রানী ভবানীর গল্প

জনশ্রুতি, লোককথা ও নন্দিত গাথাগুলোয় যতটা পরিচিত, ইতিহাসের পাতায় ঠিক ততটাই অস্পষ্ট ও বিস্মৃত এক নাম রানী ভবানী। এই স্মৃতি-বিস্মৃতি ও পরিচিতির দোলাচল থেকে মূল বাস্তবতা বের করে আনার যে দায়, তা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নন্দিত গবেষক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। তিনি রানী ভবানী শীর্ষক গ্রন্থ রচনায় হাত দিয়েছিলেন ১৩০৪ সনে। নাটোরের তত্কালীন মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায় এ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছিলেন। জনমনে রানী ভবানীকে নিয়ে যথেষ্ট আবেদন রয়েছে। জনগণের হিসাবে তিনি একাধারে বিপ্লবী, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারীদের একজন এবং জনহিতৈষী শাসক। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮ শতকের গোড়ার দিকে নাটোর রাজবংশ উত্পত্তি লাভ করে। খুব সম্ভবত ১৭০৬ সালের দিকে বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানীচরণ চৌধুরী রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন। এ সুযোগে দেওয়ান রঘুনন্দন জমিদারিটির বন্দোবস্ত পাল্টে নিয়ে নিজ ভাই রামজীবনের করে নিয়েছিলেন। বলতে গেলে তখন থেকেই নাটোর রাজপরিবারের উদ্ভব, যা ধীরে ধীরে আরো বিস্তৃত হয় আশপাশের এস্টে টগুলোয়।

১৭০৬ সালের দিকে নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন রামজীবন। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি এর আরো তিন বছর পর অর্থাত্ ১৭১০ সালের দিকে ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তারও প্রায় দুই যুগ পর ১৭৩৪ সালের দিকে তিনি মারা গেলে জমিদারি অর্জন করেছিলেন রামকান্ত। রাজা রামজীবনের মৃত্যুর মাত্র বছর চারেক আগে ১৭৩০ সালে তার ছেলে রামকান্তর বিয়ে হয় ভবানীর সঙ্গে। এর পর মাত্র ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন রামকান্ত। তিনিও মারা গেলে নবাব আলিবর্দি খান তখনকার জমিদারি ন্যস্ত করার কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি পাননি। অনেকটা নিরুপায় হয়ে তিনি একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও জমিদারির গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন ভবানীর ওপর। দায়িত্ব হিসেবে রানী ভবানী তখনকার রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম থেকে মালদহ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল জমিদারি বুঝে পান।

রানী ভবানীর কীর্তিরাজি নিয়ে বেশির ভাগ ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে জনশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় লিখিত বিভিন্ন সূত্রের পাশাপাশি জনশ্রুতি যাচাই-বাছাই করে যে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করেছেন, সেখানেও উগ্র হিন্দুত্বের ছাপ স্পষ্ট। ফলে সব সূত্র থেকে মৌলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রানী ভবানীর পরিচয় উদ্ধার বেশ কঠিন কাজ। ‘রানী ভবানী’ শীর্ষক গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সরাসরি ভবানীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ‘হিন্দু-রমণী’ পদবন্ধে। এখানে তিনি অধ্যায়ের শুরুটা করেছেন এভাবে— ‘রানী ভবানী বিধবা হিন্দু-রমণী। হিন্দু-রমণী বলিতে অধিকাংশ ইউরোপীয়গণ যেরূপভাবে নাসিকা-কুঞ্চন করিয়া আন্তরিক অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতে ইতস্ততঃ করেন না, রানী ভবানীর কীর্তিকলাপ দেখিয়া অনেকেই তাঁর প্রতি সেরূপ অবজ্ঞা প্রদর্শনের অবসরপ্রাপ্ত হন নাই।’ এক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রানী ভবানী সম্পর্কে যে আলোকপাত করেছেন, সেখানে তাঁর দুটি দৃষ্টি গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করা জরুরি। তিনি রানী ভবানীকে বিচার করতে চেয়েছেন একই সঙ্গে একজন হিন্দু ও একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে। আর রানী ভবানী কার্যত তিনটি সত্তার প্রতিনিধিত্বকারী। এক্ষেত্রে একাধারে একজন হিন্দু, একজন নারী ও বিপ্লবী শাসকের প্রতিমূর্তি তিনি। ঔপনিবেশিক কালপর্বের শুরুতে আফ্রিকা থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা কিংবা আরো অন্য সব দেশেও এমন চরিত্রের দেখা মেলে। তবে বাংলা তো বটেই, ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী নারী শাসক হিসেবে রানী ভবানীর গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেকাংশে। আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাক্কালে যখন নিজ নিজ অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখাটা বড় দায়, ঠিক তখনই অফুরান সাহস, সত্যনিষ্ঠা, পরহিতাকাঙ্ক্ষা ও স্বদেশপ্রেমের বলে ভবানী হয়ে উঠেছিলেন অনন্য ও অসাধারণ শাসনের প্রতিমূর্তি। নিজ আবাসভূমের স্বাধীনতা ধরে রাখতে প্রজাদের থেকেও নৈতিক সমর্থন পেয়েছিলেন বেশ ভালোভাবেই।

পুরো বাংলার প্রায় অর্ধেকের বেশি অঞ্চলের ওপর দাপটের সঙ্গে কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিলেন রানী ভবানী। এক্ষেত্রে বিশাল রাজ্য সঠিকভাবে শাসন করার জন্য অনেকগুলো ইউনিটে ভাগ করেছিলেন তিনি। এক্ষেত্রে একজন হিন্দু ধর্মানুরাগী হিসেবে অনেক মন্দির যেমন তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার পাশাপাশি জনগণের দিনানুদৈনিক প্রয়োজন মেটাতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি। বিশেষ করে পুরো বাংলায় তখনকার দিনে আর যাই হোক নদী-নালা ও খাল-বিলের অভাব ছিল না। নদীবাহিত বন্যার পাশাপাশি সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থান তলিয়ে যেত। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে পথঘাট চলাচলের উপযোগী থাকত না। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর বসবাস করার সক্ষমতা হারালে গৃহহীন হতে হয়েছে অনেককে। কিন্তু ভাগ্যদোষে এ অঞ্চলের মানুষই গ্রীষ্মকালে নিদারুণ পানিকষ্ট ভোগ করত। সব মিলিয়ে পানি নিয়ে পুরো জনপদের মানুষের জন্য এক উভয় সংকট উপস্থিত হয়েছিল তখন। অন্যদিকে কৃষিপ্রধান অর্থনীতির এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানি বাদে কিংবা বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানির প্রকোপে নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে স্থানীয় অধিবাসীদের। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে তখনকার জমিদার ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে রানী ভবানী যে উন্নয়ন কাজগুলো করেছিলেন, তার অনেকগুলোই কালের গ্রাসে হারিয়ে গেছে। অনেক মন্দির ভেঙে পড়েছে, অনেক স্থাপনা বিলীন হয়েছে বন্যার তোড়ে। তবে পানিকষ্ট দূর করতে তিনি যে পুকুর ও দীঘি খনন করিয়েছিলেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটি আজো টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

শুষ্ক মৌসুমে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একবার নাটোররাজের এস্টেট ভ্রমণ করতে গিয়ে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছিলেন। অনেকখানি পথ চলার পর তিনি একটি বিশাল দীঘি দেখতে পান। পরে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে প্রশ্ন করে তিনি জানতে পারেন, এটা আর কারো নয়, রানী ভবানীর কীর্তি। বর্তমানে বিস্তৃত হাইওয়ে ধরে সহজেই নাটোর পৌঁছা সম্ভব। তবে তখনকার দিনে গ্রীষ্মের ধূলিধূসরতা কিংবা বর্ষার একহাঁটু কাদাভরা পথে দীর্ঘ ভ্রমণ করে তবেই দেখা মিলত নাটোর রাজবাড়ীর। ক্লান্তিকর ভ্রমণে পথে বিশ্রামের কোনো সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনি নানা স্থানে ডাকাত দলের আক্রমণের ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো সবাইকে। রানী ভবানী পথিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেখানে অনেক পান্থশালা নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে পথিকদের প্রয়োজনীয় স্নান-আহারের সুব্যবস্থা পর্যন্ত করা হয়েছিল তখন। সেখানকার ‘ভবানী জাঙ্গাল’ নামক বিশেষ সেতু ও রাস্তা তৈরি করেছিলেন।

হিন্দুদের তীর্থস্থান কাশীতে তিনি ভবানীশ্বর শিব স্থাপন করেছিলেন। সেখানকার বিখ্যাত দুর্গাবাড়ি, দুর্গাতলা ও কুরুক্ষেত্রতলা নামের যে জলাশয়, তার সঙ্গেও জড়িত রানী ভবানীর নাম। এর পাশাপাশি হাওড়া শহর থেকে কাশী পর্যন্ত ভবানী যে বেনারস রোড তৈরি করেছিলেন, তা এখন গিয়ে মুম্বাই সড়কে উঠেছে। বড়নগরে তিনি যে ১০০টি শিবমন্দির স্থাপন করেছিলেন, তার চার-পাঁচটি এখনো টিকে আছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা মনে করেন। ইংরেজ আমলে গিয়ে রানী ভবানীর দেয়া অনেক দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তির ওপরও কর ধার্য করা হয়। তবে ঐতিহাসিক নথি হিসেবে সেগুলো তাঁর কীর্তিরাজির কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। করারোপ থেকে শুরু করে আরো নানা কারণে বাংলার অনেক জমিদার ও ভূস্বামী যখন ইংরেজদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে লিপ্ত, রানী ভবানী ছিলেন ভিন্ন স্রোতের মানুষ। তিনি যেকোনো মূল্যে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন।

সিরাজউদ্দৌলার পতনের পরও তিনি বেশ কয়েক বছর নিজ জমিদারি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে রানী ভবানীর এলাকাগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য উত্পাদন হতে দেখে সেখানে ক্রমেই ইংরেজ আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। ইংরেজরা কম মূল্যে জোর করে পণ্য কেনার পাশাপাশি মানহীন পণ্য বিক্রিতে প্রভাব খাটায়। এ সময় হঠাত্ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর দেখা দিলে আরেক সমস্যার সম্মুখীন হন রানী ভবানী। শেষ পর্যন্ত ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে নানা ধরনের বিরোধের একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ছেলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় গঙ্গাবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে পাঁচসনা বন্দোবস্তের সময় ইংরেজরা যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তার আওতায় অতিরিক্ত কর দিতে অনুত্সাহের কারণে রাজ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে এ দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যুষে এক স্মরণীয় নাম রানী ভবানী; যিনি বাংলার ইতিহাসালেখ্য, জনশ্রুতি কিংবা নিজ কীর্তিরাজির আলোয় সমুজ্জ্বল-চিরভাস্বর হয়ে আছেন আজো।

(Visited 46 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *