শিক্ষা ও নৈতিকতা

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের যা শেখাচ্ছে, তা তাদের নৈতিক অনুশীলনে যথেষ্ট অবদান রাখছে না। আর তাই যদি হতো অন্তত একটু বড় হয়ে তারা নিছক খেলাচ্ছলে মানুষের ওপর চড়াও হওয়া, ধোঁকাবাজি কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো পাশবিকতায় যুক্ত হতে দিত না। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক হলেও একজন দর্শনের শিক্ষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি, এখনকার বেশির ভাগ কলেজশিক্ষার্থী চিন্তা আর নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না। এটা নিয়ে কোনো ধরনের জরিপ না হলেও আমি শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় থেকে শুরু করে আরো নানা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তখন তাদের বক্তব্য থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা এখন অনেকটাই বন্ধ হওয়ার পথে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বক্তব্য, বাগাড়ম্বর ও অনুশীলনের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে।

বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কিংবা শিক্ষার বাজারমুখিতা অনেক ক্ষেত্রে শিশু, কিশোর ও যুবকদের নৈতিকতার চর্চা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে— অনেকে এমনটাও মনে করেন। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে দার্শনিকরাও তাদের দায় এড়াতে পারেন না। গ্রিক দর্শনের যুগে গেলেও এ প্রমাণ অনেক পাওয়া যায়, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অনুশীলন ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন দার্শনিকরাই। এক্ষেত্রে প্রটাগোরাসের উক্তি প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘মানুষের অনেকগুলো গুণ থাকতে পারে, যার মধ্যে নৈতিকতার চর্চাই মুখ্য।’ কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের নৈতিকতা অনুশীলনকারীর সংখ্যা অনেক কম বলে তার আফসোসের অন্ত ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পেশাদার দার্শনিকরাও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন। কিন্তু নৈতিক অনুশীলনের প্রশ্নে তাদের কর্মভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষক হিসেবে পড়াতে গিয়ে কিংবা বিভিন্ন আলোচনার টেবিলে একটি বিষয় বেশি দেখেছি, মানুষ স্বভাবগতভাবে নৈতিকতার চর্চা করতে চায়। কিন্তু তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়াটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতার চর্চায় আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ তখন শিশুরা যা শেখে, সেটা পুরো জীবনের জন্য পাথেয় হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে বিভিন্ন স্থানের জরিপে অংশ নিয়ে এর পক্ষে সত্য অবলোকন করার সুযোগ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো যেমন আইনস্টাইন প্রণীত ভরশক্তি সমীকরণ বাস্তবতা বিশ্লেষণে ব্যবহূত হতে পারে, কিন্তু নীতিশাস্ত্র কিংবা দর্শন আলোচনার প্রেক্ষাপটটা অনেক দিক থেকেই পুরোপুরি ভিন্ন। বিজ্ঞান পরীক্ষাগার কিংবা যুক্তির বাস্তবতায় অনেক বিষয় নির্মাণ, প্রদর্শন, উপস্থাপন ও পরিবেশন করতে পারে। নৈতিক ভিত্তির বিচারে সেটা গ্রহণযোগ্য হোক কিংবা না-ই হোক, তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ নেই বিজ্ঞানীদের কাছে। আর সেদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে দর্শনের ভাবনাগুলো অনেকটাই ভিন্ন হয়ে দেখা দেয়।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও নৈতিকতা কোন কোন ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে, সেটা চিহ্নিত করাও অনেক জরুরি। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মতবাদ অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার আনুষঙ্গিকতায় যুক্ত হতে পারে। নৈতিকতার মানদণ্ডে সেগুলো কতটুকু যাচাইযোগ্য কিংবা গ্রহণীয়-বর্জনীয়, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিশুদের নৈতিকতার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে শেখানো হয় দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে। তার মধ্যে থাকে স্কুল থেকে দেয়া বাড়ির কাজ নকল না করা, কাউকে অভিশাপ দেয়া ঠিক নয়, সব মানুষ জন্মগতভাবে সমান, অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজে ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা তৈরি, ২১ বছরের নিচে অ্যালকোহলে আসক্তি তৈরি না করা, মাছ-মাংসের চেয়ে সবজি বেশি উপকারী প্রভৃতি। বিষয়গুলো পড়ে শিশুদের মধ্যে শুরু থেকে ভুল-সঠিক চিহ্নিতকরণের মানসিকতা তৈরি হয়ে যায় প্রথম থেকেই। কিন্তু বিষয়গুলোকে ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় কিনা, সেটাই অনেক বড় প্রশ্ন। আর সেটা করা গেলে খুব সহজেই শিশুদের সুনাগরিক ও সৎ হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা সম্ভব, নচেত্ নয়।

দর্শনের শিক্ষক জাস্টিন পি. ম্যাকবায়ের এর লেখা, নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর সালিম অর্ণব

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!