স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ২৫ বছর

২০০৭ সালে শনাক্ত শবদেহের চিহ্ন

ভয়াল ১১ আগস্ট। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার প্রায় ২৫ বছর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল। বলকানের কসাই স্লোবোদান মিলোসোভিচের বিচার কিংবা শাস্তি হয়েছে কিনা সেটা পরের কথা। সবথেকে ভয়াবহ দিক হচ্ছে এহেন জাতিগত দাঙ্গা এবং সহিংসতা থামেনি, বরঞ্চ উদগ্র উন্মাদনা নিয়ে তা বেড়েই চলেছে। যার ধারবাহিকতায় আমরা দেখেছি মিয়ানমারের হিংস্র রাখাইনরা হত্যার মাধ্যমে জাতিগতভাবে বিনাশের চেষ্টা করছে আদিবাসী রোহিঙ্গাদের। এই গণহত্যার বিচার চাওয়া দূরের কথা, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নেড়ি কুকুরের মতো কুঁইকুঁই করে যাচ্ছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এসে।

কথিত মানবাধিকারের ধুয়ো তোলা ধান্দাবাজ সংস্থাগুলো খুব ভালো করেই জানে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে যুগোস্লাভিয়া থেকে কেনো নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছিল বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। কিন্ত স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই সেখানকার আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বসনীয় সার্বরা। ধারণা করা হয় কুখ্যাত বলকানের কসাই মিলোসেভিচের বাহিনীর এ গণহত্যায় কমপক্ষে এক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। সেখানে প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যার মধ্যে নৃশংসতায় সবথেকে এগিয়ে রাখা লাগে সেব্রেনিৎসা গণহত্যাকে।

মেমোরিয়াল স্টোন

সব ধরণের সংঘাতে থার্ড আম্পায়ারের ভূমিকা পালনকারী জাতিসংঘ ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসের গণহত্যায় কিছুই করতে পারেনি। জাতিসংঘ ঘোষিত কথিত নিরাপদ এলাকা সেব্রেনিৎসায় নিয়োজিত ছিল ডাচ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের সামনেই জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে বসবাসরত আদিবাসী বসনীয় নারী ও পুরুষদের। মূলত এইসময় নৃশংসতার প্রাথমিক নীলনকশা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। তার অংশ হিসেবেই আদিবাসী মুসলিম নারী ও কিশোরীদের একে একে বাসে তুলে পাঠানো হয়েছিল সার্ব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোয়। প্রতিটি জাতিগত বিনাশ প্রক্রিয়ার মতো হিংস্র সার্বরা নারী ও কিশোরীদের উপর যৌন নিপীড়ন চালায় বীভৎসভাবে। সার্ব পশুদের কাছে বসনীয় শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হয়। এর বিপরীতে সেব্রেনিৎসার সাত থেকে আট হাজার কিশোর ও পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় সেখানেই।

খুঁড়ে বের করা গণকরব (সূত্র: ভয়েস অব আমেরিকা)
শহীদ আত্মীয়-স্বজনের ছবি হাতে বসনীয় নারী (ছবি: আটলান্টিক)

সেব্রেনিৎসার মতো একই ধাঁচে গণহত্যা চলেছে সারায়েভো, জেপা, ফোকা, প্রিজেদর ও ভিজগ্রাদে। সার্বীয় সৈন্যদের হাতে হত্যা আর ধর্ষণের শিকার হয়েছিল প্রায় লক্ষাধিক বসনীয়। ইতিহাস বলছে ‘১৯৯২ এর এপ্রিলে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার যুগোশ্লাভ প্রজাতন্ত্রের সরকার যুগোশ্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পরবর্তী কয়েক বছরে, সার্ব-আধিপত্যশীল যুগোশ্লাভ সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট বসনীয় সার্ব বাহিনীসমূহ বসনিয়াক (বসনিয়ান মুসলিম) ও ক্রোয়েশীয় বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর ফলে ১৯৯৫ সাল নাগাদ প্রায় ১ লক্ষ লোক মারা যায়, যাদের শতকরা ৮০ ভাগই ছিল বসনিয়াক।’ গণহত্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজিদের হাতে অগণিত ইহুদী  হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি এটিও একই ধাঁচের গণহত্যার নিকৃষ্টতম উদাহরণ। সম্প্রতি এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে রাখাইনদের নৃশংসতার।

আন্তর্জাতিক আদালতের অনুসন্ধানে বের হওয়া গণকবর
গণকবর পরিদর্শনে যাওয়া ইরানিরা
অশ্রুজলে সিক্ত স্মৃতি রোমন্থন (সূত্র: বিবিসি)

সেব্রেনিৎসার ভয়ালয় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল ১৯৯৫ এর গ্রীষ্মকালে। তখন পূর্ব বসনিয়ার তিনটি শহর – স্রেব্রেনিচা, জেপা, ও গোরাজদে শহরে একই সময়ে আক্রান্ত হয়। বসনীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর  ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ এলাকাগুলোকে ‘মুক্তাঞ্চল’ ঘোষণা করেছিল। এই অঞ্চলগুলো বিধি মেনে নিরস্ত্রীকৃত ও রক্ষিত হওয়ার কথা। আর সেই হিসেবে সেখানে কারও বাহাদুরি দেখানোর বদলে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীদের দ্বারা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা। কিন্ত সার্ব সেনাদল তাদের একেবারে পাত্তা দেয়নি। উপরন্ত নখদন্তহীন জাতিসংঘ বাহিনীর সামনেই তারা খুন করেছে আদিবাসী বসনীয়দের।

১৯৯৫ এর ১১ জুলাই মুক্তাঞ্চলের দায়িত্ব পালন করছিল ডাচ শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি ব্যাটেলিয়ন। তাদের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে অনেকটা ভেংচি কেটে পাশবিক সার্ব সেনাবাহিনী স্রেব্রেনিৎসার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তারা বেসামরিক বসনীয় পুরুষ ও কিশোরদের নারীদের থেকে আলাদা করে ফেলে। এসময় নারী ও কন্যা শিশুদের জোরপূর্বক  বাসে তুলে বসনীয়-নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

দর্শকের ভূমিকায় থাকা ডাচ শান্তিরক্ষী ( ছবি: ফিনান্সিয়াল টাইমস)
চলছে গণহত্যা (সূত্র: আটলান্টিক)
নিপীড়নের শিকার বসনীয় নারী
বলকানের কসাই মিলোসেভিচ

গণ স্থানান্তরের এই সময়টা ছিল ভয়াবহ। তখন বসনীয় নারীদের বেশিরভাগ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ণের শিকার হন। পেছনে রয়ে যাওয়া পুরুষ ও ছেলে শিশুদের উপর ব্রাশ ফায়ার করে তাৎক্ষণিকভাবে মেরে ফেলা হয়। অনেককে ধরে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ধারণা করা হয় সেদিন সার্বদের হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হয়েছিলেন ৭,০০০-৮,০০০ বসনীয় পুরুষ ও ছেলেশিশু।

গণহত্যার প্রথম কয়েকটি দিন পার হয়ে যায়। কয়েকটি নির্বিষ নিন্দাপ্রস্তাব দেয়ার বাইরে জাতিসংঘ এই সময়  কোনো ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়। আদতে বিভিন্ন বৈশ্বিক মহামারীর সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে ভূমিকা রাখে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল এক্ষেত্রে অনেকটা তাই।

জাতিসংঘের নখদন্তহীন অবস্থানের সুযোগ নিয়ে এপ্রিল মাসেই সার্বরা জেপা শহর দখল করে নিয়েছিল। তারা সারায়েভোর জনবহুল একটি বাজারে বোমা মেরে হত্যা করে অগণিত নিরীহ বেসামরিক মানুষকে। চলমান সংঘাত ও বেসামরিক গণহত্যার মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশেষে একটু নড়ে চড়ে বসে। তৎকালীন তুরস্ক ও ইরানের ভূমিকাও এক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো। তারা আন্তর্জাতিক মহলে উপযুক্ত চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিশ্বের নানা স্থানে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হতে থাকে।

সব প্রতিবাদ-প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে ১৯৯৫ এর আগস্টে সার্বরা জাতিসংঘের দেওয়া আলটিমেটাম অগ্রাহ্য করে। আদতে তারা জাতিসংঘের নখদন্তহীন অবস্থান থেকে সাহসী হয়ে উঠেছিল। তখন এগিয়ে আসে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন তথা ন্যাটো। তারা বিভিন্ন স্থানে সার্বদের অবস্থানগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। কথিত গ্রাউন্ড অফেন্সিভে তারা বসনীয় ও ক্রোয়েশীয় বাহিনীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথাও জানা গিয়েছে। তবে এই অপারেশন কিছুটা হলেও সার্বদের বিচলিত করে। তারা সাময়িকভাবে হলেও আপাতত গণহত্যার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল তখন।

দীর্ঘদিন নির্বিষ বক্তব্যসহ প্রায় দর্শকের ভূমিকায় থাকা জাতিসংঘ এবার সচল হয়। তারা সার্বিয়ার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের এই ভূমিকার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অসহযোগ আন্দোলেন সার্বদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। পাশাপাশি তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ তাদের আর্থিকভাবে দেউলিয়া করে দেয়। অন্যদিকে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা বসনিয়ার মুক্তিবাহিনী নানা দেশ থেকে সমর্থন পায়। ফলে সার্বদের সামরিক বাহিনী বসনিয়ায় তখন তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। তারা বুঝতে পারে নিরীহ বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে খুন করা আর সরাসরি যুদ্ধ এক নয়। ফলে একরকম বাধ্য হয়েই বলকানের কসাই মিলোসেভিচ সমঝোতায় যেতে সম্মত হয়।

গণহত্যা প্রতিরোধ ও শান্তিচুক্তির উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সালে ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যে, মার্কিন নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। তখনকার সেই আলোচনায় বলকানের কসাই স্লোবোদান মিলোসেভিচ এবং তার বিপরীতে বসনিয়ার পক্ষে ইজেতবেগোভিচ অংশ নেন। ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে ফ্রানজো তুজমান এ আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। তখনকার শান্তি আলোচনা একটি ফেডারেল বসনিয়া গঠনের প্রস্তাব করে। তখন মূলত ক্রোয়েট-বসনীয় ফেডারেশন এবং সার্ব প্রজাতন্ত্রের মধ্যে  বিভক্তি আনা হয়েছিল। মূলত এরপর সাময়িক বন্ধ হয়েছিল গণহত্যা।

ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় দীর্ঘ লড়াইয়ে স্বাধীন হয়েছে বসনিয়া। কিন্ত বেসামরিক গণহত্যার সে রক্তাক্ত ঘটনা কলঙ্কিত করেছে বিশ্ব রাজনীতিকে।

(Visited 139 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *