বাংলায় প্রথম সশস্ত্র বিপ্লব

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা থেকে ভারতবর্ষের নানা স্থানে আধিপত্য বিস্তার করে। শুরু থেকে নানা স্থানে তাদের লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তীব্র বিতৃষ্ণার কারণ হয়। বলতে গেলে পলাশী যুদ্ধের পরপর প্রথম বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন বাংলার কৃষকরা। তারা যথাযথ মূল্যে তাদের ফসল বিক্রি করতে পারেননি, পাশাপাশি একের পর এক খাজনা বৃদ্ধি মৃত্যুফাঁদে রূপ নিয়েছিল। তবে পরাধীনতার প্রায় শতবর্ষ পরে এসে প্রথমবারের মতো শক্তিশালী বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন এ দেশের সাহসী সৈনিকরা। পাশাপাশি অনেক দেশপ্রেমিক রাজা ও স্থানীয় শাসক বিপ্লবে অংশ নেয়ায় পুরো ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের ভিত নড়ে গিয়েছিল। তবে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধিকার আন্দোলনে বাঙালিদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য, যা বোঝার জন্য প্রথম সশস্ত্র বিপ্লব তথা সৈনিকদের সংঘবদ্ধ আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা যারা ইতিহাস পড়ি কিংবা পড়াই অথবা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে আগ্রহ রাখি, প্রত্যেকের একটা বিষয় কমবেশি জানা রয়েছে যে, সতেরো শতকের মাঝামাঝি ইংরেজরা কীভাবে ব্যবসার অজুহাত নিয়ে এ দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। তারপর স্থানীয় নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতা, নানা চক্রান্ত ও কূটকৌশলের পৌনঃপুনিক ফলাফল এক পর্যায়ে গোটা ভারতবর্ষের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিয়ে দেয়। তবে ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় থেকে যে অসন্তোষ বাঙালির হূদয় কুরে খাচ্ছিল, সেটা প্রথমবারের মতো একটি সংঘবদ্ধ বিপ্লবে রূপ নিতে প্রায় শতবর্ষ পেরিয়ে যায়।

পলাশী থেকে বক্সার, এরপর আরো অনেক ঘটনা। তারপর সহ্যের শেষ সীমায় উপনীত সিপাহিরা অস্ত্র ধারণ করে সরাসরি রাস্তায় নেমে আসেন ১৮৫৭ সালের দিকে। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে দাগ দিয়ে রাখা এ দিনটিতেই সংঘটিত হয় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের মহাবিপ্লব। বিভিন্ন সূত্রে একে সিপাহি বিদ্রোহ কিংবা ভারতীয় বিদ্রোহও বলা হতে দেখা যায়। ১৮৫৭ সালে এ বিপ্লবের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে স্থানীয় নাগরিকদের তীব্র ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংঘাত। বিশেষ করে লর্ড ডালহৌসি যখন স্বত্ব বিলোপ নীতির আওতায় সাঁতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুরের মতো রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন, তখন তীব্র আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না এসব অঞ্চলের নেতাদের জন্য। তিনি যখন অযোধ্যার দখল নিয়ে সেখানকার নবাবকে ঘাড় ধরে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন, তখন নবাবের অধীনে থাকা পরিবারগুলো হয়ে পড়ে সম্বলহীন। একই ঘটনা ঘটেছিল ঝাঁসি কিংবা বেরিলির ক্ষেত্রেও। ভারতে কোম্পানির লাগামহীন শোষণ কৃষিকে মৃতপ্রায় করে তোলে। ধানক্ষেতে নীল উত্পাদনে কোনো কৃষকের তেমন সম্মতি ছিল না, পাশাপাশি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো অভিঘাত দরিদ্র কৃষককুলকে এক অর্থে নিঃস্ব করে দেয়। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে কৃষকদের ওপর জমিদার ও রাজস্ব আদায়কারীদের শোষণের মাত্রাও বহুগুণে বেড়ে যায়। কৃষক ও জনসাধারণের ওপর চাপানো অতিরিক্ত করের বোঝা বইবার সক্ষমতা সবার ছিল না। এক পর্যায়ে তারা ভাবতে শুরু করে ধুঁকে ধুঁকে শোষিত হয়ে মরার চেয়ে বিপ্লব করে বীরের মতো আত্মাহুতি দেয়া অনেক সম্মানের। ফলে নানা কাজের ফলাফল হিসেবে ভারতীয়রা এ মহাবিপ্লবে অংশ নিতে এক অর্থে বাধ্যই হয়েছিল।

বাংলা তো বটেই, ভারতের মানুষের মর্মমূলে মিশে আছে তাদের ধর্মাচার। এই ধর্ম যখন ব্রিটিশ মিশনারিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, হিন্দু কিংবা মুসলিম কেউই আর চুপচাপ বসে থাকতে পারেনি। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের মহাবিপ্লবের আগে সৃষ্ট দ্রোহের আগুন জ্বালাতে মুখ্য ভূমিকা রাখে ধর্মীয় অসন্তোষ। নানা স্থানে প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে খ্রিস্টান মিশনারিরা যেভাবে মানুষকে ধর্মান্তর করছিলেন, তাতে সবার মনে এ শঙ্কা জন্মে যে, একদিন ইংরেজ শাসনে তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হবে। নানা স্থানে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রকাশ্য ধর্ম প্রচার তাদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মান্তর করার ক্ষেত্রে তারা দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করেন। অন্যদিকে মন্দির ও মসজিদের জমির ওপর করারোপ জনগণের বিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢালে। এদিকে সামরিক বৈষম্য দেশীয় সৈনিকদের ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল ইংরেজদের প্রতি। পাশাপাশি কথিত গরু ও শূকরের চর্বি দিয়ে তৈরি টোঁটাযুক্ত এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহার দুর্ভাবনার কফিনে পেরেক ঠুকে দেয়ার কাজ করে। তখনকার পরিসংখ্যান হিসাব করতে গেলে দেখা যায়, ব্রিটিশ সরকার ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ ভারতীয় সৈন্যের জন্য আর্থিক বরাদ্দ রেখেছিল মাত্র ৯৮ লাখ পাউন্ড। এর ঠিক উল্টো দিকে মাত্র ৫১ হাজার ৩১৬ জন ইউরোপীয় সৈনিকের জন্য ব্যয় করতে দেখা যায় ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডের মতো। আর্থিক ক্ষেত্রে এমন চরম বৈষম্যের বিপরীতে তিলককাটা নিষিদ্ধকরণ, দাড়ি কামানো এবং পুরনো পাগড়ি ব্যবহারে বাধ্য করা ভারতীয় হিন্দু ও মুসলিম সৈনিকদের ক্ষিপ্ত করে। এরপর পশুর চর্বি আবৃত এনফিল্ড রাইফেল নিয়ে যখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এর কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো আছে, তখন এ চর্বি দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরা সৈনিকরা চরম বিক্ষুব্ধ হয়ে সংঘটিত করেন ১৮৫৭ সালের মহাবিপ্লব।

আমির খান অভিনীত চলচ্চিত্রের মঙ্গল পাণ্ডে আমাদের মনে কতটুকু রেখাপাত করেছে, সেটা বলা কঠিন। তবে এ ব্যক্তির নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো ১৮৫৭ সালে ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে শুরু হয়েছিল এ মহাবিপ্লব। তারপর মিরাট, দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় বিপ্লবের লেলিহান শিখা। এদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাশাপাশি সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের ক্যাম্পগুলোয় প্রবল বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য সংগ্রামে মাঠে নামে। তারা বিপ্লব ঘোষণার অংশ হিসেবে জেলখানা থেকে প্রায় সব বন্দিকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখলে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে কোষাগার লুণ্ঠনের পাশাপাশি সংরক্ষিত অস্ত্রাগারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তারা এক পর্যায়ে ত্রিপুরার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছিল। এ অবস্থায় ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ৫৪তম রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি ও ১০০ নৌ-সেনাকে দ্রুততার সঙ্গে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে যশোর, রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের আরো কয়েকটি জেলায় হতে থাকা বিপ্লব দমনের জন্য পাঠানো হয়েছিল শক্তিশালী নৌ-ব্রিগেড। দেশীয় সৈন্যদের বাদ দিয়ে প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে শুধু ইউরোপীয়দের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবীরা এক্ষেত্রে ঢাকা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেন। নৌ-বিগ্রেড ঢাকা পৌঁছে প্রথমেই নিয়োজিত সিপাহিদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালায়। নানা স্থানে সংঘটিত খণ্ড যুদ্ধে বেশ কয়েকজন সিপাহি শহীদ হন। তাদের মধ্যে বেশকিছু বন্দি হলেও অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে পলাতক সিপাহিদের মধ্যে যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন, দ্রুত গঠিত সামরিক আদালতে সংক্ষিপ্ত বিচারে তাদের নানা ধরনের শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অন্যদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য নানা স্থানে সড়কের পার্শ্ববর্তী গাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

গাছে ঝুলিয়ে বিদ্রোহীদের ফাঁসি

১৮৫৭ সালের বিপ্লবে বাংলাদেশের মূলত দুটি অঞ্চল— ঢাকা ও চট্টগ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। ৭৩তম স্থানীয় রেজিমেন্ট তখন ঢাকায়। এর বাইরে বাকি দুটি রেজিমেন্ট তখন অবস্থান করছে জলপাইগুড়িতে। মুন্সি রহমান আলি তায়েশ লিখেছেন, জলপাইগুড়ি থেকেই প্রথম গুজব রটেছিল বিপ্লবের। সেখান থেকে জানানো হয় যে, বিপ্লবী সৈনিকরা ক্যাম্প দখল করে নিয়েছেন। তারা বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য ঢাকায় আসছেন সৈনিকদের সঙ্গে যোগ দিতে। এ খবর পাওয়ামাত্র ঢাকার লালবাগ থেকেও সৈনিকরা বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। এরপর ১৫ জুলাই সংবাদ পাওয়া যায় চট্টগ্রামে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সৈন্যদের ওপর আস্থা না রেখে ব্রিটিশরা শুধু ইংরেজ পুলিশ, এমনকি আগ্রহী সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে বিশেষ বাহিনী তৈরি করে। তারা এ বিপ্লব সামাল দিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর আসাম থেকে বিপ্লবী সৈনিকরা অনেক স্থানে আক্রমণ চালিয়ে ব্রিটিশদের অনেক ক্ষতিসাধন করেন। এরপর কলকাতা ও ঢাকায়ও তুমুল সংঘাত হতে দেখা যায়। মণিপুরের রাজাকে গ্রেফতার করে ২ অক্টোবর কারাগারে পাঠানো হয়। এদিন সেখানে সিপাহিরা বিদ্রোহ করে বসেন। তবে ৩৪তম রেজিমেন্ট ব্যারাকপুরে যে বিদ্রোহ করেছিল, তা দমনে অনেক বেগ পেতে হয় ইংরেজদের। চট্টগ্রামের সিপাহিরা শুরু থেকে অপেক্ষাকৃত নিশ্চুপ ছিলেন। কিন্তু একজন ইংরেজ অফিসার কর্তৃক স্থানীয় সিপাহির ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে তারা ২১ নভেম্বর দুর্নিবার বিদ্রোহে যুক্ত হন। তারা কোষাগার লুট করার পাশাপাশি অনেক ইংরেজ অফিসারকে হত্যা করেন। তখনই খবর রটে যায় যে, বিপ্লবী সিপাহিরা সোজা ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছেন। ইংরেজরা বুঝতে পারে, এ বিপ্লবী সিপাহিরা যদি ঢাকায় অবস্থানরত সৈনিকদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন, তাহলে তাদের আর প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। তারা এজন্য একটা আদেশ জারি করে ঢাকার সৈন্যদের ক্যাম্প থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তারা ২২ নভেম্বর সকাল থেকে লালবাগ ও ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থানরত সৈন্যদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করে। কিন্তু অবাক করার বিষয়, এ সময় সৈনিকরা বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তবে তাদের এই আত্মসমর্পণের ওপর ইউরোপীয় সৈনিকরা আস্থা রাখতে পারেননি। তারা গায়ে পড়ে আক্রমণ চালালে প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় লালবাগ এলাকায়।

ময়মনসিংহের ইতিহাসে কেদারনাথ মজুমদার লিখেছেন, ১৮৫৭ সালে ঢাকায় যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তার দ্বারা প্রভাবিত হয় তত্কালীন ময়মনসিংহ জেলা। সেখানকার বেশির ভাগ মানুষ ছিল হিন্দু। তাদের মধ্যে বিত্তশালীরা শুরু থেকে ভয় পেয়েছিল যে ঢাকা থেকে বিপ্লবী সৈন্যরা সেখানে গিয়ে লুটতরাজ শুরু করবেন। ময়মনসিংহে এমন গুজব রটে গিয়েছিল যে, ঢাকার বিপ্লবী সিপাহিরা সব ইংরেজকে হত্যা করেছেন। তারা লুটতরাজ করতে করতে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এমন সংবাদ রটে গেলে সেখানকার বেশির ভাগ ধনী হিন্দু তাদের মূল্যবান সম্পদ নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। কেউ কেউ তাদের মূল্যবান সম্পদ লোহার শক্তিশালী সিন্দুকে ভরে মাটির নিচে পুঁতে রাখে। অনেক ইংরেজ সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, তখন এ আক্রমণের ভয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। অনেক স্থানে স্কুল পর্যন্ত ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছিল। অন্তত তখনকার ময়মনসিংহ ও জামালপুরে অবস্থা এমনই থমথমে হয়ে গিয়েছিল।

বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ সেনাদের যাত্রা

চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা এক অর্থে ঢাকার থেকেও এগিয়ে ছিলেন। ঢাকায় বিদ্রোহ সেভাবে শুরু হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা নানা স্থানে জেলখানা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করে দেন। তারা সরকারি অর্থভাণ্ডার লুট করার পাশাপাশি অস্ত্রাগারে আগুন লাগিয়ে দেন। তারা বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরা, আসাম ও সিলেটের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করেন। আসামের কাছাড় জেলার দিকে এগিয়ে যেতে থাকা সৈন্যদেও অনেকে নানা স্থানে বন্যজন্তুর আক্রমণ কিংবা ব্রিটিশদের ধাওয়ার মুখে মারা যান। অন্যদিকে রাজশাহীতে যারা বিপ্লব করেছিলেন, তাদের সম্পর্কে জানা গেছে জলপাইগুড়ি থেকে বিপ্লবে অংশ নেয়া সৈন্যদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ থেকে। তবে প্রতিটি স্থানে আলাদাভাবে সংঘটিত বিপ্লবের ফলাফল নির্ভর করছিল ঢাকার ওপর। দিল্লিতে বিপ্লবের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতায়ও এমন সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালের ১৭ মে ৪৭তম স্থানীয় সৈন্যদের রেজিমেন্ট বিপ্লবে অংশ নেয়। এরপর নদীয়া ও বহরমপুরে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লব দমনে বেশ বেগ পেতে হয় ব্রিটিশদের। দ্বিতীয় ও ৭০তম রেজিমেন্টের সৈন্যরা এ সময় ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ করে বসেন। এক্ষেত্রে তারা স্থানীয় জমিদারদের মধ্যে যারা ব্রিটিশবিরোধী, তাদের থেকে সহায়তা পান। পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে ১৮৫৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো বহরমপুরের সৈনিকরা এনফিল্ড রাইফেল বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। এ অবস্থায় ২৯ মার্চ ব্যারাকপুর থেকে সৈনিক মঙ্গল পাণ্ডে সরাসরি বিপ্লবের ডাক দেন। এক্ষেত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তারা সরাসরি বাঙালি ছিলেন না বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে উত্তর প্রদেশ, দিল্লি ও বাংলার মিলিত বাহিনী তাদের বিপ্লবের শুরুতে ২৪ এপ্রিল কার্তুজ বদলে দেয়ার দাবি জানায়। এতে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত না করলে এক পর্যায়ে বিদ্রোহ আসন্ন হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশদের সংরক্ষিত দাপ্তরিক নথি থেকেও এ বিপ্লবের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ব্রিটিশরা অনেকাংশে নিজের মতো করে এ বিপ্লবের ইতিহাস লিখেছেন। তার পরও ঘটনাপ্রবাহ থেকে আঁচ করে এ বিপ্লবের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এক্ষেত্রে বিপ্লবী বাঙালিদের পুরোপুরি খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। সিএফ বাকল্যান্ড লিখেছেন, সিপাহিদের আক্রমণের ফলে তখনকার জনমনে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। তবে কাজী আবদুল ওয়াদুদ বাংলার জাগরণ পত্রিকায় এ বিপ্লব নিয়ে লিখে গেছেন ‘ফার্স্ট ওয়ার অব ইনডিপেনডেন্স’ শিরোনামে। তিনি মারাঠা নেতা বিনায়ক সরকারের উদাহরণ টেনে এ কথা লিখেছিলেন। তবে এক্ষেত্রে কিছু মানুষের নির্লজ্জ নীরবতা সত্যি অবাক করার মতো। বিশেষ করে হিন্দু প্যাট্রিয়টের সম্পাদক হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন লিখলেন—  ‘merely a performance of the superstitious sepoys, having no connection whatsoever with the peasantry of the country, who are respectful and devoted to the English government, and their loyalty has remained unshaken.’ তখন এ বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নেতৃস্থানীয় মানুষ এ বিপ্লব সম্পর্কে লিখেছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার দিকেই তাদের আগ্রহ দেখা গেছে প্রবল। কেউ কেউ মনে করেন, সরাসরি ফরায়েজিদের সঙ্গে সিপাহি বিপ্লবের সম্পর্ক থাকায় বর্ণ হিন্দুদের অনেকে এ বিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এক অর্থে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সৈনিকের পাশাপাশি মুসলমান সম্প্রদায়ের এ বিপ্লবে অধিক সংযুক্তি বর্ণ হিন্দুদের মুখোমুখি দাঁড় করায় বিপ্লবটিকে। একদিকে ব্রিটিশরাজের সমর্থনপুষ্ট থেকে অন্যদিকে নিম্নশ্রেণীর বিপ্লবকে স্বাগত জানানো তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। ফলে মুন্সি রহমান আলি তায়েশ যখন তারিখ ই ঢাকা লিখতে গেলেন, এ বিষয়গুলো কমবেশি সেখানে উল্লেখ হতে দেখা যায়।

বিদ্রোহী সিপাহিদের বাহিনী

ততদিনে পলাশী যুদ্ধের প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে মোগল শাসনের কাছাকাছি থেকে যারা উচ্চশ্রেণীতে আরোহণ করতে পেরেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ততদিনে বিলুপ্ত হয়ে গেছেন। অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নবাব, জমিদার, খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর, গোমস্তা কিংবা এ ধরনের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বিপ্লবী সৈনিকদের পক্ষ নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। উত্তর প্রদেশ ও দিল্লি থেকে উচ্চবিত্ত অনেক পরিবারের মানুষ এ সংগ্রামকে প্রণোদিত করলেও বাংলায় এসে এর শ্রেণী সংঘাত প্রবল হয়। স্বাধীনতাকামী সৈনিকদের এ মহান বিপ্লব এক পর্যায়ে রূপ নিয়েছিল উচ্চবর্ণ বনাম নিম্নবর্ণের সংঘাতে। সেখানে দেশীয় উচ্চবর্ণের মানুষগুলোকে নখদর্পণে রাখায় নিম্নবিত্তের পরাজয় হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে ফরায়েজি নেতা দুদু মিয়ার আলিপুর কারাগার আক্রমণের সঙ্গে এ বিপ্লবকে যখন সম্পর্কিত করা হয়, তখনই ধর্ম ও স্থানীয় উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্তের সংঘাত আরো প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে  ‘Economic Condition of the Muslims of Bengal under East India Company’ থেকে যে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর ধারণা পাই, তা এক অর্থে এ বিপ্লবের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। গণমানুষের প্রতিবাদী হয়ে ওঠার মাধ্যমে একটি আন্দোলন সংঘটিত হলেও তার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে উপযুক্ত নেতৃত্বের ওপর। সিপাহী বিপ্লব এমন একজন নেতা খুঁজে নিতে পারেনি বলেই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সফলতার মুখ দেখেনি। তবে পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলন থেকে সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগ্রামীদের জন্য পাথেয় হয়ে কাজ করেছে এ বিপ্লব। আর এজন্যই অনেক ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ পর্যন্ত এ সিপাহী বিপ্লবকে ‘An epoch-making event in the history of the Indian sub-continent’ হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হয়েছেন।

(Visited 133 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *