প্রতারণার বাটখারা

বেশ কিছুদিন হতে যায়, দৈনিক বণিক বার্তার শেষ পৃষ্ঠায় একটি ছবি ছাপা হয়েছিল ক্যাপশনসহ। সেখানে দেশের নন্দিত একটি আইসক্রিম কোম্পানির এক লিটার আইসক্রিমে ১৫০-২০০ মিলিলিটার পর্যন্ত কারচুপির কথা উল্লেখ ছিল। এটা সামান্য একটি সংবাদ। প্রতিদিন বাংলাদেশের দৈনিকগুলোর প্রথম ও শেষ পাতার পাশাপাশি দেশের খবরে নজর দিলে এমন তথ্য হরহামেশাই চোখে পড়ে। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর প্যাকেট ও পাত্রে বিক্রি উপাদানে যেখানে এমন কারচুপির বিষয় স্পষ্ট, সেখানে নিয়ন্ত্রণহীন কাঁচাবাজারের কি দুরবস্থা, সেটি নতুন করে বলার নেই। এদিকে ওজন ও কারচুপি রোধে জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) তাদের নিজস্ব লোগোযুক্ত বাটখারা উৎপাদন শুরু করেছিল প্রায় এক বছর আগে। তবে সরাসরি তাদের কারখানায় না হওয়ায় বিএসটিআইয়ের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে এসব বাটখারা উৎপাদনের দায়িত্ব বর্তায় সাতটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর। তবে এখন বাজারে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির নিজস্ব লোগোযুক্ত বাটখারার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ডিজিটাল বাটখারার ব্যবহার বাড়ায় বিএসটিআইয়ের লোগোযুক্ত বাটখারার আবেদন কমেছে দাবি করা হলেও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা আগে উৎপাদিত লোগোবিহীন বাটখারা বাজারে ছেড়েছে।

কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফুটপাত থেকে আড়ত সবখানে একই দশা। পণ্যের গুণগত মানের প্রশ্নটা অনেক পরে; ওজনে কারচুপির কাছেই নাজেহাল হতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বিষয়টি আমলে নিয়েই বিএসটিআইয়ের লোগোযুক্ত বাটখারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল পুরনো লোগোবিহীন বাটখারা উৎপাদন ও বিপণন। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে বিএসটিআইয়ের লোগোযুক্ত নতুন বাটখারা ব্যবহার না করে পুরনোগুলো দিয়েই পণ্য বেচাকেনার কাজ চালাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাই পণ্য কিনতে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে এখনো ওজনে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা।

আমরা জানি, বিএসটিআইয়ের ২৯তম কাউন্সিলে লোগোযুক্ত বাটখারা তৈরির অনুমোদন দেয়া হয়। এ বিষয়ে ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অব ওয়েটস অ্যান্ড মেজার্স রুলস ১৯৮২’ সংশোধন করে গত বছর একটি এসআরও (নম্বর ২৭০/২০১৫) জারি করে সরকার। ৫০০ গ্রাম থেকে ৫০ কেজি ওজন পর্যন্ত প্রতিটি বাটখারার ওপর বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন, সিসাযুক্ত গর্ত ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলায় লেখা থাকার কথা। প্রতিটি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে এ বাটখারা ব্যবহার করতে হবে, যাতে ওজন ও পরিমাপে কারচুপি রোধ করা যায়।

বাটখারার ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে না পারলে ভোক্তারা এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। অন্যদিকে তরল পদার্থের ক্ষেত্রে এ ধরনের একটি স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করানো হয়ে গেছে সময়ের দাবি। নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে শুরু করে সেবা খাত— ভোক্তারা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রতারণার শিকার। এক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা এহেন হীন কাজ নেই, যা করতে বাকি রেখেছেন। রান্নার তেলে পেট্রোলিয়াম, হলুদের মধ্যে ইটের গুঁড়ো, মুড়িতে ইউরিয়া সার, ভাজা খাবারে ক্ষতিকর রঙ ও রাসায়নিকের ব্যবহার হরহামেশা চলছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে ওজনের ব্যাপারেও করা হচ্ছে যথেচ্ছাচার। পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে এ ধরনের যথেচ্ছাচার বন্ধ করে একটি স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেয়ার দায়িত্বটাও রাষ্ট্রীয় মান সংস্থা হিসেবে বিএসটিআই নিতে পারে। তবে ওজন নিয়ে প্রতারণা বন্ধে তাদের বাটখারা প্রচলনের যে সিদ্ধান্ত, সেটিকে সবার আগে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

(Visited 73 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *