দুবাইয়ের সাফল্যের গুপ্তকথন

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকার চেষ্টা করছে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নানামুখী শিল্প ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে। তারা এক্ষেত্রে দুবাই থেকে শিখতে চাইছে। বলতে গেলে তাদের জন্য এটি একটি মাইলফলক। একটি প্রজন্মেরও কম সময়ে বিনিয়োগের কেন্দ্রস্থলে চলে এসেছে দুবাই। পাশাপাশি এখানকার সাংস্কৃতিক উত্কর্ষও চোখে পড়ার মতো। যদিও ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থসংকট এ শহরের উন্নয়নকে পতনোন্মুখ করেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তারা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপোর কথা, যা এখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

দুবাই আর্থিক সংকটের মধ্যে নিজেকে শুধু টিকিয়েই রাখেনি, পাশাপাশি চরম সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা এখন অনেকের আলোচ্য। তাই গত গ্রীষ্মে আমি দুবাইয়ের সব সংকটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেছি। এর পেছনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোও আলাদাভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়েছি তখন। এ বাণিজ্যনগরীর অন্তত ৪০ জন ব্যবসায়ী, অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাত্কার নিয়েছিলাম। বিদ্যমান সেকেন্ডারি তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে আমি আমার সংগৃহীত তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি।

দুবাইয়ের গ্রোথ রেজিলিয়েন্সকে এবিএস মডেলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এ, বি ও এস বলতে বোঝাবে অ্যাট্রাকশন, ব্র্যান্ডিং এবং স্টেট লিড ডেভেলপমেন্ট। গাড়ির অ্যান্টি-লক ব্রেকিং সিস্টেম এখানে অনেক বড় বড় বিপত্তিকর ঘটনা ঘটতে দেয়নি। আর এ তিন ধরনের বিষয় মাথায় রেখে করা দুবাইয়ের উন্নয়ন চিন্তা আগের ধারায় বেগবান ছিল, এমনকি আর্থিক সংকটের সময়েও তারা কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়নের প্রতি আস্থা রাখার পাশাপাশি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নে আরেকটি মডেল অনুসরণ করছে দুবাই। বিশেষ করে তারা বিভিন্ন আদিবাসী রীতির সঙ্গে স্থানীয় অভিজাতদের খাপ খাইয়ে নেয়ার পথ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে বংশানুক্রমিকভাবে অনেক পরিবার সরাসরি এখানকার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আরেকটু ভালো করে বলতে গেলে, দুবাই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির দায় মেনে চিন্তাধারা ঠিক করে নেয়ায় তাদের সফলতার মাত্রাটাও একটু বেশি।

দুবাইকে মাঝে মধ্যে ‘মরুর সিঙ্গাপুর’ বলা হয়। এখানে অনেকটা সিঙ্গাপুরের মতোই স্টেট ডিরেক্টেড আর্থিক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, যা অনেক দূরদর্শী নেতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে অর্জিত। নিজেদের গৃহীত উদ্যোগের পাশাপাশি দুবাই বাইরের উদ্যোক্তাদের খুব সহজে আকর্ষণ করতে পেরেছে। নিউইয়র্ক, সাংহাই কিংবা লাস ভেগাসের মতো করে তাদের স্থাপত্যিক উন্নয়ন হয়েছে, যা অনিন্দ্যসুন্দর একটি অবকাঠামো দান করেছে শহরটিকে। নিউইয়র্ক কিংবা হংকংয়ের কথা বাদ দিলে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে দুবাইয়ের আকাশ কাজে লাগানো হয়েছে বেশি। সেখানে ভূমির পাশাপাশি আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো সত্যি চোখে পড়ার মতো। এখানে প্রায় ১৫০টির মতো আকাশচুম্বী অট্টালিকা রয়েছে।

দুবাইয়ে অনেক থ্রিডি অফিস বিল্ডিং রয়েছে, যেগুলো নির্মাণ করা হয়েছে সুন্দর কিছু দ্বীপে। এর বাইরে সেখানে রয়েছে বিশ্বের মধ্যে প্রথমবারের মতো স্বঘোষিত সেভেন স্টার হোটেল। এখানে অনেক সুন্দর শপিংমল ও অ্যাকুয়ারিয়াম রয়েছে। এখানে ইনডোরে স্কি খেলার সুযোগ যেমন আছে, তেমনি কেউ চাইলে স্কাই ডাইভিংয়ের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে না। এখানকার আইকনিক বিল্ডিং ও বিনোদন পার্কগুলো সহজেই যে কারো দৃষ্টি কাড়ে। এখানেই বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও জমকালো ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাগুলো হয়ে থাকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে বাইরে থেকে মানুষ এখানে এসে বসবাসের আগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে বাইরের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগেই দিনের পর দিন আকাশ ছুঁয়েছে এখানকার অর্থনীতি।

দুবাইয়ের মাত্র ৪ ঘণ্টার বিমান দূরত্বে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ বাস করছে। এখানকার একজন ব্যবসায়ী নারীর কাছে জানতে পেরেছিলাম তারা কোন ভরসায় এখানে বিনিয়োগ করছেন। দক্ষ শ্রমিক আর আস্থাশীল বণিকদের আগমন এর সাফল্যকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করেছে। এখানে এসে অনেকেই ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় যারা টিকতে পেরেছেন তারা প্রতিষ্ঠিত, যারা পারেননি তার হারিয়ে গেছেন কালের গহ্বরে। তবে স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি বাইরের শ্রমিকদের সহজে মেনে নেয়ার যে মানসিকতা দুবাইয়ে দেখা যায়, তা বিশ্বের আর কোথাও দৃষ্টিগোচর হবে না। এক্ষেত্রে সব মিলিয়ে একটি সহনশীল ব্যবসা উপযোগী প্রতিবেশ রয়েছে, যা এর সাফল্যকে প্রণোদনা জুগিয়েছে।

টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকগুলো চিহ্নিত করে দুবাইয়ের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ ঠিক করেছেন এখানকার মানুষ কোন শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। তারা এখানে ঠিক তা-ই শিখছে, যা তাদের উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তার ভাষ্যে, ‘আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বপ্নসারথি হবে।’ শিক্ষার এ উন্নয়ন ও বদল তাদের কাজ আরো সহজ করে দিয়েছে। ফলে তারা সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের নানা শহরের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারছে।

দুবাইয়ের আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান এবিএস মডেল নানা দিক থেকে কার্যকর। অন্তত আর্থিক সংকটের সময় পথ দেখানোর পাশাপাশি নিত্যনতুন ঝুঁকি এড়ানোর পথ করে দিচ্ছে এই বিশেষ মডেল। অনেকটা একটা কারের মতো এবিএস মডেল দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কারের স্টিয়ারিং হুইলের মতো এটি এর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এটা ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করছে বৈশ্বিক পরিসরেও। তবে এটা যদি অবকাঠামোগত সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারে, তবে একটা সময় পুরো প্রক্রিয়াটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। আর তা যাতে না হয়, সেজন্যই স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চলছে অনেক দিক থেকে।

ইয়াসের আল-সালেহ এর লেখা থেকে অনূদিত।

(Visited 16 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *