ট্রাম্পের নয়া অরাজকতা

শেষ পর্যন্ত এই ছিল কপালে! ২৭ বছর পার হয়ে গেছে সেই বার্লিন প্রাচীরের ভাঙা কিংবা ইউরোপের সমাজতন্ত্রের পতন ঘটার। আর এমন সময় এসে লিবারেল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার অনেক বড় একটা ধাক্কা খেয়ে বসল ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের  প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। মনে করা হচ্ছে, একটি উদারনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরিতে পূর্বসূরিদের যে চেষ্টা, তা এক রকম মাঠে মারা গেছে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ‘অ্যান্টি-গ্লোবালিস্ট’ নীতি বিশ্ব ব্যবস্থায় বড় রকমের হুমকি সৃষ্টি করবে। যেখানে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ আরো প্রকট হবে। বিঘ্ন ঘটবে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনায়। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় নানা অচলাবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য আবার অশান্ত হয়ে উঠবে— এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে শুরু থেকেই। তার জাতীয়তাবাদী ও একনায়কতান্ত্রিক মতাদর্শ ভিন্নমত ও পথের মানুষের টিকে থাকা কঠিন করে দেবে। এক্ষেত্রে অন্যদের হেয় করার যে প্রবণতা বিস্তার লাভ করবে, তার দ্বারা তৈরি হবে আমেরিকান হিজিমনি; ক্ষতির মুখে পড়বে লিবারেল ডেমোক্রেসি। পুরো ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেমই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা একদম উড়িয়ে দেয়া যায় না। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই বদলের কারণে বিশ্বের নানা দেশ থেকে এরই মধ্যে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

আশাবাদীরা মনে করেন, ট্রাম্প ঠিক সেভাবে সামনে এগিয়ে যেতে চাইবেন না, যেটা নির্বাচনে প্রচারণার খাতিরে তিনি বলেছেন। এবং বিশ্ব ব্যবস্থায় আস্থা রেখে আমেরিকা তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নীতির প্রয়োগ হয়েছে, তার থেকে সুফল পাওয়ার সুযোগও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটা নিছক আশার কথা, ট্রাম্পের প্রদর্শিত আচার-আচরণ কিন্তু এমন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে না। এবার সিনেট থেকে শুরু করে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ— সবখানে রিপাবলিকানদের জয়-জয়কার দেখে ধরে নেয়া যায়, অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক স্বাধীনভাবে দেশ চালাতে পারবেন। এটা বিশেষ করে বাণিজ্য ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে আগের কোনো প্রেসিডেন্ট এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। অনেক বিষয় চিন্তা করে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করতে হয়েছে, যা থেকে ট্রাম্প আপাতত মুক্ত বলা যেতে পারে।

বাণিজ্যের কথাই ধরা যাক। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া কয়েক বছর ধরে প্রায় স্থবির হয়ে আছে। এখন ট্রাম্প এ প্রক্রিয়াকে সরাসরি বিপরীত দিকে ঠেলতে চাইছেন। বারাক ওবামার সময় যে দুটো বড় বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল, তার ভবিষ্যত্ পুরোপুরি ফিকে হয়ে গেছে ট্রাম্পের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। প্রায় ১১টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের সঙ্গে যে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ তথা টিপিপি চুক্তি করা হয়েছিল, এর ভবিষ্যত্ অনেকটাই অনিশ্চিত এখন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যে ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ তথা টিটিআইপি চুক্তি করা হয়েছিল, এর বাস্তবায়নও এখন অনেকাংশে রুদ্ধ হওয়ার পথে। এদিকে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই নর্থ আটলান্টিক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট তথা কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে কৃত নাফটা চুক্তি নতুন করে বিবেচনায় নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি এর মধ্য দিয়ে চীনের বাণিজ্যের ওপর চপেটাঘাত করতে চেয়েছিলেন, যা সরাসরি একটি বাণিজ্য মহাসমরের ইঙ্গিত দেয়। তিনি এর বাইরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন তথা ডব্লিউটিওকে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, যা অনেক রাষ্ট্র মিলে একটি বাণিজ্যক্ষেত্র তৈরির প্রয়াস হিসেবে পরিচিত ছিল।

ট্রাম্পের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে বৈশ্বিক মন্দাভাব সৃষ্টি হতে পারে। এক্ষেত্রে আঞ্চলিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্যক্ষেত্র তৈরির শঙ্কা আরো প্রকট হচ্ছে। এদিকে ব্রেক্সিটের পর বাণিজ্যক্ষেত্রে ব্রিটেনের একঘরে হয়ে পড়ার কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যারা এখনো ধুঁকছে। এশিয়ায় টিপিপিতে ভাঙন ধরতে পারে, যেখানে ওবামা প্রশাসন ভুল করে চীনকে বাইরে রেখেছিল। চীনকে বাইরে রাখায় তারা সহজেই নিজেদের মতো আরেকটি ব্লক তৈরি করে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে এখন অনেকটা সফল।

ট্রাম্পের বিজয় পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তাকে নতুন করে হুমকির মুখে ঠেলে দিল, যার বাইরে নয় এর অর্থনীতিও। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধ শক্তিগুলোকে আরো দুর্বল করে দিতে তাদের বিরোধীদের নতুন করে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে চাইবে তারা। ফলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ পারমাণবিক অস্ত্রে সক্রিয় হয়ে উঠে চীনের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিতেও পারে। এদিকে প্রভাবিত দেশের মধ্যে ফিলিপাইনের কথাও বলা যেতে পারে, যারা আমেরিকার থেকে দূরত্ব হেতু দিনের পর দিন চীনের থেকে বাঁচার চেষ্টা করে এসেছে।

ট্রাম্পের বিজয়ে ইউরোপের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রাশিয়ার স্বৈরশাসক পুতিনের সঙ্গে তার সখ্য সত্যি চোখে পড়ার মতো। পুতিন রুশ ফেডারেশনের পতনকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি চাইছেন নতুন করে ওই এলাকায় রাশিয়া শক্তিমত্তা বিস্তার করুক। এ উদ্দেশ্যে তারা এরই মধ্যে জর্জিয়া ও ইউক্রেনে হস্তক্ষেপ করে বসেছে। এক্ষেত্রে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান কার্যত পুতিনকে আরেকটু সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগই করে দিতে পারে।

এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার মতো বাল্টিক দেশগুলো, যারা একটা পর্যায়ে রাশিয়ার অধীনে ছিল এবং বর্তমানে ন্যাটোভুক্ত; নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় তারা হুমকির মুখে পড়বে। এক্ষেত্রে ভঙ্গুর ইইউর পতন আরো দ্রুত হয়ে যেতে পারে, যাতে বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ বেশ সহজেই অন্যদের ওপর প্রভাব  আরো নিরঙ্কুশভাবে বিস্তার করতে পারে। বাস্তবে এ অবস্থা বুঝতে পেরে ইউরোপের অনেক নেতা প্রতিরোধ ভুলে সরাসরি পুতিনের সামনে মাথা নুইয়ে চলতে শুরু করেছেন।

ট্রাম্পের সরাসরি বর্ণবাদকে সমর্থন ও উসকানিমূলক মনোভাব হিস্পানিক অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান আরো প্রকট করবে। পাশাপাশি তার ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব একটি সাংস্কৃতিক সংঘাত থেকে শুরু করে আমেরিকার ভেতরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাস্তবে তার এ চিন্তা নতুন করে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’কে প্রণোদিত করছে, যা স্যামুয়েল হান্টিংটন অনেক আগেই ইঙ্গিত করে গেছেন।

এদিকে মেক্সিকোর বিশাল সীমান্ত নিয়ে তাদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই আচরণ লাতিনদের সঙ্গেও সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। মুসলমানদের সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আমেরিকায় প্রবেশের পথ রুদ্ধকরণের যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তার কুফল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো বড় হয়ে উঠবে। এদিকে তার ইঙ্গিত অনুযায়ী ইসলামিক স্টেট ও আল কায়েদাকে দমন করার প্রয়োজনে ইরাকের সব তেলক্ষেত্র নিজেদের দখলে নেয়ার চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

আমেরিকা এত দিন যে সফট পাওয়ার ও লিবারেল ডেমোক্রেসির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালিয়েছে, তার দ্বার সরাসরি রুদ্ধ হয়ে গেছে এখন। একজন ফ্যাসিস্ট টেনডেন্সির রেসিস্ট প্রেসিডেন্টের জয়লাভ আর যা-ই হোক, আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে।

যদিও ট্রাম্প নিজে ডেমোক্রেসি নিয়ে ঘৃণার বাণী ছড়িয়েছেন বহুবার। তিনি নিজে যদি নির্বাচিত না হন, তবে নির্বাচনের ফল মানবেন না। পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে জেলে ঢোকানোর কথাও বলেছেন বারবার। এক্ষেত্রে চীনের কর্মকর্তাদের আর সেখানে কাজ করার সুযোগ তেমন থাকছে না, যেখানে শুরু থেকেই প্রতিরোধ আর ঘৃণার বাণী উচ্চারণ করে একে একে সামনে এগিয়েছিলেন ট্রাম্প। বাস্তবে আমেরিকা এখন আর সেই ‘সাইনিং সিটি আপন দ্য হিল’ নেই, যা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন পূর্বতন প্রেসিডেন্টরা।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনবিরোধীরা এখন তাদের পালে নতুন করে হাওয়া লাগাতে পেরেছেন। দিনের পর দিন কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা সমস্যায় হতাশ আমেরিকানরা আস্থা হারিয়েছিলেন তাদের অভিজাতদের ওপর থেকে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি থেকে শুরু করে আরো নানা কারণে তারা হতাশ ছিলেন। তারা সোস্যাল লিবারেলিজমকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করেছিলেন, যেখানে তাদের দুরবস্থার জন্য দুষতে থাকেন অভিবাসীদের। এক্ষেত্রে তারা উপযুক্ত বিকল্প না পেয়ে বাধ্য হয়েই বেছে নিয়েছেন এমন একজন প্রার্থীকে, যে অন্তত কিছুটা হলেও এসব নিয়ে ভেবেছেন। এ থেকে ধরে নেয়া যায়, নির্বাচনপূর্ব জরিপ থেকে যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, ফ্রান্সের আসন্ন নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত ডানপন্থী মেরিন লে পেন খুব সহজেই জয়ী হতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে আরেকটা বড় আঘাত আসবে ইউরো, ইইউ ও পশ্চিমের প্রতি। লিবারেল ইন্টারন্যাশনালিস্টরা খুশি কি বেজার হলেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রবাসীর কিছু যায় আসে না। সবদিক থেকে ধরতে গেলে ট্রাম্পের বিজয় এক কথায় একটা বিপর্যয়; এটাকে যেমন চিন্তা করা হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি কিছু। আমাদের উচিত মুক্ত চিন্তার পথ যেন রুদ্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উদ্বিগ্ন ভোটারদের মানসিকতায় পরিবর্তন জরুরি, যা বিশ্বকে সহনশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে।

ইউরোপিয়ান কমিশন প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ফিলিপ্পে লেগারিনের লেখা থেকে অনূদিত।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!