বাংলার অভাব ও দারিদ্র্যের প্রত্নতত্ত্ব

অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞা কিংবা কাব্যকথা সবখানেই দেখা যায় অভাব সীমাহীন। আটপৌরে দিনানুদৈনিকতা থেকে ভালোবাসা কিংবা স্বপ্ন সবখানে দৃষ্টি দিলে মনে হয় জগৎজুড়ে এ এক বিস্তীর্ণ অভাবের সংসার। অতীতকালে মানুষের অভাব কেমন ছিল, তাদের রেখে যাওয়া বস্তুগত সংস্কৃতি থেকে তার একাংশ বোঝা যায় বেশ। আরেকটু জোর দিয়ে বলতে গেলে, অভাব ছিল বলেই মানুষ বিকাশ ঘটিয়েছে তার সংস্কৃতির। এ অভাব দূরীকরণে মানুষের যে প্রচেষ্টা, তাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড জে. টয়েনবি আশ্রয় নিয়েছেন ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স থিওরির’। তাই ‘অভাব ও দারিদ্র্য’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রত্নতত্ত্বের বিষয়টি চলে আসে।
ভালোবাসার দাবি নিয়ে যারপরনাই হতাশ কবি সুনীল হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। চরম খেদোক্তির সঙ্গে তার দুঃখভারাক্রান্ত মন ভাষা খুঁজে নিয়েছে অনেকটা এভাবে-
‘ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টি নীল পদ্ম
তবুও কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধু মাংসের গন্ধ
এখনও সে যে কোন নারী,
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না।’
১০৮টি নীল পদ্ম শুধুই কি সরোবরে ফোটা রক্তকমলের আরেক নাম? আমি হিন্দুশাস্ত্রীয় বিষয়গুলো সেভাবে পড়ে দেখার সুযোগ পাইনি। তবে প্রত্নতত্ত্বের প্রয়োজনে পড়তে গিয়ে একপর্যায়ে জেনেছিলাম প্রিয় কবির কবিতায় বর্ণিত ১০৮টি নীল পদ্মের রহস্য। মর্ত্যলোকে সুনীলের কবিতায় ভালোবাসার জন্য যে অভাব আর হাহাকার, তার শেকড়টা গ্রোথিত হয়েছিল আরও গভীরে। পৌরাণিক কাহিনী থেকে যতদূর জেনেছি, ‘শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য মহাশক্তি সাধনার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। এর বাইরে তিনি চেয়েছিলেন মহামায়া দেবীকেও খুশি রাখতে। রামচন্দ্র অকালে আহ্বান করে বসেন দেবীকে, তার সে অকালবোধনের স্মৃতি রক্ষার্থেই এখন শারদীয় দুর্গোৎসব হয় বেশ ধুমধামের সঙ্গে। তবে এর ইতিহাসটা বেশ করুণ ও ত্যাগের। অকালের দেবী পূজায় ১০৮টি প্রদীপ জ্বেলে দূর করা হয় অন্ধকার, অন্যদিকে দেবীর চরণেও নিবেদন করা হয় ১০৮টি পদ্ম। বড্ড আকালের দিনে বিখ্যাত মানস সরোবর থেকে ওই নীল পদ্ম তুলে এনেছিলেন মহাবীর হনুমান।
বিধির খেয়ালে অর্থনীতি থেকে পুরাণ সবখানে অভাবকে দেখা গেছে সীমাহীন। শ্রীরামচন্দ্র সেই ১০৮টি নীল পদ্ম দেবীর চরণে নিবেদন করতে গিয়ে যথারীতি অভাবের মুখে পড়ে যান আরেক দফা। ১০৭টি নীল পদ্মের দেখা মিললেও কম পড়ে একটি। সাহসীরা পুরাণ থেকে বর্তমান সবখানে লড়াই করেছেন সভ্যতার আবেদনে। এক্ষেত্রে রামচন্দ্র কিছুতেই মানতে পারেননি শুধু একটি পদ্মের জন্য পুরো পূজার আয়োজন ভেস্তে যাবে। তিনি পূজা বাতিলের শঙ্কা দেখে পদ্মের বদলে তার নীলাভ নয়ন দেবীর চরণে নিবেদনের ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে সেটা আর করতে হয়নি, ধনুর্বাণ হাতে নিতেই দেবী স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি রামচন্দ্রকে বলেছিলেন তার সন্তুষ্টির কথা। এদিকে যে পদ্মটি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা ফিরিয়ে দিলে মহাসমারোহে পূজিত হন দেবীদুর্গা। তবে যাই হোক, অন্তত পূজার স্বার্থ ও সাধনায় অভাবকে জয় করার চেষ্টাই মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রত্নতত্ত্বের তাত্তি্বক পরিসর থেকে ব্যাখ্যা দিতে গেলে সহজেই দৃষ্টিগোচর হয় প্রত্নতাত্তি্বকরা গবেষণার ক্ষেত্রে অভাবকে কীভাবে দেখেছেন। বিখ্যাত প্রত্নতাত্তি্বক লুই বিনফোর্ড প্রসঙ্গে জনপ্রিয় ধারণা হিসেবে বলা হয়ে থাকে, [He placed a strong emphasis on generalities and the way in which human beings interact with their ecological niche, defining culture as the extrasomatic means of adaptation.] এখান থেকে বাংলা করলে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি দাঁড়ায় সংস্কৃতি অভিযোজনের দেহাতিরিক্ত মাধ্যম। এখন দেহাতিরিক্ত বলতে বোঝায় বিরুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে অস্তিত্বের লড়াইয়ে দেহের বাইরে মানুষ যা অর্জন করে তাই তার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে অতীত কালের মানুষের নির্মিত, ব্যবহৃত কিংবা কর্মকা ে প্রভাবিত বস্তুগত উপকরণে। আর তাই প্রত্নতত্ত্ব চর্চার নামান্তরে বস্তু নিদর্শনের আলোকে অতীত সংস্কৃতির অধ্যয়ন করতে গিয়ে অভাব ও দারিদ্র্যের নানা বিষয় এসে ধরা দিচ্ছে দৃশ্যপটে।
সংস্কৃতি যদি অভিযোজনের দেহাতিরিক্ত মাধ্যমই হয়, তবে তা একদিক থেকে দৈহিক অভাব পূরণের নিমিত্তে বিশেষ সাড়াদানও। যেমন ধরা যাক, কোনো পশু-প্রাণী সহজেই জলাশয়ে মুখ দিয়ে যেমন পানি পান করতে পারে, তেমনি সরাসরি মাটি থেকেই খাবার খাচ্ছে। কিন্তু মানুষ এই কাজ পারে না বিধায় এটাও একটা অভাব। তাদের অভাব দূর করার জন্যই একটা পর্যায়ে তৈরি করতে হয়েছে মৃৎপাত্র। বেশিরভাগ প্রত্নস্থান খনন করার পর এ মৃৎপাত্রের দেখা মেলে দেদার। একইভাবে পশুপাখি যে কোনো স্থানে যেমন রাত যাপন করতে পারে, তেমনি তীব্র শীত ও গরমে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতেও সক্ষম। আর মানুষ এটা পারে না বলেই তার অভাব দূর করতে আশ্রয় নেয় নানা শীতবস্ত্রের। গ্রীষ্মকালে গরম থেকে রক্ষা পেতে সিলিং ফ্যান যেমন চলে, তেমনি চোখে পড়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পেল্লাই সাইজের সব যন্ত্র।
সিন্ধু তথা হরপ্পা সভ্যতার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। বৈদিক সাহিত্য ইন্দ্রকে নাম দিচ্ছে ‘পুরন্দর/পুরিন্দর’, যিনি কি-না পুরের ধ্বংসকর্তা। এখানেও বেশ জনপ্রিয় প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা চলছে এই বলে যে, স্থানীয়রা তখন অবধি লোহার ব্যবহার শিখে উঠতে পারেনি। ফলে তাদের লোহার হাতিয়ার না থাকার সুযোগ নিয়েছে আর্যরা। সিন্ধু অধিবাসীদের ব্রোঞ্জে তৈরি তলোয়ার অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাই লড়াইয়ের ময়দানে ঋগবেদে বর্ণিত আর্যদের লোহার তরবারির ওপর লড়াই করে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। সিন্ধু থেকে শুরু তারপর ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় অনেক অনেক সময় পেরিয়েছে। খোদ মোগল যুগে এসেও দেখা গেছে দুস্তর অভাব। বিখ্যাত ফতেপুর সিক্রি পরিত্যক্ত হয়েছিল শুধু পানির অভাবেই। এদিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের রোমাঞ্চক নিদর্শন তাজমহল তৈরি করতে গিয়েও বিশ্রী রকম অভাবে পড়েছিল মোগলরা। জনশ্রুতি আছে, দক্ষিণ ভারতের কয়েক স্থান থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের ফলে সেখানে দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত দেখা দিয়েছিল। এদিকে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে গুপ্তযুগের পর যে রদবদল সেখানেও বর্বর হুন আক্রমণের পেছনে অভাবকেই চিহ্নিত করা যায় স্পষ্টভাবে।
মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত ব্রাহ্মীলিপির ভাষ্য বিশ্লেষণ করে সেখান থেকেই বাংলাদেশে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা বলে মনে করা হয়। কিন্তু অবাক বিষয়, এই শিলালিপি থেকে জানা যাচ্ছে স্মরণাতীত কালের এক দুর্ভিক্ষের বর্ণনা। আমরা জানি যে, অশোকের সময়ের প্রতিনিধিত্বশীল কোনো লিপি বাংলায় পাওয়া যায়নি, যা থেকে বাংলায় মৌর্য শাসনের ইতিহাস রচনা করা সম্ভব। লিখনশৈলী ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্তি্বক গবেষকরা বাংলাদেশের মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলাফলক লিপিটিকে অশোকের আমলের বা অন্তত মৌর্য আমলের বলে দাবি করেন। বিশেষ করে মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপিটি একটি রাজ আদেশ, যা পু ্রনগরের ‘মহামাত্র’ পদবিধারী শাসকের উদ্দেশ্যে জারি করা হয়। এখানে পু ্রনগরের মহামাত্রকে দুর্ভিক্ষ-পীড়িত ‘সম্বঙ্গীয়’ জনগোষ্ঠীকে শস্যাগার থেকে ধান ও কোষাগার থেকে গ ক মুদ্রা দিয়ে সাহায্য করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। বিশেষ করে এই ধরনের জনহিতকর নির্দেশ একমাত্র সম্রাট অশোক জারি করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে লিপিটি ব্রাহ্মী হওয়াতে সম্রাট অশোকের লিপি হওয়ার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে।
১৯৩১ সালের ৩০ নভেম্বর বারু ফকির নামে এক কৃষক জমি চাষ করার সময় এই শিলালিপিটি আবিষ্কার করার পর থেকে বাংলার ইতিহাসে এই সময় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে শুরু হয়। অনেকটা ভগ্নাবস্থায় প্রাপ্ত এই লিপিটির পাঠোদ্ধার করতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হলেও তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র লাভ করা গেছে। ৭ লাইনে উৎকীর্ণ এই লিপিটির সঙ্গে অশোকের চতুর্দশ কালসী লিপির অনেক মিল শনাক্ত করা গেছে। অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই লিপিটির পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে কিছুটা অনুমানের আশ্রয় নিতে হয়েছে। তারপরও এর পাঠোদ্ধার করে এর মূল বাণী শনাক্ত করা হয়েছে এভাবে, ‘পু ্রনগরে অবস্থানরত মহামাত্র দুর্দিনকে সমবঙ্গীয় জাতির দুর্ভিক্ষের যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য রাজকোষ থেকে গ ক মুদ্রা ও ধান দিয়ে সহায়তা করতে বলা হয়েছে। সঙ্গে এই বলা হয়েছে যে, প্রজাদের সুদিন ফিরে এলে এই মুদ্রা ও ধান আবার রাজকোষে ফিরে আসবে। আসলে আবহমান বাংলায় মানুষের যে অভাবের সংসার তা প্রত্নতাত্তি্বক সূত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে বেশ স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে।
একইভাবে গুপ্ত কিংবা পালদের পাশাপাশি চন্দ্র, বর্মণ ও স্থানীয় অনেক শাসকের লিপি এবং তাম্রশাসন পাওয়া যায় বাংলার নানা স্থান থেকে। পাথরে উৎকীর্ণ লিপির পাশাপাশি তামার ফলকে খোদাই করা যে লিপি পাওয়া গেছে সেগুলোকে বলা হয় তাম্রশাসন। এগুলো বাস্তবে বিশেষ ধরনের ভূমি দানপত্র। বাংলার মানুষের অভাবের নানা চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে এসব তাম্রশাসন কিংবা শিলালিপিতেও। বাংলার মানুষ মনসার মতো অনেক লৌকিক দেবদেবীর পূজা করত, যেখানে শুধু অভাব থেকে মুক্তি প্রাপ্তিই ছিল এক এবং একমাত্র লক্ষ্য। এদিকে অভাব দূর করে অর্থসম্পদের অধিকারী হওয়ার জন্য যক্ষ কুবেরের পূজাও প্রচলিত ছিল অনেক অঞ্চলে। মা লক্ষ্মীর ভাঁড়, লক্ষ্মীসরা প্রভৃতি এক অর্থে অভাবে জীর্ণ মানুষগুলোর নিত্যদিনের নানা চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন। সব মিলিয়ে আবহমান বাংলার মানুষের অভাবের সংসারে যে দারিদ্র্যের ছাপ থেকে মুক্ত নয় প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শনগুলোও। কারণ অতীতকালে মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকা গুলোর বিমূর্ত রূপ প্রত্নবস্তু; যেগুলো মূর্ত হয় উপযুক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণানুসঙ্গে। আর এভাবে বর্ণিত প্রত্ন-আখ্যানের হাত ধরেই আমরা খুঁজে ফিরি রোমাঞ্চক অতীতের স্বাপ্নিক কথকতা

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!