উৎসব ভাতা, পণ্য কেনা ও বাড়ি ফেরা

কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়— ‘মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানোর চেয়ে ফকির হয়ে জন্মানো ভালো। ফকিরদের অভিনয় করতে হয় না। কিন্তু মধ্যবিত্তদের প্রতিনিয়ত সুখী থাকার অভিনয় করে যেতে হয়।’ উক্তিটি হুমায়ুন আহমেদ করেন আর নাই করেন, মধ্যবিত্তের যাপিত জীবনে এহেন যন্ত্রণার শেষ নেই। তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু, এমনকি মৃত্যুর পর যে চেহলাম করা হয়, সেখানেও অভিনয়ের ছড়াছড়ি। ব্রিটিশ উপনিবেশ শেষ হওয়ার পর ভারতবর্ষে জনগণের একাংশ শিক্ষিত হলেও অসচ্ছল থেকে যায়। তারা অর্থসম্পদের বাস্তবতায় নিম্নবিত্ত থেকে গেলেও নিজেদের এ অবস্থা স্বীকার করে না। উপরন্তু নানা ধরনের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের উচ্চবিত্তের সঙ্গে ব্যর্থ প্রতিযোগিতায় নামায়। ইউরোপের রেনেসাঁ, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লবের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদরা তত্ত্বকথার মারপ্যাঁচে নানা আঙ্গিকে মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা দিতে চাইবেন। আমি তার তত্ত্বকথার মধ্যে না গিয়ে সহজ বাংলায় বলতে চাইছি—‘যাঁরা আয় ও কর্মের দিক থেকে নিম্নবিত্ত হয়েও উচ্চবিত্তের ব্যর্থ অভিনয় করে যাচ্ছেন, তারাই এ দেশের মধ্যবিত্ত।’

পরিসংখ্যান আর সংবাদের দিক থেকে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বলা হচ্ছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন করি, মধ্যম আয়ের দেশ— আমাদের এখানে মধ্যবিত্ত কোথায়? বিধি বাম, সহজ এ প্রশ্নের সদুত্তর মেলা ভার। জনৈক মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘মধ্যবিত্তের বেতন অনেকটা ছোটগল্পের মতো, এখানে পকেটের সব টাকা শেষ হয়ে গেলেও ধার-দেনা শেষ হতে চায় না।’ এটা নেহায়ত দিনানুদৈনিকতার চিত্র। তবে মধ্যবিত্তের জীবনে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে উপস্থিত হয় এক একটি উৎসব। ফিতর ও আযহা মিলিয়ে মুসলমানদের দুই ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা। সম্প্রতি উঠতি উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখ স্ব-স্ব প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে গেলে অভিন্ন। বাংলাদেশের একান্নবর্তী পরিবারগুলোর কথা বাদ দিলেও সদ্য বিকশিত ছোট পরিবারেও এ চিন্তাধারার অন্যথা হয় না। এখানে উৎসব সামনে রেখে পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে উচ্ছলতা কাজ করলেও উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্য এ এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

প্রতিষ্ঠান থেকে মাসের শেষে, ক্ষেত্রবিশেষে নতুন মাসের অর্ধেক পার করে পাওয়া বেতন-ভাতার সঙ্গে উৎসব সামনে রেখে দেখা মেলে বোনাসের। পোশাক শ্রমিকদের তাও একটা সুবিধা আছে, প্রতিবার ঈদ সামনে এলে পাওনা বেতন-ভাতার দাবিতে তারা আন্দোলন শুরু করে। তবে মধ্যবিত্তের যন্ত্রণা এখানে অনেক। আগে থেকেই পরিবারে বোনাসের খবর চাউর হওয়ায় ধরনা দিতে হয় বিভিন্ন বিপণি বিতান থেকে শপিং মলগুলোতে। ফলে অন্য মাসের চেয়েও বিশ্রী পরিস্থিতির শিকার হতে হয় প্রতিটি পরিবারকে। অন্তত শপিং মল থেকে বের হওয়ার পর একবার দু’হাতে ঝুলতে থাকা শপিং ব্যাগের দিকে চোখ যায়, পরক্ষণেই মনে পড়ে ওয়ালেটের দুর্বল স্বাস্থ্যের কথা।

শুধু কি তাই! ঈদ শপিং শেষ হতেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় কথিত ‘গাঁয়ে ফিরতে গাড়ির টিকিট কাটার হ্যাপা।’ পুবাকাশে সূয্যিমামার প্রথম উঁকি কিংবা ব্যস্ত নগরীর প্রথম কাকটা ডেকে ওঠার আগেই টিকিটপ্রার্থীদের অবস্থান নিতে হয় গন্তব্য অনুযায়ী কল্যাণপুর, বালির মাঠ, মহাখালী, কালিপুর কিংবা ফকিরেরপুল এলাকায় গিয়ে। এদিকে রমজান আসতেই নগরীর যানজটে যে বিশ্রী দশা দেখা যায়, তা অসহনীয়তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপস্থিত হয় ঠিক ঈদের কয়েকদিন আগেই। তখন একই সঙ্গে কিছু মানুষের রাজধানী ছাড়ার প্রস্তুতি, অন্যদিকে আরেক শ্রেণীর মানুষ সপরিবারে নেমে আসে রাস্তায়।

খেয়াল করলে দেখা যায় বেগুন, ছোলা, খেজুর, ময়দা চিনির দাম বাড়িয়ে যখন প্রথম রমজান সমাগত, শুরুতেই বাজিমাত করেন ব্যবসায়ী শ্রেণী আর ভিক্টিম কথিত মধ্যবিত্তরাই। মোটা অঙ্কের বেতন আর উচ্চহারে ঈদ বোনাস প্রাপ্তির পর দামি গাড়ি নিয়ে উচ্চশ্রেণী যখন শপিংয়ের জন্য রাজপথে নামে, তখন যানজটে পিষ্ট হয় মধ্যবিত্ত। উচ্চশ্রেণীর বিলাসিতার নামান্তরে বাজারে সৃষ্ট আপেক্ষিক মূল্যস্ফীতির যে অপরিণামদর্শিতা, তার দুর্ভোগও পোহাতে হয় এদেরকেই। গ্রামের বাড়ি ফিরতে বাসের টিকিটের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, বর্ধিত রিকশা ভাড়া, সেলুনের অতিরিক্ত বখশিশ, পিওন-আর্দালি-দারোয়ানের টিপস এর সবই দিতে হয় কথিত মধ্যবিত্তকেই।

১৭ জুন শুক্রবার। মিরপুর থেকে গন্তব্য কারওয়ান বাজার। পথিমধ্যে যে যানজট দেখা গেছে, নিশ্চিত এ যানজট দেখলে জহির রায়হান তার উপন্যাসের নাম ‘আরেক ফাল্গুন’ না দিয়ে ‘আরেক শুক্রবার’ রাখতেন! বলতে গেলে সবার গন্তব্য ঈদ সামনে রেখে কেনাকাটা সেরে ফেলা। অনেকটা রাজার পুকুরে দুধের বদলে পানি ঢালার গল্পটার মতো অবস্থা। এক্ষেত্রে হয়তো সবাই মনে করেছেন, রোজার শেষ দিকে ঈদের বাজার করতে গেলে প্রচুর ভিড়ভাট্টা আর ক্রেতার চাপ থাকবে। তখন পছন্দ করে পণ্য কেনা অনেক দিক থেকেই কঠিন হয়ে যাবে। এটা একে একে সবাই যখন ভেবেছেন, হয়তো তখনই ঘটে গেছে লঙ্কাকাণ্ড। সবাই একযোগে নেমেছেন রাস্তায়, গিয়ে হাজির হয়েছেন প্রত্যেকটি শপিংমল কিংবা বিপণি বিতানে। ফলে যে ভিড় হওয়ার কথা ঈদের ঠিক কয়েকদিন আগে, সেই ভিড় এখনই জমে গেছে রাস্তা থেকে রাস্তায়, বিপণি বিতানের গণ্ডি পেরিয়ে গলি-ঘিঞ্জির ছোটখাটো দোকানগুলো পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত যে আশঙ্কা সামনে রেখে সবার এই পথে নামা, তা হয়েছে হিতে বিপরীত। যেটুকু সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তারা দ্রুত বাজার করে রাখতে চেয়েছেন অন্তত এ যানজট ঠেলে, সব যন্ত্রণা ভুলে কেনাকাটা শেষ করার পর তার সিকিটাকও অবশিষ্ট থাকবে না।

নানা আয়োজন, অনেকের কাছ থেকে বিবিধ পরামর্শ এগুলো আসতেই পারে। তবে রোজার শেষাংশে ভিড় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান তাদের বকেয়া বেতন দিতে চেষ্টা করে ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে কিংবা লোক দেখানোর খাতিরে নামমাত্র বোনাস দেয়, তাদেরও সময়কালটা ঠিক ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে। তাই ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই, মানুষ বাধ্য হয় তাদের ঈদ শপিংটা রোজার শেষ ভাগে এসে করতে।

প্রয়োজন কোনো নিয়মনীতি মানে না। এক্ষেত্রে ঈদ বাজারের ভিড় আর শত যন্ত্রণা সহ্য করে গ্রামে ফেরার চেষ্টাটা হয়ে গেছে অনেকটা তাই। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ বছরে এই একটি সময় বাদে তেমন কোনো ছুটি পান না। অন্তত দুই ঈদের তিনদিন করে ছুটির সঙ্গে কথিত উৎসব ভাতা যুক্ত হওয়ায় নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার চেষ্টা এ সময় এক ধরনের অনিবার্যতায় পরিণত হয়। বাড়ি ফিরতে গেলে সবাইকে টিকিট করতেই হবে বাস-ট্রেন-লঞ্চের। সুযোগ বুঝে ভাড়া বৃদ্ধি করে আখের গুছিয়ে নিতে চায় অসাধু যানবাহন মালিকরা। এদিকে উৎসবে যোগ দিতে হলে চাই সুন্দর নতুন পোশাক, তাই দাম যতই হোক মানুষ জামা-কাপড়-শাড়ি-থ্রিপিস কিনবেই। এ সুযোগে দাম বাড়িয়ে কয়েক গুণ মুনাফা করে নেয় সুবিধাভোগী পোশাক ব্যবসায়ীরা। একটু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে শুরু হওয়া যে সংকট, তা অনেকটাই পরস্পর সম্পর্কিত। এখানে একটা সমস্যার সঙ্গে আরেকটা সমস্যা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে রমজানের শুরু থেকে রাজধানীর সব স্কুল-কলেজ ছুটি দিয়ে যেমন রাজপথের ওপর যানবাহনের চাপ কমানো যেতে পারে; তেমনি রাজধানীতে শিক্ষার জন্য জড়ো হওয়া মানুষ ছুটি পেয়ে গ্রামে ফিরে গেলে জনস্রোতও কিছুটা হালকা হতে পারে। তেমনি রাষ্ট্রীয় নির্দেশে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত আগে বেতন-ভাতা কিংবা ঈদ বোনাস প্রদান সম্ভব হলে রমজানের শেষভাগে এসে রাস্তা এবং বিপণিবিতানের ভিড়ও কিছুটা কমিয়ে আনা যেতে পারে। তবে এগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে কল্পনাপ্রসূত কাকতাল মাত্র, বাস্তবতা নয়।

(Visited 37 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *