১৯ জুলাইয়ের দিনলিপিতে দুই লেখকের গল্প

হুমায়ূন আহমেদ
কাজী আনোয়ার হোসেন

চলে গেল অদ্ভুত ১৯ জুলাই। অন্তত যারা বাংলা ভাষায় সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন, আলোচনা-সমালোচনায় যুক্ত আছেন কিংবা নিতান্তই আগ্রহী পাঠক, তাদের ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি অন্যভাবে আনন্দ-বেদনার কালিতে দাগ কাটা আছে। সাহিত্যের ভাষায় বললে, এক নক্ষত্রের পতন আর অবাক সূর্যোদয় ঘটেছিল এ দিনটিতেই। এদিন ইহলোক ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ যাঁর প্রকৃত নাম শামসুর রহমান, আর ঠিক এ দিনটিই কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন নবাবের তথা সবার প্রিয় কাজী দা’র জন্মদিন।

অনুবাদ নাকি মৌলিক (!), লেখার মান কী (?), পাঠক কারা (!), সারবস্তু (!)— বিশ্বের খ্যাতনামা সব লেখকের লেখালেখি নিয়ে এমন তর্ক হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। তবে সব প্রশ্নের বেড়াজাল ভেঙে যদি সহজ দুটি প্রশ্ন করা যায়— ১. বাংলা সাহিত্য কীভাবে পাঠকমুখী হয়েছে? ২. বাংলা ভাষায় লেখা বই কখন থেকে বাণিজ্যসফল হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে? আমি বলব, দুটি প্রশ্নের উত্তর একই সুতোয় গাঁথা। আর প্রশ্ন দুটির উত্তর যদি একটি কাগজে পর পর লিখে সাজানো হয়, তা হবে সহজ কথায় এ দুই লেখকের গল্প।

হুমায়ূন আহমেদ ও কাজী আনোয়ার হোসেনের তুলনা কিংবা একই সঙ্গে আলোচনা করতে দেখে হয়তো অবাক হবেন অনেকেই। হুমায়ূন লিখেছেন উচ্চ মধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণী আর তাদের অতৃপ্ত মনের নানা কল্পবিলাস নিয়ে। তিনি পুরো সমাজকে নিজের চোখে দেখেছেন। সেখান থেকে খুঁজে নিয়েছেন নানা অতৃপ্তি, ক্লান্তি, বিরক্তি আর অবদমিত আগ্রহকে। আর সেখানে তার কলম হয়ে উঠেছে সমকালীন সমাজের প্রতিবিম্ব।

যে বিম্বে কখনো পাঠক দেখেছে হিমুকে, কখনো পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে নানা অসঙ্গতি দেখিয়েছে মিসির আলি। চুপ থাকেনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত শুভ্র কিংবা চির অভিমানী রূপা। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে গণ্য হুমায়ূন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার ও গীতিকার। অন্যদিকে তাকে আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ বলাটাও ভুল হবে না।

দুই শতাধিক জননন্দিত গ্রন্থের রচয়িতা হয়েও কেউ যে নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে সমান সমাদৃত হতে পারেন, তার উপযুক্ত উদাহরণ হুমায়ূন আহমেদই। বাংলা কথাসাহিত্যে সংলাপকেন্দ্রিক এক অন্য রকম শৈলীর জন্ম দিয়েছেন তিনি। এর ওপর ভিত্তি করে সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে মৃত্যুর ঠিক পূর্ব পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক রূপকার।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে লিখতে বসলে একটা দশাসই প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে যাবে। এক হিমু নিয়েই তিনি লিখেছেন ডজন দুয়েক উপন্যাস। ময়ূরাক্ষী, দরজার ওপাশে, হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, পারাপার, হিমুর রুপালি রাত্রি, হিমুর দ্বিতীয় প্রহর, তোমাদের এই নগরে, সে আসে ধীরে, হলুদ হিমু কালো র্যাব, হিমু রিমান্ডে কিংবা চলে যায় বসন্তের দিন— কোনোটিকেই আলাদা করে চেনাতে হবে না পাঠককে।

দেয়াল, নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগারে, এইসব দিনরাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, গৌরীপুর জংশন, নিশীথিনী, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে, ইস্টিশন কিংবা এপিটাফ জনপ্রিয়তার দিক থেকে কম ছিল না কোনোটিই।
সে সময়ে বাংলাদেশের টিভি নাটক আর হুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠেছিলেন সমার্থক। যার প্রমাণ হিসেবে বলা যেতে পারে এইসব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়, আজ রবিবার, ফুচকা বিলাস, বুয়া বিলাস, বৃক্ষমানব, নিমফুল, তারা তিনজন কিংবা মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতমের কথা।

ধ্বংসের মুখে থাকা বাংলা চলচ্চিত্রও এক নতুন পথ খুঁজে পায় তার হাত ধরে। শঙ্খনীল কারাগারে, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া, দূরত্ব, নন্দিত নরকে, নিরন্তর, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, দারুচিনি দ্বীপ, সাজঘর, আমার আছে জল, প্রিয়তমেষু, ঘেটুপুত্র কমলার মতো চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে নতুন দিনের সন্ধান দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। অল্প যে কয়েকটি গান তিনি লিখে গেছেন, সেগুলোও অনেক দিন গুনগুন করে গাইতে শোনা যাবে। এমন সব সৃষ্টি লেখক হুমায়ূনকে করেছে এতটা উজ্জ্বল, যার নিচে চাপা পড়ে গেছে অনেক কিছু। আর তাই ১৯ জুলাই নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের জন্য এক কালো দিন।

কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্মদিনও এ ১৯ জুলাই। সেবা প্রকাশনীর পেপার ব্যাকে মোড়ানো নিউজপ্রিন্টের বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় নেই এমন পাঠক কিংবা লেখক বাংলাদেশে বোধকরি পাওয়া যাবে না। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে অসাধারণ মানের বই, পাঠকপ্রিয় ভাষায় পরিবেশনা, বিদেশী সাহিত্যের গ্রহণযোগ্য বাংলা অনুবাদ থেকে শুরু করে আরো নানা কারণে এক কথায় সবাই জানে প্রিয় কাজীদার কথা। লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক এবং জনপ্রিয় মাসুদ রানা সিরিজের অমর স্রষ্টা হিসেবে তাকে বাদ দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে কল্পনা করার সুযোগ নেই। পাঠক একবাক্যে স্বীকার করে নেবে মাসুদ রানা ও কুয়াশার মতো কালজয়ী চরিত্র যার হাতে তৈরি, তিনি আর কিছু না করেন অন্তত মানুষকে বাধ্য করেছেন একটা বই হাতে নিতে, আর সেটাইবা কম কিসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাস করে কাজী আনোয়ার হোসেন প্রথম জীবনে গান গাইতেন বেতারে। তার পর ধীরে ধীরে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করা। ১৯৫৮-৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। এদিকে ১৯৬৩ সালের দিকে যে সেগুনবাগান প্রেসের যাত্রা হয়েছিল তার হাত ধরে, নাম পাল্টে তা হয়ে যায় সেবা প্রকাশনী। বলতে গেলে জনপ্রিয় সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ আর পেপার ব্যাক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয় প্রকাশনা সংস্থাটি। কাজী আনোয়ার হোসেন অমর হয়েছেন মাসুদ রানা চরিত্রটির রূপায়ণের মধ্য দিয়ে।

তিনি চেয়েছিলেন পাঠক নিজেকে রানা ভাবুক, তাই চেহারার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা আসেনি তার গল্পে। পাশাপাশি রানার কাহিনীগুলোয় জেমস হেডলি চেজ, ডেসমন্ড ব্যাগলি, হ্যামন্ড ইনস, ফ্রেডরিক ফোরসাইথ, পিটার বেঞ্চলি, কেন ফোলেট, ক্লাইভ কাসলার, এডওয়ার্ড এস আর্নস, কলিন ফর্বস, জেরার্ড ডি ভিলিয়ার্স, জ্যাক হিগিন্স কিংবা উইলবার স্মিথের প্রভাব রানার চরিত্রকে দাঁড় করায় এক ভিন্ন আঙ্গিকে। আর এভাবেই ইয়ান ফ্লেমিংয়ের বিখ্যাত জেমস বন্ডের বাংলা ভার্সন মাসুদ রানার রূপায়ণ ঘটেছে কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে।

সম্প্রতি লেখকমাত্রই মুখ বাঁকিয়ে বলতে চেষ্টা করেন— পাঠক বই পড়ে না, ক্রেতা বই কেনে না। দুই লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও কাজী আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে হয়তো এমন কথা শুনতে হয়নি কখনো। বাংলাদেশের মানুষমাত্র জানে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা আর হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে সমার্থক হয়ে উঠেছেন। বইমেলায় হয়তো এমনও দিন গেছে, যেদিন সব লেখকের বই বিক্রির খতিয়ান এক করলেও তা হুমায়ূন আহমেদের সমতুল্য হতে পারেনি। অন্যদিকে কাজী আনোয়ার হোসেনের বইয়ের পাঠক একসময় তুঙ্গে ছিল, এখনো বেশ আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

একদিক থেকে দেখলে এটা নতুন প্রজন্মের অনেক লেখকের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করবে নিঃসন্দেহে। লেখক বেঁচে থাকেন পাঠকের সাড়াদানে। আর নিওলিবারেল বিশ্বের হিসাবে সেই লেখকই শ্রেষ্ঠ, যিনি পাঠকপ্রিয়। আর সেদিক থেকে ধরলে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন দুই ধারার এ দুই লেখক। অন্যদিকে বাংলাদেশের ধুঁকতে থাকা প্রকাশনা শিল্পকে একটু হলেও গতিময়তা দেয়ার কৃতিত্বটাও অনেকাংশে এ দুই লেখকেরই। তাই ১৯ জুলাইয়ের দিনলিপি লিখতে গিয়ে একজনকে জানাতে হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি, অন্যজনের জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

(Visited 39 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *