ক্যামেরাকি পিছে কৌন হ্যায়!

মনের অনেক না বলা কথা ঠাঁই পায় শিল্পীর তুলিতে কিংবা কবির কলমে। তাই শিল্পীর তুলিতে ক্যানভাসের ওপর এ আঁকিবুঁকি কিংবা কবিতার খাতাগুলো মানবমনেরই প্রতিচ্ছবি। একজন শিল্পীকে কোনো বিষয়ের বাস্তব চিত্রায়ণে দৃষ্টিশক্তি, চিন্তা, মেধা ও মননের সমন্বয় ঘটাতে হয়। বাস্তবতার নিরিখে যাচাই করতে গেলে একজন চিত্রশিল্পী আর ফটোগ্রাফারের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই, আবার আছেও। ফটোগ্রাফারের ক্ষেত্রে মাইন্ড সেটআপ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার জন্য রিঅ্যাকশন টাইমটা খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে তা সেকেন্ডের ক্ষুদ্রাংশও হতে পারে। এই স্বল্প সময়ে হুট করে একটি ফ্রেম নির্দিষ্ট করা, তারপর ক্লিক করাটা সত্যিই বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। আর কাজটা দক্ষতা, মেধা ও মননের সঙ্গে করতে পারেন বলে একজন ফটোগ্রাফারের সৃষ্টিশীলতা শিল্পীর থেকে কোনো অংশে কম নয়। যদিও পাল্টেছে যুগ, বদলে গেছে ক্যামেরার গঠন, আলোক সম্পাত ও ছবি ধারণের ক্ষমতা।
একজন শিল্পীর কল্পনার জগত্ উন্মুক্ত। আর সেটাকেই তিনি তুলে ধরেন রঙ, তুলি মাধ্যমে। অন্যদিকে ফটোগ্রাফারের মনস্তত্ত্বে একটু ভিন্নদিকে প্রবাহিত। শিল্পী যেমন কল্পনা থেকে বেশির ভাগ ছবি আঁকেন বাস্তবে, তেমনি ফটোগ্রাফার বাস্তবে যা থাকে, সেটাকেই ধারণ করেন শৈল্পিক দক্ষতায়। একজন ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পীর উপস্থাপনের পরিসর কিন্তু অনেকটাই কাছাকাছি। একটা বিশাল এলাকার প্রতিচিত্র থেকে শুরু করে একটি সাধারণ লক্ষ্যবস্তুকে ফটোগ্রাফার ধারণ করেন তার ক্যামেরায়, আর শিল্পী ছবি আঁকার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন বিশেষ লক্ষ্যবস্তুর ওপর। এখানে শিল্পীর সেই লক্ষ্যবস্তু বড় থেকে শুরু করে ছোট কিংবা মাঝারি এমনকি ক্ষুদ্র একটি নিদর্শনও হতে পারে। তবে একজন ভাস্কর কিংবা চিত্রশিল্পীর উপস্থাপন পদ্ধতি এবং ধারাটি সম্পূর্ণই তার নিজস্ব, যার সঙ্গে ফটোগ্রাফির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে একজন ভাস্কর কিংবা চিত্রশিল্পী একটি ইমেজ তৈরি করেন আর ফটোগ্রাফার একটি চিত্র দেখার পর দক্ষতা, সময় ও পরিস্থিতির দায় মিটিয়ে সেটা তার ফ্রেমে ধারণ করেন। এক্ষেত্রে অধিকাংশ ফটোগ্রাফার আগে থেকেই আনুমানিকভাবে কর্মপরিকল্পনা নির্দিষ্ট করে রাখেন বলেই সেটা সম্ভব হয়।
ক্যামেরার পেছনে থাকা একজন ফটোগ্রাফার লক্ষ্যবস্তুকে একান্তই নিজের মতো করে দেখেন। বিশেষ করে তিনি যখন ভিউফাইন্ডার কিংবা এলসিডি স্ক্রিনে চোখ রেখে যা দেখেন, তার সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুর গাঠনিক আকৃতির সমন্বয় করাটা সত্যিই কাজ। এক্ষেত্রে ছবি তোলার পর পরই তিনি লক্ষ্যবস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাতের মাত্রাগত সঠিকতা, তার প্রবৃদ্ধি ও আকৃতির সমন্বয় যাচাই করে দেখেন। বলতে গেলে আলোকচিত্র ধারণের প্রথাগত ধারণায় এগুলোই সবার আগে ভেবে দেখতে হয়। কিন্তু ধারণাগুলো একটু সংশোধন করে নেয়াটা জরুরি। বিশেষ ফটোগ্রাফার যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে ক্যামেরা নির্দিষ্ট করেন, সেটি থাকে ত্রিমাত্রিক আর যখন ক্যামেরা ছবিটি ধারণ করে, সেটি হয়ে যায় দ্বিমাত্রিক। বিশেষত ত্রিমাত্রিক লক্ষ্যবস্তুকে দ্বিমাত্রিক তলে সুস্পষ্ট ও সূচারুরূপে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। ফটোগ্রাফির মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে তার চিন্তা ও মননের একটি সম্পর্ক স্থাপন হয়। তাই পূর্বপ্রস্তুতি বাদে একজন ফটোগ্রাফারের পক্ষে উদ্দিষ্ট ফটোগ্রাফি সম্ভব হয় না। একজন ফটোগ্রাফার যখন ছবি তোলেন তখন কাজ করে তার অন্তর্দৃষ্টি। এক্ষেত্রে তিনি কোনো ক্যাপশন রেখে কাজটি করেন না। তাই দর্শকের উচিত ক্যাপশনের আগে ছবিটা দেখা। এভাবে ছবি দেখলে একজন ফটোগ্রাফার ছবি তোলার সময় কী চিন্তা করেন, তার মনস্তত্ত্বে কী ধারণা থাকে আর তিনি কী দেখাতে চান, তা মানুষ একান্ত নিজের মতো করে ভেবে নিতে পারে। অন্যদিকে একজন ফটোগ্রাফারের পক্ষে বিস্তৃত ভাববস্তুর কোনো বিষয়কেও ছোট্ট ফ্রেমে এনে প্রকাশ করা সম্ভব হয়।

(Visited 31 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *