গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক

বিহারের রোটাসগড় পাহাড়ে উত্কীর্ণ একটি সিল। ‘শ্রী শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য’ পদবন্ধে উল্লিখিত স্থানীয় কোনো শাসকের নাম। তিনিই শশাঙ্ক, প্রথম জীবনে যাঁর পদ ছিল মহাসামন্ত; যা সামন্ত রাজাদের মধ্যে তাঁর উপযুক্ত শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করে। তথ্যপ্রমাণ যাচাই করলে দেখা যায়, প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে স্থিতিশীল সময় তেমন একটা আসেনি। গুপ্ত আমলের শক্তিশালী শাসনে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও সেটা ক্ষণস্থায়ী। হূণ নামক এক দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জাতির আক্রমণে গুপ্ত সাম্রাজ্য ছত্রখান হয়ে যাওয়ার পর সমগ্র উত্তর ভারতজুড়ে অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্যের উত্থান ঘটে। এই সময়ের বাংলার ইতিহাসের স্বরূপ উদ্ঘাটনে আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বঙ্গ ও সমতটের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। ৬ শতক থেকে শুরু করে প্রায় ১১ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, যার সাথে উত্তর-পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক অবস্থার তেমন কোনো মিলই ছিল না। গুপ্ত রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পর বরাবরের স্বাধীনচেতা এই অঞ্চলের মানুষ খুঁজতে শুরু করে মুক্তির পথ। এ সময় বাংলার প্রথম সফল ও শক্তিশালী শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন গৌড়রাজ শশাঙ্ক। থানেশ্বররাজ হর্ষবর্ধনের অনুগ্রহপ্রাপ্ত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যত বিষোদ্গারই করেন না কেন, শশাঙ্কই অস্থিতিশীল বাংলায় প্রথমবারের মতো স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের আলোচনায় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সমতট অঞ্চল ও সংলগ্ন বঙ্গ জনপদ কিংবা তার অংশবিশেষ মূলত এর আওতায় পড়ে। অন্যদিকে হরিকেল, বঙ্গাল ও বাকলা বা চন্দ্র দ্বীপও এর আওতাভুক্ত। ৬-১১ শতক পর্যন্ত এখানে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তার পরিচয় মেলে, যা বাংলার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বরেন্দ্র ও মগধের সিংহাসনের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আচরণের তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। বিশেষ করে এ দুটি অঞ্চলের শাসন কাঠামো এতটাই আলাদা ছিল যে, কোনোভাবে একটি অন্যটির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি।

পালরাজা দ্বিতীয় মহীপাল অল্প কিছু সময়ের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় হস্তক্ষেপ করলেও তা স্থায়ী হয়নি। তাই সেন-পূর্ব যুগে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বতন্ত্র শাসন টিকে ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় এই সময়ে যেসব রাজা রাজত্ব করতেন, তারা রাজনৈতিকভাবে পুরো বাংলায় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হলেও একটি স্বতন্ত্র শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। এ শিল্পকলা ও সংস্কৃতি বরেন্দ্র ও মগধের থেকে পুরোটাই ভিন্ন ধাঁচের। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বিকশিত এ বিশেষ শিল্পকলার সাথে বাংলার মাটির যোগ রয়েছে। এখানে রাজমহলের কালো ব্যাসল্ট পাথর ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। এখানে স্থানীয় নরম পাথরেই ভাস্কর্য নির্মাণ হয়েছিল। এর পাশাপাশি বাংলার স্থাপত্যশিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বিশেষ অবদান ছিল।

গুপ্তোত্তরকালে খ্রিস্টীয় ৬ শতক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও ভারতের অন্যত্র বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক রাজশক্তির উদ্ভব ঘটে। খ্রিস্টীয় ৬-৭ শতকের স্বাধীন বঙ্গরাজ্য, গৌড় ও সমতটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এ অঞ্চলে বেশ কয়েকজন শক্তিশালী রাজা শাসন করেন। তাদের মধ্য থেকে সমতটের বৈন্য গুপ্ত, বঙ্গ অঞ্চলে গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব এবং পরবর্তীকালে সমতটের নাথ ও রাত বংশের কথা বলা যায়। তবে গৌড়রাজ শশাঙ্ক একক ক্ষমতাবলে অনেক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্যদিকে পরবর্তীকালে চন্দ্র ও বর্মণ বংশীয় রাজারাও বেশ দাপটের সাথে রাজ্যপাট খুলে বসেন। এসব রাজ্যের ইতিহাস রচনার জন্য ওই সময়ের রাজাদের জারি করা লিপিগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্ত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

গুপ্ত রাজবংশের পতনের ঘটনাপ্রবাহ শেষে একটি শক্তিশালী রাজবংশ হিসেবে পাল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা পায়। প্রথমত. গুপ্ত রাজাদের পতনের পর তাদের অধীনে থাকা উত্তর বাংলার গৌড় দখল করে নিতে দেখা যায় মহাসামন্ত শশাঙ্ককে। বিহারের রোটাসগড়ে একটা পাহাড়ের গায়ে পাওয়া সিলের ভাষ্যমতে, ‘শ্রী শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য’ যা নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়েছে। এর অর্থ করলে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি ছিলেন একজন মহাসামন্ত, যা শাসক হিসেবে একটা সম্মানিত পদ। এভাবে স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শশাঙ্ক খুব শক্তিশালী রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি অনেক রাজ্য অধিকার করলেও তাঁর মৃত্যুর পর রাজ্য ধরে রাখার মতো যোগ্য কোনো শাসক ছিলেন না। গুপ্তোত্তর বাংলার ইতিহাসের শশাঙ্ক গৌড়াধিপতি হিসেবে উত্তর ও পশ্চিম বাংলার বিশাল এলাকাজুড়ে তাঁর রাজ্য গড়ে তোলেন। পাশাপাশি মগধ বা দক্ষিণ বিহার, উত্কল ও কঙ্গোদ কিংবা উত্তর উড়িষ্যার উপরেও তিনি আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

স্বাধীন বঙ্গরাজ্যের অবসানের পর উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় কর্ণসুবর্ণকে কেন্দ্র করেই স্বাধীন গৌড় রাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল। এই সময়ের তথ্যপ্রমাণ হিসেবে গৌড়রাজ জয়নাগ ও শশাঙ্কের লিপি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। তত্কালীন কর্ণসুবর্ণরাজ জয়নাগের বপ্পঘোষবাট তাম্রশাসনের মাধ্যমে ঔদুম্বরিক বিষয়ের বপ্পঘোষবাট গ্রামটি জনৈক ব্রাহ্মণ ভট্ট ব্রহ্মবীর স্বামীকে দান করার তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে গৌড়রাজ শশাঙ্কের আমলে জারি করা তাম্রশাসনগুলো পাওয়া গেছে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্কল তথা উড়িষ্যা থেকে।

বিহারের রোহটাসগড় দুর্গ-প্রাচীরে একটি সিলমোহরের ছাপ পাওয়া যায়, যেখানে শশাঙ্ককে মহাসামন্ত বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শশাঙ্ক প্রথম জীবনে একজন সামন্তরাজা ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি স্বাধীন হন এবং মেদিনীপুর তাম্রশাসন-১, মেদিনীপুর তাম্রশাসন-২ ও ১১ তাম্রশাসন থেকে তার রাজত্বকালের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তবে শশাঙ্কের গঞ্জাম তাম্রশাসন সামন্তরাজা দ্বিতীয় মাধব বর্মা জারি করেছিলেন। এর মাধ্যমেও শশাঙ্ক সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। শশাঙ্কের তাম্রশাসনে গুপ্তধারার প্রতিফলন থাকলেও আর্থসামাজিক চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন চোখে পড়ে। বিশেষ করে তাঁর আমলে বাংলার সমাজ ও প্রশাসন অধিকতর সামন্তনির্ভর হয়ে পড়েছিল। তবে এ ধরনের তাম্রশাসনে সামন্ত, মহাসামন্ত, অগ্রহারীণ প্রভৃতি পদবির উল্লেখ ছিল না বললেই চলে।

এখানে অগ্রহারীণ ছিলেন নিষ্কর ভূ-সম্পত্তির ভোক্তা, যারা চাষীদের জমি বন্দোবস্ত দিয়ে নির্দিষ্ট হারে কর আদায় করতেন। এরা এই অর্থ ধর্মীয় বা অন্য কাজে ব্যয় করতেন, কিন্তু নিজেরা রাজা বা রাজ্যকে কোনো কর দিতেন না। সময়ের আবর্তে তারা ভূস্বামীতে পরিণত হয়ে ব্যাপক শক্তিমত্তা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে এসব অগ্রহারীণ ও সামন্তরাজ এত প্রতিপত্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন যে, তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্যতায় রূপ নেয়। তাদের কেউ কেউ সরাসরি রাজশাসনকেই অস্বীকার করে বসেন। এ সংঘাত-সংঘর্ষ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলায় শতবর্ষব্যাপী অরাজকতাময় যুগের আবির্ভাব ঘটিয়েছিল। পাল বংশের শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত অব্যাহত এ গোলযোগই মাত্স্যন্যায় হিসেবে ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে। যাই হোক, শশাঙ্কের আমলে ব্রাহ্মণরা সংঘবদ্ধভাবে স্থানীয় প্রশাসনে ভূমিকা পালন করতেন, যা গুপ্ত আমলে ছিল না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে মহামহত্তর ও মহত্তর, মহাপ্রধান ও প্রধান, অগ্রহারীণ, ভট্ট, বৈষয়িক, করণিক, পুস্তপাল ও স্থায়ীপালের কথা জানা যায়। শিল্প-বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ববিহীন এ পরিষদে করণিক ও পুস্তপাল সরকারি কর্মকর্তা, বাকিরা ভূমিনির্ভর সামন্ত অভিজাত এবং ব্রাহ্মণ-পুরোহিত শ্রেণির প্রতিনিধি।

বিশেষ করে গুপ্ত যুগেই বাঙালি স্বাধীন রাজ্য গড়ার প্রত্যয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিল, যার অনেকটা পূর্ণতা লক্ষ করা যায় শশাঙ্কের সময় এসে। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেবের স্বাধীন বঙ্গরাজ্য একটি ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের ফসল। দাক্ষিণাত্যের চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মণের হাতে বঙ্গ রাজ্যের স্বাধীনতার অবসান ঘটে। তার পর সমতট অঞ্চলে ভদ্র, খড়গ, নাথ, রাত প্রভৃতি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান লক্ষ করা যায়। বস্তুত এরই ধারাবাহিকতায় ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে গুপ্ত অধিকৃত গৌড়কে স্বাধীন করে শশাঙ্ক একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিয়েছিলেন।

শশাঙ্ক উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের বিশাল এলাকাজুড়ে গৌড় রাজ্য গড়ে তোলেন। এর বাইরে তিনি মগধ বা দক্ষিণ বিহার এবং উত্কল তথা উড়িষ্যা অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেন। মেদিনীপুরও তাঁর দখলে চলে আসায় উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে শশাঙ্কের প্রভাব লক্ষ করা যায়। রোটাসগড়ের সিলটির পাশাপাশি কিছু তাম্রশাসন আর ৭ শতকের দিকে আসা চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙের বিবরণী, বাণভট্টের লেখা হর্ষচরিত গ্রন্থ থেকে শশাঙ্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে শশাঙ্কের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা পাঠ করেও তাঁর সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে’ শশাঙ্ক সম্পর্কে কিছু তথ্যের অবতারণা লক্ষ করা গেছে।

শশাঙ্কের রাজক্ষমতা গ্রহণের আগেই স্বাধীন বঙ্গরাজ্যের পতন ঘটেছিল এবং পরবর্তী গুপ্তরাও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করেন মহাসামন্ত শশাঙ্ক। তিনি গৌড়ের সিংহাসন দখল করে সামন্ত অধিপতির বদলে গৌড়ের স্বাধীন রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করলেন কর্ণসুবর্ণে, যা বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ এলাকায় অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এখানে আবিষ্কৃত রক্তমৃত্তিকা বিহার শশাঙ্কের স্মৃতি বহন করে। রক্তমৃত্তিকা বা রাঙামাটি আর তার কাছে অবস্থিত কানসোনা গ্রাম এখনো শশাঙ্কের স্মৃতি চিহ্নগুলো ধারণ করে আছে।

তবে গোঁড়া শৈব ধর্মানুসারী শশাঙ্ক বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন, যার প্রমাণ রয়েছে হিউয়েন সাঙের বিবরণীতে। হিউয়েন সাঙ শশাঙ্ককে পছন্দ করতেন না। শশাঙ্কের শত্রু থানেশ্বরের রাজা হর্ষবর্ধন ছিলেন হিউয়েন সাঙের একজন পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে আরেকজন বর্ণনাকারী বাণভট্ট ছিলেন শশাঙ্কের বিরোধী হর্ষবর্ধনের সভাকবি। তাই তাদের বিবরণের আলোকে শশাঙ্ককে সরাসরি বৌদ্ধদলনকারী হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না। তবে উগ্র শৈব মতাদর্শী শশাঙ্কের দ্বারা বৌদ্ধদলন অনেকটাই সম্ভব ও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ধরা যেতে পারে। তাই এক্ষেত্রে দুটি ঘটনাকেই সম্ভাব্য ধরে ইতিহাস রচনা করা উচিত। বিশেষ করে অনেক ইতিহাসবিদ শশাঙ্ককে পূতঃপবিত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙকে একহাত নিয়েছেন, সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। সেন শাসনামলে নিম্নবর্ণের হিন্দু-বৌদ্ধ-বহিরাগত মুসলিম দলন থেকে শৈব মতাদর্শী শশাঙ্কের বৌদ্ধদলনের সম্ভাবনা আরো স্পষ্ট হয়।

সর্বভারতীয় মৌর্য ও গুপ্ত শাসনের অধীনে থেকে এ দেশের মানুষের পক্ষে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তার বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন রাজ্য গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন গৌড়রাজ শশাঙ্ক। তিনি রাজবংশ গড়ে তুলতে না পারলেও এককভাবে স্বাধীন বাঙালি সত্তার জাগরণে প্রথম পদক্ষেপটি তাঁরই ছিল। হর্ষবর্ধন ও ভাস্কর বর্মণের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল গৌড়ের স্বাধীনতা। কিন্তু বাংলার ইতিহাসের আদিযুগে পরাধীনতার শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টাকারী হিসেবে শশাঙ্ক সত্যিই কৃতিত্বের দাবিদার।

রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে মহাসামন্ত শশাঙ্ক ইতিহাসে ছিলেন প্রায় অপরিচিত। শক্তিমত্তা, সাহস, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক মেধার ওপর ভর করে তিনি গুপ্ত রাজাদের দুর্বল সময়ে প্রবল আঘাত হেনে গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন। তিনিই প্রথমবারের মতো বাংলায় স্বাধীন রাজত্বের পত্তন করেন। পাশাপাশি সর্বভারতীয় রাজবংশ যেভাবে বাংলার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে বাঙালির স্বাধীনতার চেতনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল, তার ইতি টানতেও সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। হিউয়েন সাঙের বিবরণী অনুযায়ী তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর এ তিন দশকের রাজত্বকাল বাংলার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তিনি একদিকে যেমন রাজ্য বিস্তার করেছিলেন, অন্যদিকে শক্তিশালী ভারতীয় রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করে বাংলার স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ন রাখেন। প্রাপ্ত তথ্যসূত্র ও বিজয়গাথার ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, শশাঙ্কই বাংলার প্রথম সফল ও শক্তিশালী শাসক।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!