প্রযুক্তিনির্ভর গণশিক্ষার অগ্রপথিক

বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতি শব্দবন্ধ দুটি শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের ধারণা প্রতিনিয়ত পাল্টে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে নানাভাবে জীবনসংগ্রামে যুক্ত মানুষের কাছে শিক্ষা যেমন মৌলিক চাহিদা, তেমনি এর সুযোগটাও হওয়া উচিত অবারিত। প্রথাগত প্রচলিত ধারণার শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ ঝরে পড়া মানুষের সংযুক্ত হওয়ার সুযোগটা তুলনামূলক কম। অন্যদিকে ‘গণশিক্ষা’ ও ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ বিষয় দুটিকে যখন আমরা পাশাপাশি দেখার চেষ্টা করব, তখন এক অর্থে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সামনে চলে আসে— ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়— বাউবি’। সেদিক থেকে দেখলে মূক তথা ম্যাসিভ অনলাইন ওপেন কোর্সেসের সফল প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করা যায় এখানেই। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই এ বিশেষ ধরনের শিক্ষার প্রচলন ঘটতে দেখা গেছে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে। বলতে গেলে ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স (ওইআর) আন্দোলনের আওতায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা করেছিল। লক্ষ্য নির্ধারণের শুরুতেই বলা হয়েছিল শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসার কথা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, কেউ যদি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ অনুভব করে, বাউবি তাকে তার স্বপ্নপূরণের প্রতিটি পদক্ষেপে সব ধরনের সহায়তা করবে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় এর শিক্ষা খাত নিয়ে। বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষার আলো সমভাবে পৌঁছে দেয়ার প্রক্রিয়াটা অত সহজ ছিল না তখন। বিষয়টি নিয়ে উপযুক্ত ও গঠনমূলক চিন্তা করতে গিয়েই প্রথম বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অনুভূত হয়। তবে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে আমরা দেখি, এর বহু আগে ১৯৫৬ সালের দিকেই প্রথমবারের মতো চিন্তা করা হয়েছিল এ ধরনের একটি উন্মুক্ত শিক্ষার বিকাশ নিয়ে। তখন ২০০টির মতো বেতার রিসিভার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতরণের মধ্য দিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এটা নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা তখন থেকে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষাপদ্ধতি দাঁড় করানোর উদ্যোগটা অসম্পূর্ণই থেকে গিয়েছিল। এরপর একটি অডিও ভিজ্যুয়াল সেল গঠন করা হলে ১৯৬২ সালের দিকে কোনোক্রমে বিকাশ ঘটতে দেখা যায় কথিত অডিও ভিজ্যুয়াল এডুকেশন সেন্টারের। তবে এর উপযুক্ত গঠন প্রক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটা দেখার অনেক বাকি ছিল, অন্তত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এ নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর চিন্তাও হতে দেখা যায়নি।

এদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে নতুন করে যে চ্যালেঞ্জ দেখা গিয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্যই ১৯৭৮ সালের দিকে বাংলাদেশ সরকারকে একটি স্কুল ব্রডকাস্টিং পাইলট প্রকল্প হাতে নিতে দেখা যায়। ১৯৮৩ সালের দিকে এ পাইলট প্রকল্প থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইইএমটি) প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। এনআইইএমটি পরবর্তীকালে বদলে গিয়ে রূপ নেয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিস্ট্যান্স এডুকেশনে (বিআইডিই)। বিভিন্ন ধরনের অডিও ভিজ্যুয়াল উপকরণ তৈরির পাশাপাশি এ বিআইডিই তখন ব্যাচেলর অব এডুকেশন তথা বিএড প্রোগ্রাম চালু করেছিল দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে। বিআইডিই প্রোগ্রামের সাফল্য একটা পর্যায়ে এসে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের অনুপ্রাণিত করে। এরপর ১৯৯২ সালের দিকে এ চিন্তা আলোর দেখা পায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৯২ (Bangladesh Open University Act 1992)’ পাসের মধ্য দিয়ে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাউবি এর বিস্তৃত পরিসরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানাভাবে শিক্ষাদান করছে। শিক্ষাদানের পদ্ধতিগত দিক বিচার করতে গেলে সবার আগে প্রযুক্তির বিষয়টি চলে আসে। সাধারণ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়ে অনুসৃত অভিনব পাঠদান পদ্ধতির দ্বারা শিক্ষাকে সহজেই মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে বাউবি। বিশেষভাবে ওয়েব পোর্টাল বাউটিউবের (BOUTube) পাশাপাশি বাউবির ওয়েবসাইটে একদম বিনামূল্যে প্রাপ্ত ই-বুক ফরম্যাটের বইগুলোর কথা বলা যায়। একইভাবে বাউবির ইউটিউব চ্যানেলে নানা কোর্সের উপযুক্ত ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে বাউবি শিক্ষামূলক কার্যক্রম প্রচারের দিক থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক কিংবা টুইটারেও সমান সক্রিয় বলা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে বাউবির ১২টি বিশেষায়িত বিভাগের কথা, যা নানাভাবে এর প্রোগ্রামগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। প্রশাসন, কম্পিউটার, ইঞ্জিনিয়ারিং ও এস্টেট, পরীক্ষা বিভাগ, ফিন্যান্স ও অ্যাকাউন্ট, ইনফরমেশন ও পাবলিক রিলেশন, লাইব্রেরি অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন, মিডিয়া, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, পাবলিশিং, প্রিন্টিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কিংবা স্টুডেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস— প্রত্যেকটি বিভাগই নানাভাবে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাউবি নানাভাবে প্রযুক্তিকে অবলম্বন ভেবে এর শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে বর্তমান উপাচার্যের উপযুক্ত নেতৃত্বে আরো গতিশীল হতে দেখা গেছে এর নানা প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপদ্ধতিগুলোকে। একদিকে বাউবির ওয়েবসাইটে এখানে ভর্তির নানা তথ্য ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে ৫০০-এর মতো ই-বুক শিক্ষার্থীদের সহজে পাঠগ্রহণের এক অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, পুরোপুরি মুফতে সরবরাহ করা বাউবির বইগুলো স্ব-শিখন তথা সেলফ লার্নিং পদ্ধতিতে বিশেষ মডিউলার ফর্মে লেখা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের টিউটরের সাহায্য ছাড়াই এ বই থেকে যে কারো শিক্ষালাভ করতে পারার কথা। এদিকে দেশের খ্যাতনামা বৈষয়িক বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ ও বিজ্ঞ শিক্ষকদের নিজ নিজ বিষয়ে ভিডিও টিউটোরিয়াল তৈরি করে তা বাউটিউব (BOUTube), ইউটিউব, ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানে সমানভাবে ইন্টারনেট সুবিধা নেই— এমন কথা বিবেচনায় এনে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব স্থানে ইন্টারনেট নেই কিংবা থাকলেও স্পিড অনেক স্লো, সেখানকার শিক্ষার্থীও রয়েছে বাউবির। তাদের জন্য মাইক্রো এসডি কার্ড এমবেডেড মোবাইল ফোনে ভিডিও কিংবা অডিও টিউটোরিয়াল সরবরাহের কথা ভাবা হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। এ প্রক্রিয়া পুরোপুরি চালু করা গেলে যেখানে ইন্টারনেট সুবিধা নেই, সেখানকার শিক্ষার্থীরাও সমানভাবে বাউবির নানা প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি আমরা উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি বাউবির বিশেষ অ্যাপসের কথা। সেখানে নানা ধরনের স্টাডি ম্যাটেরিয়ালের পাশাপাশি ভর্তি সম্পর্কিত তথ্য এবং বাউবির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা রয়েছে। এদিকে ইন্টারঅ্যাকটিভ ভার্চুয়াল ক্লাসরুম তথা আইভিসিআরও চালানো হচ্ছে বাউবির অধীনে। এক্ষেত্রে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম— এলএমএসের জন্য ই-লার্নিং প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেওআইসিএর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পরিচালিত এটুআই প্রোগ্রাম থেকে সহায়তাদানের কথা রয়েছে।

নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধার সঙ্গে সংযুক্তি বাউবিকে অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করেছে। সম্প্র্রতি শিক্ষার দ্বার সবার জন্য অবারিত করতে যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তির সংযুক্তির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের জন্য পথিকৃত্ হতে পারে বাউবি। বিশেষ করে নানা প্রোগ্রামের উপযুক্ত ক্লাসগুলোকে সরাসরি ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে পুরো দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া গেলে সত্যিকার অর্থে বাউবি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিত। এক্ষেত্রে বাউবির ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি ‘ওপেনবাংলাটিভি’ ও ‘ওপেনবাংলাওয়েবরেডিও’কে সক্রিয়করণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এটা সম্ভব হলে বাউবির ছয়টি স্কুল তথা ওএস, সার্ড, এসওবি, এসওই, এসএসএইচএল ও এসএসটির নানা প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা নানাভাবে এর প্রতিটি কর্মকাণ্ডে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে সংযুক্ত হতে পারত। অন্তত মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও বিশ্বগ্রাম প্রতিষ্ঠার এ যুগে এসে শিক্ষার সুযোগ অবারিত হোক— এটা যেমন চাওয়া, তেমনি বাংলাদেশে তার গ্রহণযোগ্য, বস্তুনিষ্ঠ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর একমাত্র অবলম্বন হতে পারে বাউবি। দেখতে দেখতে নানা সাফল্যের পথ পরিক্রমণে গৌরবের ২৫ বছর পার করতে যাচ্ছে বাউবি। উত্সবের এ মুহূর্তে এসে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, টিউটর, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিরন্তর শুভকামনা। বাউবি তার সাফল্যের স্বপ্নসোপানে পা রেখে দেশের শিক্ষা উন্নয়নের চরম শিখরে উত্তরণের পথে আরো এগিয়ে যাক— এটাই সবার প্রত্যাশা।

(Visited 15 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *