ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা

সম্পাদকীয়

ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা

কেনেথ রগফ| ২১:৩৫:০০ মিনিট, জুলাই ০১, ২০১৬

 

 0 Shares

যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত, সেখানে ব্রিটেনের স্বার্থ থেকে অভিবাসী প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বের হয়ে আসার যে প্রক্রিয়া, সেখানে বাধা ছিল বেশ ক্ষীণ। অন্তত ৭০ শতাংশ ভোটার টার্নআউট থেকে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৩৬ শতাংশ উপযুক্ত লোকের ভোট পেয়েই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এটিকে গণতন্ত্র না বলে রাশিয়ান রুলেট ফর রিপাবলিক বলা যেতে পারে। উপযুক্ত চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বাদেই এখানে সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে।

মাত্র বছরকাল পেরিয়ে যাওয়ার পর যদি এ ভোট আবার হয়, সেখানে কী ফলাফল আসবে? পার্লামেন্টের একটি বড় সংখ্যক মানুষ কি এই ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেন? বাস্তবে সেটি নয়। ইংল্যান্ডের জনগণ কি জানে যে তারা কেন, কীসের জন্য ভোট দিচ্ছে। অবশ্যই নয়। বাস্তবে এদের কেউই জানে না যে, এই ভোটগ্রহণ ইংল্যান্ড কিংবা বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে। আমি আতঙ্কিত যে, এভাবে ভোটগ্রহণ থেকে কোনো ভালো কিছু আশা করা দুরাশার নামান্তর হবে।

ধরা যাক, পশ্চিমের মানুষ বেশ স্বস্তিতে বাস করছে। বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় এবং গৃহযুদ্ধের শঙ্কা কমে গেছে অনেকাংশে। কিন্তু সেখানে কী লাভ এমন গণতন্ত্রের চর্চা করে, যা আরো অনেকের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। এটি সত্যিই অনেক বেশি যে, বৃষ্টিভেজা দিনে মাত্র ৫২ শতাংশ ভোট নিয়েই এত বড় একটি বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। স্থায়িত্ব থেকে আরো অনেক প্রশ্নের মুখে সরকার নানা সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। এক্ষেত্রে ডেভিড ক্যামেরনের সরকার ইইউ থেকে বের হয়ে আসার প্রশ্নে যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন, তার পেছনেও এমনই দ্যোতনা কাজ করে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে ব্রেক্সিটই প্রথম বলা যায় না, এমন নজির আরো রয়েছে। বলা যেতে পারে ২০১৪-এর স্কটল্যান্ডের কিংবা ১৯৯৫ সালে কুইবেকের ঘটনা। তবে যা-ই হোক, বন্দুক থেকে ছোড়া গুলি আর ফেরত নেয়া যায় না। তাই এখনই সময় বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার।

একটি ধারণা বেশ প্রচলিত যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে যেটি হবে, সেটিই সর্বজনস্বীকৃত ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু এটিই এর পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। মডার্ন ডেমোক্রেসিতে এ বিষয়গুলোকে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করতে গিয়ে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এতে করে অন্তত যা-ই হোক, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সমরূপী সিদ্ধান্ত কারো জন্য ভয়াবহ হয়ে দেখা না দেয়, এমনটা নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত যত বেশি মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে এবং বেশি দিন টিকে থাকবে, সেটিই সিদ্ধান্ত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। এদিক থেকে চিন্তা করেই ধরা হচ্ছে, কীভাবে এ পদ্ধতির অসারতা দিনকে দিন আরো প্রবল হচ্ছে। বিশেষ করে দুটি দেশ বিভাজিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এ ধরনের জটিলতা যখন দেখা দিচ্ছেই, সেখানে পান করার বয়স নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্তগুলো নিতে এ পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে। সেখানকার অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে আরো বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে এ বিষয় কার্যকর হবে কিনা, তা বিচার করার সুযোগ এনে দিতে পারবে। এ ভোট নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ বিভাজনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে এখনো জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিশেষ করে এই ভোট হওয়ার আগে সমাজবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিকদের মতামতকে তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এক্ষেত্রে যাদেরই মতামত নেয়ার কথা ছিল, তাদের বেশির ভাগ একবাক্যে না করে দিয়েছেন, তবুও হয়েছে গণভোট।

ব্যালটের দিক থেকে চিন্তা করলে খুবই সাধারণ একটি ভোটপ্রক্রিয়া ছিল ব্রেক্সিট সামনে রেখে অনুষ্ঠিত এ গণভোট, তবে তার ফলাফল হ্যাঁ-সূচক হলে ক্ষতিটা কি হবে, এটি নিয়ে বেশির ভাগ মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না। এর মধ্য দিয়ে জানা গেছে, নন-ডিফাইনিং তথা অসংজ্ঞায়িত বিষয়গুলোয় সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেশেই থাকে কিছু সুপার মেজরিটি এবং ইংল্যান্ডের এ ক্ষেত্রে তারাই সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ থেকে শুরু করে গ্রহণযোগ্য মানে ৬০ শতাংশ, যা-ই হোক না কেন সবার মতামতের প্রতিফলন সেখানে ঘটে না। একটি দেশ কখনই এমন দুষ্পরিবর্তনীয়, ফান্ডামেন্টাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রেজর থিন মাইনরিটির ভোটকে এত গুরুত্ব দিতে পারে না, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগ বিবেকের চেয়ে অগ্রগামী হয়েছে। এমনকি এ সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ব্রিটেনের মুদ্রার মান পর্যন্ত ধপ করে পড়ে যাবে, এমন চিন্তাও তাদের মাথায় ছিল না। পাশাপাশি এ সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে তাদের ভাবনার প্রশ্নই ওঠে না।

প্রাচীন যুগ থেকেই দার্শনিকরা পদ্ধতিগত সংস্কার করে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে ভিন্নমতের প্রতিফলন ঘটাতে সচেষ্ট হয়েছেন। প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টান অ্যাসেম্বলিতে কণ্ঠভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চল ছিল। এক্ষেত্রে মানুষ তার প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কণ্ঠভোট আয়োজন করত, যা একজন বিচারক হিসাবের মাধ্যমে নির্ধারণ করতেন সংখ্যাগরিষ্ঠের চাহিদা কোনটি। এটি অনেক ক্ষেত্রে অপূর্ণ থাকত, তবে সম্প্রতি ব্রিটেনে যা হয়ে গেছে, তার চেয়ে ভালো ছিল। অনেক সূত্র থেকে জানা গেছে, স্পার্টার সিস্টার স্টেট এথেন্সে ছিল বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ। সেখানে সব শ্রেণী-পেশার পুরুষ নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতেন। একমাত্র বিপত্তিকর যুদ্ধের সিদ্ধান্তগুলো বাদ দিলে এথেন্স প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণে গুরুত্ব দিয়েছে।

এখানে ইইউর সদস্যপদ নিয়ে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্ন ওঠে তবে যুক্তরাজ্য কি করবে? নিঃসন্দেহে এক্ষেত্রে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হবে। অনেক দিক থেকে চিন্তা করতে গেলে তাদের জন্য ব্রেক্সিট প্রয়োজনীয় হয়েই দেখা দিয়েছিল। এক্ষেত্রে হাউজ অব কমন্সের ৬০ শতাংশ ভোট সে একই সিদ্ধান্তের সপক্ষে থাকেনি। এক্ষেত্রে ব্রেক্সিট যদি টিকেই যায়, তবে এটিকে আমরা কখনই জনগণের একাংশের ওয়ান টাইম স্ন্যাপশট বলতে পারি না। যুক্তরাজ্যের এ গণভোট ইউরোপকে এক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এর অনেক বিষয় নির্ভর করছে বিশ্ব কি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার ওপর এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকার কীভাবে তাদের গুছিয়ে নেবে, এটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো দেশের আর্থ-রাজনৈতিক সীমারেখা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাই এমন একটি ওয়ান টাইম ভোট যথেষ্ট নয়। সিম্পল মেজরিটি রুলের ক্ষেত্রে চলমান বিশ্বে যা দেখা যাচ্ছে, এখানেও তাই হয়েছে— একটি বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

ইকোনমিকস অ্যান্ড পাবলিক পলিসি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কেনেথ রগফের লেখা থেকে ভাষান্তরিত।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!