জিপিএ ৫ পাওয়াই কি সবকিছু?

প্রতি বছর দেখা যায় বেশ কয়েকটি দুশ্চিন্তার পসরা সাজিয়ে আসে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল। মাধ্যমিক কিংবা পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষার তুলনায় এক্ষেত্রে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজটা একটু বেশিই দেখা যায়। অভিভাবকরা যেমন ভাবতে থাকেন, তার সন্তান ভালো ফলাফল অর্জন করার নামান্তরে জিপিএ ৫ মতান্তরে সোনালি জিপিএ ৫ পাবে কিনা? সন্তানরা দুর্ভাবনায় ঘুম হারাম করে ফেলে যে জিপিএ ৫ না পেলে তাদের কী ধরনের যন্ত্রণা পোহাতে হবে, মা-বাবার কাছে কী ধরনের বকুনি খেতে হবে, কতটা অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখে পড়তে হবে। আর নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টরা ভাবতে থাকেন, এত শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাচ্ছে, এতজন পাস করছে নানা গ্রেড পয়েন্ট পেয়ে, কিন্তু সে ফলাফল নিয়ে তারা কোথায় যাবে?

চিন্তার মেঘ সরে গেছে ফলাফল প্রণেতাদের সামনে থেকে, তাদের কাজ শেষ। তারা বেশ জানিয়ে দিলেন এ বছর এইচএসসি ও সমমানের ১০টি বোর্ডে পরীক্ষার্থীদের গড় পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তাদের পরিসংখ্যানগত তথ্য বিচার করতে গেলে দেখা যায়, গড় পাসের হার নেমে গেছে। পাসের হারে এ অবনমন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতেই পারে, হতে পারে নানা আলোচনা-সমালোচনা। পরিসংখ্যানের দিকে আরেকটু দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট হবে ১০ বোর্ডে এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৮৯৪ জন, যেখানে গত বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৭০ হাজার ৬০২ জন। অর্থাৎ তাদের হিসাবে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২৭ হাজার ৭০৮ জন। সব মিলিয়ে মোটা দাগে বলা যেতেই পারে, গত বছরের তুলনায় এবারের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ৬১ হাজার ৬১৪ জন ছেলেমেয়ে। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন। ফলাফলের জেন্ডারগত বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে ছাত্রীরা; যেখানে ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ, সেখানে ছাত্রদের ৬৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তবে ছেলেরা ২৩ হাজার ২৯৭ জন জিপিএ ৫ পেয়ে এগিয়ে গেছে, যেখানে মেয়েরা পেয়েছে ১৯ হাজার ৬০১ জন।

পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বরাবরের মতো আপন আলোয় ভাস্বর, প্রতিটি দৈনিকের প্রথম পাতায় এ ফলাফল হয়েছে ব্যানার হেডিং, উল্লাসরত ছেলেমেয়েদের ছবি ছাপা হয়েছে তিন কলাম কিংবা চার কলাম সাইজে। কিন্তু একটু সতর্ক পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এ উল্লাস হতাশায় পরিণত হতে তেমন সময় লাগবে না। অবাক করার বিষয় হলেও সত্য, অভিভাবকরা ভালো ফলাফলের দিকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, ফলাফলের ব্যবহারে তাদের সতর্ক দৃষ্টি নেই বললেই চলে। দুর্ভাবনার ভবিষ্যদ্বাণী করলে বলা যেতেই পারে, উচ্চ মাধ্যমিকে সোনালি জিপিএ ফাইভধারী শিক্ষার্থীর অনেকেই হয়তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির সুযোগ পাবে না। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার ধরন থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। বলা যায়, এখনকার লেখাপড়ার ধরনে শর্টকার্ট রাস্তা বেশি হয়ে যাওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের মূল বইয়ের বদলে সাজেশন নোট-গাইড আসক্তি আর কম পড়ে বেশি নম্বর পাওয়ার প্রবণতা এক্ষেত্রে কাল হয়ে দেখা দেয়।

অধিক জনসংখ্যার এ দেশে বাড়তি শিক্ষার্থীর জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেই উপযুক্ত আসন। বলতে গেলে প্রতি বছর যেভাবে দেশে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে পাসের হার বাড়ছে (এবার কমেছে), যা অনেকটা দ্বান্দ্বিকভাবে আমাদের আশাবাদী এবং হতাশ করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে শিক্ষার মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে, সে বিতর্কে যাওয়াটা বোধকরি অবাস্তব। কিন্তু সহজেই প্রশ্ন তোলা যায়, এত মেধাবী তরুণ-তরুণী পাস তো করে গেছে, কিন্তু তারা কোথায় ভর্তি হবে? আজ থেকে এক যুগ আগে যখন এইচএসসি পরীক্ষা হতো, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল কম, হাতেগোনা। অল্প কয়েকটি মেডিকেল কলেজের বিপরীতে বুয়েট ছিল প্রকৌশল বিদ্যার একমাত্র আশ্রয়স্থল। তবে এখন যুগের বিবর্তনে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ও। কিন্তু এ বেড়ে যাওয়াটাও অধিক শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়। স্পষ্ট করে বললে মেধাবীদের অনেকেই এ ধরনের স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে না বলা যায়। অন্তত ফলাফল প্রকাশের পর তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যার আনুপাতিক বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এদের অনেকের জন্যই দেশের প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির কোনো সুযোগ নেই।

দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাই পত্রিকার পাতাজুড়ে হওয়া এসব ব্যানার হেডিং, থ্রি-সি, ফোর-সি সাইজের ছবিতে তেমন আশার আলো দেখি না। বরং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যখন এইচএসসির ফলাফল প্রকাশের পর মেধাবী তরুণ-তরুণীদের ছবি আমি দেখি, তখন দুশ্চিন্তার মেঘ আরো ঘনীভূত হয়। আশঙ্কা পেয়ে বসে মেধার বদৌলতে আমরা কি তবে সনদনির্ভর জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি?

দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য রয়েছে অনেক কারখানা। অর্থবিত্তের শক্তিমত্তা বেশি থাকলে কেউ যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে; তা সম্ভব না হলে আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও যোগ্যতা না কুলালে আছে পাস কোর্স। আর ঘরে বসে কোনো কিছু না পড়ে ডিগ্রি নেয়ার জন্য চালু হয়েছে আরো কত পথ। কর্মক্ষেত্রে থেকেও টাকার বিনিময়ে সনদ প্রাপ্তির জন্য চালু হয়েছে এমবিএর নানা ধারা। বলতে গেলে, দু হাত বাড়িয়ে সাদর সম্ভাষণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাদের ভাবখানা এমন— টাকা দাও, আর কিছু না পাও, অন্তত সনদ নিয়ে যাও।

ফলাফল প্রকাশের আগের রাতে মিরপুর শর্মা হাউজের আড্ডায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য শাখার শিক্ষককে তুলোধুনো করে ছাড়লেন তার বন্ধু। ভদ্রলোক কটাক্ষ করে বললেন, ‘দোস্ত তুই যে সাবজেক্ট পড়াস, তার এতই দাম যে, ঢাকা শহরে কোনো একটা বিল্ডিংয়ের মাথা থেকে কিছু ছুড়ে মারলে যে লোকের গায়ে লাগবে; সে-ই তোর সাবজেক্টে পড়েছে’; উনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ের শিক্ষক, যা বলাই বাহুল্য। রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের পরিক্রমায় শিক্ষামন্ত্রী আসেন, শিক্ষামন্ত্রী যান; কিন্তু বদলায় না শিক্ষানীতি। আমরা নামমাত্র যে শিক্ষানীতি পেয়েছি, সেখানেও নেই প্রজন্মের জন্য কোনো নির্দেশনা। শিক্ষিত বেকারের দল দিন দিন যতটা ভারী হয়ে উঠছে, সেখানে আগামী ২০ বছরে আমাদের কতজন স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শিক্ষিত জনশক্তি প্রয়োজন; সে ব্যাপারেও নেই কোনো পরিসংখ্যানগত তথ্য কিংবা দিকনির্দেশনা।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু সাবজেক্ট আছে, যেখানে শুধু সনদের জন্য মানুষ ভর্তি হয়। এর পর পাস করে বেরিয়ে ওই সনদের থাকে না সিকি পয়সার মূল্য। তখন বাধ্য হয়ে চাকরির জন্য অন্য কোনো ডিপ্লোমা কিংবা আরেকটা বিষয়ে মাস্টার্স করতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থী। তবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, আর একটি ডিগ্রির জন্য তারা ভর্তি হচ্ছে এসব সাবজেক্টে। আর শেষ পর্যন্ত তারা শিক্ষিত বেকারের সারিতে যোগ করছে আরেকটি টালি চিহ্ন। এইচএসসি পাস করা কেউ কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে দ্বারস্থ হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে; পাবে নামসর্বস্ব একটা সনদ, যা দেখিয়ে সে চাকরি পাবে, এ নিশ্চয়তা এই দেশ কিংবা আমাদের সমাজ তাকে দেবে না।

আমাদের তরুণ সমাজের বুদ্ধিদীপ্ত অবস্থান ও মেধার উপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু তাদের শুধু সনদ প্রাপ্তির নামান্তরে কর্মহীন জনগোষ্ঠীতে যোগ দিতে বাধ্য না করে উৎসাহিত করতে হবে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে। তাদের আগ্রহী করতে হবে এমন শিক্ষায়, যা সনদনির্ভর নয়, বরং কর্মসংস্থান প্রদায়ক এবং দেশের উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক। দেশের নাগরিক হিসেবে উচ্চশিক্ষা লাভ প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর অধিকার, আর সেজন্য উদ্যোগ নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই। উপযুক্ত কর্মকৌশল, সময়োপযোগী শিক্ষানীতি এবং কৌশলপত্র প্রণয়ন ও তার সফল বাস্তবায়নে চেষ্টা করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে মেধাবীদের জন্য উন্মুক্ত ও সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দ্বিতীয় শিফট চালু করে অধিক শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেয়া যায়। স্থান সংকুলানের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরি কিংবা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে পাঠদানও চালু করা যেতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষা যেন সনদমুখী না হয়ে উন্নয়ন ও কর্মমুখী হয়। সেটা নিশ্চিত করা গেলে অন্তত এত ভালো ফলাফলের পর হতাশায় দিন গুনতে হবে না আমাদের। শিক্ষিত জনশক্তি বেকার থেকে দেশের বোঝা হবে না, বরং তারাই হবে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নসারথি।

(Visited 32 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *