মর্মন্তুদ_কৃষ্ণচূড়া

নগরবাসীর আক্ষেপ, এবার শীত সেভাবে আসেনি। তার পর বলা নেই, কওয়া নেই হঠাত্ স্নিগ্ধতাহীন অবাক বসন্ত। তাতে আক্ষেপ ছিল শিমুল-পলাশ-কৃষ্ণচূড়ারও, হয়তো তারই এক মর্মন্তুদ প্রতিফল শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুর অসময়ে চলে যাওয়া। বিভিন্ন অনলাইন দৈনিক থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেলগুলোর স্ক্রলে যখন দেখাচ্ছিল রাজধানীর ধানমন্ডিতে কৃষ্ণচূড়া গাছ পড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা মিঠু, তা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইনি। তবে এটিই সত্য, সোমবার বেলা ৩টার দিকে ধানমন্ডি ৪ নম্বরের মাথায় রিকশায় চড়ে যাওয়ার পথে কোনো রকম প্রাকৃতিক উদ্যোগ ছাড়াই একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে তার ওপর পড়ে। রিকশাচালকসহ গুরুতর আহত মিঠুকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি বিকাল ৪টার দিকে ইহলোক ত্যাগ করেন। দিনের পর দিন মহানগরী ঢাকায় মানুষের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে, তার এক ভয়ানক উদাহরণ সৃষ্টি করেই মারা গেছেন মিঠু। এর পর যথারীতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়েছে তার মরদেহ। সেখানে অগ্রজ, অনুজ, সহকর্মী, সহমর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী থেকে শুরু করে আগত জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন মিঠু।

এখানেই কি সব শেষ? আশপাশে খোঁজখবর নিলে প্রতি মাসে তো অবশ্যই, সপ্তাহান্তে এমন দুর্ঘটনার সংবাদ নজরে আসবেই। বলা বাহুল্য, এমন দুর্ঘটনা বিগত কয়েক বছরে কমেনি, বরং বেড়েছে বহুগুণে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিমেন্টের তৈরি বাঘ প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এক অসহায় ভ্যানচালকের। তার পর বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার পাতাজুড়ে বেশ আলোড়ন তুলেও হঠাত্ স্তিমিত হয়ে আসে সে সংবাদ। এদিকে শিশু জিহাদের অপরিসর পাইপে পড়ে যাওয়া, তার পর দিনভর উদ্ধার নাটক আর বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তা সরাসরি সম্প্রচারের হতাশাজনক অভিব্যক্তি ভুলতে পারেননি কেউ। তবে ঘটনার মর্মস্পর্শী দিক, সেসঙ্গে গণমাধ্যমের উপযুক্ত প্রচারণা সবাইকে বিষয়টি নিয়ে যেভাবে আলোচনা করতে বাধ্য করেছিল, তার রেশটা বরাবরের মতো বেশিক্ষণ টেকেনি। অল্প পরিসরেই তা হারিয়ে গেছে লোকমুখ থেকে।

রাজধানী ঢাকার যানজট, পানি সংকট আর বিদ্যুত্ বিভ্রাটের বাইরে যে সমস্যাগুলো সরাসরি মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার চোখ রাঙানি নিয়ে অপেক্ষমাণ, তা নেহাত কম নয়। নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে ইট বা অন্য নির্মাণ উপকরণ পড়ে কারো আহত হওয়া কিংবা মুত্যুমুখে ঢলে পড়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এর বাইরে আছে মুখ খোলা ম্যানহোল, বিপজ্জনক ড্রেন, খানাখন্দে ভরা রাস্তা, পতনোন্মুখ দেয়াল ও ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড, প্লেট খোলা সিঁড়ি ও রেলিংবিহীন ফুট ওভারব্রিজ, বিপজ্জনক আন্ডারপাস, সামান্য বাতাসে ভেঙে কিংবা উপড়ে পড়তে পারে এমন গাছ, অনিরাপদ বৈদ্যুতিক তার থেকে শুরু করে বিপজ্জনক লেভেল ক্রসিং। এ ধরনের নানা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো থেকে প্রতিদিন কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে, আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা।

চিন্তার বিষয় হচ্ছে, প্রতিদিন এমন নানা দুর্ঘটনার সঙ্গে কমবেশি পরিচিতি থাকলেও সতর্ক না হয়ে বরং ধাতস্থ হয়ে গেছেন সবাই। উপায় না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বিপজ্জনক জেনেও বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলছেন গন্তব্যে যেতে, অপরিসর গলিপথে পতনোন্মুখ ভবন থাকলেও সেখান দিয়ে যাতায়াত করছেন কেউ কেউ, মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বহুবর্ষী গাছগুলো যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও তার নিচ দিয়ে চলছে যানবাহন, যাচ্ছে মানুষ। একইভাবে বিপজ্জনক উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক লাইনগুলোর পাশাপাশি ভেঙে পড়ার মতো বিলবোর্ডগুলোও রয়েছে যথাস্থানে। মোদ্দাকথা, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপনে শঙ্কা বহুমাত্রিক হলেও সতর্কতা এবং এ থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই; দুর্ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। তাই এ ধরনের প্রাণনাশের ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদে চলাচল ও শঙ্কাহীন জীবনযাপন নিশ্চিত করতে ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চাই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন।

(Visited 54 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *