বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের ভূমিরূপ ও প্রতিবেশ

বাংলাদেশের আকৃতিগত ক্ষুদ্রতা থেকে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এখানকার ভূমিরূপ একর্থে তেমন বিশেষ বৈচিত্র্যের অধিকারী নয়। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, আকৃতির দিক থেকে এর চেয়ে অনেক বড় বড় দেশের চেয়েও শতগুণ বৈচিত্র্যের অধিকারী বাংলাদেশের ভূমিরূপ। আকৃতি যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের অবস্থান এর ভূমিরূপকে দিয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য। পাশাপাশি দেশটির নানা স্থানের মাটির গঠন, জন্মানো বৃক্ষরাজির বিন্যাস প্রভৃতিও অনেকাংশে ভিন্ন হতে দেখা যায়। উজানে একের এর পর এক দিতে থাকা বাঁধ, পরিবেশ বিপর্যয় আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদাসীনতায় বেশির ভাগ নদ-নদী শুকিয়ে গেলেও কাগজে কলমে জনপদটিকে এখনো নদীমাতৃক দেশ হিসেবেই ডাকা হয়। ভৌগোলিক বর্ণনা দিতে গেলে দেখা যায়, দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে এখনো ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু নদ-নদী। অল্প বিস্তৃতির এ দেশের অমন প্রতিবেশ ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যই এক অর্থে এর সংস্কৃতির বিকাশকে প্রণোদিত করেছে। সাধারণ অর্থে নদীবিধৌত প্লাবন সমভূমির একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাস তেমন প্রাচীন হওয়ার কথা নয়। তার পরও নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রমাণ করে, দেশটির ঐতিহ্যের শিকড় কয়েক হাজার বছরের প্রাচীনত্বে গ্রোথিত।

ভৌগোলিক বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করতে গেলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের প্রায় অর্ধেক অংশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা— এ তিনটি বৃহৎ নদীপ্রণালির সর্বনিম্ন ভাটিতে অবস্থিত। তবে এর গড় উচ্চতা ১০ মিটার সমোন্নতি রেখা অতিক্রম করতে পারেনি। বিশেষ করে উচ্চতা ও ভূমিরূপের এ বৈচিত্র্যের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের ভূমিরূপের শ্রেণীবিভাগ করা হয়। বিশেষত বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। টারশিয়ারি যুগের পাহাড়, প্লাইস্টোসিন যুগের সোপান আর নতুন গড়ে ওঠা নদীবিধৌত প্লাবন সমভূমি এলাকা। এক্ষেত্রে তৃতীয় ভূমিরূপটি সমুদ্র সমতল তেমন উঁচুতে অবস্থিত নয়। ফলে প্রায় প্রতি বছর বর্ষাকালে বাংলাদেশের সিংহভাগ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হতে দেখা যায়। এ বছর যারা দৈনিক পত্রিকার পাতায় চোখ রেখেছেন, খুব সহজেই বলতে পারবেন, পুরো দেশের নানা অঞ্চল কীভাবে প্লাবিত হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে এ প্লাবন হয়ে আসছে আমাদের দেশে। বলতে গেলে দেশটির এ প্লাবননির্ভর প্রতিবেশই প্রণোদিত করেছে এখানকার সাংস্কৃতিক বিকাশকে। পাশাপাশি এখানকার জনজীবন, সামাজিক প্রথা, শিল্পের বিকাশ, বাণিজ্য বিস্তার ও নগর-কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও প্রতিবেশের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক।

ভৌগোলিক ইতিহাস বিচারে অনেকে দাবি করেছেন, বাংলাদেশের ভূমিরূপ যেখানে তেমন প্রাচীন নয়, সেখানে তার ইতিহাস কিংবা এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক বিকাশ তেমন পুরনো নয়। কিন্তু ভূমিরূপ থেকে জানা যাচ্ছে, গঙ্গ, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) ও মেঘনা নদীর পাশাপাশি তাদের অসংখ্য উপনদী ও শাখানদী যে পলল বয়ে এনেছে, তা দিয়েই গড়ে উঠেছিল এ দেশ। ভৌগোলিক কালপর্বের বিচারে কোয়াটারনারি যুগ তথা আজ থেকে প্রায় ২০ লাখ বছর আগে থেকে এ পলল বহন, অবক্ষেপণ ও ভূমি গঠন পর্ব শুরু হয়েছিল। এ পলল সঞ্চিত হয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড। সম্প্রতি গড়ে ওঠা পলল সমভূমির মধ্য উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থায় অনেকটা বলার মতো পরিবর্তন গোচরে আসে। বিশেষ করে গত দুই শতকে গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পূর্বমুখী স্থানান্তর বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্রের উল্লেখযোগ্যভাবে পশ্চিম অভিমুখে সরে যাওয়াকেও আমলে নিচ্ছেন ভূতাত্ত্বিক গবেষকরা। তবে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের ভূমিরূপ আলোচনা করতে গেলে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হয় টারশিয়ারি যুগের টিলা ও পাহাড়গুলোকে। সেই শিলং মালভূমির দক্ষিণ পাশ থেকে বিকাশ লাভ করা শৈলশিরা থেকে বেরিয়ে আসা একটি সরু পথ বরাবর এগিয়েছে এ ভূমিরূপ। রাজনৈতিক মানচিত্র হিসেবে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র সহিংস মিয়ানমারের সীমানা দিয়ে গেছে এ বিশেষ ভূমি। পাশাপাশি সিলেট জেলার পূর্ব ও দক্ষিণভাগেও এর বিস্তৃতি রয়েছে। তবে দেশের দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সিংহভাগ এলাকা ভূমিরূপ হিসেবে এর মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশের তিনটি বিশেষ ভূমিরূপ হিসেবে প্লাবন সমভূমি, সোপান অঞ্চল কিংবা পার্বত্য ভূমি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে গড়ে উঠেছে। এগুলোকে মোট ২৪টির মতো উপাঞ্চলের পাশাপাশি ৫৪টি এককে ভাগ করা হয়। পূর্বাঞ্চলের প্রতিবেশ ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বিশ্লেষণ করার জন্য এ ভূমিরূপের বিশেষ অধ্যয়ন জরুরি। এক্ষেত্রে হাওড় অববাহিকা বলতে যে বৃহৎ, সুষম অবনমিত ভূপ্রকৃতির কথা বলা হয়, তা পশ্চিমে পুরনো ব্রহ্মপুত্র, উত্তরে মেঘালয় মালভূমির পাদদেশ ছাড়িয়ে পূর্বে সিলেটের উঁচু সমভূমি পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। পাশাপাশি দক্ষিণে পুরনো মেঘনা মোহনার প্লাবনভূমি দ্বারা ঘিরে আছে এ অংশ। তবে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে এ অববাহিকার সর্বোচ্চ বিস্তার লক্ষ করা গেছে প্রায় ১১৩ কিলোমিটারের কিছুটা বেশি। এ বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলটিকে সিলেট অববাহিকা নামে চিহ্নিত করা হয় অনেক ক্ষেত্রে। এখানে যেমন অসংখ্য হ্রদ বা বিল ও বৃহদাকৃতির জলাশয় তথা হাওড় রয়েছে, তেমনি এর বিস্তারটাও নেহাত মন্দ নয়; প্রায় ৫ হাজার ২৫ বর্গকিলোমিটার। বাস্তবে এ এলাকা গঠিত হয়েছে বিশাল একটা পিরিচাকৃতির অববাহিকা হিসেবে। এখানকার অবনমনশীল ভূমিরূপের গঠন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এ অবনমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মধুপুরগড়ের উত্থান নানাভাবে সম্পর্কিত।

ভূতাত্ত্বিক গবেষকরা দাবি করেছেন, এর আগের প্রায় দুই শতক ধরে এ নির্দিষ্ট এলাকা ৯ থেকে ১২ মিটার নিচে নেমে গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ভূতাত্ত্বিক পরিমাপ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানেও এ অবনমন প্রক্রিয়া বেশ সক্রিয়। ফলে এ অঞ্চলের ভূমি বর্ষাকালে নিয়মিতভাবে প্লাবিত হয়। অন্যদিকে শিলংয়ের স্তূপ পর্বতের দক্ষিণের অভিক্ষিপ্ত পার্শ্ব শাখা বরাবর অবস্থিত পাহাড়গুলোর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে এ অঞ্চলের ভূমির সঙ্গে। এর বাইরে বহুসংখ্যক ছোটখাটো পর্বতমালার অবস্থান লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল তথা সিলেট অঞ্চলে। এদিকে ভূমিরূপের গঠনতাত্ত্বিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট পর্যায়ের তবে উল্লেখ করার মতো ছোটখাটো এসব পাহাড়কে স্থানীয়ভাবে টিলা বলা হয়। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, কৈলাসটিলা, ডুপিটিলা ও বিয়ানীবাজারের টিলাগুলো গড়ে উঠেছে প্লাইস্টোসিন যুগের ক্লাস্টিক সেডিমেন্টে। এ বিশেষ টিলার বেশির ভাগই উচ্চতার দিক থেকে ৬০ মিটারের বেশি নয়। ১৯৯৬ সালের দিকে ঢাকার ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত দ্য জিওগ্রাফি অব দ্য সয়েলস অব বাংলাদেশ গ্রন্থে হু ব্রামার এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকে বিখ্যাত গবেষক এফএইচ খানের বর্ণনার সূত্র ধরে (Geology of Bangladesh, University Press Limited, Dhaka, 1991) প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, সুরমা-কুশিয়ারার প্লাবনভূমি তথা সিলেটের হাওড় অববাহিকা গড়ে উঠেছে পূর্বাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলোর পলল অবক্ষেপণে। প্রায় ৪ হাজার ৮৬৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এ ভূখণ্ড বিস্তৃত হয়েছে সিলেট অঞ্চলের নিকটবর্তী কিছু ছোট পাহাড় ও তার পাদদেশীয় এলাকাজুড়ে। অন্যদিকে এ ভূমিরূপ সাধারণভাবে নানাদিকে বিস্তৃত ও প্রশস্ত শৈলশিরা অববাহিকা দ্বারা ঘিরে আছে। ফলে এ বিশেষ সুষম গঠনবিশিষ্ট ভূমিরূপ বাংলাদেশের অন্যত্র তেমন গড়ে উঠতে দেখা যায় না। মাটির বৈশিষ্ট্য হিসেবে ভারী পলির পাশাপাশি বেশকিছু অঞ্চল আবার কর্দমগঠিত। পাশাপাশি প্রাক-মৌসুমি বায়ু, মৌসুমি বায়ুু ও মৌসুমি বায়ু-উত্তরকালের বৃষ্টিপাতে এ প্লাবনভূমিতে বন্যা হতে দেখা যায়। বারবার পানিতে ডুবে গেলেও অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে এখানকার উর্বরাশক্তি বেশি। বলতে গেলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ অংশের ভূমিরূপের ওপর নির্ভরশীল। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও তার ঐতিহ্যের শিকড়ে গ্রোথিত স্লোগান ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। সেখানে কৃষিবিমুখতা যেমন পুরো দেশ থেকে চালের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, পাশাপাশি জলাশয় ভরাট করায় মাছের পর্যাপ্ত জোগানও সেখানে হুমকির মুখে। ফলে শেষ পযন্ত এই হাওড়াঞ্চল একাধারে মাছ ও ভাত দুটোরই জোগান দিয়ে আসছে আবহমানকাল থেকে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভূগোলে এ অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে বেশ।

তবে খেয়াল করতে হবে, বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব দিকে পর্বত পাদদেশীয় যেসব সমভূমি রয়েছে, ঠিক তার উত্তর ও পূর্বের সীমান্ত বরাবর বিশেষ ধরনের ঢালু সমভূমি অবস্থিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোর পাদদেশে এমন সমভূমির বিস্তার লক্ষ করা গেছে। চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমভূমিকে এ বিশেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যেতেই পারে। পাশাপাশি অ্যালুভিয়াল ফ্যান তথা পলিজ পাখাগঠিত এ বিশেষ সমভূমি পাহাড়ের কাছাকাছি এলাকায় মূলত পলিকণা কিংবা বালুকাময় অবক্ষেপে গড়ে উঠতে দেখা যায়। এর কাছাকাছি অবস্থিত প্লাবনভূমি অববাহিকায় বিশেষভাবে কাদার প্রাধান্য চোখে পড়ে। একটু ভিন্ন ধরনের ভূমিরূপে গড়ে উঠলেও প্রায় বেশির ভাগ বর্ষা মৌসুমে এ এলাকায়ও আকস্মিক বন্যা হতে দেখা যায়। উচ্চতর অংশে সংঘটিত বন্যা প্রধানত কম গভীর থাকে। তবে অববাহিকা এলাকায় এ বন্যার মাত্রা বেশ ভয়াবহ রূপ নিতে দেখা যায়। আমরা খেয়াল করলে দেখি, সিলেট অঞ্চলের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, মাধবপুর, হবিগঞ্জ সদর, চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ এবং কুলাউড়া এ বিশেষ ধরনের ভূমিরূপের মধ্যে পড়েছে। এ বিস্তৃত অঞ্চল সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে। ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মাছ ও নানা জলজ সম্পদের জন্য এ ভূমিরূপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর টিলাময় অঞ্চলে চাষ করা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী কৃষিজ পণ্য চা। এদিকে চট্টগ্রামের উপকূলীয় সমভূমির বিস্তার ঘটতে দেখা গেছে সাগর উপকূল ধরে এ জেলার সংকীর্ণ এলাকাজুড়ে। এ বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলের উত্তরে ফেনী নদী থেকে শুরু করে দক্ষিণে মাতামুহুরী নদীর বদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তার লক্ষ করা গেছে প্রায় ১২১ কিলোমিটার বিস্তৃত এক সমভূমির। পাহাড়ি এলাকার কাছাকাছি এ ভূমি সুষম ঢালবিশিষ্ট পাদদেশীয় সমভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ফেনী, কর্ণফুলী, হালদা ও অন্যান্য নদ-নদীর গতিপথ বরাবর গড়ে উঠেছে নদী গঠিত বিশেষ প্লাবনভূমি। এখানে নদ-নদীগুলোর ভাটিতে গড়ে উঠেছে জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি; উত্তরাংশে গঠিত হয়েছে নবীন মোহনা অঞ্চলের ছোটখাটো প্লাবনভূমি এবং তার বিস্তার লক্ষ করা যায় দক্ষিণে সাগর উপকূল বরাবর।

হারুন উর রশীদের বর্ণনা থেকে (Geography of Bangladesh, University Press Limited, Dhaka, 1991) দেখা যায়, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বল্প উচ্চতার পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে সীতাকুণ্ড ও মারা তং পাহাড়সারি। দক্ষিণ দিকে মধ্য রামগড়সহ ফেনী নদী উপত্যকায় দেখা যায় বিশেষ যৌগিক পাহাড়শ্রেণী। তবে সীতাকুণ্ড পাহাড়সারি মধ্যভাগে ৩২ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, যার মূল চূড়ার উচ্চতা ৩৫২ মিটার। তবে দক্ষিণে গিয়ে এ পাহাড়সারি হঠাৎ করে নিচু হতে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম মহানগরীর ভেতরে এসে এ পাহাড়সারির উচ্চতা কমে মাত্র কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে দেখা যায়। তবে কর্ণফুলী নদী ও বাংলাদেশের দক্ষিণ শীর্ষবিন্দুর মধ্যে পাঁচটি বিচ্ছিন্ন পাহাড় চোখে পড়ে। বাঁকখালী নদীর দক্ষিণে কক্সবাজারে এ পাহাড়গুলোকে সোজা গিয়ে সাগরে মিশতে দেখা যায়। অন্যদিকে টেকনাফ উপদ্বীপে গিয়ে সেখানকার প্রধান পাহাড়সারির অংশ হিসেবে শেষ হয়েছে। এক অর্থে এ ধরনের পাহাড়ি অঞ্চল নিয়েই চট্টগ্রামের বেশির ভাগ ভূমিরূপের বিকাশ ঘটেছে। এ বিশেষ ধরনের এ অঞ্চলের প্রতিবেশকে যেমন নির্ধারণ করে দিয়েছে, তেমনি এর ওপর নির্ভর করেই বিকাশ লাভ করেছে এখানকার সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো।

ভূমিরূপের প্রাচীনত্বের দিক থেকেও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলকে এগিয়ে রাখতে হয়। বাংলাদেশের প্রাচীনতম মানবসংস্কৃতির বিকাশও ঘটেছিল এ অঞ্চলেই। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও ফেনীর ছাগলনাইয়া অঞ্চলেই প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯৯২ সালের দিকে প্রকাশিত দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর বিখ্যাত Ancient Bangladesh গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। প্রসঙ্গত আরো বলা যায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৮৬ সালে তার ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পাহাড়ে এক প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম-কাঠে নির্মিত পাথর যুগের হাতিয়ার আবিষ্কারের কথা জানিয়েছিলেন। এরপর ১৯১৭-১৮ সালের দিকে জে. কগিন ব্রাউন তার Prehistoric antiquities of India: Preserved in Indian Museum গ্রন্থে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি প্রাগৈতিহাসিক সেল্ট প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর ১৯৫৮ সালে ডাইসন রাঙ্গামাটি জেলা থেকে আরেকটি প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার প্রাপ্তির কথা জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংস্কৃতির শিকড় এ পূর্বাঞ্চলেই গ্রোথিত। ভূমিরূপ ও ভূ-প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক পর্যাপ্ত গবেষণা সম্ভব হলে এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক প্রাচীনত্ব সম্পর্কে যেমন জানা সম্ভব হবে, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে এ অঞ্চলের ভূমিরূপ কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পেরেছে, সেটাও বোঝা যাবে।

(Visited 30 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *