নকনি দালগিপ্পা

বাঁধন ছুটে গেছে তোমার আমার যবে
আমি হলাম এখন এক পথহারা পথিক
—পাহাড়ি লোকগীতি<

ছোট্ট একটি বীজ গর্ভে নিয়ে প্রকাণ্ড বৃক্ষ সৃষ্টি করে বলেই এ মাটিকে আমরা মা বলে ডাকি, মাতৃভূমি বলে ডাকি। কারণ মাটির গর্ভেই সঞ্চারিত হয় অসংখ্য জীবনের স্পন্দন। যাহোক, নর-নারী কিংবা বাবা-মায়ের যৌথ ভূমিকাই সমাজকে অনেকটা পথ সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু সময় আর বাস্তবতার কারণে নারী-পুরুষের এই পথচলায় এসেছে ভিন্নতা, বিচিত্রতা। নারী ও পুরুষ যৌথভাবে পরিবারে জীবনযাপন করলেও অর্থনৈতিক তথা ক্ষমতার প্রশ্নে ধীরে ধীরে সবকিছুই যেন পুরুষের কব্জায় চলে আসে। সে হয়ে ওঠে কর্তা। যে কারণে জন্ম, বিয়ে, মৃত্যুসহ সব রীতি-নীতিতেই পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ লক্ষণীয়। এ কারণেই বিয়ের পর নববধূ ঘোমটা মাথায় শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওঠে। সেখানেই তাকে বাকি জীবনটুকু কাটাতে দেখা যায়। তবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পুরোটা জায়গায় এমন অবস্থা বর্তমান থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণে মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের দেখা মেলে। সেখানে তাদের যাবতীয় রীতি-নীতি কিন্তু আবার ঠিক উল্টো। ধরুন, সঞ্জীব মানকিনের সঙ্গে নাদিয়া নকরেকের বিয়ে হলো। এখন সঞ্জীবকে গিয়ে উঠতে হবে তার শাশুড়ির বাড়িতে। সেখানেই নাদিয়ার সঙ্গে তাকে বসবাস করতে হবে। যাকে আমাদের মূলধারার সমাজ ঘরজামাই বলে আখ্যায়িত করে। শুধু বিয়ের ক্ষেত্রেই নয়, গারো সমাজে বিয়ের পর নবদম্পতির স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ কিংবা ত্রিপুরাদের কিছু গোত্রের বিয়ে-পরবর্তী সামাজিক কর্মকাণ্ডে রয়েছে বিস্তর মিল। এখানেও কন্যাসন্তান পিতার বংশপরিচয়ে পরিচিত না হয়ে লাভ করে মায়ের পরিচিতি। আর মায়ের সম্পত্তি ভোগদখলে পূর্ণ অধিকার থাকে তাদের। এ বিষয়গুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, মাতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলোর পরিকাঠামো কিংবা আচারানুষ্ঠানে বিস্তর কোনো ফারাক থাক আর না-ই থাক, ঐতিহ্যগতভাবে একটি ধারা বিকাশ লাভ করেছে।

বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সমান্তরালে চলতে গিয়ে বদলে গেছে তাদের অনেক রীতি-নীতি। তবুও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদী প্রকল্পে তাদের এহেন সামাজিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে নানা আঙ্গিক থেকে বিকাশ লাভ করার পর সামাজিক নেতৃত্বের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নারী। মূলত সমাজে বসবাসরত মানুষের জীবিকা ও কর্মপরিধি বিবেচনায় গড়ে ওঠে পরিবারের এই প্রকৃতি। বেশির ভাগ পরিবারের প্রধান পুরুষ হলেও অনেক আদিবাসী গোষ্ঠীতে মায়েরা সন্তান প্রতিপালন ও গৃহস্থালিই শুধু নয়, পারিবারিক নেতৃত্ব প্রদানেও সামনে এগিয়ে আসে। আর সামাজিক বৈচিত্র্য হিসেবে নৃ-বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানে গুরুত্ব পায় বিষয়টি। দ্বিতীয় ধাপে ফেমিনিস্ট তাত্ত্বিক কাঠামো বিকাশ লাভ করার পর্যায়ে অনেক বেশি আলোচিত হয় মাতৃতান্ত্রিকতা ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারী নেতৃত্বের বিষয়টি। সাধারণ অর্থে ধরতে গেলে, যে পরিবারের প্রধান একজন মহিলা কিংবা বয়োবৃদ্ধা, সে পরিবারই মাতৃতান্ত্রিক। এক্ষেত্রে বংশানুক্রম থেকে শুরু করে সামাজিক পরিচিতি সবকিছুই হয়ে থাকে মায়ের দিক থেকে অর্থাৎ সন্তান-সন্ততি পরিচিত হয়ে থাকে মায়ের পরিচয়ে। সামাজিক কাঠামো বিবেচনায় তাদের যে অবস্থান, সেখানেও নেতৃস্থানীয় পদগুলো ধরে রাখে নারীরাই।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু কিংবা মুসলিম সমাজে একটি পরিবারপ্রধান যেমন পুরুষ, তেমনি তাদের সন্তান-সন্ততি পরিচিত হয় তাদের পিতার বংশানুক্রমে, সম্পত্তির অধিকার থেকে শুরু করে বিয়ে-পরবর্তী জীবনেও পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব থাকে স্পষ্ট। অন্যদিকে একই বিষয় খেয়াল করে দেখা যাক মান্দি কিংবা খাসিয়াদের সমাজে। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে তাদের পরিবার থেকে পুরুষরা বিভিন্ন স্থানে চাকরিতে নিযুক্ত হচ্ছে কিংবা অর্থ উপার্জনের দায়িত্ব পালন করছে ঠিকই, কিন্তু নেতৃস্থানীয় পদগুলো ধরে রেখেছে মেয়েরাই। এখনো খাসিয়া কিংবা মান্দিদের বিয়ের অনুষ্ঠান, কারো জন্ম-মৃত্যু, সামাজিক উৎসব আয়োজন কিংবা সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে নারীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সামাজিকভাবে তাদের প্রতিটি উৎসব আয়োজনের নেতৃত্ব ন্যস্ত হয় নারীদের ওপরই। পরিবারের কর্তা হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রণী থাকে মেয়েদের সিদ্ধান্ত। একইভাবে সন্তানের নাম রাখা কিংবা বংশগত পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে ওঠে তার মাতৃপরিচয়ই। এক্ষেত্রে আমাদের সমাজে বিশ্বাস বংশের কোনো সন্তান যেমন পরিচিত হবে বিশ্বাস হিসেবে, খান পরিবারের সন্তান যেমন পরিচিতি পাবে খান হিসেবে, ঠিক তেমনি ঘটে খাসিয়া কিংবা মান্দি সমাজে। ধরা যাক, কোনো খাসিয়া পরিবারে একটি সন্তান জন্মলাভ করল, যার মায়ের বংশ রম্বাই কিংবা লানং। এক্ষেত্রে ওই শিশুর নামের সঙ্গে শুধু মায়ের পদবি যুক্ত হবে এমনটি নয়, তার নাম রাখার ক্ষেত্রেও মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখার চেষ্টা চলবে।

আভিধানিকভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার তথা মাতৃতান্ত্রিকতাকে অনেক ক্ষেত্রে গাইনার্কি (Gynarcy), গাইনোক্র্যাসি (Gynaecocracy) কিংবা গাইনিকোক্র্যাসি (Gynicocracy) হিসেবেও অভিহিত করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে বসবাসকারী পুরুষ ও নারীদের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে নারী থাকার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এটা র্যাডিকেল নারীবাদী চিন্তার একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে নারীকেন্দ্রিকতা তথা গাইনোসেট্রিজমকে (Gynocentrism) পুরুষ প্রাধান্যের (Masculinity) বিপরীত অনুক্রম হিসেবে ধরা যেতেই পারে, যেখানে মূল বিতর্ক ক্ষমতা প্রশ্নে।

সামাজিক প্রশ্নে মাতৃতান্ত্রিকতার বিকাশ অনেক আগে থেকেই। দক্ষিণ এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে মাতৃতান্ত্রিকতার বিকাশ ঘটে অনেক আগে। বিশেষ করে শাক্ত সমাজে এখনো নারীমূর্তির নিয়মিত আরাধনা আর কৃষিভিত্তিক সমাজে যক্ষিণীর আরাধনা সমাজে নারী প্রাধান্যের প্রতিই ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের সামাজিক পরিকাঠামো হিসাব করতে গেলেও নারী প্রাধান্যের ধারণাটি বেশ প্রাচীন। নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থান থেকে আবিষ্কৃত বিশেষ যক্ষিণীর মূর্তি এর ইঙ্গিত দেয়। তবে ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট হিসাব করলে মনসা দেবী, চণ্ডী দেবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন লৌকিক আরাধনায়ও নারীর প্রভাব স্পষ্ট। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডল হিসাব করতে গেলে মিয়ানমার, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নানা দেশ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়ও মাতৃতান্ত্রিকতা ও মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের বিস্তৃতি স্মরণাতীত কাল থেকেই।

সামাজিকতা প্রশ্নে পরিবার বাদে জীবন কল্পনা করা যায় না। যার অর্থ একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে জন্ম, কর্মসম্পাদন ও মৃত্যু। জীবনের অন্যতম নির্ধারক উপাদান সম্পত্তিও পারিবারিকভাবে বণ্টিত ও ব্যবহূত হয়। যৌথ সম্পত্তি ও পারিবারিক বন্ধন পরিবারের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ রাখে— পারিবারিক গণ্ডির বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। পারিবারিক রীতি-নীতি ও চর্চার বাইরে যাওয়া ব্যক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে নেতৃত্বের প্রশ্নে নারী কিংবা পুরুষ— কে গুরুত্বপূর্ণ হবে তা সমাজের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যমান পারিবারিক ব্যবস্থা ও রীতি-নীতি নারী-পুরুষের মধ্যে প্রভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং পুরুষ কর্তৃক নারীর ওপর শাসন-শোষণের পথ প্রশস্ত ও বিধিবদ্ধ করে। এজন্য বলা হয়, একটি ধনী পরিবারে বসবাসরত মেয়েরাও অবস্থানগতভাবে অনেক দরিদ্র। বিয়ে নামক সামাজিক বৈধতা নিয়ে নারী-পুরুষ শুরু করে তাদের জীবনের যাত্রা। এক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক তথা আনুষ্ঠানিক নানা পরিসরে কে নেতৃত্ব দেবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে বেশকিছুটা সময় লেগে যায়।

পরিবার পিতৃতান্ত্রিক নাকি মাতৃতান্ত্রিক হবে, তার মাধ্যমেই একটি সমাজে নারী ও পুরুষের কর্মভূমিকা নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে সামাজিক পরিমণ্ডলে নেতৃত্বের ধারণার বিকাশ থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালন, বেড়ে ওঠা, শিশুর সামাজিকীকরণ, সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মতো বিষয়গুলো নির্ধারণ করে দেয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এটি। স্বাভাবিক বিচারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিবারে নারীর ভূমিকা দুটি। প্রথমত. সন্তান জন্মদান ও তার বেড়ে ওঠা। দ্বিতীয়ত. সামাজিক গতিশীলতা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে গৃহস্থালির প্রায় সব কাজ থেকে শুরু করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনা এবং জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় উৎসবে দায়িত্ব পালন করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। একটু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে প্রথম কাজটি স্বাভাবিক মনে হলেও দ্বিতীয়টি বেশ জটিল এবং পরিস্থিতিসাপেক্ষে পরিবর্তন ও রূপান্তরযোগ্য। আর পিতৃতান্ত্রিক কিংবা মাতৃতান্ত্রিক সমাজের কর্মপরিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

আমাদের সমাজে গৃহস্থালির সব কর্মকাণ্ড নারীই সম্পাদন করে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যা মাতৃতান্ত্রিক সমাজেও ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয় না। আর আমাদের সমাজে পারিবারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রগুলো যেমন— কৃষি, চাকরি, ব্যবসা, ফসল বিক্রি, ধার প্রভৃতি সরাসরি অর্থ উপার্জন সম্পর্কিত। আর পারিবারিক বিভিন্ন খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। জমিজমার ব্যবস্থাপনা, ঘর-দরজা নির্মাণ, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, সুবিধা ও সেবা বণ্টন, বিয়ে-শাদি, সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান ইত্যাদি ক্ষেত্রেও পরিবারপ্রধানের ভূমিকা থাকে। তবে এগুলোর মধ্যে আয় ও ব্যয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্ব পায়, যেখানে পুরুষ কিংবা নারী— কে নেতৃত্বে রয়েছে তা বিবেচ্য হয়ে ওঠে।

স্বাভাবিকভাবে দেখতে গেলে, পরিবার একটি অর্থ উপার্জনকারী ও বণ্টনকারী প্রতিষ্ঠান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেমন কৌশলগত খাতগুলোর সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই, তেমনি মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে পুরুষদের অবস্থান অনেকটা প্রান্তিক। তবে এও ঠিক যে, ধনী পরিবারগুলোর তুলনায় দরিদ্র পরিবারে মহিলা সদস্যের পারিবারিক সিদ্ধান্তে কার্যকর অংশগ্রহণের মাত্রা বেশি। কারণ সেখানে নারী-পুরুষকে সম্মিলিত কায়িক শ্রমে পারিবারিক আয় নির্বাহ করতে হয়। তাই পারিবারিক আয়-ব্যয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে উভয়ের কম-বেশি সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণ থাকাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ধনী পরিবারগুলোর পারিবারিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যমূলক অংশীদারিত্ব লক্ষ করা যায়। একইভাবে যৌথ পরিবারের চেয়ে অণু পরিবার ও একক পরিবারে পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণের মাত্রা অধিক বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হিসাব করতে গেলে একমাত্র খাসিয়া ও মান্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রচলন দেখা যায়। সামাজিকভাবে খাসিয়া কিংবা মান্দিরা একজন পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হলেও তারা পারিবারিকভাবে মায়ের ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় দেখা যায়, পুরো পরিবার তথা সমাজ মাতৃতান্ত্রিক অর্থাৎ একজন নারীর ওপর নির্ভরশীল। সিলেট জেলার পাহাড়ি অঞ্চলের সামনের দিকে খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে খাসিয়া আদিবাসীদের বসবাস। ‘খাসিয়া’— এর উত্পত্তি ‘খাসি’ থেকে। খাসি নামের অর্থ ‘মাতৃগর্ভজাত’, যেখানে ‘খা’ মানে জন্ম আর ‘সি’ মানে মা। খাসিয়াদের বিশ্বাস, আদিতে তারা একই মা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে নানা দল, উপদল দেখা দিলেও তারা অদ্যাবধি খাসি পরিচয়ে পরিচিত হয়ে আসছে। ফলে পুরো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়ে আসছে খাসিয়াদের। পুরো খাসিয়া সমাজ বেশ কয়েকটি গোত্রে বিভক্ত। গোত্রগুলো হচ্ছে— মাজাও, নং, পাংখন, দিয়েঙ্গ, যাপাং, খার, খং, খাইরিয়েম, লিংডো, রম্বাই, উয়ালাং প্রভৃতি। এ গোত্রগুলোর আবার অনেক উপগোত্রও আছে। উপগোত্রগুলো হলো— লুখী, মাওফ্লাং, উমনইদ, খংলা, লামিন, লাম্বা, খংস্টিয়া, মাউপট, মাওলাং, মার্বানিয়াং, নংপিউর, ফুনং, সুয়েট, থাম, থার্সিং, খলাউ, উম, মুখিম, মার্লিয়া, পাপাং, তালাং, মার্মেন প্রভৃতি। এ উপগোত্রগুলোর নামকরণ করা হয়েছে কিছু প্রাণীর নামে। যে প্রাণীর নামে গোত্রের নাম, তার জন্য আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে।

খাসিয়া সমাজে একগামিতা প্রচলিত রীতি এবং বিয়ে-পরবর্তীকালে স্বামী স্ত্রীর গৃহে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। পরিবার-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে স্ত্রী এবং তার ভাই কিংবা মামারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা নিরসনেও স্ত্রীর দাদা-মামারাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারণা পাল্টেছে। অনেক পরিবারে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরুষদের এগিয়ে আসা তাদের ধ্রুপদী রীতি পাল্টে দিয়েছে অনেকাংশে। অবশ্য সামাজিক ন্যায়বিচার রক্ষার স্বার্থে প্রতিটি পুঞ্জি অথবা গ্রামে তাদের সামাজিক কাউন্সিল বা দরবার রয়েছে। এখানকার প্রধান মন্ত্রী নামে পরিচিত। তারা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রধানের দায়িত্ব পালন করে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবার হিসেবে এক্ষেত্রে নারীদের কারো প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। জৈন্তাপুরের খাসিয়া পল্লীতে প্রবন্ধের প্রথমোক্ত লেখক যখন একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে সরজমিন ভ্রমণে গিয়েছিলেন, প্রধান হিসেবে আবিষ্কার করেছেন একজন পুরুষকেই। আর সাক্ষাত্কার পর্বে তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তার হিসাবে পরিবার এখনো মাতৃতান্ত্রিক ঠিকই, তবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার বিষয়টিও তাদের মাথায় রাখতে হয়েছে।

সম্পত্তির বিলিবণ্টনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ সমাজ ব্যবস্থায় সবাই যেমন মায়ের পদবি ধারণ করে এবং মায়ের পরিচয়ে বড় হয়, তেমনি পারিবারিক সম্পত্তি ভোগদখলের একমাত্র উত্তরাধিকার হয় মেয়েরাই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছেলেরা কোনো সম্পত্তি পায় না বললেই চলে। তবে পরিবারে পিতা এবং ছেলেরা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করে, যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। পরিবারের কর্ত্রী অর্থাৎ মায়ের কথার বাইরে গিয়ে কখনই কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর হয় না। এক্ষেত্রে মামা-দাদারা পরিবারে প্রধান উপদেষ্টা এবং নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করে। কোনো ধরনের বিপদ বা সংকটে মায়েরা তাদের মামা-দাদার শরণাপন্ন হয়। এটা তাদের সমাজের একটি রীতি।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!