মানসা মুসা

ইহুদি লেখক বারবারা ক্রেসনার বেশিরভাগ লিখেছেন শিশু সাহিত্য। পাশাপাশি ইহুদি ছেলেমেয়েদের লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে তিনি নানা ধরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই হিসেবে বারবারা ক্রেসনারের আফ্রিকা বিষয়ক লেখাগুলো অবাক করার মতো।
ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা যেখানে একটু অন্য ধাঁচের। স্পষ্ট করে বললে তিনি জায়নবাদী হিংস্রতার প্রতীক। সেখানে হঠাৎ আফ্রিকার দেশ মালি কিংবা তাদের বিখ্যাত রাজা মানসা মুসাকে নিয়ে লেখার চেষ্টা আরও ব্যতিক্রম।
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে তিনি লিখেছেন লাতিন আমেরিকার লেখক পাওলো কোয়েলহোর আলকেমিস্ট পড়ার পর তিনি লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার কৈশোরে। এই লাইনটা পড়ার পর আমি মূলত তার লেখা পড়তে আগ্রহী হয়েছিল।
হঠাৎ করে একদিন চোখে পড়ল Mansa Musa: The Most Famous African Traveler to Mecca শীর্ষক বইটি। দুইবারের মতো বইটি পড়ে সেখানে অনেকগুলা অপূর্ণতা দৃষ্টিগোচর হয়। বইটি পড়তে গিয়ে প্রথম অধ্যায়ের পরেই বুঝতে পারি সেখানে আসলে কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করণের চেষ্টা চলেছে নিরন্তর।
কাতালান মানচিত্রে মানসা মুসা

উত্তরটা জেনেছিলাম আগেই। কারণ ‘জুইশ বুক কাউন্সিল’ তাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে একটু অন্যভাবে। তাদের বর্ণনামতে তিনি পেনসিলভেনিয়ার মেলরোজ পার্কের ইহুদি নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গার্টজ কলেজে ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট। সেখানে তার গবেষণার বিষয়বস্তু ‘হলোকাস্ট এবং জেনোসাইড স্টাডিজ’। এর বাইরে সাময়িক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে মার্কার কাউন্টি কমিউনিটি কলেজে তিনি হিউম্যান রাইটস সেন্টারের ডিরেক্টর হিসেবেও কর্মরত।

মুসার হজ্জ যাত্রা

বিশ্বের অন্য স্থানের তুলনায় আফ্রিকার ইতিহাসের ব্যতিক্রমগুলো কি? কেনো আমাদের আফ্রিকার ইতিহাস পড়তে হবে। এখানকার ইতিহাস পাঠের সংকট ও সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে আমি নিজেই একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি বইটির শুরুতে।

অনুবাদকের ভূমিকা না হয়ে ভূমিকা অংশটি হয়েছে মূলত আফ্রিকার ইতিহাসের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, উত্তর-ঔপনিবেশিকতা এবং ইতিহাসের পাঠ-পদ্ধতি নিয়ে। অন্তত মূল বইটি পড়ার আগে যারা ভূমিকাটা আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারবেন তাঁরা আফ্রিকার অন্যান্য দেশ কিংবা লাতির আমেরিকার ইতিহাস সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন। তারা বুঝবেন এখানে ইতিহাসের নামে কি লেখা হয় প্রতিনিয়ত।
আমার বলতে বাধা নাই, শিশু সাহিত্য এবং ইয়াং অ্যাডাল্ট নভেল লেখিকা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বারবারা ক্রেসনারের লেখালেখি নিতান্ত কম জনপ্রিয় নয়। ২০১০ সালে বিখ্যাত ‘Writing Jewish-themed Children’s Books শীর্ষক ওয়ার্কশপের মধ্য দিয়ে তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে।
তিনি পরপর কয়েকবছর ইহুদিদের জন্য শিশু সাহিত্য রচনার উদ্যোগ হিসেবে এই ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছেন। মজার ব্যাপার তার বই বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি গাঁটের কড়ি খচ্চা করে কিনে নেয়। জায়নবাদী বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নেও কেনা হয় বারবারা ক্রেসনারের বই। এমনকি শিশুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি নেসলের নিডো দুধের প্রমোশনাল প্রোগ্রামেও তার বই ফ্রিতে বিলানো হয়।
বই বিক্রির কোনো দুশ্চিন্তা না থাকায় অনেকটা মনের শান্তিতে এবং রাজার হালে শিশু সাহিত্য লিখতে পারেন বারবারা ক্রেসনার। সত্য বলতে আমার দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছিল এখানে। আমি ভাবলাম এই ভদ্রমহিলাকে কোনা খ্যাপা কুত্তায় কামড় দিল যে আয়েশী শিশু সাহিত্য লেখকের জীবন ছেলে মালির ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাতে গেলেন!!!
খোঁজ নিয়ে বুঝলাম ইহুদি ইতিহাস বিষয়ক The Whole Megillah শীর্ষক গবেষণা তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এর জন্য বিশ্বের কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাকে প্রচুর অর্থসাহায্য ও বৃত্তি দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় অনেকগুলো প্রকল্প পরিচালনা করেছেন তিনি। তাই তার লেখার ধারার বাইরে গিয়ে মালির রাজা মানসা মুসাকে নিয়েছেন তিনি। শুধু অনুসন্ধিৎসু চিন্তা থেকে তিনি এই বইটি লিখতে গেছেন এতটা নির্বিষ চিন্তার সুযোগ নেই এখানে।
বইটির নানা স্থানে তিনি আকারে ইঙ্গিতে জাতিবিদ্বেষী কথাবার্তা ছড়াতে চেষ্টা করেছেন সুক্ষ্মভাবে। আমি অনুবাদক হিসেবে যতটুকু নয় তার থেকে ঢের একজন প্রত্নতত্ত্ব চর্চাকারীর চোখ দিয়ে দেখেছি। তাই মালির ইতিহাসের গল্প বলতে গিয়ে একজন মানসা মুসার চরিত্র চিত্রণ দুর্দান্ত হয়েছে। তারপরেও বলছি বইটি পাঠ করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক পাঠকের একটু অনুসদ্ধিৎসু দৃষ্টি রাখা জরুরি।
বি.দ্রঃ লকডাউন, করোনাক্রান্তিকালের নানা ভয়াবহতা আর দুর্ভোগের কবলে না পড়লে বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা গত বছরের ডিসেম্বরে। কিন্ত দুর্ভাগ্যবশত তা প্রকাশে অনেকটা দেরি হয়ে গেল। একই পরিস্থিতিতে আরও কয়েকটি বই আটকে পড়েছিল। ইনশাআল্লাহ সেগুলোও দ্রুত বাজারে আসছে। সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী।
বই সম্পর্কে-
বইঃ Mansa Musa: The Most Famous African Traveler to Mecca
লেখকঃ Barbara Krasner
রূপান্তর, ভূমিকা ও পরিশিষ্টঃ Md. Adnan Arif Salim
প্রচ্ছদঃ Sokal Roy
প্রকাশকঃ Dibya Prakash
(Visited 10 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *