আটপৌরে শশব্যস্ততায় শয়তানের চাকা

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, শাঁ করে গাঘেঁষে বিদ্যুত্গতিতে বেরিয়ে গেল একটি রিকশা, চলে বিদ্যুতেই। প্রতিদিন এমনই ঘটনা অহরহ ঘটছেই। রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে এখন এক যন্ত্রণা ও আতঙ্কের নাম এ ব্যাটারিচালিত রিকশা। পূর্বতন কাঠামোয় কেবল বৈদ্যুতিক মোটর ও ব্যাটারি সংযুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ গতি তোলার চেষ্টা থাকায় যানটির ভারসাম্য ঠিক রাখতে চালকদের বেগ পেতে হয়। বিশেষ করে ব্রেক, বডি থেকে শুরু করে গতির সঙ্গে সমন্বয় ঘটানো হয়ে পড়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একজন যাত্রী সেদিন কৌতুকের ছলে বলেই বসলেন, একটা চার বছরের বাচ্চাকে ৪০ বছরের মানুষের পাঞ্জাবি পরালে সে যেভাবে হাঁটবে, এ রিকশা হয়েছে তাই। কার্যত গতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়হীনতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনাই প্রতি ক্ষেত্রে চোখে পড়ে। মাঝে আইন করে মিরপুরের রাস্তায় এ ধরনের রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণের একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা ধোপে টেকেনি।
বিশেষ করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা রাস্তায় এ রিকশাগুলোর চলাচল নিশ্চিত করে। ফলে কোনো আইনকানুন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করেই এগুলো চলছে দেদার। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মনীতি না মেনেই বাস, কার ও মাইক্রোবাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করছে। বিশেষ করে লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তারা হরহামেশা দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা— অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ থেকে চার্জ দেয়া হয় এসব রিকশার ব্যাটারি। বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মীর সহায়তায় এ কাজ করে সংশ্লিষ্ট রিকশাচালকরা। দেশের বাইরে থেকে আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের পাশাপাশি দেশী নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করে এ ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো তৈরি করা হয়।
দেশজুড়ে চলাচল করলেও এগুলোর আইনগত বৈধতা নেই। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ব্যস্ততম মহাসড়কেও চলাচল করছে। ফলে তীব্র যানজটের পাশাপাশি গতিজনিত জটিলতায় জনগণের ভোগান্তি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বর্তমানে সারা দেশে কী পরিমাণ এ-জাতীয় রিকশা চলাচল করছে তার সঠিক পরিসংখ্যানও জানা নেই কারো।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয়সাধন করতে প্রয়োজনীয় যানবাহনের চাহিদা পূরণ এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে রাজধানী ও বড় শহরগুলোর বাইরে যানবাহনের তীব্র সংকটে এ রিকশাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর চলাচলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর না হওয়ায় এ ধরনের রিকশা পরিবেশবান্ধব। কালো ধোঁয়ার বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে একে উপযুক্ত নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব হলে মানুষ যেমন উপকৃত হবে, পরিবেশও বাঁচবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ রিকশাগুলো যেমন কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তেমনি এর মাধ্যমে মানুষ সহজে কম ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারছে। শারীরিকভাবে অক্ষম অনেক ব্যক্তি এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। তাই উপযুক্ত নীতিমালার আলোকে এ বাহনকে চলাচলের বৈধতা দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে । তবে নীতিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এবং বিদ্যুতের চুরি রোধে রাজধানীতে এর চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা বাঞ্ছনীয়।

(Visited 8 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *