ঐতিহ্যের মোরগ লড়াই

হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির ধারক বাংলাদেশে গণমানুষের কাছে অন্যতম উপভোগ্য আয়োজন মোরগ লড়াই। গ্রামবাংলার একটি জনপ্রিয় ক্রীড়ানির্ভর চিত্তবিনোদন হিসেবে আবহমান কাল থেকেই মোরগ লড়াই মানুষের মাঝে ঠাঁই করে নিয়েছে। মোরগ লড়াই বলতে মূলত দুই ধরনের খেলা বোঝায়। প্রথমত. মোরগে মোরগে সরাসরি লড়াই। দ্বিতীয়ত. শিশুদের মধ্যে একপায়ে দাঁড়িয়ে নেচে নেচে খেলতে দেখা যায়। বণিক বার্তায় বাংলার মানুষের লাইফস্টাইল বিষয়ক নানা আয়োজনের মতো এ দুটি খেলা নিয়েও থাকছে দুটি আয়োজন। আজ প্রথম পর্বে থাকছে সরাসরি মোরগে-মোরগে লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত। প্রাণপণে লড়ছে দুটি মোরগ। তাদের সঙ্গে সমান উত্তেজনায় চারপাশে জড়ো হয়ে হাততালি দিচ্ছে হাজারো মানুষ। একবাক্যে বলতে গেলে এটাই গ্রামবাংলার মোরগ লড়াইয়ের প্রাথমিক পরিচয়। কোথাও মোরগ লড়াই আয়োজন হলে তা দেখতে আশপাশের গ্রাম তো বটেই, এমনকি দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসত হাজারো মানুষ। বলতে গেলে এ খেলাকে কেন্দ্র করেই সেখানে তৈরি হতো এক উত্সবমুখর পরিবেশ। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার বিশেষ করে গ্রামগঞ্জেও তার পরশে বদলে গেছে সময়। আর গ্রামবাংলার অন্যান্য ঐতিহ্যের মতো বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় মোরগ লড়াইও। বিশেষ করে মানুষের বিনোদনে প্রযুক্তির প্রভাব আর কায়িক শ্রম বিমুখতায় আবেদন খুইয়েছে মোরগ লড়াইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী লোকক্রীড়া। ইতিহাস কিংবা প্রত্নতত্ত্বের সঙ্গে যাদের পড়ালেখার যোগসূত্র আছে কিংবা প্রাচীন বাংলার তথ্যে যাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে, তারা জানেন মোগল আমলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মতো সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এসেছিল পরিবর্তনের ছোঁয়া। ধারণা করা হয়, ঠিক তখন থেকেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মোরগ লড়াই জনপ্রিয় ও প্রসিদ্ধ খেলা হিসেবে জনমানসে স্থান করে নেয়। তবে ইতিহাস বিশ্লেষণ করে জানা যায়, চাকমা, মারমা, খাসিয়া, হাজং ও মুরংদের মধ্যে মোরগের একটি আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বিশেষত ভোরবেলার ঘুম ভাঙানো সুন্দর গঠনের প্রাণী মোরগের যথেষ্ট আবেদন লক্ষ করা যায়।

খুবই আকর্ষণীয় ও ঐতিহ্যবাহী খেলা হিসেবে মোরগ লড়াই বাংলার স্বকীয় অবস্থান তৈরি করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয়; পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলংকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ব্রাজিলেও একসময় মোরগ লড়াই বেশ জনপ্রিয় ছিল বলে জানা যায়। ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে অনেকটা উত্সবের আমেজে অনুষ্ঠিত এ খেলা। তুরস্ক, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়ায় স্থান করে নিয়েছে মোরগ লড়াই।

কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল এলাকায় এখনো মোরগ লড়াইয়ের ঐতিহ্য টিকে থাকলেও খুব সহজেই প্রত্যক্ষ করা যায় এর ক্রান্তিকাল। বিশেষত অর্থ ও দর্শক অভাবে খেলাটির গৌরব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। মোগল আমলে বিভিন্ন স্থানের দেওয়ান এ খেলা আয়োজন করলেও ধীরে তা স্থানীয় অধিবাসীদের একান্ত নিজস্ব আয়োজনে পরিণত হয়। খেলার নিয়মনীতি খুবই সহজ। সাধারণত এক মোরগকে অন্য মোরগের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ করে তুলে তাদের মধ্যে মল্লযুদ্ধ লাগানো হয়। দীর্ঘক্ষণ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে হার-জিতের মধ্য দিয়ে খেলা শেষ হয়। এ লড়াইয়ে জয়-পরাজয়ের মধ্যম দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন মোরগের দাম ও মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সুন্দর গাত্রাবয়ব, চিত্তাকর্ষক রক্তলাল ঝুঁটি, ইয়া লম্বা পা, ইগলের মতো চোখ আর কম পালকের মোরগ লড়াইয়ে সবচেয়ে ভালো করে বলে জানা যায়। বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সচরাচর প্রাপ্ত দুর্লভ প্রজাতির হাসলি মোরগ লড়াইয়ের জন্য বিখ্যাত হলেও চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে আসিল নামে আরেকটি বুনো মোরগ পাওয়া যায়। অনেকে একে স্থানীয়ভাবে আছিল মোরগ নামে অভিহিত করে। কারাতে, কুংফু ও মার্শাল আর্টের নানা কায়দা-কানুনের মতো এ লড়াইয়ে একেকটি লড়াকু মোরগের দুর্ধর্ষ নিজস্ব স্টাইলের ফ্লাইং কিকগুলো মানুষকে আকর্ষণ করে। এ বিশেষ কিকগুলোকে গ্রামবাংলার মানুষ নিজস্ব ভালোলাগা থেকে নানা নামে পরিচিত করেছে। আমরা ‘ঝাঁপ’, ‘নিম’, ‘কড়ি’, ‘বাড়ি’, ‘ফাক’, ‘ছুট’, ‘কর্নার’-এর মতো বিচিত্র সব আঘাতের নাম জানতে পারি। এগুলো অসম্ভব তেজি ও যোদ্ধা প্রকৃতির মোরগগুলোর দারুণ ভঙ্গিমায় উড়তে থাকা অবস্থায় করা আঘাতের নাম। এদের পেছনের এক ইঞ্চির বেশি লম্বা সুচালো পেরেকের মতো আঙুলটিও তাদের দৈহিক গঠনে বৈচিত্র্য যোগ করেছে। নানা প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে এখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের অনেক শৌখিন হাসলি মোরগ পালনকারীর নিরলস শ্রম আর আন্তরিক অংশগ্রহণে টিকে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যর আকর্ষণীয় মোরগ লড়াই। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে হলেও এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা সম্ভব হলে সমুন্নত হবে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য।

(Visited 141 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *