অর্থনীতিবিদ বনাম অর্থনীতি

সত্যি বলতে কি— পুরো বিশ্বের অর্থনীতির হালচাল এখন কেমন, সেটি ঠিকমতো কারোরই তেমন জানা নেই। ২০০৮ সালের দিকে অর্থনীতিতে যে ছন্দপতন হয়েছিল, তার থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অনেক শ্লথ। এক্ষেত্রে অর্থনীতি কি পূর্বতন অবস্থায় ফিরে যাবে, নাকি সেটা ‘সেক্যুলার স্ট্যাগনেশনের’ প্যাঁচে আটকা পড়বে— এ প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে। এদিকে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রভাবটা তার ওপর কেমন? আর বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া এক্ষেত্রে কার্যকর নাকি স্তিমিত হয়ে পড়ছে— প্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েও।

নীতিনির্ধারকরা আসলে এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না আসলে কী করতে হবে। তারা স্বাভাবিক কিংবা অবাস্তব নানা বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে ঝামেলা বাড়িয়ে তুলছেন নানা দিক থেকে। এক্ষেত্রে নানা দেশে দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। যারা ‘ব্যাক টু টার্গেট’ পলিসি নিয়ে এগিয়ে চলেছে, তাদের হিসাব বাদ দিলে বাকিদের অবস্থা বেশ সঙ্গিন। অর্থনীতির নানা বিধি এখানে যেমন মানার প্রবণতা দেখা যায়নি, তেমনি পূর্বতন আস্থা ফিরে পেতেও সময় লেগে যাচ্ছে বেশ। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নে গত মাসের গোড়ার দিকে এ প্রসঙ্গে একটি বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর বক্তব্যের শিরোনাম ছিল ‘দ্য স্পেকটর অব মনস্টারিজম’। এক্ষেত্রে কেইনসীয় অর্থনীতির আশাবাদী ধারা অনেকটাই হোঁচট খেতে দেখা গেছে মনস্টার মতাদর্শীদের কাছে।

বাস্তবে কাজে লাগানোর মতো তেমন কোনো ম্যাক্রোইকোনমিক টুলস নেই। এক্ষেত্রে একটি পথই খোলা রয়েছে, সেটি হচ্ছে কাঠামোগত সংস্কার। তবে কেউ মূল বাস্তবতার সঙ্গে একমত হতে পারছেন না। জনসমর্থন প্রত্যাশী নেতারা সব ক্ষেত্রে ওই পথ বাতলে নিতে চাইছেন, যা অন্তত জনগণের আস্থা পূরণে যথেষ্ট হয়। অন্যদিকে অর্থনীতি হচ্ছে একটি পদ্ধতি, যেখানে বেলা শেষে জয়টা তারই হবে, যে অন্তত ব্যবস্থাপনার কাজটা ভালো করতে পারে। এখানে জনসমর্থনের রাজনীতি ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ২০০৮ সালের আগে বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন, পুরো বিষয়টি একটি নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনা প্রয়োজন। হ্যাঁ, সেখানে বেশকিছু খাতে নানা সমস্যা ছিল। এর থেকে উত্তরণের চেষ্টায়ও দেখা গেছে নানা জটিলতা। যেমন— ফেড চেয়ারপারসন জ্যানেট ইলেন ২০০৫ সালের দিকে বলেছেন, তাদের আবাসন খাতে বেশকিছু উন্নতি চোখে পড়েছে কিন্তু বাজার ব্যবস্থার কারণে সে উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারেনি সেভাবে। এর পর তাদের পথ-ঘাট উন্নয়নের বেশকিছু উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে বেলা শেষে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে, এত উন্নতি সত্ত্বেও তাদের অর্থনীতির অমন দুরবস্থা কেন? এ ধরনের প্রশ্নই লন্ডনের রানী এলিজাবেথ ২০০৮ সালে রেখেছিলেন একদল অর্থনীতিবিদের কাছে। এক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রত্যেকে নানা কথা বললেও মূল প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগ সবাই। শেষ পর্যন্ত নিজের মতো করে একটি ব্যাখ্যা উপস্থিত করে আপাতত পার পাওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ করা গেছে তাদের মধ্যে। এখানে অনেকে অর্থনীতি শিক্ষার নানা দুর্বলতা নিয়ে চরম সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষার সুষম অবস্থান না থাকার কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বেশির ভাগ অর্থনীতি শিক্ষার্থী অন্তত মনোবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস কিংবা রাজনীতির পাঠ নিচ্ছেন না। তাদের অনেকটা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া হয় শুধু অর্থনীতির নানা বিষয়। শেষ পর্যন্ত কিছু তত্ত্বকথা আর গাণিতিক হিসাবের বাইরে তাদের জানাশোনার গণ্ডিতে আর কিছুই থাকে না বলা চলে। পুরো পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন, তাদের তা থাকে না বললেই চলে।

গত ১৯ শতকের অনেক বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের প্রসঙ্গ আনা যেতে পারে এক্ষেত্রে। তিনি মনে করতেন, শুধু অর্থনীতি পড়ে কারো পক্ষে পুরোদস্তুর অর্থনীতিবিদ হওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মিলদের সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে অনেক বড় করে দেখা হতো। এক্ষেত্রে আরো অনেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধ্যয়ন অনেকটা বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে পড়ত। তখন মনে করা হতো, মানববিদ্যার কোনো বিষয়ই একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তখনকার দিনে সমাজবিজ্ঞানের আরো নানা বিষয় পড়ে তার পর বোঝার চেষ্টা করা হতো অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কেমন হবে। বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা চলকের উপযুক্ত অধ্যয়নের জন্য আর কী কী প্রয়োজন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নিতে দেখা গেছে সে সময়ে। ফলে অর্থনীতির পাঠ তখন কেবল অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

একমাত্র কারণ হিসেবে মনে করার কোনো সুযোগ নেই যে, অর্থনীতিতে শুধু যুক্তিবিদ্যাকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এখানে অনেক সত্য ও মিথ্যা থেকে মূল বাস্তব বেছে নেয়া হয় বলে শুধু যুক্তিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে বরং পুরো ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা অনেক গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে পারে সময়ের পরিক্রমায়। অন্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় এখানেই বিশেষজ্ঞরা দাবি করতে পারেন, নানা বাস্তবতা কীভাবে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে সেই বিষয়কে। এখানে আপাতদৃষ্টিতে অনুমানের কোনো সুযোগ নেই বলা যেতে পারে। তুলনামূলক যেকোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে বাস্তবতা আর যুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে দেখা গেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। অনেকটা মেশিনের মতোই তাত্ত্বিকরা তত্ত্বগুলো দিয়ে গেছেন, ওই তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটুকু, তা বুঝে উপযুক্ত বিশ্লেষণ করার দায়টা বর্তায় অর্থনীতিবিদের ওপরই। এক্ষেত্রে নন্দিত মার্কিন অর্থনীতিবিদ আরভিং ফিশার একটি হাইড্রোলিক মেশিনের সঙ্গে তুলনা করে গেছেন অর্থনীতিকে। এখানে চাপ এবং তার বিপরীত বাস্তবতা কেমন হবে, সেটি অনুমান করে নেয়া যায় সহজেই। সরবরাহ কিংবা চাহিদার ভিত্তিতে বাজার ব্যবস্থা ও সাম্য অবস্থা কখন কীভাবে আসতে পারে, সেটি নিয়ে নতুন করে বলার নেই।

এখানে কেউ যদি অর্থনীতিকে একটি মেশিন মনে করে, তবে সে অর্থনীতির সমস্যাগুলোকে গাণিতিক সমস্যা বলেই মনে করবে। একটি দক্ষ রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সাম্য অবস্থা আনতে অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করে সমাধানে আসতে হয় অর্থনীতিবিদদের। তারা কিছু গাণিতিক সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে সব ধরনের জটিলতা নিরসনের চেষ্টা চালান, যার প্রতিটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর নাও হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে আরো বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয় তাদের। এর কিছু কিছু জনহৈতিষী হলেও বেশির ভাগ জনবান্ধব নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে গেলে নিজ নিজ রীতির বাইরে যাওয়ার প্রবণতা অর্থনীতিবিদদের নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসৃত না হলে হোঁচট খাওয়ার ভয় থেকেই যায়, যার থেকে মুক্ত নন কোনো অর্থনীতিবিদ।

গুণী অর্থনীতিবিদরা মেনে চলেন প্রতিটি পদ্ধতিরই একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এক্ষেত্রে তারা অর্থনীতিকে মনে করেন নানা সমস্যা সমাধানের একটি মাধ্যম। প্রতিটি বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করতে তার শিষ্যদের সতর্ক করেছিলেন জন মেইনার্ড কেইনস। ‘দ্য জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি’ গ্রন্থে তিনি কোনো মডেল নিয়ে তেমন বাড়াবাড়ি করেননি। তিনি গাণিতিক সমাধানের পাশাপাশি বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী ছিলেন নানা দিক থেকে। জোসেফ শুম্পিটার এবং ফ্রেডরিখ হায়েকের মতো অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ আবার অর্থনীতিকে দেখেছেন মেশিন হিসেবে। বিশেষ করে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে বিতর্কে জড়িয়েছে শুম্পিটার, যেখানে তিনি মনে করেন পুরনো অনেক সম্পর্কের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে এই নীতি। অন্যদিক হায়েক ম্যাজিক অব মার্কেটের প্রশ্ন তুলে দেখাতে চেয়েছেন কিছু ভিন্ন যুক্তি, যা সাধারণ সাম্য অবস্থা নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু এক্ষেত্রে যুক্ত বিভিন্ন চলক প্রসঙ্গে তেমন কিছু বলতে পারেননি তিনি।

বিস্তৃত পরিসরের শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রায় সব অর্থনীতিবিদ কমবেশি একমত হতে পেরেছেন। এর মাধ্যমেই তারা অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজ নিজ মত প্রদানের সুযোগ পেয়েছেন। পূর্বতন প্রজন্মের অর্থনীতিবিদরা নিজের অনুষদের বাইরেও আরো অনেক বিষয় সম্পর্কে বেশ ভালো করে জানতেন। কেইনস মূলত গণিতে স্নাতক ছিলেন, যিনি অর্থনীতির পুরো ধারণা পাল্টাতে ভূমিকা রেখেছেন। শুম্পিটার ছিলেন আইনে পিএইচডি, হায়েক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতেন। তিনি এর বাইরে দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং ব্রেন অ্যানাটমি নিয়েও বিস্তর পড়েছেন।

আজকাল পেশাদার অর্থনীতিবিদরা পারতপক্ষে এক অর্থনীতি বাদে আর কিছুই পড়েন না। তারা নিজের অনুষদের ধ্রুপদী গ্রন্থগুলো পর্যন্ত পড়ে দেখার ফুরসত পান না। যা-ই হোক, অর্থনৈতিক ইতিহাস আর কিছুই না, এটি আসে পুরনো সব তথ্য ও উপাত্ত থেকে। দর্শনশাস্ত্রই পারে তাদের শাস্ত্রীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে। পক্ষান্তরে গণিত তাদের চিন্তাকে পুরোপুরি এককেন্দ্রিক করে তুলেছে। এজন্য কেউ কেউ বলে অর্থনীতিবিদরা এখনকার সময়ের ‘ইডিয়টস স্যাভেন্ট’।

রবার্ট স্কাইডেলেস্কির লেখা থেকে অনূদিত।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!