সংস্কার ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

উয়ারী বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান মহাস্থানগড় থেকে শুরু করে চাকলাপুঞ্জি-ময়নামতির প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসকে হাজার বছরের সীমারেখা স্পর্শের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে বারবার একই প্রশ্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো— বাংলাদেশের নানা নিদর্শনের ঐতিহ্যিক মূল্য এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রচলিত রীতি। বিশ্ব ঐতিহ্যে তালিকাভুক্তির পর পাহাড়পুর বিহারের ঠিক মাঝ বরাবর স্থাপন করা হয় পানি বের করার পাইপ। এ পাইপ একাধারে নিদর্শনটির গাঠনিক ও ঐতিহ্যিক মূল্য হ্রাস করেছে এবং হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে পুরো স্থাপত্য কাঠামোটিকে। শেষ পর্যন্ত নানা প্রতিবাদ-প্রতিরোধে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। তারা পাইপ সরিয়ে নেয়। পাশাপাশি বিশ্ব ঐতিহ্যে তালিকাভুক্ত এ নিদর্শনের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে। বহুদেশীয় একটি কমিটি করে তার প্রস্তাবনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির পথ পায় পাহাড়পুরের নিদর্শনটি। একই পরিণতি ঘটতে দেখা যায় আরেক ঐতিহ্য নিদর্শন ষাট গম্বুজ মসজিদের ক্ষেত্রে। সামনের দিকে অবস্থিত পেডিমন্টটি গায়েব করে দেয়া হয় সংস্কারের নামে। সেখানকার পূর্বের আকৃতির সঙ্গে বর্তমানে সংস্কারকৃত অবস্থার তেমন মিল নেই।

সংস্কার ও ব্যবস্থাপনার নামে একটি ঐতিহ্য নিদর্শনের কতটা ক্ষতি করা যেতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ঢাকার অমূল্য নিদর্শন লালাবাগ কেল্লা। বিভিন্ন ইতিহাসবিদের তরফ থেকে জানানো হচ্ছে, ঐতিহ্যিক মূল্য তেমন না থাকায় দুর্গপ্রাচীর ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে গাড়ি পার্কিং। কিন্তু মূল অবকাঠামোর সঙ্গে অনেক দিন ধরে যুক্ত থেকে দেয়ালটি হয়ে গেছে স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সাধারণ দর্শকের চোখে এ দেয়াল ভাঙার ঘটনাটি নিদর্শনটির ঐতিহ্যহানি বলেই মনে হয়েছে। ঐতিহ্য অনুরাগী মানুষের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের রিটে বন্ধ হয় দেয়াল ভেঙে গ্যারেজ তৈরির উদ্যোগ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, ওই দেয়াল ভাঙার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অবৈধ পথে দু’পয়সা কামিয়ে নেয়ার অনৈতিক স্বার্থ যুক্ত রয়েছে।

সম্প্রতি বণিক বার্তার দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন কান্তনগর মন্দিরের সংস্কার বিষয়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেখানকার টেরাকোটা নিদর্শন থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে করা হয় উপযুক্ত সংস্কার। বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে এ মন্দির অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কয়েকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এ নবরত্ন মন্দির এমনিতেই তার পূর্বের অবস্থায় আছে কিনা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ রয়েছে। তার ওপর এহেন সংস্কার কোনো আশার কথা বলে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য যে বাজেট বরাদ্দ রাখে, তার যথাযথ খরচ নিশ্চিত করতে গিয়েও অনেক ফরমায়েশি সংস্কারকাজে হাত দিতে দেখা যায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে। যদি এ সংস্কারকর্ম তেমনই কোনো কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে হতাশার পুনরাবৃত্তি বৈকি। যত দূর জানা যায়, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে।

প্রাকৃতিক কারণে নোনা ধরা থেকে শুরু করে ইটের স্থাপত্যে আনুষঙ্গিক যে ক্ষতিগুলো হয়, তা প্রতিরোধ এ ধরনের সংস্কার থেকে অনেক জরুরি। কিন্তু বিদেশী সংরক্ষণবিদ এনে কান্তনগর মন্দির সংস্কারের বাজেট শেষ করার যে উদ্যোগ এক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে, তা থেকে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ তথা সাংস্কৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পুরো বিশ্বে যে নীতি অনুসরণ করা হয়, সেখানে অবিকল সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। তা একদিকে যেমন সময়সাপেক্ষ, অন্যদিকে ব্যয়বহুলও বটে। পাশাপাশি সে কাজের জন্য প্রয়োজন হয় অভিজ্ঞ জনবলের। তাই কান্তনগর মন্দিরের সংস্কার ঐতিহ্য অনুরাগীদের মনে যে আশার সঞ্চার করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এখন থেকেই সতর্ক হওয়া; যা দেশের অন্য ঐতিহ্য স্থানের ক্ষেত্রেও সমভাবে জরুরি।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!