ট্রাম্প যে মডেল রেখে এগিয়েছে

বার্লিন প্রাচীর পতনের দিনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছে, যিনি মেক্সিকো সীমান্তে আরো বড় প্রাচীর তৈরির উসকানি দিয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার সামনে দুটো পথ খোলা— তিনি কি বিভেদনীতির ওপর ভর দিয়ে এগোতে চাইবেন, নাকি আমেরিকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ভাববেন?

ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে কিছুদিন আগে গণভোটের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে আসার মিল রয়েছে। নির্বাচনে জেতার পর বিভিন্ন রিপাবলিকান নেতা যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে খুব একটা পার্থক্য নেই যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার ঘটনার। তবে পরাজিতরা চুপচাপ বসে ছিলেন না। তাদের কেউ কেউ বেশ উত্তপ্ত বক্তব্য দিয়েছেন, যেটা এবারো আলোচ্য বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রভাব পড়েছিল। নানা স্থানে ঘৃণা ও বর্ণবাদ যেমন প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি কয়েকটি কলেজ ও স্কুলে ঘটে হামলার ঘটনা। ট্রাম্পের বিজয় অনেক বর্ণবাদীকে সাহসী করে তুলবে। তারা এত দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পরিচয় লুকিয়ে থাকত, এবার তাদের রাস্তায় নামার পালা।

১৮ মাস ধরে আক্রমণ ও কাদা ছোড়াছুড়ি যেভাবে চলেছে, সেখানে মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা গেছে প্রতিপক্ষকে কুপোকাতের প্রবণতা। মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্র বিপক্ষে থাকলেও বিশেষ সুবিধা হয়নি। উপরন্তু শেষ অবধি এ ধরনের আচরণের বিরোধিতা করে গেছেন গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন মানবতাবাদী, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের কর্মী ও অভিবাসী মুসলিমরা। শঙ্কা হলো, ট্রাম্প কু ক্লাক্স ক্ল্যানের মতো বর্ণবাদী সংগঠনকে উত্সাহিত করবেন, যাদের হাত ধরে সাদা বর্ণবাদীরা আগ্রাসী হয়ে উঠবে।

বাস্তবে ট্রাম্প তার সমর্থকদের এমন অনেক ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন, যা অনেক বিভাজন সৃষ্টিকারী, এমনকি ভয়াবহও বটে। পরবর্তীকালে এগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে তা ভয়ানক জাতিবিদ্বেষ তৈরি করবে। পাশাপাশি নাগরিক অধিকার বিপন্ন হলে সাধারণ মার্কিন নাগরিক, বহিরাগত ও অভিবাসীরা হুমকির মুখে পড়বে। বিপরীতক্রমে তিনি যদি তার দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে কিছু বিষয় বাদ দেন, তাহলেও সমস্যা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে তাকে আবার পিছু হটতে হবে— যা তার সমর্থকদের আরো আগ্রাসী করে তুলতে পারে।

হোয়াইট হাউজে ওঠার পর ট্রাম্প অনেক বিষয় নিয়ে নিঃসন্দেহে চিন্তা করবেন। এক্ষেত্রে তিনি আগের অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণের পাশাপাশি ঝুঁকিও মাথায় রাখবেন। তিনি যদি একজন দায়িত্বশীল নেতার মতো চিন্তা করেন এবং আমেরিকার ঐক্য চান, তাহলে এ বিষয়গুলো মাথা থেকে ঝেড়ে রাষ্ট্র চালাবেন, যা তিনি প্রচারণায় ব্যবহার করেছিলেন।

সবকিছুর উপরে তিনি যদি মার্কিন সংবিধান সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হন, তবে এ ধরনের নানা ঝামেলা থেকে সহজে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। তিনি শুরুতেই সব ধরনের সংঘাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন। তার সমর্থকদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার যে শঙ্কা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে, এগুলো থেকে সবাইকে রক্ষায় তিনি অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে এখনই অপেক্ষাকৃত সহনশীল হতে পারেন। বিজয়ে আত্মহারা না হয়ে পুরো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলে ট্রাম্প সহজেই তার অবস্থান স্পষ্ট করতে পারবেন। সব ধরনের শত্রুতা ভুলে তিনি সবাইকে সাম্যের ভিত্তিতে একটি উন্নত দেশ গঠনে প্রণোদিত করতে পারেন। এক্ষেত্রে দলীয় ভেদাভেদের চেয়ে দেশের ঐক্যকে তিনি গুরুত্ব দিলে সংকট নিরসনের কাজটা সহজ হয়ে যায়।

এখানে ধরে নিতে হবে ট্রাম্প কোনো একক সত্তা নন। একজন নেতা হিসেবে তার উচিত সবার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা। এক্ষেত্রে কীভাবে তিনি তার প্রশাসন সাজাবেন, কীভাবে সবকিছু স্বাভাবিক করে তুলবেন— এ গুরুদায়িত্বটা তাকেই নিতে হবে। তিনি সবকিছু ওলটপালট করতে পারেন। তবে এর চেয়ে কোন ব্যাপারগুলোয় গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতি স্থির ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে— চোখটা সেদিকে ফেরালে সবার ভালো হয়। এজন্য সবার সমন্বয়ে একটি গ্রুপও গড়ে তুলতে পারেন তিনি। এক্ষেত্রে ট্রাম্প খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যাতে চলমান প্রশাসনিক কাঠামোর আমূল সংস্কার সম্ভব হয়। কর্মদিবস শুরুর ১০০ দিনে তিনি নানা ধরনের পরিবর্তন ও সংস্কারে মনোযোগ দিতে পারেন। পাশাপাশি এমন উদ্যোগ নিতে পারেন, যেগুলো তার নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে ঘৃণা ও বিভাজনের বীজ বপন করেছিল।

ট্রাম্পপন্থী কিংবা ঘোরতর ট্রাম্পবিরোধী প্রায় সব মানুষ, তারা রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যা-ই হোন না কেন— সবাই কিছু ব্যাপারে মিলেমিশে কাজ করতে চাইবেন। এক্ষেত্রে আগুন নিয়ে খেলার দিন শেষ হয়েছে। এখন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তোলার সময়।

বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও অলাভজনক খাতের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও বিজ্ঞদের উচিত শান্ত হয়ে আসা। সংঘাত ও ঘৃণার বাণীতে কোনো সমাধান নেই বলে বিষয়টিকে মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি সম্প্রদায়ের নেতাকে গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে, যাতে ভয়াবহ সংঘাত এড়ানো যায়। একজন পাবলিক ফিগার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের যে অবস্থান, তাতে তিনি সব বিভেদ দূর করে স্বাভাবিক অবস্থান ফিরিয়ে আনতে চাইবেন— এমন ভাবাটা হাস্যকর মনে হতে পারে। তবে তার বিজয়ী ভাষণে তিনি যেভাবে ‘প্রেসিডেন্ট ফর অল আমেরিকানস’ বলে উল্লেখ করেছেন, তার সঙ্গে আমি একাত্ম।

একটি দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে কিংবা পরে এগিয়ে যাওয়ার জন্য চাই ভিন্ন ভিন্ন দক্ষতা। তাই প্রথম ১০০ কর্মদিবসে তিনি চাইবেন বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার করতে। এ সময়টায় তিনি চাইবেন অন্তত স্থিতিশীলতা ও আস্থার জায়গাটা পোক্ত হয়ে উঠুক। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে আব্রাহাম লিঙ্কনের দ্বিতীয় উদ্বোধনী বক্তৃতার কথা। যখন গৃহযুদ্ধোত্তর আমেরিকা নানাভাবে বিভাজিত, তিনি বলেছিলেন— ‘লেট আস স্ট্রাইভ অন’ এবং ‘বিল্ড আপ দ্য নেশনস উওন্ডস।’ ট্রাম্প ব্যক্তি হিসেবে লিঙ্কন নন, কিন্তু বিজয়ী ভাষণে তিনি অনেকটা তেমনই উদ্যম দেখিয়েছেন। অনেকে ভাবছেন, তিনি এ রকমই বোঝাতে চেয়েছিলেন।

একটি ভেঞ্চার কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও লুসি মার্কেসের নিবন্ধ থেকে অনূদিত

(Visited 5 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *