি জনপদে প্রকাশ্যে বা’আলের যজ্ঞবেদী নির্মিত হয়েছিল এবং সেখানে বলিদান করা হতো। একেশ্বরবাদে অনুগত জনৈক ইসরাইলি এটা সহ্য করতে না পেরে রাতের আঁধারে চুপিচুপি যজ্ঞবেদীটি ভেঙে ফেলে।

তাদের এই বালপ্রীতি দূর করতে গিয়ে সামুয়েল (সামায়েল), তালূত এবং দাউদ (ডেভিদ) ও সুলাইমান (সোলেমান) কে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাঁরা কেবল বনী ইসরাঈলেরই সংস্কারই করেননি, পাশাপাশি শিরক ও মূর্তিপূজা নির্মূল করেছিলেন। থবে সুলাইমানের মৃত্যুর পর বালের পূজা আবার শুরু হয়েছিল। উত্তর ফিলিস্তিন তথা বর্তমানের সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল যেখানে অবস্থিত সেখানে বালের পূজার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ করা গেছে।

Oxford University Press থেকে প্রকাশিত John C L Gibson এর লেখা Textbook of Syrian Semitic Inscriptions, Vol. III: Phoenician Inscriptions পড়তে গেলে পাতার পর পাতা বালের বর্ণনা পবেন। ভেবে অবাক হবেন বিশ্বের এত মানুষ বালের পাগল আর আমরা সেটা নিয়ে গালি দেই।

পরিশিষ্টঃ

[১]. ঈশ্বরদীতে এক হাটবারে আমার এলাকায় আতি হোঙ্গল ও সাত্তার পাগলের বচসার কথা মনে পড়ে। কথায় কথায় আতি হোঙ্গল সাত্তার পাগলাকে বলছে তুই আমার বালের সমান। সাত্তার পাগলা টান দিয়ে আতি হোঙ্গলের লুঙ্গি উপরে তুলে ভিতরে উঁকি দিয়ে বলে, দেখা শালা কত বড় হইছে আমি মাপ দ্যা দেখি।

[২]. বাল বাংলার প্রচলিত এবং জনপ্রিয় গালির একটি। কেউ কেউ মনে করেন দিনে কয়েকবার ‘বাল’ কথাটি উচ্চারণ না করলে পেটে অম্বল হবে। এক ছেলে তার বাপকে চিঠি লিখতে গিয়ে প্রায় প্রতিটি লাইনে অভ্যাসবশত ‘বাল’ লিখেছে। পরে চিঠির নিচের দিকে পাদটীকা দিয়েছে ‘সব বাল কাটা বাল’।

[৩]. অনলাইনে যাঁরা দীর্ঘদিন থেকে আছেন কমবেশি মুরাদ টাকলা সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচিত। এরা ইংরেজি হরফে বাংলা লিখে অভ্যস্থ। তবে সেখানকার বানান থাকে বীভৎস। এরা বাংলায় তুই সম্বোধনে ‘বল’ বলতে গিয়ে প্রায়ই বাল বলে বসে। যেমন-       ক. সাহাস টাকলা কাটা বাল, কানকে মাগে তোরা তুদে, খ. জোকটি দেয়া কাটা বাল, গ. কোব টো পাক পাক কারচালা, আকান কাটা বাল। (টাকলানুবাদ: ক. সাহস থাকলে কথা বল (**** সেন্সরড), খ. যুক্তি দিয়ে কথা বল, গ. খুব তো পক পক করছিলি, এখন কথা বল।

[৪]. ট্রেনে ডাকাতি করতে গিয়ে যাত্রীদের কাছে মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র পাওয়া যায়নি। ডাকাতদল হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় ডাকাতসর্দার চামচা ডাকাতদের নির্দেশ দিলো প্রত্যেক যাত্রীর পোশাক খুলে একটি করে তাদের গুপ্তকেশ (Pubic Hair) ছিঁড়ে নিতে। কবি আখতারুজ্জামান আজাদের গল্পে পাওয়া যায় ‘নির্দেশপালন শেষে গুপ্তকেশের আঁটি জমা দিতে-দিতে সর্দারকে উদ্দেশ করে এক ইন্টার্ন ডাকাত কাচুমাচু করে জিজ্ঞেস করল, ‘ওস্তাদ, কী দরকার ছিল এগুলো ছিঁড়ে আনার? কী করবেন এইসব দিয়ে? লম্বাচুল হলে নাহয় কাজে আসত, কৃত্রিম বেণি তৈরি করা যেত। কিন্তু কী হবে এই সীমিত আকারের কোঁকড়া-কোঁকড়া কাঁচা-পাকা যৌনকেশ দিয়ে?’ নির্বিকার সর্দার নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো, ‘একটা করে ছিঁড়ে না রাখলে এই যাত্রীরা বুড়ো হয়ে নাতিদের কাছে গল্প করবে— ‘একবার ট্রেনে পড়ল ডাকাত। আমি ছিলাম সেই ট্রেনে, আমি একাই ডাকাতদেরকে পিটিয়ে করলাম সাইজ। জানিস, দাদু? ডাকাতরা আমাদের বালটাও ছিঁড়তে পারেনি।’

লেখার কারণঃ দৈনন্দিন গালি দেয়ার বাইরে বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে অনেকে বাল নিয়ে নানা কথা লিখছেন।  সেখানে বেশ কিছু ভুল পেলাম আমি। অন্যদিকে আমি ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক রেফারেন্স টেনে বাল নিয়ে এতকিছু লিখলাম। তারপরও পড়া শেষ করে আপনারা বলবেন ব্যাটা ইতিহাসের মাস্টার কাজকাম নাই, বাল নিয়ে টানাটানি করছে। দেশটা উচ্ছন্নে গেল। আমি বলি! গেলে কার কি বাল হবে ?

(Visited 296 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *