চুতিয়াদের ইতিহাস

ভারতের নানা অঞ্চলে ঘোঁচু এবং চুতিয়া গালি হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এবং পরিচিত। বাংলাদেশে ভারতীয় তথা হিন্দি শব্দ বাল (बाल) যেমন গালি হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তেমনি মূর্খ, নির্বোধ, বলদ, োদনা, আদ ুদাই, ভোক্সদ এর বিকল্প গালি হিসেবে ভারতে এই চুতিয়া শব্দটির জনপ্রিয়তা বেশ তুঙ্গে। কিন্ত তার আড়ালে হারিয়ে গেছে আসামের আদিবাসী ‘চুতিয়া’ সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানতে পেরেছি নামের সঙ্গে ‘চুতিয়া’ থাকলে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। অবাক হয়ে ভাবছিলাম যে শব্দ এত বিশ্রি একটা গালি হিসেবে জননন্দিত হয়েছে তা কিভাবে কারও উপাধি হয়!!!
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সংবাদ থেকে জানতে পেরেছিলাম শব্দটি ভারতে গালি হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ায় ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্ত এই একাউন্ট বন্ধ করার ফলে বিপদে পড়ছেন আসাম রাজ্যের ‘চুতিয়া’ সম্প্রদায়ের লোকজন।
আআকসু তথা The All Assam Chutia Students’ Union (AACSU) অভিযোগ করেছে তাদের সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়া হয়েছে। তাদের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি প্রসাদ চুতিয়া এর বিশদ ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
আআকসু নেতার মতে ‘চুতিয়া’ সম্প্রদায়ের অনেক সদস্যের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র নামের শেষে চুতিয়া শব্দটি থাকায়। তাদের পদবীকে গালি মনে করে ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো বাতিল করছে। কিন্ত অদ্ভুত তথ্য হচ্ছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানেই না এই ‘চুতিয়া’ হচ্ছে আসামের একটি আদিবাসী সম্প্রদায়।
১৫১২-১৫২৪ সালের দিকে চুতিয়া এবং আসামীদের দ্বন্দ্ব বাধার আগে তাদের একটি সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। আমরা চুতিয়াদের রাজা হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম নাই। ১৪ শতকের একেবারে শুরু থেকে ১৫ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত তারা রাজত্ব ধরে রাখে। ১৪ শতক থেকে ১৫ শতকের শেষাংশ অবধি তাদের প্রায় ১০ জন রাজার নাম জানা গিয়েছে। তারা হচ্ছেন- ১. নন্দীশ্বর, ২. সত্যনারায়ণ, ৩. লক্ষ্মীনারায়ণ, ৪. ধর্মনারায়ণ, ৫. দুর্লভ নারায়ণ, ৬. মুক্তধর্মনারায়ণ, ৭. প্রত্যক্ষণনারায়ণ, ৮. যশনারায়ণ, ৯, পুরন্দর নারায়ণ এবং ১০. ধীরনারায়ণ।
চুতিয়া রাজবংশের পতনের পর তারা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। তারা বিভিন্ন বনাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতে থাকে। সাংস্কৃতিক নানা দিক এবং জীবনাচারণের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকলেও তারা মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল-
ক. হিন্দু চুতিয়া,
খ. অহম চুতিয়া,
গ. বোরাহি চুতিয়া,
ঘ. মিরি চুতিয়া।
বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতো চুতিয়াদেরও ছেলে কিংবা মেয়ে হিসেবে আলাদা ঐতিহ্যবাহী পোশাক রয়েছে। চুতিয়া ছেলেদের ঐতিহ্যবাহী পরিধেয় হচ্ছে চুতিয়া পাগুরি, চুরিয়া বা চুরুলসা, গামুসা ও বিশুবান, তাঙ্গালি এবং ছেলেংশা বা ছেলেঙ্গচাদর।
বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং যাপিত জীবনেও চুতিয়া মেয়েদের পরিধেয় পোশাক পুরুষের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়। তারা রঙ বেরং এর পোশাক পরে যেমন উৎসব পালন করে, তেমনি দৈনন্দিন জীবনের পরিধেয় হিসেবে সাদামাটা পোশাকই তাদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চুতিয়া মেয়েরা মূলত মেখেলা বা ইগু, রিহা বা রিশা, গাথিগি, দুকোতিয়া, চাদর ও কোকালমোরা, হাসোতি ও দাবুয়া কাতারি এবং হারুদাই জাপি পরে থাকে।
Lakhimpur, Dhemaji, Dibrugarh এবং Tinsukia অঞ্চলের দখল নিশ্চিত করতে গিয়ে অহমিয়া রাজা সুহুঙ্গমুঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল চুতিয়া রাজা ধীর নারায়ণের। তিনি এই যুদ্ধে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। বলা যায় এই সময় থেকেই বিলুপ্তির দিকে পা বাড়িয়েছে সমৃদ্ধ চুতিয়া সম্প্রদায় এবং তাদের ইতিহাস। বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখলেও আমরা প্রাথমিকভাবে চুতিয়াদের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু কথা লিখতে পারি।

গল্পটা পনের শতকের মধ্য থেকে শেষভাগের। আসামের তিংশুকিয়া জেলার সাদিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল চুতিয়া রাজ্য। ইতিহাস গবেষকরা এটাকে মধ্যযুগের শেষভাগে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোর একটা বলে মনে করেন। আসাম থেকে সীমানা প্রসারিত হয়ে অরুণাচল প্রদেশ অবধি এর বিস্তৃতি ছিল বলে অনেক ইতিহাস গবেষকের ধারণা।

চুতিয়াদের বিস্তৃতি কোন অঞ্চলে ছিল তা নিয়ে উপযুক্ত ভৌগোলিক সীমারেখা তৈরি করা কঠিন। তবে বর্তমান আসামের লক্ষীপুর, ধেমাজি, তিংশুকিয়া এবং দিব্রুগড়ের অনেকটাই চুতিয়ারা দখল করে নিয়েছিল। তারা বিভিন্ন আসাম এবং অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, অনুচ্চ টিলা এবং তার সংলগ্ন সমতল জুম চাষের জমিতে আধিপত্য নিশ্চিত করে। ১৫২৩-২৪ সালের দিকে অহম রাজ্যের কাছে পতনের পর তারা ঐ রাজ্যের সাদিয়া খোউয়া গোহাইন অংশে পরিণত হয়। এর সঙ্গে কিঞ্চিত মিল রেখে বর্তমান সিলেটের একটি উপজেলার নাম গোয়াইনঘাট।

সিলেটের জৈন্তা রাজাদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি প্রথমবারের মতো চুতিয়া রাজবংশের সম্পর্কে জানতে পারি। তখন ভারতের অন্য অংশের রাজ্যকাঠামো ও শাসনের সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম, অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডের বিস্তর পার্থক্য ছিল। ভারতবর্ষের অন্য অংশের মতো শক্তিশালী রাজত্ব প্রতিষ্ঠার বদলে এখানে কিছু অপূর্ণাঙ্গ রাজ্য ছিল।

ইতিহাস গবেষকরা যে রুডিমেন্টারি স্টেটের কথা বলেছেন আমি পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটাকে বাংলায় অপূর্ণাঙ্গ রাজ্য লিখি। কারণ একটি রাজ্য বলতে যা বোঝায় এই বিশেষ রাজ্যগুলোর মধ্যে তার সব বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না। অন্যদিকে এদের ইতিহাস রচনার জন্য লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রের তুলনায় কথ্যসূত্র ও উপকথার উপর নির্ভর করতে হয় বেশি।

অপূর্ণাঙ্গ রাজ্য বলতে অহম, দিমাসা, কোচ কিংবা জৈন্তা রাজাদের পাশাপাশি এই চুতিয়াদের কথা বলা যায়। তারা প্রত্যেকেই কম বেশি ১৩ থেকে ১৬ শতকের দিকে রাজত্ব করেছিল। খুব সম্ভবত কামরুপরাজ্যের পতনের পর এদের উদ্ভব ঘটে থাকতে পারে। ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসন আর লামা তারনাথের বর্ণনার বদৌলতে আমরা পাল শাসন পূর্ব সময়কালের কিংবা পাল শাসনামলের যে বর্ণনা পাই এদের সম্পর্কে সেভাবে জানা বেশ কঠিন। তাই তখনও কোনো মাৎসন্ন্যায় ঘটেছিল কি না সে ব্যাপারে বলা কঠিন।

অমলেন্দু গুহ (Guha, Amalendu, 1991, Medieval and Early Colonial Assam: Society, Polity and Economy) মনে করেন এই অঞ্চলের অপূর্ণাঙ্গ রাজ্যগুলোর মধ্যে চুতিয়ারা ছিল সবথেকে সমৃদ্ধ। তারা রাজনৈতিকভাবে অতটা সক্ষম না হলেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ছিল অনেক অগ্রবর্তী। স্থানীয় কৃষিকাজ, কুটির শিল্প ও আন্তদেশীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা এই সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। অন্যদিকে সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও তাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান।

চুতিয়ারা এই অঞ্চলের পাহাড়ি ভূমির মধ্যবর্তী খণ্ড খণ্ড সমতল অংশে কৃষির বিকাশ ঘটায়। তারা এই কাজকে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন বলে মনে করতো। চুতিয়া রাজ্য অহম রাজ্যের অধীনে যাওয়ার পর তারা নতুনভাবে কৃষিকাজ শুরু করে। তবে তাদের সিংহভাগ জমি তখন ব্যবহৃত হয় অধিক জনসংখ্যার খাবারের চাপ সামাল দিতে জরুরি হয়ে ওঠা অতিরিক্ত ধান চাষের প্রয়োজনে(Gogoi, Jahnavi (2002). Agrarian System of Medieval Assam.) ।

এই অঞ্চলে চুতিয়াদের উদ্ভবের ঘটনা অনেকটাই অস্পষ্ট। ঠিক সেভাবেই ইতিহাসের অনেক অস্পষ্টতা রেখে তারা অহম রাজ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। লৌহিত্য তথা ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলের তৎকালীন রাজ্যগেুলো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ডি. নাথ (Nath, D (2013), “State Formation in the Peripheral Areas: A Study of the Chutiya Kingdom in the Brahmaputra Valley”) আনুমানিক ছয়টি অঞ্চলের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে চুতিয়া, কামাতা, কাচারি, বোরাহি, মোরান এবং নাগাদের কথা বলা যায়। এরা সুকাফা রাজত্বের সময় নিজেদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছিল।

লিপিসূত্রে প্রথম যে চুতিয়া রাজার কথা জানা গিয়েছে তার নাম নন্দিন তথা নন্দীশ্বর। তার সময়কাল ১৪ শতকের দ্বিতীয় ভাগ। তাঁর সন্তান সত্যনারায়ণের একটি ভূমি দানপত্রে তার নাম উল্লেখ থাকতে দেখা যায়। তবে এই ভূমি দানপত্র থেকে ‍চুতিয়া সাম্রাজ্যের মাতৃতান্ত্রিক প্রভাব সম্পর্কেও জানা গিয়েছে। চুতিয়ারা সরাসরি মাতৃতান্ত্রিক না হলেও তারা যে পিতৃতান্ত্রিক ছিল এমনটা বলা যাবে না।

 

আরেকটি ভূমিদানপত্রে চুতিয়ারাজ দুর্লভনারায়ণ তার দাদা রত্ননারায়ণের কথা উল্লেখ করেছেন। তার উল্লিখিত এই রত্ননারায়ণকে সত্যনারায়ণের সঙ্গে শনাক্ত করা গিয়েছে। তিনি ছিলেন কামাতাপুরার রাজা। সন্ধ্যারাজ্যের পূর্বাংশে এই কামাতাপুরার অবস্থান শনাক্ত করা যায়। অন্যদিকে সন্ধ্যারাজ্যের পূর্বাংশ কামাতার পশ্চিমাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল মনে করা হয়। অনেক ইতিহাস গবেষক মনে করেন তৎকালীন সন্ধ্যাপুরী বর্তমান সময়ের সাদিয়া অঞ্চল হিসেবে শনাক্ত করা যায়। তবে ফ্রান্সিস জ্যাকসন (Jaquesson, François, 2017, Translated by van Breugel, Seino. “The linguistic reconstruction of the past: The case of the Boro-Garo language”) মনে করেন বিলুপ্ত অহম ভাষায় (Tai-Ahom language) রচিত বংশানুবর্ণনে যে রাজ্যকে তিওরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঠিক সেটাকেই আবার আসামী ভাষায় বলা হয়েছে চুতিয়া রাজ্য।

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বিভিন্ন রাজ্য যেমন বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, অরুণাচল এবং নাগাল্যান্ডের ইতিহাস লিখতে গেলে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন রাজ্য হিসেবে অহম, চুতিয়া, জৈন্তা, কোচ এগুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। উপযুক্ত সূত্রের অভাব এবং অপ্রতুল গবেষণার কারণে ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে গায়েব হয়ে গেছে চুতিয়ারা। অন্যদিকে তাদের সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা এতোটাই কম যে আমরা মানুষকে গালি দেই চুতিয়া বলে। আর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সেই চুতিয়া গালিকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে কারও নামের সামনে-পেছনে চুতিয়া থাকায় তাদের ব্লক করে দিচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে।

(Visited 67 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *