বেসামাল ঘোড়াশাল

সার কারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা নানামুখী শিল্পকারখানা, বাস্তবে এর কোনোটিরই কমতি নেই। একই সঙ্গে নেই পরিবেশ-সম্পর্কিত কোনো সচেতনতার ধার ধারা। বিশেষ ভূমিকা না রেখে সব ধরনের ভান-ভণিতা ছেড়ে উল্লিখিত ওই এক বাক্যেই পরিচয় করিয়ে দেয়া যায় নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত শিল্পাঞ্চল ঘোড়াশালকে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলে এক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চারপাশে মাত্র ১০ কিলোমিটার পরিসর এলাকায় গড়ে উঠেছে ৩২টি অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা। বায়ুদূষণকারী সিমেন্ট কারখানা থেকে শুরু করে লাগামহীন পানিদূষণের জন্য দায়ী সার কারখানাও বাদ পড়েনি এ তালিকা থেকে। সেসঙ্গে গড়ে উঠেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাটকল, পোশাক ও খাদ্যপণ্য প্রস্তুত কারখানাও। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই এসব কারখানা থেকে ভয়াবহ সব বর্জ্য গিয়ে মিশছে পানিতে, বায়ুতে ছড়াচ্ছে সিমেন্ট কারখানার ছাই আর বিভিন্ন কারখানার চিমনি দিয়ে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের শব্দও ছাড়িয়েছে সহনীয় মাত্রা। এসব নানা দিক হিসাব করতে গেলে ঘোড়াশালের বেসামাল এ শিল্পায়নে ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রাণ, প্রকৃতি ও স্থানীয় প্রতিবেশ।

সম্প্রতি সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (সিইজিআইএস) যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, সেখানে হতাশার চিত্র স্পষ্ট। ঘোড়াশাল ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র রিপাওয়ারিংয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যাচ্ছে আগামীতে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র। বিশেষ করে পৌরসভাকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে ১০ কিলোমিটার এলাকার পানি, বায়ু ও শব্দের নমুনার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন থেকে ওই এলাকার ভয়াবহ দূষণ আর পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা অজানা তথ্য জানা গেছে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মানমাত্রা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় বাতাসে ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা তথা পিএম১০ ও পিএম২.৫-এর মিশ্রণের দৈনিক সহনীয় মাত্রা যেখানে সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম। আর বার্ষিক সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ যেখানে ২০ মাইক্রোগ্রাম থাকার কথা। সেখানে বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যামবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড (এনএএকিউএস) অনুযায়ী, বাতাসে এ ধরনের ধূলিকণার সহনীয় মাত্রা দিনে সর্বোচ্চ ১৫০ আর বছরে সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়েছে বেশ আগেই। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, ইআইএর প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, ঘোড়াশাল পৌর এলাকার বাতাসে ক্ষুদ্র ধূলিকণা মিশ্রণের মাত্রা দৈনিক ৪৮৮ ও বছরে ২০৪ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকারক ধুলাবালি মিশ্রণের পরিমাণ দৈনিক ৩১১ দশমিক ৮ ও বার্ষিক ১০৬ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রামের মতো বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নাক জ্বালাপোড়া ও শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ এ এলাকায় ডব্লিউএইচওর মানমাত্রা অতিক্রম করেছে। এদিকে বায়ুদূষণের পাশাপাশি ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও অন্যান্য কারখানায় দিন ও রাতে সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। ডব্লিউএইচও ও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৭ অনুযায়ী আবাসিকে সহনশীল শব্দসীমা ৫৫ ডেসিবল। কিন্তু ওই এলাকায় দিনের বেলায় তথা সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ৬০-৬৭ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ সৃষ্টি হতে দেখা গেছে।

পরিবেশদূষণের ফলে দিনের পর দিন এ অঞ্চল যেমন বসবাসের উপযোগী থাকছে না, তেমনি ভয়ানক শব্দদূষণের ফলে আশপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের পক্ষে রাতের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক কাজকর্মেও ব্যাঘাত ঘটছে। পলাশ ও ঘোড়াশাল পৌর এলাকায় বিদ্যমান প্রায় সব ক’টি শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ব্যবহার করায় দিনের পর দিন ক্ষতির মুখে পড়ছে নদীটি। এদিকে বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য ও এগ্রোকেমিক্যাল বর্জ্যের কারণে নদীর পানিতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি), আয়রন, নাইট্রেট ও অ্যামোনিয়ার মাত্রাও মান ছাড়িয়ে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন না হলে বিপর্যয় আসন্ন। অন্তত অভিযুক্ত শিল্পকারখানায় নিয়ম মেনে অভিযান চালানো ও জরিমানার পাশাপাশি তাদের পরিবেশ আইন মানতে বাধ্য করাটা এখন সময়ের দাবি।

(Visited 9 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *