মার্কিন মুলুকে প্রথম রোজাদার

বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখন সিয়াম সাধনায় রত। এর থেকে বাদ যান না যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রায় আট মিলিয়ন মুসলিম। আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের নানা স্থানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠী বাড়ছে। তবে ঠিক কোন সময় থেকে আমেরিকায় মানুষ প্রথম রোজা রাখা শুরু করেছিল, সেটা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে তর্ক চলছে বহুদিন থেকেই। মনে করা হচ্ছে, আফ্রিকা থেকে আসা ক্রীতদাসদেরই প্রথম এই রোজা রাখতে দেখা গেছে।
সম্প্রতি আমেরিকায় ইমিগ্রান্ট মুসলিম সম্প্রদায় সেখানে রমজানের শুরুটা কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে দুস্তর গবেষণা শুরু করেছে। তারা রমজানকে একটা ‘নিউ আমেরিকান ট্র্যাডিশন’ হিসেবে দেখছেন। তারা জানতে চেষ্টা করছেন এখানে এর শুরুটা কীভাবে হয়েছিল, তার পর কত দিনে তা পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে, সেটা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে জাতিসত্তার ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা চলছে অনেক দিন আগে থেকেই। আর এ ইতিহাস লিখতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, শুধু রোজা নয় আমেরিকায় ইসলামের আবির্ভাবের ইতিহাসটা জড়িয়ে আছে আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাসদের সঙ্গে। তারা ক্রীতদাস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। জাতিগতভাবে তারা ছিলেন মুসলিম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত দাসরা একটা পর্যায়ে এসে স্বাধীন ধর্মচর্চার অধিকারও লাভ করেন। বলতে গেলে সে সময় থেকেই আমেরিকান সমাজে রোজা রাখা কিংবা ঈদ উৎসব প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
সমাজবিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন একটা সময় ১৫-৩০ শতাংশ দাস ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। সংখ্যার হিসাবে তারা ছয় থেকে ১২ লাখ হতে পারেন। তাদের বেশির ভাগকে ঔপনিবেশিক দাস ব্যবসায়ীরা ধরে এনেছিলেন আফ্রিকার নানা দেশ থেকে। বলতে গেলে তাদের যেসব দেশ থেকে অপহরণ করে আনা হয়েছিল, সেখানে সিংহভাগ মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস।
তবে শুরুতে এসব দাস তাদের মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি ধর্মচর্চার অধিকার সেভাবে পাননি। তারা শুরুর দিকে রোজা রাখার চেষ্টা করেও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন নানাভাবে। অনেক দাসকে কাজ করতে দেখা গেছে আমেরিকার নানা স্থানে বিভিন্ন তুলার খামারে। তারা সেখানে সেহরির মাধ্যমে রোজা রাখার এবং ইফতার করার সুযোগটুকু পাননি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে পিউরিটান খ্রিস্টান মতাদর্শের মালিকেরা এটা টের পেয়ে নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই দাসেরা সেহরি কিংবা ইফতারির সুযোগ না পেয়েও অনেক ক্ষেত্রে রোজা রাখার চেষ্টা করেছেন। শুরুর দিকে এটা টের পেয়ে মালিকরা তাদের কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। তারা মনে করেছেন এভাবে অত্যাচার করলে দাসরা যা-ই হোক, অন্তত রোজা রাখার চেষ্টা করবেন না। অনেক দাসকে দেখা গেছে বড় দিনগুলোয় বেশ কষ্ট সহ্য করে রোজা রাখার চেষ্টা চালিয়েছেন, তারা ইফতার-সেহরি এমনকি প্রার্থনার উপযুক্ত সময় পাননি। অন্তত আমেরিকায় দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এমন যন্ত্রণাদায়ক সময়ের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার পর আমেরিকার শ্রমিকরা তাদের আর সব অধিকারের মতো ধর্ম পালনের অধিকার ফিরে পান। তারা সেখানে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ লাভ করলে এসব দাস নতুন করে ধর্ম-কর্মে মন দিয়েছিলেন। তবে আমেরিকায় অবস্থানরত আফ্রিকার দাস সম্প্রদায় যেভাবে রোজা রাখা শুরু করেছিল, সেটা শুধু কথিত ‘নিউ আমেরিকান ট্র্যাডিশন’ নয়, এটা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস পুনর্লিখনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন, এমন অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য ভিন্ন মত দিয়েছেন আমেরিকায় অবস্থানরত দাসদের ধর্মপালনের ক্ষেত্রে। তারা পবিত্র কোরআনের সূত্র থেকে উল্লেখ করেছেন ‘কেউ প্রতিকূল পরিবেশে নিজের পরিবার-পরিজন ও বসতিস্থল থেকে দূরে থাকলে, তাকে কাজের চাপ উপেক্ষা করে রোজা না রাখলেও চলে।’ তবে মনোবিজ্ঞানের গবেষকদের মতে, এই দাসরা নিজেদের মধ্যে একতা ধরে রাখতেই রোজা কিংবা নামাজের মতো ইবাদতগুলো ছাড়েননি। এগুলো তাদের জন্য ধর্মকর্মের পাশাপাশি এক ধরনের জাতিসত্তার পরিচয় নির্মাণের পাথেয় ছিল। সুদূর আমেরিকায় দাস হিসেবে গিয়ে তাদের পক্ষে নিজের পরিচিতি ধরে রাখা ছিল বেশ কষ্টকর। তারা নিজেদের স্বকীয় অবস্থান ধরে রাখতে গেলে কিংবা সামাজিক পরিচিতি নিশ্চিত করার জন্য অন্তত এ ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার বিকল্প কোনো পথ খুঁজে নিতে পারেননি। তারা আমেরিকান সমাজের ব্রাত্যজন, সেখানে ধর্ম থেকে শুরু করে জীবনযাপনের সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তবে একটি সামাজিক পরিচিতি থাকলে তা কোনো দিন তাদের হয়তো মুক্তি পথ বাতলে দিতে পারে। তাদের কেউ কেউ এই বিশ্বাস নিয়েই লড়ে যাচ্ছিলেন মুক্তির প্রয়াসে। তাই তারা শত কষ্ট আর লাঞ্ছনা সহ্য করেও প্রতি ওয়াক্তে নামাজের সময় হতেই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতেন আর প্রতিটি রমজানে তারা চেষ্টা করেছেন রোজা রাখার। তাদের জন্য এই রোজা যেমন ইবাদত, তেমনি ইফতার কিংবা সেহরির সময়ে তারা সবাই মিলেমিশে মনের কিছু কথা বলার সুযোগ পেতেন। অন্তত ইবাদতের পাশাপাশি এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাননি আফ্রিকা থেকে মার্কিনমুলুকে পাড়ি জমাতে বাধ্য হওয়া দাসদের অনেকেই।
তবে সবাই মিলে একত্র হয়ে ধর্ম-কর্ম তো বটেই, অন্য যেকোনো কাজ করা ছিল তখনকার দাসপ্রথার বিরুদ্ধে। তাই অনেক সময় রোজা রাখার জন্য সেহরি কিংবা ইফতারিতে একত্র হওয়া দাসদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। শুধু রোজা রাখার অপরাধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাবুকের আঘাত সহ্য করতে হয়েছে তাদের অনেককে। তবে তাদের এই শাস্তির পেছনে ধর্মীয় উন্মাদনার বাইরে রাজনৈতিক কারণটাই মুখ্য ছিল। আমেরিকার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করত এরা রোজার সময় যেভাবে একত্র হচ্ছে, তারা যেকোনো মুহূর্তে বিদ্রোহ করে বসলে সেটা সামাল দেয়া কঠিন হবে। এমনকি দাস বিদ্রোহ ঠেকাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দাসদের তারাবিহর নামাজ পর্যন্ত পড়তে দেয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দাসদের ঈদের নামাজে দাঁড়ানোর পর ছত্রভঙ্গ হতে হয়েছে শুধু বিপ্লবের আশঙ্কা থেকে। এক্ষেত্রে আমেরিকানদের যুক্তি ছিল একটাই, দাসরা তাদের স্লেভ কোড ভঙ্গ করে সমবেত হয়েছেন। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেকোনো ধরনের অ্যাকশনে যেতেই পারে।
এদিকে ১৭২৩-এর ভার্জিনিয়া ক্ষোভ কোড দাসদের কোনো স্থানে উপযুক্ত কারণ ছাড়া সমবেত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় অবস্থানরত দাসদের পক্ষেও নামাজ কিংবা রোজার সময়ে একত্র হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়। তারা ধর্মীয় কারণে একত্র হতে চাইলেও সব থেকে বড় বাধা হয়ে দেখা দেয় তাদের ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার সম্ভাবনা। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন মনে করেছিল দাসরা যেকোনো মুহূর্তে বিদ্রোহ করে বসতে পারেন। আর এই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়েই আমেরিকায় দাসদের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে, সেটার মধ্যে পড়ে যান রোজাদার দাসদের অনেকে। শুধু নতুন বিপ্লবের আশঙ্কা রোধ করতেই তাদের ওপর বর্বর অত্যাচার চালানো হয়। অনেককে যেমন চাবুক মেরে ভয়াবহ রকম আহত করা হয়, তেমনি নেতৃস্থানীয় অনেক দাসকে হত্যাও করা হয়েছিল রোজা রাখা কিংবা ইফতারি-সেহরির সময়ে সমবেত হওয়ার অপরাধে। তবে এখনকার আমেরিকায় নেতৃস্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় দাসদের এ অবদানকে তেমন স্বীকার করতে চান না।
ধর্মের পাশাপাশি একটি আলাদা ভাষা কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয় জাতিবিদ্বেষীদের জন্য ভয়ানক বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে একটি বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে অবৈধভাবে অপহরণ করে এনে সব ধরনের নৈতিক, মানবিক ও মৌলিক অধিকার বিবর্জিত অবস্থায় শ্রমদানে বাধ্য করা হতো দাসশ্রমনির্ভর আমেরিকাতে। এক্ষেত্রে মুসলিম কিংবা যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন, তখন দাসদের মানবিক অধিকার বলতে কিছু ছিল না। এ অবস্থায় আফ্রিকার দাসরা সেখানে তাদের গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গত পরিচয় ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন নানা দিক থেকে। জাতিগতভাবে মুসলিম হওয়ায় তাদের নামাজ কিংবা রোজার সময় তারা স্বতন্ত্র পরিচয় স্পষ্ট করতে পেরেছেন সহজেই। অনেক ক্ষেত্রে সেহরি কিংবা ইফতারিতে খাবার হিসেবে উপযুক্ত কিছু না পাওয়া এই দাসরাই বর্তমানে সেখানে অবস্থানরত ধনিক মুসলিম সম্প্রদায়ের পূর্বসূরি। হয়তো টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরবীয়, ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি খাবারের পসরা সাজিয়ে ইফতারিতে বসা মুসলমানদের কেউ খোঁজই রাখেননি তাদের শুরুটা কেমন ছিল। এদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে আমেরিকার মাটিতে প্রথম রোজাদার যারা ছিলেন, তাদের ইতিহাস ধর্মীয় থেকে জাতিসত্তার পরিচয় নির্মাণের প্রেক্ষাপট থেকে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। অন্যদিকে তাদের রোজা রাখাটা যতটা না ধর্মের জন্য, তার থেকে ঢের বেশি শ্রেণীসংগ্রামের পরিচয় বহন করে। তাই তাদের এই রোজা একদিক থেকে যেমন ধর্মানুভূতির পরিচয় বহন করেছিল, অন্যদিকে দাসশ্রমনির্ভর সমাজে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবেও তখন কাজ করেছিল।

(Visited 24 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *