রফতানিবাণিজ্য কেনো জরুরি?

একটি দেশের উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে রফতানিতে বিশেষ নজর দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি? আদৌ কোনো দেশে মানুষের জীবনযাপন-সম্পর্কিত মৌলিক চাহিদা যেমন— শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, টেলিকম, নিরাপত্তা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কিংবা আনন্দ-বিনোদনের ক্ষেত্রে রফতানির তেমন ভূমিকা নেই। যদি তা-ই হয়, তবে বাইরের দেশের ভোক্তাদের প্রয়োজন মেটাতে তাতে এত গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন কেন?

অল্প কথায় বলতে গেলে, এটাই মুক্তবাজার অর্থনীতি তথা অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের বিরোধীরা এবং সব শিল্পে সমান গুরুত্ব দেয়ার পক্ষপাতীরা জানতে চান। কিন্তু ভুল প্রশ্নের সঠিক উত্তর নেই। এর অন্যতম কারণ, প্রতিটি দেশের সরকার মূলত নিজ দেশের মানুষের প্রতি লক্ষ রাখতেই রফতানির প্রতি গুরুত্ব দেয়।

বিষয়টি বোঝার জন্য বাজার অর্থনীতি আদৌ কী, সেটা বিবেচনা করুন। পোপ ফ্রান্সিসসহ কেউ কেউ বলেন, এ ব্যবস্থা লোভতাড়িত, যেখানে সবাই নিজ স্বার্থই দেখে। কিন্তু বাজার অর্থনীতিকে এমন ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা উচিত, যেখানে অন্য লোকের জন্য কিছু করে মানুষ নিজ পরিবারের উপার্জন নিশ্চিত করে। বাজার অর্থনীতি অন্যদের প্রয়োজন বা চাহিদা সম্পর্কে সচেতন হতে আমাদের বাধ্য করে। কেননা অন্যের চাহিদাই আমাদের জীবিকার উৎস। কিছু অর্থে বাজার অর্থনীতি এক ধরনের উপহার বিনিময় ব্যবস্থা; সেখানে অর্থ কেবলই একে অন্যের উপহারের মূল্য সৃষ্টি করে।

ফলে বাজার অর্থনীতি বিশেষায়ণকে প্রণোদিত করে। এই বিশেষায়ন কিছু দক্ষতা বা পণ্য উৎপাদনে বাড়তি পারঙ্গমতা অর্জনে সাহায্য করে। এবং আমরা ওসব দক্ষতা বিনিময় করি কয়েক মিলিয়ন ভিন্ন জিনিস উৎপাদনে, যেগুলো কীভাবে তৈরি হয় তার সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। পরিণামে আমরা কেবল উল্লেখযোগ্য কিছু পণ্য তৈরি করেই নিজেদের সক্ষমতা নিঃশেষ করছি এবং বাকি পণ্যগুলো অন্যের কাছ থেকে কিনছি।

ব্যক্তি থেকে নির্দিষ্ট কোনো স্থান— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ পর্যবেক্ষণ সত্য, স্থানটা হোক কোনো দেশের খুব কাছাকাছি  কোনো শহর কিংবা গ্রাম, অঙ্গরাজ্য কিংবা প্রদেশ। প্রতিটি শহরে রয়েছে মুদিদোকান, বিউটি পার্লার, গ্যাস স্টেশন ও মুভি থিয়েটার— যেগুলো স্থানীয় অধিবাসীর সেবায় কাজে লাগে। অর্থনীতিবিদরা এসব বিষয়কে বলেন ‘অ-বাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ড’। কারণ এগুলো দূরবর্তী গ্রাহকের কথা মনে রেখে করা হয় না।

কিন্তু নির্দিষ্ট শহরের কেউ ওসব পণ্য তৈরি করতে না জানলেও ওই শহরের মানুষ সেসব ব্যবহার করতে চায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেশির ভাগ শহরই খাদ্য, গাড়ি, গ্যাসোলিন, ওষুধ, টিভি কিংবা ফিল্ম তৈরি করে না। সেজন্য সেগুলো অন্য কোথাও থেকে ‘আমদানির’ প্রয়োজন হয় তাদের। শহরের বাইরের লোকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত পণ্যের দাম দিতে হলে তারা যেসব পণ্য উৎপাদন করতে জানে, সেসবের কিছু অবশ্যই বেচতে হবে।

অবশ্য শহরের বাইরের লোকদের অন্য স্থান থেকেও পণ্য কেনার সুযোগ আছে। সেজন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থানের পণ্য ও সেবা ওই স্থানে বসবাস করে না— এমন লোকদের কাছে বেচলে সেখানকার জীবনমানে এক ধরনের সামঞ্জস্যহীন প্রভাব পড়ে।  এদিক থেকে ধরলে একটি খনিনির্ভর শহরে খনি বন্ধ হয়ে গেলে শহরটি পুরোপুরি ভূতের রাজত্বে পরিণত হয়। কারণ খনি বন্ধ হলে সেখানে বিদ্যমান মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, মুভি থিয়েটারগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও চলচ্চিত্র ‘আমদানির’ সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।

আবার অ-বাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ডের বিপরীতে কোনো স্থানের রফতানি বৃদ্ধিতে ওই স্থানের অনাবাসিক লোকদের আকর্ষণে প্রণোদনা থাকা চাই। কেননা অন্য অনেক স্থান থেকে তাদের পণ্য কেনার সুযোগ আছে। তার মানে রফতানিকে অবশ্যই আকর্ষণীয় মানের/ব্যয়-অনুপাত হতে হবে।

রফতানির এ ব্যয়-অনুপাত বৃদ্ধির একটি উপায়— মান ও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন। অন্য উপায় হলো, নিম্ন মজুরি। কেননা রফতানি কর্মকাণ্ডে যতই উৎপাদনশীলতা ও মান বাড়ানো সম্ভব হবে, ততই শ্রমিককে বেশি মজুরি দেয়া যাবে কিংবা মজুরির ক্ষেত্রে একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় থাকা যাবে। রফতানি খাতে কর্মসংস্থান লক্ষণীয় হলে ওই খাতের মজুরি শহরের অন্য পেশাজীবীদের মজুরিও প্রভাবিত করবে (তেল রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল নয় এমন বেশির ভাগ স্থানের ক্ষেত্রেও এটা সমান সত্য)। এভাবে সবারই নিজ স্থানের রফতানি উন্নয়নে একটি স্বার্থ থাকে।

রফতানি খাত তুলনামূলক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় অর্থনীতির অন্য খাতের তুলনায় আলোচ্য খাতে দ্রুত প্রযুক্তিগত ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন প্রয়োজন হয়। এজন্য কোনো নব আবিষ্কারে সবচেয়ে আগে হুমকিতে পড়ে ওই খাত। এমনকি ওই আবিষ্কারের জেরে কোনো নতুন প্রতিযোগী সহজেই রফতানি খাতের কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ধসিয়ে দিতে পারে। একদা আধিপত্যশীল ফিনল্যান্ডের ফোনসেট নকিয়ার কথা বিবেচনা করুন— কীভাবে তারা আইফোনের আবির্ভাবের মুখে ধসে গেল! কিংবা ভাবুন— শেল অয়েল উৎপাদন কীভাবে ওপেকের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে ।

প্রথম দিকে একটি স্থান থেকে সাধারণ প্রযুক্তি সুবিধা কাজে লাগিয়েও সফলতার মুখ দেখা বিচিত্র নয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার উন্নয়ন করা না গেলে শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে উন্নয়ন ধরে রাখা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৬৩ সালের দিকে থাইল্যান্ডের ৯৭ শতাংশ রফতানি বাণিজ্য পরিচালিত হতো কৃষি ও খনিজ পণ্য যেমন— চাল, রাবার, টিন ও পাট কেন্দ্র করে। পরে ২০১৩ সালের দিকে এসে দেখা যায়, সেখানে কৃষি খাত থেকে রফতানি নেমে গেছে ২০ শতাংশে। আর তার স্থান দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারি ও কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি; যা প্রায় ৫৬ শতাংশ স্থান দখল করে আছে। প্রতিটি নন-ওপেক উন্নয়নশীল দেশেও একই রূপান্তর দেখা যাবে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, তুরস্ক কিংবা ইসরায়েলের কথা উল্লেখ করা যায়।

সুতরাং দেশ, প্রদেশ কিংবা শহরগুলোর কী করা উচিত? সংশয়বাদীরা হয়তো বলবেন, তাদের উচিত কেবল স্থানীয় অধিবাসীদের প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন— শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা ‘ব্যবসায়িক পরিবেশ’ উন্নয়ন প্রভৃতিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। আর রফতানি আপনাতেই তাদের দেখভাল করবে।

তবে জীবন এর চেয়ে অনেক জটিল। তাই রফতানি কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনটা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থেকে যায়। নিঃসন্দেহে রফতানি কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিধি, অবকাঠামো দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অ-বাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা হবে। যেখানে নতুন কোনো ক্ষেত্রে সবসময় বৈচিত্র্যমুখিনতা নিশ্চিত চ্যালেঞ্জিং, সেখানে বাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ডে তা আরো কঠিন। কেননা ওই খাতকে শুরু থেকেই বিদেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। বিপরীতে অবাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তারা নিজেদের কাজ শুরু করে একটি সীমাবদ্ধ বাজারে (ক্যাপটিভ মার্কেট)। অধিকন্তু, রফতানিকারকদের গ্রহের অন্য কোথাও কী কৌশল নেয়া হচ্ছে, তা জানা লাগে। এজন্য তাদের বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করতে হয়। এভাবে তারা বিদেশী বিনিয়োগ, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক পেশাগত সংযোগ প্রভৃতি বিষয়ে হতে হয় অধিক সংবেদনশীল।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে প্রতিটি সমাজ ও দেশকে অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে বেচা যাবে এমন পণ্য ও সেবা উৎপাদনে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়। যা-ই হোক, নতুন সুযোগ অনুসারে কাজ ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করে রফতানিতে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে পূর্ব এশীয় দেশ ও আইরিশদের প্রবৃদ্ধি মিরাক্যাল। অন্যদিকে অ-বাণিজ্যযোগ্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একটি দেশের স্পোর্টস লিগের দারুণ মিল আছে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থন করে। আর এদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে রফতানিমুখী বাণিজ্যের অবস্থা অনেকটা জাতীয় দলের মতো, যা পুরো অবস্থানের পরিচয়জ্ঞাপক।

অর্থনীতিবিদ ও ভেনিজুয়েলার সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী রিকার্ডো হসম্যানের লেখা লাইভমিন্ট থেকে অনূদিত

(Visited 16 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *