প্রযুক্তিবান্ধব মানবিক বিদ্যা ও বাংলাদেশ

গুলশান কিংবা বনানীর অভিজাত পল্লী থেকে ব্যবহূত পুরানো টেলিফোন সেট, হেয়ার ড্রায়ার, ব্লাড প্রেশার মাপার ডিজিটাল মেশিন, ভিসিআরের ক্যাসেট, ভাঙা ডিভিডি ইত্যাদি যখন ফেলে দেয়া হয়, সেগুলো মূলত বিক্রি হয় ভাঙারির দোকানে। অনেক সময় তা কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আশপাশের বস্তির শিশুদের বেশ রসিয়ে খেলাধুলা করতেও দেখা যায়। অনেকটা কটাক্ষের মতো শোনালেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন কোনো বিষয় যুক্ত হতে দেখা গেলে সবার আগে আমার এ কথাই মনে হয়। বিশ্বব্যাপী নিগৃহীত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্টি ছাড়া ভ্রান্তিবিলাস দেখে এ কথাই মনে হয়েছে বারবার। এর বাইরে এমন অনেক প্রযুক্তিগত উপাচারে আমাদের চারপাশ ঘিরে থাকতে দেখা যায়, যেগুলো অনেক আগেই উন্নত বিশ্বের মানুষ ছুড়ে ফেলেছে তাদের দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞ থেকে।

প্রত্নতত্ত্ব-ইতিহাসের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং পরবর্তীকালে শিক্ষক হিসেবে নিজের বিষয় থেকেও দুস্তর উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন— আশির দশকের শেষাংশে এসে আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হতে দেখা যায় সাবঅলটার্ন স্টাডিজকে। তবে সেই ১৯৮৮ সালের দিকেই ক্যারি নেলসন ও লরেন্স গ্রসবার্গ সম্পাদিত ‘মার্ক্সিজম অ্যান্ড দি ইন্টারপ্রিটেশন অব কালচার’ গ্রন্থে বিষয়টিকে তুলোধুনো করে ছেড়েছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তিনি প্রশ্ন করে বসেন, ‘ক্যান সাবঅলটার্ন স্পিক?’ মজার বিষয় হচ্ছে, কথিত অভিজাত পরিবার থেকে পরিত্যক্ত টেলিফোন তুলে নিয়ে কোনো রকম ওয়্যার কানেকশন বাদেই বস্তির শিশুরা যেমন অহেতুক হ্যালো হ্যালো করতে থাকে, ঠিক তেমনি সাবঅলটার্ন বিষয়টি আলোচনা শুরু হয় এ দেশের ইতিহাস অঙ্গনে। এর পর থেকে ভাবখানা গিয়ে দাঁড়ায়, যারা বুঝে কিংবা না বুঝে সাবঅলটার্ন কথাটি উচ্চারণ করতে পেরেছেন, তারা কিছু না পারেন অন্তত ইতিহাসচর্চার আধুনিক স্রোতে যুক্ত হতে পেরেছেন। একইভাবে মর্ডানিটি, পোস্ট মর্ডানিটি কিংবা প্যাটাসিজমের মতো ধারণাগুলোও ধীরে যখন এ দেশে পরিচিতি পেয়েছে, অন্য দেশে তার বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে বলা যায়।

গৌরচন্দ্রিকায় বিক্ষিপ্ত দুটি গল্প বলার প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন নয়। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। দেশ-বিদেশের নানা গবেষক নিজ নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝাতে চাইলেন প্রযুক্তি কীভাবে মানবিক বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিংবা হতে পারে। এ সম্মেলনের আলোচ্য সূচিতে ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে শুরু করে ক্লাসরুম প্রেজেন্টেশন, চলচ্চিত্র কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের তত্ত্বকথা— বাদ পড়েনি কিছুই। আমন্ত্রিত আলোচক হিসেবে এখানে আমার বলার সুযোগ হয়েছিল শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে পাঠদানকে চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তুলতে পারে এ বিষয়ে। অনেক আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ করেছি, ভারত ও বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষে প্রযুক্তি বলতে ক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট ব্যবহারের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে এখনো ভাবতে শুরু করেননি। একটি বিশেষ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে স্বল্প সময়ে তার ওপর প্রয়োজনীয় তথ্য নির্দিষ্ট অংশীজনের সামনে উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এ সফটওয়্যার। শ্রেণীকক্ষের পাঠদানে এর সংযুক্তি মূলত পাঠের বৈষয়িক ধারণার সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে শিক্ষার্থীকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি শিক্ষকের উপস্থাপনা প্রাঞ্জল, অর্থবহ ও বাস্তসম্মত করে তুলতেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে এটি। তবে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সমান্তরালে দৃশ্যমানতা তৈরির  জন্যই এর উপযোগিতা সবচেয়ে বেশি।

অবাক করার বিষয় হলো, কলা ও মানবিক বিদ্যার বেশির ভাগ শিক্ষক মনে করেন যে শ্রেণীকক্ষে অপেক্ষাকৃত আধুনিক হওয়ার জন্যই তাদের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা, সেটাই উহ্য থেকে যাচ্ছে সিংহভাগ ক্ষেত্রে। শিক্ষার্থীদের দুস্তর অভিযোগ, অনেক শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের কোনো প্রস্তুতি না নিয়েই ক্লাস শুরু করছেন পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে। তারপর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাওয়ার পয়েন্টের প্রেজেন্টেশন চালু করে, বিশ্রীভাবে তা রিডিং পড়ে ক্লাস শেষ করছেন। এতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের মিথস্ক্রিয়া যেমন হচ্ছে না, তেমনি আগের সাধারণ শ্রেণীকক্ষ পাঠদানের চেয়েও বিরক্তির মাত্রাটা বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব টেবিল, চার্ট, লেখচিত্র কিংবা গ্রাফিকসের অনর্থক প্রদর্শনী চলছে, তার সঙ্গে আদতে পাঠ্য বিষয়ের কোনো সম্পর্কই থাকছে না। সত্যি বলতে, প্রযুক্তির এমন অযাচিত ও অবাঞ্ছিত ব্যবহারের তেমন কোনো উপযোগ যেমন নেই, তেমনি তা একার্থে চরম ক্ষতির কারণ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য। হিউম্যাশিনিটিজ শীর্ষক এ সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা হয়েছে। বিশেষ করে প্রায় প্রত্যেক গবেষকের উপস্থাপনায় স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা ছিল, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান প্রযুক্তির প্রয়োগকে যৌক্তিক ও অর্থবহ করে তোলা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমার উপস্থাপনায় গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছি তিনটি বিষয়— ১. শিক্ষার্থীদের ধাঁচ বুঝে প্রযুক্তির প্রয়োগ, ২. প্রযুক্তি ও পাঠদানের সমন্বয় সাধন এবং ৩. শিক্ষকতায় সক্রিয় অবস্থান নিশ্চিতকরণ। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগই শুধু নয়, তার প্রয়োগকে কতটুকু যৌক্তিক করে তোলা সম্ভব, সেদিকেই জোর দিতে বলা হয়েছে।

একটু পেছনে ফিরে গেলে দেখা যায়, সেই ১৯৬০ সালের দিকেই মানুষ ও মেশিনকে একত্রে ভেবে আলোচনা শুরু হয়েছিল। সাইবারনেটিক অর্গানিজম তথা সাইবর্গ নিয়ে তখনকার আলোচনার প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন ম্যানফ্রেড ক্লাইনেস ও ন্যাথান এস ক্লাইন। তারা এ সময় থেকেই যখন বাইয়োনিক কিংবা বায়োরোবট নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন, তখন এ ধরনের ভাবনা ভারত উপমহাদেশের কমিকসেও ছিল না। এজন্যই যখন হিউম্যান ও মেশিন মিলিয়ে ‘হিউম্যাশিনিটিজ’ শব্দটি উচ্চারণ করতে হচ্ছে, তাতে যে কারো ভিরমি খাওয়ার দশা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ একটাই, পুরো বিশ্ব যখন রোবোটিক্সে বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধন করেছে, বাংলাদেশের প্রজন্ম মেতে আছে অদ্ভুতুড়ে বাংলা চলচ্চিত্র ‘মেশিনম্যান’ নিয়ে ট্রল করতে। ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রয়াত নায়ক মান্নার পাশাপাশি মৌসুমী, অপু বিশ্বাস ও কাজী হায়াৎ অভিনীত চলচ্চিত্রটির কাহিনী, চিত্রনাট্য কিংবা সংলাপ— প্রতিটি ক্ষেত্রের দৈন্য আর কিছুই নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। সম্প্রতি টেসলার প্রতিষ্ঠাতা, বিজ্ঞানী এলান মাস্ক দুবাইয়ে এক সম্মেলনে হাইপার লুপ সম্পর্কিত আলোচনায় বলেছেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে টিকে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তার বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে আরো নতুন কিছু যুক্ত করে সাইবর্গ রূপ নিতে হবে।’ প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, সাইবর্গ হচ্ছে প্রাকৃতিক ও যান্ত্রিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশেষ মানুষ। নন্দিত গায়িকা ম্যাডোনার পেশিবহুল হাত যেমন নারী-পুরুষের সক্ষমতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে, তেমনি রোবোকপের কথাও বলা যায়। টেলিভিশনে প্রচারিত চরিত্রটি একজন সাহসী পুলিশ অফিসারের। দুর্ঘটনার পর তাকে বাঁচিয়ে রাখতে শরীরের অনেক অঙ্গ কৃত্রিমভাবে প্রতিস্থাপন করতে হয়েছিল। এ সমন্বয় থেকে তাকে মানুষ আর রোবটের মিশ্রণে গড়ে ওঠা বিশেষ সংস্করণ বলা যায়, যেখানে মানুষের বুদ্ধির সঙ্গে যন্ত্রের সুবিধা যুক্ত হয়েছিল। মানুষের নশ্বর দেহ আগুনে পুড়ে গেলেও তার মতো বোধশক্তিসম্পন্ন রোবটের স্টিলের হাত আগুনে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

কবি কবিতা লিখবেন, ঔপন্যাসিক মনের মাধুরী মিশিয়ে ভাষা খুঁজে নিতে চেষ্টা করবেন কালি ও কলমে কিংবা গল্পকারের কল্পনা অল্পবিস্তর হলেও পাঠ উপযোগী হয়ে উঠবে কথকতায়। এগুলো নিয়ে গত্বাঁধা আলোচনা আর বছরান্তে পরীক্ষার নামে চলা ৪ ঘণ্টার যুদ্ধক্ষেত্রে খাতা ভরে যা ইচ্ছা তা-ই লেখার লড়াইয়ে লিপ্ত হবে শিক্ষার্থীরা। আর এভাবে বছরের পর বছর বিশেষ আজগুবি পাঠদান ও পরীক্ষা গ্রহণে চলতে থাকা শিক্ষা ব্যবস্থাই সাধারণের চোখে মানবিক বিদ্যা। অনেক পরে হলেও সম্প্রতি হিউম্যাশিনিটিজ তথা ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ শীর্ষক যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাকে আরো গতিশীল করে তুলতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও গণমানুষের সামনে মানবিক বিদ্যা সম্পর্কিত ধারণা পাল্টে দিলেই এ বিশেষ ধারণার সার্থকতা নিশ্চিত করা যাবে না। এক্ষেত্রে এমন একটি টেকসই পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে, যা একাধারে শিক্ষকের পাঠদান প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে; পাশাপাশি শিক্ষার্থীর বিরক্তি ও জ্ঞানার্জনের পথে অন্তরায় হয়ে দেখা না দেয়। অন্যদিকে মানবিক বিদ্যায় পাঠদানের পাশাপাশি ওই অনুষদের বৈষয়িক গবেষণায় যারা যুক্ত রয়েছেন, তাদের উচিত প্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তার নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সতর্ক থাকা। অন্তত প্রয়োগের নামে এমন প্রযুক্তির অনর্থক ব্যবহারে বাহবা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই, যা আদতে শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষে পাঠদান কিংবা শিক্ষার্থীদের অনুধাবন দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে হিউম্যাশিনিটিজ তথা ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ শীর্ষক যে আলোচনা গতি পেয়েছে, তা সাবলীলভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হলে এ ধরনের প্রতিবন্ধক থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে অন্তত মানবিক বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির উপযুক্ত ও কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে বলে বিশ্বাস রাখাই যায়।

(Visited 19 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *