দক্ষিণ বাংলার ভূমিরূপ ও প্রতিবেশ

বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ভূতাত্ত্বিক অবক্ষেপের বিশ্লেষণ থেকে এর প্রাচীনত্বের ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। তবে বাংলাদেশকে মোটা দাগে সবাই যেভাবে ‘পলল সমভূমি’ বলতে অভ্যস্ত, তা মূলত দক্ষিণ বঙ্গের ভূমিরূপ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ততা আর উত্তর থেকে ধেয়ে আসা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নদীর স্রোতধারা মিশে একাকার হয়েছে এ অঞ্চল। নদীর ভাঙাগড়ার খেলায় এ অঞ্চলের ভূমিরূপ প্রকৃত অর্থে অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশ নবীন। অন্তত নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলের ভূমিরূপ তেমন স্থায়িত্ব পায় না বললেই বলে। নদীবাহিত পলল এ অঞ্চলের ভূমিকে যেমন উর্বর করেছে, তেমনি সেখানে ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে সাগরের লবণ। পাশাপাশি একের পর এক সাইক্লোন, সুনামি কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব সবার আগে পড়েছে এখানেই। সর্বোপরি বাংলাদেশের ভূমি ও ভূপ্রকৃতির মধ্যে এখানেই জোয়ার-ভাটা সবচেয়ে সক্রিয়। এ অঞ্চলের ভূমিরূপ গঠন ও তার বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্তত জোয়ার-ভাটার এ প্রভাব অস্বীকারের সুযোগ নেই।

দক্ষিণ বঙ্গের ভূভাগ নিয়ে বিভিন্ন বইপত্রে যে একঘেঁয়ে বিবরণ লিখতে দেখা যায়, সেখানে বিশেষ পার্থক্য নেই এবং এটা কমবেশি আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই জানা রয়েছে। যেমন এএফএম আব্দুল জলীল তাঁর ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন— ‘হিমালয়ের তুষার নিঃসৃত জলরাশি শত শত নির্ঝরণী পথে বহির্গত হইয়া গঙ্গা নদীতে পতিত হয়। অপরিমিত পর্বতরেণু বহন করিয়া গঙ্গা সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয় এবং উহার পলি দ্বারা নূতন ভূমি গঠন করে। গঙ্গা ও উহার শাখা নদীসমূহ পলিমাটি বহন করিয়া পার্শ্ববর্তী ভূমি গঠন করিতে করিতে সুদূর দক্ষিণে সাগরে মিশিয়া যায়। এভাবে যুগ যুগ ধরিয়া পলি দিয়া গঙ্গা স্বীয় শাখা প্রশাখার দ্বারা দুই বাহুর মধ্যবর্তী ত্রিকোণ ভূভাগ গঠন করিয়াছে। এই ভূভাগকেই গঙ্গা নদীর দ্বারা সৃষ্ট বলিয়া গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বলা হয়’। তিনি নবীনচন্দ্র দাসের ‘অ্যানসেইন্ট জিওগ্রাফি অব এশিয়া’ গ্রন্থের সূত্র ধরে আরো লিখেছেন— ‘অতি প্রাচীনকালে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল গঠিত হয়ে নাই। এবং উহা তখন অতল সমুদ্রের একাংশ ছিল। ঋগ্বেদের আমলে বঙ্গের অধিকাংশ স্থান ছিল অতল সমুদ্র। শুক্লযজুর্বেদের যুগের গ্লকী নদীর পূর্বদিক জলপ্লাবিত ছিল। মহাভারতিক কালেও দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ ছিল সমুদ্রে লীন। স্ট্রাবোর ভারত ভ্রমণকালে (১৮২৪ খ্রি.) সমুদ্রের লোনাজল প্রতিরোধে জন্য বহু নগরের চারিদিকে বাঁধ ছিল। হিউয়েন সাং সমতট ও কামরূপের মধ্যাঞ্চলে হাজার ক্রোশব্যাপী হ্রদ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন’।

দক্ষিণ বাংলায় ভূমিরূপের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা। বেশির ভাগ নদী এ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল বলে মাছ ধরা থেকে শুরু করে এ ধরনের নানা কাজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়েছে এখানকার মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা হয়ে দেখা দিয়েছে যে, নদীর মতো সমুদ্রের উপকূল সেভাবে ভাঙে না। ফলে নানাস্থানে নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হলেও সাগর তীরে এসে কিছুটা নিষ্কৃতি মিলেছিল এখানকার অধিবাসীদের। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে অনেক স্থানজুড়ে বনের অস্তিত্ব ছিল। এখনো নানা স্থানে পুকুর খুঁড়তে গেলে মাটির নিচ থেকে জলমগ্ন কাঠের গুঁড়ি পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় ওয়াটার লগড তথা জলমগ্ন নিদর্শন নামে পরিচিত এসব গাছের গুঁড়ির অস্তিত্ব এখানকার প্রাচীন পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে অবাক করার বিষয় কালো হয়ে যাওয়া এ ধরনের কাঠ মাটির নিচ থেকে ওঠার পর মানুষ সেগুলো শুকিয়ে সাধারণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। পরে এগুলো কাজে লাগিয়ে ভূমিরূপের ইতিহাস বিনির্মাণ ও স্থানভিত্তিক প্রাচীনত্ব সম্পর্কে অনুমানের যে সুযোগ সেটা একদমই নেই। তবে বিস্তৃত বনভূমি কেটে ফেলে সেখানে নতুন করে মানববসতি নির্মাণ করা হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাংলাপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পুরাতন মেঘনা মোহনার বিস্তৃত সমভূমি জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে অববাহিকা এলাকার পাশাপাশি শৈলশিরায় গড়ে ওঠা অঞ্চলের মধ্যে আংশিকভাবে উচ্চতার সামান্য পার্থক্য প্রত্যক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে পুরাতন মেঘনার মোহনার দুই পাশে বিস্তৃত প্লাবনভূমি তুলনামূলক সমতল। এ বিশেষ ধরনের ভূমির দক্ষিণাংশে প্রাকৃতিক নদ-নদী এবং জলধারার উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ে না। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির দায় মেনে খাল খনন করা হয়েছিল। একটা পর্যায়ে এসে এ অঞ্চলের নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেকাংশে নতুন খননকৃত খালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মাটির বৈশিষ্ট্য বিচার করতে গেলে প্রকরণ হিসেবে প্রধানত গভীর এবং পলিকণাসমৃদ্ধ নিদর্শনই বেশি চোখে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অববাহিকার কেন্দ্রের মাটি অগভীর কাদার স্তরে ঢাকা থাকতে পারে। দক্ষিণ-পূর্বাংশ বাদ দিলে প্রায় পুরো এলাকায় মৌসুমি বন্যা বেশ গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এসব এলাকায় নদী অববাহিকার মধ্যভাগে শুকনো মৌসুমেও এক ধরনের আর্দ্রতা বজায় থাকতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বাইরের নদীগুলোতে যখন উচ্চমাত্রায় পানিপ্রবাহ থাকে তখনকার পরিস্থিতি শুষ্ক মৌসুমের মতো নয়। বিশেষত, বৃষ্টিপাতের ফলে ভূমির উপরিভাগে সঞ্চিত পানি এ এলাকায় বন্যা সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ। এখানে গোমতীর মতো অনেক ক্ষুদ্রাকৃতির নদ-নদীর সন্নিহিত প্লাবনভূমি সহজেই নদীর পানিতে প্লাবিত হয়। এ ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির নদীগুলো আনুমানিক ৭ হাজার ৩৮৭ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল মেঘনা মোহনার প্লাবনভূমিকে লাগোয়া পাহাড় আর পাদদেশীয় সমভূমি থেকে আলাদা করে রেখেছে।

মেঘনা মোহনার তীর ধরে গড়ে ওঠা নতুন প্লাবনভূমি তত্সংলগ্ন এলাকাজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে। মোহনাসংলগ্ন দ্বীপ থেকে শুরু করে এর মূল ভূখণ্ড ওই প্লাবনভূমির মধ্যে পড়ে। আনুমানিক ৪ হাজার ৬৩৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এর বিস্তৃতি। এ প্লাবনভূমির প্রান্তভাগে অবস্থিত এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক ও বিরামহীন পলল সঞ্চয়ন ও ক্ষয়কাজের মাধ্যমে ভূমির আকৃতি পরিবর্তিত হয়। এখানে সঞ্চিত পলল স্বল্প পরিমাণ চুনযুক্ত। এগুলো পরে গভীর পলিকণা হিসেবে স্তরীভূত হতে দেখা যায়। তবে এ প্লাবনভূমির নানা স্থানে মাটির উপরিভাগ শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ত হতে দেখা যায়। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে যে এ ঘটনা ঘটে এমন নয়। এক্ষেত্রে মৌসুমি প্লাবনমাত্রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তুলনামূলক অগভীর। কিন্তু লাগাতার জোয়ার-ভাটার কারণে এ গভীরতার ওঠানামা করতে দেখা যায়। বৃষ্টিপাত কিংবা নদ-নদীর বয়ে আনা মিঠা পানির দ্বারাই মূলত এখানকার বন্যা সংঘটিত হয়। বেশির ভাগ মৌসুমে উচ্চ জোয়ার-ভাটা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়। এতে বাহিত লবণাক্ত পানি সময় অসময়ে প্লাবিত করে এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে। তবে এ অঞ্চলের একেবারে প্র্রান্তসীমা বরাবর এ বন্যা সংঘটিত হয়।

ভূতাত্ত্বিকরা খেয়াল করেছেন গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি গঙ্গা নদী থেকে উত্পত্তি লাভ করেছে। তবে এর পর এ সক্রিয় প্লাবনভূমি বিস্তৃত লাভ করেছে সাপের মতো এঁকে বেঁকে। সংলগ্ন সর্পিলাকার বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমির আয়তন প্রায় ২৩ হাজার ২১৩ বর্গকিলোমিটার ছাড়িয়ে যাবে। এখানকার বিস্তৃত এ সর্পিলাকার প্লাবনভূমি মূলত নানা স্থানে শৈলশিরা, অববাহিকা এবং পুরাতন নদী খাত নিয়ে গড়ে উঠেছে। ফলে এটাকে একটা সুষম ভূমিরূপ বলা যেতেই পারে। এদিকে গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি স্থানীয়ভাবে বর্তমান এবং পরিত্যক্ত নদীর গতিপথ বরাবর অনিয়মিতভাবে গড়ে উঠতে দেখা যায়। এখানে বিশেষত পশ্চিম অংশে মাঝে মাঝে পর্যায়ক্রমে কিছু নিম্ন শৈলশিরা এবং অবনমন চোখে পড়ে। এ অবনমনগুলোর সক্রিয় প্লাবনভূমি হিসেবে গঙ্গা নদী প্রতি বছর নতুন করে বিকাশ লাভ করছে। বিশেষত, বন্যার সময় ধারাবাহিক ক্ষয় এবং নতুন নতুন চর গঠনের মাধ্যমে গতিপথ বদল করতে দেখা যায়। প্রসঙ্গত, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার তুলনায় এ ধরনের নদীগুলো কম চর তৈরি করছে। এখানে অবক্ষেপণ এবং সঞ্চয়নকালে যে গাঙ্গেয় পলল অবক্ষিপ্ত হয় তা মূলত চুনযুক্ত। তবে এখানকার বেশির ভাগ অববাহিকা কর্দম বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে কিছু কিছু অপেক্ষাকৃত প্রবীণ শৈলশিরার উপরিভাগের মাটি অপেক্ষাকৃত কম চুনযুক্ত। এখানকার মাটির অম্লত্বও/ তুলনামূলকভাবে বেশি হতে দেখা যায়। ভূতাত্ত্বিক গবেষকরা এ ধরনের মাটিতে অগারিং করে দেখেছেন এর ভেতরের স্তরে চুনের উপস্থিতি বেশ কম। অন্যদিকে অববাহিকাগুলোর পাশাপাশি বেশির ভাগ শৈলশিরার মধ্যাংশে কর্দমনির্ভর মাটির আধিক্য লক্ষ করা যায়। এসব শৈলশিরার উপরের অংশে মূলত নানা ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দোআঁশ মাটির পাশাপাশি বালুময় মাটি চোখে পড়ে।

ভূতাত্ত্বিক গবেষকরা দেখিয়েছেন, বিশেষ কিছু কারণে গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি পশ্চিমাংশ থেকে শুরু করে উত্তর অংশে মৌসুমি বন্যার মাত্রা তুলনামূলক কম গভীর হয়। পাশাপাশি এখানকার উঁচু শৈলশিরার শিখর সাধারণ সময়ে বন্যার আওতামুক্ত থাকে। কিন্তু এর পূর্ব-দক্ষিণ দিকে বন্যার গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বাংলাপিডিয়ার প্রদত্ত বিবরণ থেকে দেখা যাচ্ছে ‘প্রধানত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উত্থিত হওয়ার ফলে বন্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। সক্রিয় গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি এবং এর নিকটবর্তী উপনদী খাতসংলগ্ন এলাকায় বর্ষা ঋতুতে নদীর প্রবাহমাত্রা ভেঙে গেলে অনেক সময় এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। উত্তর-পশ্চিমের মহানন্দা প্লাবনভূমি এবং দক্ষিণ-পূর্বের পুরাতন মেঘনা মোহনাজ প্লাবনভূমির কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকা এ ভূপ্রাকৃতিক এককের অন্তর্ভুক্ত। তিস্তা ও গঙ্গার মিশ্র পলল দ্বারা সৃষ্ট সব অনিয়মিত ভূপ্রকৃতি নিয়ে মহানন্দা প্লাবনভূমি গঠিত। মেঘনা প্লাবনভূমির বিচ্ছিন্ন অংশগুলো সুষম এবং প্রধানত পলিমাটি দ্বারা গঠিত, যা মৌসুমি ঋতুতে বৃষ্টিপাতের কারণে গভীরভাবে প্লাবিত হয়ে থাকে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও যশোর জেলার বেশির ভাগ এলাকা; সমগ্র কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা জেলা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার অংশবিশেষ গাঙ্গেয় প্লাবনভূমির অন্তর্ভুক্ত। ভূপ্রাকৃতিক এ একেকটি আকৃতির দিক থেকে প্রায় ত্রিকোনাকার এবং দক্ষিণে রয়েছে গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি। গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি তার দক্ষিণ প্রান্তে গোপালগঞ্জ-খুলনা পীট অববাহিকাকে আবদ্ধ করে রেখেছে। গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি দক্ষিণাংশ গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি নামে পরিচিত। অসংখ্য স্রোতজ নদ-নদী ও খাঁড়ির সমন্বয়ে দাবার ছক-কাটা ঘরের মতো কর্তিত অনুচ্চ শৈলশিরা এবং অববাহিকা নিয়ে গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমি গঠিত। স্থানীয় ভূমির উচ্চতার পার্থক্য সাধারণত এক মিটারের কম, যেখানে গাঙ্গেয় প্লাবনভূমিতে এ পার্থক্য দু-তিন মিটারের মতো। ভূমি গঠনকারী পলল প্রধানত চুনবিহীন কর্দমজাতীয়, তবে নদী তীরগুলোয় এবং পূর্বদিকে লোয়ার মেঘনা প্লাবনভূমিসংলগ্ন অবস্থান্তরিত অঞ্চল পলিকণাসমৃদ্ধ এবং সামান্য পরিমাণে চুনযুক্ত। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার অধিকাংশ এলাকা এবং সমগ্র ঝালকাঠি ও বরগুনা জেলা গাঙ্গেয় জোয়ার-ভাটা প্লাবনভূমির অন্তর্গত। তবে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সুন্দরবন এ প্লাবনভূমির বহির্ভূত। এ ভূপ্রাকৃতিক একেকটির আয়তন প্রায় ১০ হাজার ৯৮১ বর্গকিলোমিটার।

দক্ষিণাঞ্চলের ভূপ্রকৃতি প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে গঙ্গা নদী বছরজুড়ে উত্তর-পূর্ব থেকে শুর করে পূর্বদিক বরাবরা নির্দিষ্ট পরিমাণ মিঠা পানি বহন করে আনে। পাশাপাশি এখানকার লবণাক্ত পানি স্থলভাগের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে শুষ্ক মৌসুমের দিকে। শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে প্রবাহ কমে গেলে সহজেই মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যায়। আর তার প্রভাবে অনেক স্থান থেকে প্রাচীনকালে মানুষ তাদের বসতি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ফলে সুদূর অতীতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি হয়ে উঠেছিল অনেকটাই বাণিজ্যনির্ভর। দক্ষিণাঞ্চলের ভূমিরূপে অগণিত নদীর উপস্থিতি নৌপথে যাতায়াত সুগম করেছে। ফলে সহজেই সেখান দিয়ে যাতায়াত ও পরিবহন নিশ্চিত করা গেছে। তবে সম্প্রতি পশ্চিমাংশ দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ভূমির লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে। বছরের প্রায় বেশির ভাগ সময় দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে লবণাক্ততা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে গঙ্গার শাখা নদীগুলো আগের তুলনায় অনেক কম পানি ও পলল বহন করে আনায় জটিলতা বেড়েছে বহুগুণে। এক্ষেত্রে মেঘনা নদীর ভাটি অঞ্চল উচ্চ প্লাবনমাত্রায় থাকা অবস্থায় সেখানে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টির পানি জমা হতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময়জুড়ে কোনো ভূভাগে বৃষ্টির পানি আবদ্ধ হয়ে থাকার কারণে এখানকার উত্তর-পূর্বাংশে বেশ ভালো গভীরতার বন্যা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। অন্যদিকে এর অন্য স্থানগুলোতে মৌসুমি ঋতুতে ভরা জোয়ার দেখা যায়। এ জোয়ারের প্রভাবে প্রধানত অগভীর প্লাবন হয়ে থাকে। কিছু কিছু এলাকায় বাঁধ বা পোল্ডার দিয়ে জোয়ারসৃষ্ট এ ধরনের বন্যা প্রতিরোধ করার চেষ্টা চলছে। তবে তা ভূমিরূপের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দিয়েছে বহুলাংশে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবন অনেকাংশে এ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রকৃতি ও ভূমিরূপের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি থেকে শুরু করে মাছের জোগানের সিংহভাগ এখনো আসছে দক্ষিণাঞ্চল থেকে। নানা কারণে এ অঞ্চলের ভূমিরূপ তার উর্বরাশক্তি হারাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেয়া ও নদী শাসনের ফলে অনেক নদী তার স্বাভাবিকতা হারিয়েছে। ফলে শুষ্ক কিংবা বর্ষা মৌসুমে সেগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করছে। অন্যদিকে উজান থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে শুষ্ক মৌসুমে যেমন সীমাহীন খরার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তেমনি বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে পানি ছেড়ে দিয়ে প্লাবিত করা হচ্ছে এ অঞ্চরে নিম্নভূমি। অন্যদিকে নৌপথে যান চলাচল করতে গিয়ে ক্ষতিকর তেল নিঃসরণ কিংবা কার্গোডুবিতেও কয়েক দফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের ভূমিরূপ, পাশাপাশি বিরান হতে চলেছে বনভূমি। দেশের স্বার্থে এ অঞ্চলের ভূমিরূপের স্বাভাবিকত্ব ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এ উদ্দেশ্যে সবার আগে প্রাকৃতিক বনভূমি উজাড়করণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নৌপথে ক্ষতিকর যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। উর্বর ভূমির এ অঞ্চলে শিল্প বিকাশের নামে ক্ষতিকর রাসায়নিক নিঃসরণ ভূমিরূপকে তার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত করছে। এ ধরনের অশুভ প্রবণতা বন্ধ করতে উদ্যোগী হতে হবে এখনই। সরকারের সচেষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এ অশনিসংকেত রুখতে স্থানীয় জনগণেরও আন্তরিক হওয়ার বিকল্প নেই।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!