আসন্ন জাতিবিরোধী বিপ্লব

কয়েক শতক ধরে বিশ্ব পর পর কয়েকটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে, যা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটেছে। এ বিপ্লব মানুষের মনস্তত্ত্বে একবার ঠাঁই নেয়ার পর কোনো ধরনের সীমারেখা না মেনে একের পর এক বিস্তৃত হয়েছে। যুদ্ধের মতো নানা ক্ষেত্রে না হলেও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ভাষার বাধা না মেনে এটা বিশ্বের প্রায় পুরোটা ছেয়ে গেছে। পরিণামে যে ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার সঙ্গে যুদ্ধের কোনো কারণের মিল নেই এবং তা বিতর্কের অধীন থাকেনি।

আমি মনে করি, আগামীতে ঘটতে যাওয়া এ ধরনের কোনো বিপ্লব, যা খুব সম্ভবত একুশ শতকেই হতে পারে— চ্যালেঞ্জ করে বসবে জাতিরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাবকে। এটা নানা অবিচারের বিরুদ্ধেও মুখ খুলবে, যা একাধারে ধনী কিংবা দরিদ্র সব দেশে দীর্ঘদিন থেকে হয়ে আসছে। মানুষ যত বেশি মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে কাজ করবে এবং নানা দেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারবে, তত তাদের বিচার সম্পর্কিত ধারণা প্রভাবিত হবে।

এটা তেমন অভূতপূর্ব কিছু নয়। ইতিহাসবিদ স্টিভেন পিঙ্কাস তার বই ১৬৬৬: দ্য ফার্স্ট মডার্ন রেভলিউশন গ্রন্থে কথিত ‘গ্লোরিয়াস রেভলিউশন’ নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন। এটাকে ব্রিটেন পার্লামেন্টে তাদের কোনো এক সদস্য বর্ণিত একজন ক্যাথলিক রাজা সম্পর্কিত ঘটনা যেমন বলা যাবে না, তেমনি ওই ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে সৃষ্ট কোনো সাধারণ দৃশ্যায়ন কল্পনারও সুযোগ নেই। বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে এর গুরুত্বকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগও থাকছে না কোনো দিক থেকে। যুদ্ধক্ষেত্রের কথা চিন্তা না করে ভাবা যেতে পারে একটি কফিশপের পরিবেশ নিয়ে। যেখানে সবাই সংবাদপত্র পড়ছে, নিজ নিজ মতামত পরস্পরের সঙ্গে সহজে বিনিময় করতে পারছে এবং জনপ্রিয় বিষয়গুলো তাদের আলোচনা থেকে বাদ পড়ছে না। আর এটা যদি সম্ভব হতো, তাহলে কোনো শক্তিশালী রাজাকে সরিয়ে দিতে মানুষের চিন্তাগত একতাবদ্ধতাই কার্যকর সমাধান বলে পরিগণিত হতো।

১৭৭৬ সালের জানুয়ারিতে থমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’ শীর্ষক পুস্তিকা বের হলে তা প্রায় ১৩টি কলোনিতে বেস্ট সেলারের মর্যাদা পায়। এটা এ ধরনের বিপ্লবের আরেকটি উদাহরণ, যা ব্রিটিশরা এর পরের বছর থেকে সরাসরি বুঝতে পেরেছিল। কমন সেন্স বইটা কত মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ এ বইয়ের যতগুলো কপি বিক্রি হয়েছে, ঠিক ততজনই পড়েছে এমনটা নয়। কারণ এটা বিভিন্ন চার্চে ও সভায় পড়তে দেখা গেছে বেশ নিয়মিতভাবে। এর পর ধীরে ধীরে বংশানুক্রমিক সম্রাটরা আধ্যাত্মিকভাবে তাদের সর্বেসর্বা অবস্থান থেকে নেমে আসতে থাকেন।

বিশ্বব্যাপী দাসপ্রথা অবলুপ্তির ঘটনাও উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা স্বাভাবিক কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি, বরং হিংস্রতা ও পাশবিক আচরণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও বৈপ্লবিক এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তা অর্জন করা গেছে। শুধু অভিজাত ব্যক্তিদের ভোটদানের ক্ষমতা বন্ধ করে সংখ্যালঘুসহ সবার অধিকার নিশ্চিতকল্পে ১৮৪৮-এর যে আন্দোলন, তা ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে আলোড়ন তুলেছিল বিশ্বব্যাপী। এর পর নারীদের যন্ত্রণাগুলো ধীরে ধীরে আলোচনায় আসে। বিশ ও একুশের দশকে এসে নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বাদ পড়েননি বর্ণ এবং সেক্সুয়াল দিক থেকে সংখ্যালঘু ব্যক্তিরাও। প্রায় প্রতিটি ‘জাস্টিস রেভলিউশন’ হয়েছে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রে যারা নিপীড়ক তারা মনে করেছেন, সবাইকে চেপে রাখা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে নির্যাতিত মানুষ ঠিকই নিজেদের বের হওয়ার পথ করে নিয়েছেন।

আসন্ন বিপ্লব হয়তো কোনো মানুষের জন্মস্থানের গতি-প্রকৃতি পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারবে না। তবে জাতীয়তাবোধ নিয়ে তাদের যে ধারণা তা পুরোপুরি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সম্প্রতি অ্যান্টি-ইমিগ্রান্ট যে চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছে, তা এ ধারণাকে উল্টোরথে চালনা করছে। যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের সেন্স অব ইনজাস্টিস আরো বাড়িয়েছে। অন্তত গায়ের জোরে মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ এখানে থাকছে না। তবে জাতীয়তাবাদী চিন্তার গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের চিন্তায় বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় সুবিধার কথা চিন্তা করে কেউ কেউ অভিবাসনের বিরোধিতা করছেন, যার বিপরীতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

পল এ স্যামুয়েলসন ১৯৪৮ সালের দিকে যে ‘ফ্যাক্টর-প্রাইস ইকুয়ালাইজেশন থিওরেম’-এ উল্লেখ করেন। বাজার ব্যবস্থার ওপর পরিবহন খরচ কতটা প্রভাব বিস্তার করে। পাশাপাশি উৎপাদন, শ্রমিকের মজুরি এবং বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতও বাজার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্ব পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক থাকে তবে মানুষকে তার ন্যায্য বেতনের জন্য এক দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও পাড়ি জমাতে হবে না। তারা এমন ক্ষেত্রে কাজ করবে, যে পণ্য উৎপাদনের পর বিশ্বব্যাপী বিক্রির সুযোগ রয়েছে।

প্রযুক্তি যেহেতু যাতায়াত ও যোগাযোগ অবারিত করেছে, তাই তার সূত্র ধরে উৎপাদন ও পরিবহন খরচও কমে যাবে বহুলাংশে। এক্ষেত্রে বাণিজ্যসমতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে তাই উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সেখানে বিদ্যমান বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ নিয়ে তার সফল বাস্তবায়নের সুযোগটাও থাকা চাই। ‘ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’-এর পাশাপাশি ‘ট্রান্স আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’-এর আওতায় যে ফ্রি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট আলোচনার অধীন, সুবিধাভোগী দলগুলোর কাছ থেকে তা নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের অভিমতই এসেছে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এবং প্রয়োজন অনুভব করি, এ ধরনের আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে।

ফ্যাক্টর প্রাইস ইকুয়ালাইজেশন অর্জনের জন্য মানুষকে এমন একটি ভিত্তি দাঁড় করাতে হবে, যার ওপর পুরো জীবনের কর্মক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা পায়। এতে একটি দেশে থেকেই তারা বিভিন্ন স্থানের কাজ করতে পারবেন, দৈহিকভাবে অন্যস্থানে উপস্থিত হওয়ার তেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে না। এখনকার জাতিরাষ্ট্রে ফরেন ট্রেড থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে প্রবণতা, তা দূর করতে গেলে এ অবস্থান নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই। ট্রেড অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স তথা টিএএ ১৯৭৪ সালের দিকে আসন্ন পতন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি আর্নিং সাপ্লিমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে একই ধরনের অভিজ্ঞতা ১৯৯৫ সালের দিকে হয়েছে কানাডার। ইউরোপিয়ান গ্লোবালাইজেশন ফান্ড ২০০৬ সালের দিকে যাত্রা করলেও তাদের মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ছোট বাজেট ছিল। এর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টিএএ প্রোগ্রাম আরেকটু এগিয়ে নিতে মনস্থ করেন। তার পর থেকে এর বেশ উন্নয়নও চোখে পড়েছে।

বাস্তবে আগামীর বিপ্লব হতে পারে কম্পিউটার মনিটরের সামনে বসে বিভিন্ন দেশের মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রে সবাই হবে অনেক বুদ্ধিমান ও করিতকর্মা। এক্ষেত্রে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য কী করতে হবে, তা মানুষ নিজেই বেছে নিতে শিখবে। এর সূত্র ধরেই আরো সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নানা বাণিজ্য চুক্তি করা সম্ভব হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে হিসাব করতে গেলে, এ উদ্যোগের ফলেই সম্ভব হবে সমরূপী একটি উন্নয়ন; যেখানে মানুষ স্ব স্ব সামাজিক পরিকাঠামোর মধ্যে থেকেই উন্নয়নের সুবাতাস প্রত্যক্ষ করতে পারবে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জেমস শিলারের লেখা থেকে ভাষান্তরিরত

(Visited 36 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *