ভূত, ডাকিনীবিদ্যা ও জাদুমন্ত্রের প্রত্নতত্ত্ব

মানবসংস্কৃতির উন্মেষকাল থেকেই অতিপ্রাকৃত কিংবা অবাস্তব শক্তি নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষ করে অনগ্রসর সমাজে এর প্রভাব বেশি হলেও কথিত সভ্য সমাজও এ ভ্রান্ত ধারণা অতিক্রম করতে পারেনি। অন্তত বিভিন্ন উপকথা, অতিকথন কিংবা গল্পগাথাকে উপলক্ষ করে তৈরি করা চলচ্চিত্র নিয়ে আকাশচুম্বী উচ্ছ্বাস কিংবা জনপ্রিয়তাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। লোকগাথা ও কল্পকথায় ভূত বলতে বোঝায় অতৃপ্ত অশুভ আত্মার আবির্ভাবকে। প্রচলিত বিশ্বাস থেকে মানুষের মনে এদের নিয়ে বদ্ধমূল বিরূপ ধারণা জন্মায় যে, এরা মৃত্যুর পর নানাভাবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে মানুষের ক্ষতি করে। ভূতদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত অস্পষ্ট। অনেকটা এমন যে, তারা মানবসমাজে না থেকেও সবখানে আছে কিংবা সবখানে থেকেও কোথাও নেই। নেক্রোম্যান্সি কিংবা নেক্রোফ্যান্টাসির মতো ঘটনা থেকেই মানুষ ভূতকে নিয়ে অদ্ভুত  সব ভাবনা ঠাঁই দিয়েছে মনে। এভাবেই অশুভ আত্মার আবির্ভাব, লৌকিক বরাভয়, ডাকিনীবিদ্যা কিংবা জাদুমন্ত্রে অন্ধ বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের গল্পটা অনেকটাই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে জনমানসে।

ডাকিনীরা রাতের বেলা উড়ে বেড়ায়ভূত-প্রেত নিয়ে যে অনভিপ্রেত কাকতাল কিংবা অন্য রকম কল্পনা, এর অস্তিত্ব খুঁজতে গেলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্বের কথা বলাই যায়। বিখ্যাত আলতামিরা কিংবা লাসকক্স গুহাচিত্রে এমন নানা সূত্র রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক মানবসংস্কৃতির মিল নেই বললেই চলে। কেউ কেউ এগুলোকে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি অর্ঘ্য নিবেদনের অনুষঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, কারো হিসেবে এগুলো নিছক ভূত-প্রেত কিংবা ডাকিনীবিদ্যার অনুষঙ্গ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, প্রাচীন মানুষের সংস্কৃতি ভাবনা। তারা আশপাশের প্রকৃতি ও প্রতিবেশ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে যেগুলোকে অস্বাভাবিক দেখেছেন, সে সম্পর্কে নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়েছেন। তারা দেখেছেন সূর্য কীভাবে ওঠে আর অস্ত যায় কিংবা আকাশে চাঁদের আবর্তন কোন সময়টায় কেমন থাকে? এগুলো নিয়ে চিন্তার পর তারা শুধু নিজের খেয়ালখুশিমতো ব্যাখ্যাই দাঁড় করাননি, পাশাপাশি চেষ্টা চালিয়েছেন এর আলোকে একটা ধর্মাচার গড়ে তোলার। সময়ের আবর্তে বিভিন্ন দেশ-সংস্কৃতির মানুষ যে নিদর্শনগুলো ফেলে গেছেন, সেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ডাকিনীবিদ্যা থেকে শুরু করে ভূত-প্রেত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ সম্ভব।

 অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলে বোঝা যায়, তানজানিয়ায় পাথর যুগের একটি গুহাচিত্রে জাদুমন্ত্র-সম্পর্কিত যে বিষয় চিত্রিত হয়েছে, তা থেকে এ যুগের মানুষও বের হতে পারেনি। অন্তত ইউরোপের নানা দেশের প্যাগানরা মাথায় ঝুড়ির মতো টুপি পরে ঘোড়ার লেজ ধরে হাঁটাহাঁটি করে যে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করে, তার সঙ্গে এমন প্রাচীন গুহাচিত্রের মিল রয়েছে দেদার। প্রাচীন যুগের মানুষ প্রকৃতির নানা অসাম্য থেকে মুুক্তি পেতে জাদুটোনার আশ্রয় নিতেন। তাদের অনেককে দেখা গেছে কুদৃষ্টি ও ভূত-প্রেত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বিভিন্ন ধরনের তাবিজ-কবচ ব্যবহার করতে। এগুলো লৌকিক বিশ্বাসে অস্বাভাবিকভাবে হলেও টিকে আছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল উয়ারী-বটেশ্বর থেকে বিশেষ ধরনের মন্ত্রপূত কবচ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। মিসর, সুমের, ব্যাবিলন কিংবা পারস্যের অনেক প্রত্নস্থান থেকেও কমবেশি এ ধরনের তাবিজ-কবচের দেখা মিলেছে। প্রত্ননিদর্শন থেকে আদিবাসী সংস্কৃতি, অতীতের কল্পকথা কিংবা গল্পকথা সবখানেই এমন ধরনের বিশ্বাস ও আচারের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। নন্দিত লেখক হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড তার অ্যালান অ্যান্ড দি আইস গড লিখতে গিয়ে তুলে ধরেছেন নানা ধরনের জাদুটোনার কথা। নেকড়ে মানব প্যাগ সেখানে ‘ভালুকগুলোই দেবতা নাকি দেবতারাই ভালুক’ বলে বিশ্বাসের প্রতি কটাক্ষ করেছে। কিন্তু একপর্যায়ে দেখা গেছে, জাদুটোনা কিংবা অশুভ ভৌতিক শক্তির ভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি সেও। এ ধরনের কাহিনী রচনার পটভূমি বিশ্লেষণ করতে গেলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। ইংরেজ লেখক হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড আফ্রিকার এমন একটি সমাজে থেকে এ কাহিনী লিখেছেন, যেখানে এ ধরনের বিশ্বাস ও কুসংস্কারের অস্তিত্ব ছিল। তিনি একজন লেখক হয়ে হূদয়ে বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে এ লেখা শুরু করেছেন বলেই শেষ পর্যন্ত দুশ্চিন্তা অতিক্রম করতে পারেননি। তিনি তার চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন লেখায়। দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত তিনি ভূত-প্রেত কিংবা ডাকিনীবিদ্যার নানা বিষয় তার গল্প-উপন্যাস থেকে বাদ না দিয়ে অনন্যসাধারণ ব্যঞ্জনায় তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তার রচিত কথাসাহিত্যে।

মরদেহ নিয়ে তান্ত্রিকদের আচার অনুষ্ঠান

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা বিশ্বের নানা দেশ থেকে আবিষ্কার করেছেন বিভিন্ন ধরনের সমাধি। সেখানে মরদেহের সঙ্গে নানা ধরনের খাবার থেকে অস্ত্রসহ দাফন করার রীতি শনাক্ত করা গেছে। এর বাইরে সমাধির সেনোটাফে দেখা গেছে বিচিত্র সব অলঙ্করণ। এগুলোর প্রতীকী অর্থ বিশ্লেষণ করতে গেলে বেরিয়ে আসে ডাকিনীবিদ্যা ও ভূত-সম্পর্কিত অগণিত অকথিত কথন। বিজ্ঞান ও  প্রযুক্তির উত্কর্ষের এ যুগে আমরা মাথা খাটিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে পারি। তবে প্রাচীনকালের মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনগ্রসর ছিল। তারা যেকোনো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে নিজের মতো ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছেন। আর সেখানে ধর্ম থেকে শুরু করে অস্বাভাবিক শক্তির প্রতি তাদের বিশ্বাস আর জাদুমন্ত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে পরস্পর মিলেমিশে থাকার অনুপ্রেরণা জোগানোর পাশাপাশি আরো নানা ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক শক্তি থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতা গুরুত্ববহ ভূমিকা রেখেছে। এর বাইরে প্রাকৃতিক নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে স্বাভাবিক জীবনধারণের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত প্রভাব ছিল তাদের বিশ্বাস ও আচার-আচরণে। প্রথম দিকে মানুষের কর্মকাণ্ডে এসব বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকলেও পরবর্তীকালে ধর্মগ্রন্থ ও পবিত্র গ্রন্থিত সূত্রগুলোয়ও ঠাঁই মেলে এসবের। প্রত্নসূত্র থেকে বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, প্রথম দিকে মানুষ নিজের মতো করে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। এরপর মানুষ নিজের প্রয়োজন আর সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বদলে ফেলেছে তাদের বিশ্বাসের ধরন। এখানে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছে নানা কুসংস্কার। ফলে একপর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে, মানুষ আস্থা রাখছে জাদুটোনায়, ডাকিনীবিদ্যায়, এবং এসব বিষয় বদ্ধমূল ধারণা হিসেবে ঠাঁই নিচ্ছে মন ও মননে।

মোদ্দাকথা, ম্যাজিকো-রিলিজিয়াস যে বিষয়গুলোকে মানুষ তাদের স্বাভাবিক যুক্তিতে বুঝে নিতে পারেনি, সেখান থেকেই ডাকিনীবিদ্যার বিস্তার। বিভিন্ন দেশ তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বিষয়টিকে কীভাবে স্থান করে নিয়েছে, তার প্রমাণ মেলে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণের পাশাপাশি প্রত্নসূত্রের বিশ্লেষণ থেকে। এক্ষেত্রে একটি প্রাচীন বস্তুনিদর্শনের প্রতীকী ও কার্যকারণগত বিশ্লেষণ তার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা আধ্যাত্মিক বিষয়ের ধারণা দেয়। মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশ থেকে শুরু করে তদনুষঙ্গে যে বিষয়গুলো এসেছে, সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে সামানিজম। এক্ষেত্রে বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে এক তান্ত্রিকের করতালবাদনদেখা যায় তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে সাধনা করতে। তারা সামাজিক ও ব্যক্তিগত নানা সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে অতিলৌকিক কিংবা এনিমিস্টিক তথা পাশবিক পথ অবলম্বন করেছে। ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্নতায় নানা ধরনের ভূতচর্চা কিংবা ডাকিনীবিদ্যার বিস্তার লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে অদৃষ্টের দোষ কাটাতে কিংবা রোগব্যাধি থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় নানামুখী পদ্ধতি অনুসৃত হয়। রোগের ক্ষেত্রে যেমন ওষুধ রয়েছে, তেমনি ভাগ্যদোষ এড়াতে নানা যাগযজ্ঞের প্রচলনও দেখা যায়।

বিশ্বের নানা দেশের নৃ-বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার জন্য উর্বর ক্ষেত্র মনে করেন আফ্রিকাকে। এক্ষেত্রে নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে সেখানে, যার সূত্র ধরে বিভিন্ন ধরনের অতিলৌকিক বিশ্বাস ও সামাজিক আচার প্রতিষ্ঠা পেতে দেখা যায় এ অঞ্চলে। বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে অনেকটা অমিল রেখে এখানে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি বিস্তার ঘটতে দেখা গেছে বিবিধ কুসংস্কারের। তারা ভূত-প্রেত নিয়ে যেমন বিশ্বাস করে, তেমনি অদৃষ্টের অনিষ্ট এড়াতে যাগযজ্ঞনির্ভর লোকাচার বিস্তার ঘটিয়েছে নানাভাবে। অন্তত আধ্যাত্মিক কিংবা শারীরিক উভয় পরিসর থেকেই তারা চেষ্টা চালিয়েছে নিজেদের স্বতন্ত্র একটি পরিচয় দাঁড় করাতে। কেনিয়ার মাসাই জনগোষ্ঠী যেমন তাদের বিশ্বাস সামনে রেখে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজস্ব সামাজিক আচার, তেমনি জুলু, বান্টু, হটেনটট কিংবা পিগমিদের বিশ্বাস নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এর বাইরে নানা রোগশোকের চিকিত্সা করতে তারা পথ করে নিয়েছে নিজের মতো করে। গাছগাছড়া আর তন্ত্রমন্ত্রনির্ভর যে চিকিত্সা পদ্ধতি, সেগুলোর নৃ-বৈজ্ঞানিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলেছে বেশ। বলা যেতে পারে নাইজেরিয়া থেকে প্রাপ্ত কাঠের তৈরি ‘ইগবো’ নিদর্শনটির কথা। এর থেকে ধর্মবিশ্বাস কিংবা ডাকিনীবিদ্যার নানা বিষয় তুলে ধরা যেতেই পারে। এর বাইরে তারা এখনো ভূতে ধরায় বিশ্বাস করে। ভূত ছাড়াতে বিভিন্ন ধরনের গাছগাছড়ার ডালপালা থেকে শুরু করে তন্ত্রমন্ত্রের ব্যবহার তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এখনো। বিশেষ করে হিস্টিরিয়ার অনেক রোগীকে সেখানকার ওঝাদের পাশবিক নির্যাতনের বলি হয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তেও দেখা গেছে ভূত তাড়ানোর নামে। বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে আফ্রিকার আদিবাসী বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত ভূত তাড়ানোর নিদর্শন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে ধরে নেয়া যেতে পারে, প্রাচীনকালেও তাদের মধ্যে ভূত-প্রেতের দুশ্চিন্তা বেশ ভালোভাবে আসন গেড়ে ছিল। তাই ভূত তাড়াতে তাদের ব্যবহূত কাঠের তৈরি ‘সেনুফো কুনুংবাহা’ মুখোশ কিংবা ‘কিকুজু পেতনি চিকিত্সক’ ঐতিহাসিক কিংবা বর্তমানের বাস্তবতা দুই ক্ষেত্রেই উপস্থিত। বান্টু বিশ্বাস থেকে তাদের ভূতের ওঝা ‘নাগাঙ্গা’র গুরুত্ব রয়েছে বেশ। তারা নানা মৃত্পাত্র, ঝাড়ু, লাঠি, মড়ার খুলি, পশুর অস্থি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ কাজে লাগিয়ে ভূত তাড়াতে সিদ্ধহস্ত। এর বাইরে নানা ধরনের তন্ত্রমন্ত্র ও ঝাড়ফুঁক তো রয়েছেই তাদের মধ্যে।

বেনিনের ভুডু সংস্কৃতির কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। এখানে ‘ফন বোসিও’ প্রতিকৃতি নিয়ে তাদের যে তেলেসমাতি, সেটা শুধু দেখা নয়, গল্প শুনতে গেলেও গায়ে কাঁটা দেয়ার মতো। তারা বিশ্বাস করে, এই আদিভৌতিক চরিত্রটি তাদের ভূত থেকে রক্ষা করবে। ফলে এ থেকে অতিলৌকিক শক্তি খুঁজে নিতে দেখা যায় তাদের। ঘানা, বুরুন্ডি কিংবা বারকিনা ফাসোয় তারা এই ভুডু সংস্কৃতির আদলে বিশেষ উত্সব পর্যন্ত আয়োজন করে। বিভিন্ন ধরনের রঙিন ঝালরযুক্ত বাহন তৈরির পাশাপাশি সারি করে মড়ার খুলি সাজিয়ে আয়োজন করা হয় যজ্ঞানুষ্ঠানের। এদিকে টোগোর এই ভুডুদের উত্সব সামনে রেখে আয়োজন করা হয় বিশেষ মেলারও। এখানে মূলত হাইতিতে নিয়ে আসা দাসদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও যন্ত্রণার জীবন থেকে শাপমুক্তির পথ খোঁজার সনাতন রীতিই প্রতিষ্ঠা পেতে দেখা গেছে জনমানসে। অন্তত দাসরা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেছে নিয়েছিল অদ্ভুত সংস্কৃতির মাধ্যমে যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনকে উপভোগ করার উপায়। একপর্যায়ে এসে এই হাইতিয়ান ভুডু ধর্মাচার হিসেবে ঠাঁই নিয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতিতে। বিশেষ উত্সব সামনে রেখে তারা ঐতিহ্যবাহী নানা আয়োজন প্রদর্শন ও উদযাপনের পথ করে নিয়েছে এখানে। উত্সব সামনে রেখে আফ্রিকার যেসব আদিবাসী আয়োজন, সেগুলোকে সামনে থেকে পরিচালনা করেন বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা। তারা পরিস্থিতির দায় মেনে এসব কাজ করছেন নিজ উদ্যোগেই। অন্তত মানুষের বিশ্বাস আর ভয়কে কাজে লাগিয়ে ওঝাদের করা কীর্তিকলাপে ভূত-প্রেত কিংবা ডাকিনীবিদ্যার মতো বিষয় স্থায়ী আসন করে আছে শতসহস্র আফ্রিকানের মনে।

বিজ্ঞানের যুগে এসে হয়তো জাদুমন্ত্রের পাশাপাশি ডাকিনীবিদ্যার আবেদন কমেছে। কিন্তু যে ভূতের ভয় মানুষের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে, তা থেকে মুক্তি দেয় সাধ্য কার? আফ্রিকা থেকে আমেরিকার উত্তর কিংবা দক্ষিণাংশ, পারস্য থেকে অস্ট্রেলিয়া আর এশিয়ার নানা দেশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগণিত প্রমাণ রয়েছে ভূতকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও সামাজিক আচারানুষ্ঠানের। শিব কিংবা শক্তি-সম্পর্কিত ভারতীয় বিশ্বাস, লিঙ্গ পূজা সরাসরি শিব আরাধনার নানা রীতি বিশ্লেষণ করতে গেলেই বোঝা যায়, ডাকিনীবিদ্যা কতটা শক্ত স্থান করে নিয়েছে এসব অঞ্চলের মানুষের মন ও মগজে। তারা তান্ত্রিকতার ধুয়ো তুলে মানুষের অন্ধ অনুরাগ আর ভয়কে দিয়েছে ভিন্ন এক জগত্। বর্তমান সমাজে বিদ্যমান সামাজিক আচার অনুষ্ঠান আর উত্সবের নৃ-বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যনির্ভর আলোচনায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে দেখা যায় ভূত ও ডাকিনীবিদ্যা-সম্পর্কিত বিষয়গুলো। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এগুলোকে আলোচনায় ঠাঁই দেয়ার বিকল্প নেই। অন্তত কথিত এ আধুনিক যুগে এসেও ডাইনি শিকারের যে কিম্ভুতকিমাকার ঘটনাগুলো ইউরোপসহ অনেক উন্নত দেশে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো এখনো অস্তিত্বমান, সে কথাই প্রমাণ করে।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!