নতুন করে লিখতে হচ্ছে বাংলার ইতিহাস

ভূমিরূপ ও বসতিবিন্যাস বিচার করে একটা পর্যায়ে মনে করা হয়েছিল, বাংলাদেশে মানববসতি খুব প্রাচীন নয়। বিশেষ করে গাঠনিকভাবে এখানকার ভূমিরূপ যেখানে অপেক্ষাকৃত নবীন নদীবাহিত পললে গঠিত, সেখানে পাথর যুগ কিংবা সমকালীন নিদর্শনপ্রাপ্তি অনেকটা অসম্ভবের মতো। কিন্তু হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও নরসিংদীতে আবিষ্কৃত প্রত্ননিদর্শন বলছে, বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার তৈরির উপযোগী পাথর নেই বলে থেমে থাকেনি মানুষ। তারা পাথরের মতো শক্ত জীবাশ্ম কাঠ ব্যবহার করে বিকাশ ঘটিয়েছে এ ভূখণ্ডের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতি।

কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি অঞ্চল ও হবিগঞ্জের চাকলাপুঞ্জী থেকে জীবাশ্ম কাঠের প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার আবিষ্কার কিংবা সিলেটের জৈন্তাপুর থেকে স্টোনহেইঞ্জের পাথরনির্মিত স্থাপনার আদলে মেগালিথিক নিদর্শনপ্রাপ্তি বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। একইভাবে আদি ঐতিহাসিক প্রত্ন-অঞ্চল হিসেবে উয়ারী, বটেশ্বর, টঙ্গীর টেক, ধুপির টেক, জানখার টেক, রাইঙ্গার টেক উন্মোচনও এ দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সম্প্রতি বিক্রমপুরে পরিচালিত প্রত্নখননে রঘুরামপুর থেকে খ্রিস্টীয় ৯-১০ শতকের বিক্রমপুরী বৌদ্ধবিহার আবিষ্কার কিংবা তারই কাছাকাছি নাটেশ্বরে ৭-১২ শতকের তিনটি পর্বে বিভিন্ন স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ, অলঙ্কৃত বৌদ্ধমন্দির, আটকোনা স্তূপ নানাদিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে এ দেশের ইতিহাসকে। এ বছরে দিনাজপুরের কাহারোল অঞ্চলে পরিচালিত উৎখননে নবরথ মন্দির আবিষ্কারের পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরে একই এলাকা থেকে বেলওয়ার পানুঢিবি, গোপালপুর, বোচাগঞ্জের ইটাকুড়া ঢিবির খনন এক কথায় বলতে গেলে বাংলার ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে।

উপযুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য গবেষণাকে। যেমন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ল্যাবরেটরি অব আর্কিওবোটানি অ্যান্ড প্যালিও ইকোলজিতে গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মিজানুর রহমান জামী আনুমানিক প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো ধান চিহ্নিত করতে পেরেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ফসল ও ফাইটোলিথ তথা ঘাসের জীবাশ্ম চিহ্নিতকরণের অপেক্ষায় আছে। এ আবিষ্কার ও চিহ্নিতকরণ সম্ভব হলে বাংলাদেশের অতীত প্রতিবেশ, প্রাচীনকালের কৃষিকাজ ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কয়েকটি স্থান থেকে জলমগ্ন নৌকা ও বন্দর আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রাচীনকালে এ দেশের মানুষের নদীনির্ভর যাতায়াত, পরিবহন ও নৌ-বাণিজ্যের পরিচয় বহন করে। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও উৎখননে অনেকগুলো বন্দর বাণিজ্যপথ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও সম্প্রতি উজ্জ্বল হয়েছে। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে ভবিষ্যত্ গবেষণার।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন ‘প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাস নির্মাণের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই যে প্রত্ননিদর্শন আমরা পাই, সেগুলো ইতিহাস নির্মাণের চাক্ষুষ তথ্য প্রদান করে। যে যুগের জন্য কোনো লিখিত তথ্য নেই, সে সময়ের ইতিহাস বিনির্মাণে এ ধরনের প্রত্ননিদর্শনের বিকল্প নেই, বরং তা সে যুগের প্রতীক। বিদ্যমান ইতিহাসকে তা আরো সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিয়েছে।’

একই ইঙ্গিত মিলেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজের ভাষ্যে। তিনি মনে করেন, প্রত্ন-ইতিহাস যে তথ্যের সংস্থান করছে, তাতে বাংলাদেশে প্রত্ন-ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে দীর্ঘদিন প্রকৃত অর্থে এ বিষয়ে গবেষণা, অনুসন্ধান ও উৎখনন না হওয়ায় অনেক কিছুই উন্মোচন হয়নি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রত্নগবেষণা ও চর্চার সুযোগ প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন উদ্যমে যে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তার সুফল আমরা পাচ্ছি। এখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারক মহল ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা।

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নগ্রামের পাশাপাশি বিক্রমপুরের বেশকিছু স্থানে প্রায় ১৬ বছর ধরে জরিপ, অনুসন্ধান, খনন ও গবেষণাকর্মের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। দীর্ঘদিনের গবেষণা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ঐতিহ্য অন্বেষণের পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘সাম্প্রতিক প্রত্নতত্ত্বচর্চার অংশ হিসেবে আমরা যে দুটো জায়গায় কাজ করছি, তা হচ্ছে উয়ারী-বটেশ্বর ও বিক্রমপুর, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য মাইলফলক। এর একটা হচ্ছে উয়ারী-বটেশ্বর, যেটা বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজ্য ও নগর। এ নগরের চরিত্র, সমৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিবেশ, প্রযুক্তি, শিল্প, দর্শনসহ নানা বিষয় এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব পাঠেও যুক্ত হয়েছে এ আবিষ্কারের নানা বিষয়। সেখানে ২০টি সাইট মিউজিয়াম নির্মাণের কথা রয়েছে, যার দুটি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। চন্দ্র, বর্মণ ও সেনদের রাজধানী বিক্রমপুরেও আমরা কাজ করছি দীর্ঘদিন ধরে। আদতে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা রঘুরামপুর ও নাটেশ্বরে মন্দির, স্তূপ ও বিবিধ স্থাপত্যিক নিদর্শন আবিষ্কার বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি সমুন্নত করছে এ জনপদের ঐতিহ্যিক অবস্থান।’

বাস্তবে বাংলায় প্রত্নতত্ত্বচর্চার ইতিহাসটা বেশ প্রাচীন। ১৮৬০ সালের দিকে বাঁকুড়ার বিহারীনাথ পার্বত্য অঞ্চল থেকে ভ্যালেন্টাইন বল যে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার আবিষ্কার করেন, তাকে এর ভিত্তি ধরা যেতে পারে। এভাবে বিভিন্ন গবেষকের নিরলস শ্রমে প্রায় দেড়শ বছর পার করেছে এ দেশের ঐতিহ্য গবেষণা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠা পায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান ও খননকাজ করে আসছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল আবিষ্কার যেমন সম্ভব হয়েছে, তেমনি উৎখননের ফলে বাংলাদেশের প্রত্ন-ঐতিহ্যের বেশকিছু নান্দনিক স্মারক উন্মোচন করা গেছে। কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহীর পঞ্চগড়ের ভিতরগড় এবং ঢাকার অদূরে গাজীপুর থেকে শুরু করে দেশজুড়ে আরো অনেকগুলো ঐতিহ্যস্থানে সম্প্রতি আমাদের গবেষণাকর্ম পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো আমাদের ইতিহাস বিনির্মাণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি। পাশাপাশি এগুলোর উপযুক্ত গবেষণা, প্রকাশনা ও উপস্থাপন সম্ভব হলে তা আমাদের ক্রমবিকাশমান পর্যটন শিল্পকেও সমৃদ্ধ করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিদ্যায়তনিক পরিসরে প্রত্নতত্ত্ব শিক্ষাদানের কাজটা প্রথম শুরু করে। বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায়ও বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন। এদিকে ঐতিহ্য অন্বেষণ, প্রতিবেশ প্রত্নতত্ত্ব দল, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনসহ অনেকের ব্যক্তিগত উদ্যোগ আরো সমৃদ্ধ করেছে বিগত এক দশকের প্রত্নতত্ত্ব গবেষণাকে। সম্প্রতি হায়ার এডুকেশন এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রামের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার জন্য অর্থায়ন করছে। এ ধরনের একটি প্রকল্পে দিনাজপুর অঞ্চলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশের অংশগ্রহণে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান ও খননকাজ পরিচালিত হচ্ছে ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৬ কর্মবর্ষে।

বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ কামরুল আহছান, অধ্যাপক স্বাধীন সেন ও সাবিকুন নাহারের তত্ত্বাবধানে দিনাজপুরের বেশ কয়েকটি প্রত্নস্থান শনাক্তকরণের পাশাপাশি পাঁচটির মতো প্রত্নস্থল খনন করা হয়। এতে সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে দিনাজপুরের কাহারোল থেকে আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে একটি নবরথ বিষ্ণু মন্দির ও দুষ্প্রাপ্য প্রস্তর ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্যসহ অন্যান্য নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে ১১-১২ খ্রিস্টাব্দে এখানে বৈষ্ণব মতাবলম্বীদের একটি কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। প্রাপ্ত পাথরের ভাস্কর্যটিকে বিষ্ণুর একমাত্র নারী অবতার তথা মোহিনী প্রতিমা হিসেবে শনাক্ত করেছেন ক্লদিন বুদজে-পিক্রো।

খনন কার্যক্রমের পরিচালক অধ্যাপক স্বাধীন সেন বলেন, আবিষ্কৃত মন্দিরটির গর্ভগৃহ বাইরের দিকে উলম্ব অভিক্ষেপকে প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের পরিভাষায় ‘রথ’ বলা হয়। নয়টি রথবিশিষ্ট বলে মন্দিরটিকে নবরথ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যায়। পাশাপাশি দিনাজপুর-জয়পুরহাট অঞ্চলে এ ধরনের মন্দির আরো ছিল বলে আমাদের অতীত জরিপ ইঙ্গিত করে। অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে ইটের তৈরি রেখা-দেউল ও পীড়া-দেউলসহ মন্দির এখনো পাওয়া যায়নি। আবিষ্কৃত এ মন্দিরের রেখা-দেউল কেমন ছিল, তা বোঝা যেতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে বহুলড়ায় অবস্থিত সিদ্ধেশ্বর মন্দিরটি দেখে।

খননকর্মের সঙ্গে যুক্ত বিভাগের আরেক শিক্ষক সাবিকুন নাহার মনে করেন, এ প্রত্নস্থলগুলোর খনন যা-ই হোক, প্রত্নতত্ত্ব-বিষয়ক নতুন জ্ঞান তৈরি করেছে। বিশেষ করে আদি মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্রিক ভূমিরূপ ব্যবস্থা, বসতিবিন্যাস, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও সংঘাত বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটি। পক্ষান্তরে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং পর্যটন বিকাশেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে নতুন এ আবিষ্কার ও উৎখনন।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!