গণমানুষের পাতে ইলিশপেটি আর নিন্দুকের ছিদ্র ঘটি

ঢাকা থেকে আশপাশের শহরতলি কত দূর? কিংবা কবির ভাষায় পাখি ডাকা ছায়া ঢাকা সেসব গ্রাম? যেখানেই বসতভিটা হোক না কেন জাতীয় মাছ, পশু, ফুল, ফল-পাখি এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আশৈশব এক হতাশা নিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। গ্রাম-মফস্বলের জীবনে ঠিকই কা-কা করা কাকের দেখা নেই। হয়তো সেখানে খুব ভোরে জাতীয় পাখি দোয়েলের শিষেই ঘুম ভাঙে অনেকের। গ্রীষ্ম মৌসুমে কারো খোলা জানালায় উঁকি দিলে এখনো চোখে পড়বে গাছে ঝুলে আছে জাতীয় ফল কাঁঠাল। তবে জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু সংবিধান আর শিশুশিক্ষার বইগুলোর মলাট কিংবা রঙিন ছবিতেই আটকা পড়েছিল। নিম্ন আয় থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের এক রকম নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল এই দেশের সব থেকে সুস্বাদু মাছটি। শিশুরা তাদের দাদি-নানির কাছে যেমন গল্প শোনে শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। একটা সময় আশঙ্কা হয়ে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশের ইলিশ হয়তো আর সাগর-নদীতে দেখা মিলবে না। এই ইলিশকে খুঁজে ফিরতে হবে গল্পগাথা কিংবা কল্পকথায়।

বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা অনিয়ম, উজানে বাঁধ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী পদ্মাকে মেরে ফেলা, অনিয়ন্ত্রিত নদীদূষণের সঙ্গে অসময়ে ডিমওয়ালা ইলিশের পাশাপাশি জাটকা শিকার বাস্তবতা থেকে সরিয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই দিয়েছিল ইলিশকে। আজ থেকে দেড় যুগ আগের কথা, স্কুলজীবন থেকে দেখেছি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার কীভাবে ডিমওয়ালা ও জাটকা ইলিশ ধরার বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছিল। কারেন্ট জালের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশের কোস্ট গার্ড থেকে শুরু করে নৌবাহিনীর সদস্যরাও বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। এদিকে নিজের ভবিষ্যত্ নিয়ে জেলেদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে সচেতনতা। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিগত কয়েক বছরে আমাদের সাগর ও নদীর মোহনায় ইলিশের যাতায়াত বেড়ে যায় বহুগুণে। বস্তুত আলাদাভাবে চিহ্নিত করা না গেলেও প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কার্যকর হওয়ায় ইলিশের উত্পাদন এভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে শোনা যাচ্ছে ভূমিকম্প ও ভূ-আন্দোলনজনিত বিশেষ কারণে সাগরের তলদেশে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, সে কারণে প্রকৃতির তাড়া থেকেই ইলিশ এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের মোহনায়। জেলেরা স্বাভাবিকভাবেই সেখানে গিয়ে জাল ফেলে অভাবনীয় সাফল্যের দেখা পেয়েছেন। তবে যা-ই হোক নদীঘাট থেকে স্থানীয় ইলিশ মোকাম, মাছের আড়ত থেকে কাঁচাবাজার, ফুটপাত থেকে শপিংমল সবখানে এখন ইলিশের জয় জয়কার।

বাংলাদেশ থেকে শুরু করে কলকাতার লেখক-সাহিত্যিক সবাই কেমন যেন স্বাপ্নিক হয়ে উঠেছে ঐন্দ্রজালিক ইলিশের সুঘ্রাণে। বুদ্ধদেব বসু ইলিশ নিয়ে একটা কবিতাই লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন কেরানীর ঘরে কীভাবে ইলিশ ভাজা হচ্ছে, মালগাড়িতে কীভাবে ভরা হচ্ছে ইলিশ এবং আরো কত কিছু। ‘তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে ঘরে/ ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানীর গিন্নির ভাঁড়ার/ সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ-উত্সব’ বলতে তিনি আসলে যে সময়ের কথা বলেছেন, তেমনটা না হলেও এবার মোটামুটি ইলিশকে সুলভ বলা যায়। উচ্চবিত্তের উচ্চ আয়ে কেনা এক বস্তা মাছ দেখে এটিকে ইলিশ উত্সব বলা যাবে না। যারা মধ্যবিত্ত, তারা বাজারের কোনো কোনায় ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দেখলে, তা সামর্থ্যের বাইরে জেনে ওই গলি পরিহার করে অন্য গলি দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এবারের মৌসুমে সুলভ ইলিশ প্রাপ্তি হয়তো তাদের সেই ভয়ভীতি একটু হলেও কমিয়েছে। গল্পে শোনা ইলিশের সুঘ্রাণ এবার নিজে থেকে নেয়ার সুযোগ তারাও হাতছাড়া করেনি। আর যে নিম্নবিত্ত আজীবন শুধু লোকমুখে শোনা ইলিশের স্বপ্ন দেখেছে, তাদের কেউ কেউ জমানো টাকা থেকে দু-একটা মাঝারি কিংবা ছোট ইলিশ কিনে তার স্বাদ পরখ করতে পেরেছে। সবমিলিয়ে এবারের ইলিশ মৌসুমকে তাই উত্সবমুখর না বলে জমজমাট বলা যেতেই পারে।

নদীতে ইলিশের উত্পাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে হঠকারী সিদ্ধান্তের বলি হয়ে একটা সময় দেশীয় বাজারের চেয়ে কম দামে বাইরের দেশগুলোয় পাচার হয়ে যাচ্ছিল ইলিশ। নিম্নবিত্ত তো বটেই মধ্যবিত্ত যে কারো জন্য ইলিশ সাধারণ আমিষ না থেকে হয়ে গিয়েছিল নিতান্তই বিলাসদ্রব্য। গণমাধ্যমগুলোয় সংবাদ প্রচার করা হয় দেশের চেয়ে অনেক কম দামে পাচার হয়ে যাচ্ছে ইলিশ। এতে বিব্রত হয়ে রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করে ইলিশ রফতানি। ইলিশের ওই দুর্দিন থেকে উত্তরণের পর জাতি যখন নতুন করে জাতীয় মাছের স্বাদ নিতে শুরু করেছে, তখন একটি মহল মিছে বক্তব্যের ফুলঝুড়ি আর সাদা-কালোর কটুকথায় বাদ সাধতে চাইছে এখানে। দেশের মানুষকে ইলিশের স্বাদ পরখের সুযোগ বঞ্চিত করে যে মহলটি রফতানির ধুয়ো তুলছে, ইলিশকে বিপন্ন প্রজাতিতে পরিণত করার দায়টা তাদের কম কীসে?

বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের আয়বৈষম্য কতটা ভয়াবহ— এটি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বণিক বার্তা এ প্রসঙ্গে পর পর অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বলে বসতে পারেন ভালো মানের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে বেশ সহনীয় দামে। কিন্তু এই সহনীয় দামটা কার কত, আয়ের মানদণ্ডে সেটি সবার আগে হিসাব করতে হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ তাঁর একটি গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে দেশের উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আয়বৈষম্য। আর তাঁর হিসাবে গত ২০ বছরে এ বৈষম্য বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থনীতি আর তাত্ত্বিক কথকতা থেকে বেরিয়ে সাদা চোখের পর্যবেক্ষণে সহজেই ধরে নেয়া যায়, বাংলাদেশের সব মানুষের ইলিশ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য এখনো হয়নি। সে দিক থেকে ধরতে গেলে, কেউ যদি মনে করেন ভালো মানের ইলিশের দেখা মিলছে সহজে এবং সহনীয় দামে তবে সে বোকার স্বর্গে বাস করছে।

বাংলাদেশে যে সময় ইলিশের দাম কমে গেছে, তখন ছিল কোরবানির ঈদ। ধনীদের ঘরে তখন ডিপ ফ্রিজ ভর্তি গরু-খাসির মাংস। তাই উচ্চদামে ইলিশের ক্রেতা যারা, তাদের বেশির ভাগের ফ্রিজে তেমন জায়গা নেই। কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও সেই মাংস গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে ভবিষ্যতে পেটপুজো করার নিমিত্তে। তেমনি এর বিপরীত প্রভাবে যখন তাদের নিত্যদিনের খাবার ইলিশের দাম একটু কমেছে, সেটি নিয়েও হাপিত্যাশের অন্ত নেই তাদেরই। অনেকটা শ্রেণীসংঘাত থেকেই তাদের কেউ কেউ টিভিপর্দা কিংবা পত্রিকার পাতাজুড়ে বিলাপ শুরু করে দিয়েছেন ইলিশকে রফতানিপণ্যে পরিণত করতে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সদয় দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। হঠাত্ করে ইলিশের দাম তুলনামূলকভাবে একটু কমে গেছে, তাই বলে রফতানির সিদ্ধান্ত নেয়াটা হবে আত্মঘাতী। ব্যাপার অনেকটা এমন— গৃহস্থের একটি গাভী আছে। সে গাভীর দুধ বিক্রি করে আর তার শিশুটিকে খাওয়ানোর জন্য বাজার থেকে গুঁড়ো দুধ কিনে আনে।

যখন বাজারের ইলিশের দাম কমা নিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণী কান্না জুড়েছে, ঠিক তখনই ব্রিটেনভিত্তিক টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে স্পষ্ট হয়েছে এক হতশ্রী অবস্থানের অভিজ্ঞান। তাদের ডিজিটাল ট্রাভেল সংস্করণের সম্পাদক অলিভার স্মিথ এক নিবন্ধে দেখিয়েছেন, বিশ্বের মাংস খাওয়া মানুষের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে সবার নিচে। পাশাপাশি মাছের যে বাজারদর, তাতে করে এ দেশের মানুষ মাছও তেমন একটা খেতে পারে না; এটি অনেক দিক থেকে নিশ্চিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বাজার ব্যবস্থায় একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা হ্রাস অনেকগুলো বিষয়ের পরিপূরক। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, ইলিশের সুলভ প্রাপ্তি বাজারকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে একটু দাম কমাতেই মানুষ অনেক আগ্রহ নিয়ে কিনেছে ইলিশ। আর কোরবানির পর ফ্রিজে থেকে যাওয়া মাংসের কারণে বাজারে গরু-খাসির মাংসের চাহিদা তুলনামূলক কম। এদিকে ইলিশ ও মাংসের প্রভাবে কমে গেছে অন্য মাছ কিংবা মুরগির দামও।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, ইলিশ রক্ষায় এবার প্রজনন মৌসুমে ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত এই মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। সংবাদটি নিঃসন্দেহে আমাদের ইলিশ রক্ষা ও সুষ্ঠু প্রজনন নিশ্চিতকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এবারের ইলিশ মৌসুমে আমরা যেভাবে অপেক্ষাকৃত কম দামে মাছ কিনতে পেরেছি, তা ধরে রাখতে গেলে সরকারি আদেশ মেনে চলার বিকল্প নেই। এ সময়টায় রাষ্ট্রীয় নির্দেশ মেনে আমাদের উচিত ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন, মজুদ বা বিনিময় বন্ধ রাখা। পাশাপাশি বিভিন্ন মাছঘাট, মত্স্য আড়ত, হাটবাজার ও চেইনশপে নিষেধাজ্ঞার সময় অভিযান চালাবে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মত্স্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা।

আশার কথা, নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও মা-ইলিশ সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় ধরা পড়তে দেখে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় ১১ থেকে বাড়িয়ে ১৫ দিন করা হয়েছিল প্রথমে। এবার তা বাড়িয়ে করা হলো ২২ দিন। এ সময় নিয়ম মানতে জেলেদের বাধ্য করার পাশাপাশি তাদের জন্য উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। এদিকে মাছ ধরার পর জেলেরা যাতে তাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থ ঠিকমত বুঝে পায়, সে সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত কোনো দাদন ব্যবসায়ী কিংবা মধ্যস্বত্বভোগী যাতে জেলেদের ঠকিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখাও প্রয়োজন। ইলিশ সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগও থাকা চাই। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। আর সবকিছু ঠিকমতো চললে জাতীয় মাছ ইলিশ হয়ে উঠবে গণমানুষের আমিষের উত্স।

(Visited 25 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *