কওমী এবং আলিয়া মাদ্রাসা প্রসঙ্গ

কওমী বনাম আলিয়া মাদ্রাসার যে দ্বৈরথ তা আলোচনার আগে পোপতান্ত্রিক ইউরোপের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর আগে একটু বলে রাখা ভাল আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট আসলে কি ছিল? অনেকে মজা করে আলিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের তুলনা করে। তারা বিরক্তির সঙ্গে বলে বাপ মহেশ ভাট না থাকলে যেমন অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের ভাত ছিল না, তেমনি ইংরেজ প্রভুরা না আসলে আলিয়া মাদ্রাসা নামের অদ্ভুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা পেত না।

ইতিহাস বলছে দাপ্তরিক ভাবে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া নামে পরিচিত এই মাদ্রাসা ১৭৮০ সালে বাংলার ফোর্ট উইলিয়ামের গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিসং কর্তৃক কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজ শাসনের প্রাথমিক পর্বে প্রশাসন পরিচালিত হতো প্রচলিত ফার্সি ভাষায় রচিত আইন অনুসারে। এ কারণে প্রশাসনের জন্য, বিশেষ করে বিচার বিভাগের জন্য প্রয়োজন ছিল আরবি, ফার্সি ও বাংলা ভাষায় দক্ষতা। এ ছাড়া মুসলিম আইনের ব্যাখ্যা ও মামলায় রায় দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল অনেক মৌলবি ও মুফতির। একই সঙ্গে মৌলবি ও মুফতিদের ইংরেজি ভাষায় জ্ঞান থাকারও প্রয়োজন ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মুসলমানদের জন্য একটি মাদ্রাসা ও হিন্দুদের জন্য একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম হেড মাওলানা ছিলেন মাওলানা মাজদুদ্দীন।

১৭৮১ থেকে ১৮১৯ সাল পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসা ‘বোর্ড অব গভর্নরস’ দ্বারা এবং ১৮১৯ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ইংরেজ সেক্রেটারি ও মুসলমান সহকারি সেক্রেটারির অধীনে ‘বোর্ড অব গভর্নরস’ দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৮৫০ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যক্ষের পদ সৃষ্টি হলে ড. এ. স্প্রেংগার মাদ্রাসার প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৮৫০ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ কর্মকর্তাগণ এ পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯২৭ সালে শামসুল উলামা খাজা কামালউদ্দীন আহমদ সর্বপ্রথম এ মাদ্রাসায় মুসলমান অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

কলকাতা মাদ্রাসা শুরু থেকেই লক্ষেমŠর ফিরিঙ্গি মহলের প্রখ্যাত আরবি স্কুল ‘দারসে নিযামিয়া’র মডেল অনুসরণ করে পাঠদানের কোর্স প্রণয়ন করে। ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত মাদ্রাসার পাঠক্রমে ফার্সি ভাষা মুখ্য স্থান দখল করে। ত্রৈরাশির দ্বৈত নিয়ম অর্থাৎ অনুপাত ও সমানুপাত পর্যন্ত গণিত শেখানো হতো, এবং ইউক্লিডের শুধু একটি পাঠ পড়ানো হতো। অ্যারিস্টটলের পুরনো দার্শনিক মতের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের কোর্সসমূহ পড়ানো হতো।

১৮২৯ সালে আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি বিভাগ খোলা হয়। ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩৪ বছরে এ বিভাগে ১৭৮৭ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। এঁদের মধ্যে নওয়াব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী বিশেষ কৃতিত্ব লাভ করেন। ১৮৬৩ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় এফ.এ পর্যায়ের ক্লাস সংযোজিত হয়। ১৮৫৪ সালে মাদ্রাসায় একটি পৃথক ইনস্টিটিউট হিসেবে ইঙ্গ-ফারসি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ভর্তির সময় শরাফতনামা (উচ্চ বংশে জন্মের সনদপত্র)-র উপর জোর দেওয়া হতো। ইংরেজি এবং ফারসি ভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইঙ্গ-ফারসি বিভাগের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উপযোগী করে গড়ে তোলা। ইঙ্গ-ফারসি বিভাগ মুসলিম অভিজাতদের মধ্যে তেমন আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। ১৮২১ সালে মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মাদ্রাসায় প্রথাগত পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৮৫৪ সালের শিক্ষাসংক্রান্ত ‘ডেস্পাচ’-এ কলকাতা মাদ্রাসাকে প্রস্তাবিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসার ইঙ্গিত থাকলেও মাদ্রাসাটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনা হয়নি। ১৯০৭ সালে মাদ্রাসায় তিন বছর মেয়াদি কামিল কোর্স চালু হয়।

১৯৪৭ সালে আলিয়া মাদ্রাসা কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ঢাকায় আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন খান বাহাদুর মাওলানা জিয়াউল হক। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে নজরুল কলেজ)-এ মাদ্রাসার কার্যক্রম চলতে থাকে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ১৯৫৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকার বখশীবাজারে মাদ্রাসার চারতলাবিশিষ্ট নতুন ভবন ও ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৬১ সালে মাদ্রাসা লক্ষ্মীবাজার থেকে বখশীবাজারে স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন খান বাহাদুর মাওলানা জিয়াউল হক। এই তথ্যগুলো আমার লেখা নয় বাংলাপিডিয়াতে লিখেছেন আ.ব.ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী।

এদিকে কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে কওম তথা জাতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আলিয়া মাদ্রাসা যেখানে ধীরে ধীরে ইসলামকে ব্রিটিশদের বেঁধে নেয়া নীতির আলোকে সাজাতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে বারংবার তার বিপরীতে কওমী মাদ্রাসা একেবারেই ভিন্ন স্রোতের যাত্রী। যদিও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত বেসরকারি ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর পরিচিতি। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্টার সঙ্গে বিপ্লব ও সংগ্রামের অনেক ইতিহাস জড়িত।

ইতিহাস বলছে কওমী ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল “আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দ”। দাবি করা হয় কওমি মাদ্রাসাগুলো সাধারণত সরকারি আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে মুসলিম জনসাধারণের সহায়তায় পরিচালিত হয়। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা বহুল প্রচলিত। ভারত উপমহাদেশের পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। তবে উপমহাদেশের বাইরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সাধারণত দারুল উলুম বা “দেওবন্দি মাদ্রাসা” নামে পরিচিত।

যাই হোক কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তর সমমান ঘোষণা দেয়ার পর নানা মহল থেকে তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। কওমী কর্তৃপক্ষ বলছেন ইসলামের শিক্ষাই তাদের মূল লক্ষ্য, তবে পাঁচটি ভাষার শিক্ষাও দেয়া হয় – বাংলা, ইংরেজি প্রাথমিক পর্যায়ে, আরবি উচ্চস্তর পর্যায়ে, উর্দু এবং ফারসি। পক্ষান্তরে চাকরির বাজারে চাপ পড়ায় এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেনি আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। অন্যদিকে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষার্থী হয়রানি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনুদানের প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত লম্পট, নিপীড়ক, ধর্ষক ও নেশাখোরদের অনেকের গভর্নিং বডিতে ঢুকে পড়া নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে চারদিকে।

ক্যাথলিক মৌলবাদের যুগে ইউপের চার্চগুলো পোপদের সীমাহীন লোভের বলি হয়। তারা আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে অনেক অসাধু মানুষকে সেখানে যুক্ত করেছিল। ফলে চার্চকেন্দ্রিক অপকর্ম, অজাচার, সমকামিতা, বৈরাগ্য, নারী নির্যাতন, ধর্ষণের পর ডাইনি পরিচয়ে সুন্দরী নারীদের হত্যাকাণ্ড এগুলো বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে। অনেক মাতুব্বর বলতে পারেন সমকামিতাকে আমি অপরাধের তালিকায় রেখেছি কেনো? আমার স্পষ্ট উত্তর Homosexuality is the worst primitive stage of Sadomasochism. আর বেশি চুলকানি যাদের তারা স্বেচ্ছায় আমার বন্ধুতালিকা থেকে দূর হন।

বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থা অনেকটা মধ্যযুগের ইউরোপের মত। এখানে মানুষ ইসলাম ধর্মকে উপযুক্ত পদ্ধতিতে পালনের তুলনায় বিদআত করছে বহুগুণ বেশি। আর তার থেকেও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এই বিদআতকে ধর্মাচার হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এর থেকে সুযোগ নিচ্ছে এনজিওকেন্দ্রিক ছোটলোক, শুয়োর এবং ধান্দাবাজগুলো। অন্যদিকে পরমতসহিষ্ণু যে হাজার বছরের সংস্কৃতিকে বাংলাদেশ ধারণ করে তা কয়েকদফা হোচট খাচ্ছে ইসলামোফোবিয়ার চৌকাঠে এসে। কথিত প্রগতিশীলতার দাবিদার ছোটলোকগুলোর সঙ্গে মূলত ইসলামের নামে বিদআতে যুক্ত অতি ধর্মিকের বিশেষ পার্থক্য নেই। এরাও মূর্খতা, বিষেদগার আর বিভাজনের বিষে বিষাক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত করছে সুন্দর একটা দেশকে।

প্রিয় পাঠক! আপনারা কি সত্যিই একটা সুন্দর বাংলাদেশ চান ? যদি তাই চান তবে শয়তানির মুখোশে ঢাকা নষ্ট বকধার্মিক এবং জার্মানির ভিসালোভী ইসলামোফোবিক জানোয়ারগুলোকে এড়িয়ে চলুন। এদের প্রতিহত করার প্রয়োজন নাই। কারণ ওরা সংখ্যায় খুব নগন্য। আপনাদের প্রতিহতকরণ আদিখ্যেতায় এদের মত ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা গো-শাবকের আদল পায়। তারপর বিষেদগারের বিষবৃক্ষ বেড়ে উঠে একদিন মহীরূহের রূপ নেয়। তার ছায়াতলে সুন্দর আশ্রয় পায় বুদ্ধিবৃত্তির মেশপালের মধ্যে উদ্ভট ভঙ্গিমায় চলতে থাকা ঐ গো-শাবক।

(Visited 113 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *