দ্য রিয়েল বিজনেস অব বিজনেস

যখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইঁদুর দৌড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্ত হয়েছেন, তখন থেকেই নৈতিকতার স্খলন, বৈশ্বিক বাণিজ্য বিস্তারের উচ্চাভিলাষ আর এমনই কিছু বিষয় অনেকটা টাইম বোমার মতো সেট হয়ে ছিল। আর সেই বোমাটার বলা যায় বিস্ফোরণ ঘটেছে গত ২০ জানুয়ারি।

অনেক উদার গণতান্ত্রিক দেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যেখানে একনায়কতান্ত্রিক আমেজ প্রত্যক্ষ করেছে, সেখানে স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি বাক স্বাধীনতাকেও সীমাবদ্ধ করে তোলা হয়েছিল। প্রচার মাধ্যমের নিজের মতো করে কাজ করার সুযোগও রাখা হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ ফাঁদ থেকে মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে। এখানে বিদ্যমান চেক অ্যান্ড ব্যালান্স নীতি অন্য যে কোনো দেশ থেকে দেশটিকে আলাদা করেছিল।

তবে নতুন করে ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আগে থেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানে সেভাবে থাকেননি, তার পক্ষে জনগণের সামনে উত্তেজক বক্তব্য রাখা যেমন সহজ, তেমন সহজ হবে না রাষ্ট্র পরিচালনার কাজটি। দ্রুততার সঙ্গে যেকোনো সমালোচনার জবাব দিয়ে পাবলিক ফিগার হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প অতীতেও অনেক কাজ করেছেন, যেটা সবার কাছে পছন্দসই মনে হয়নি এবং এ ধরনের কর্ম তিনি ভবিষ্যতেও করবেন বলে মনে হচ্ছে।

ট্রাম্পের ট্রানজিশন টিম এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জিতে জরিপ চালিয়েছে। তারা খুঁজে বের করেছে, যারা ক্লাইমেট চেঞ্জ পলিসি নিয়ে কাজ করেন তাদের। তিনি তার জামাতা জেরার্ড কুশনারকে হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব করেছেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে উত্থাপিত রাশিয়ার হস্তক্ষেপে নির্বাচনে কারচুপির কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন। নািস নিয়ন্ত্রিত জার্মানির উদাহরণও টানতে চাইছেন কেউ কেউ, যা নিয়ে বিস্তর বিবাদ চলছে বিশ্বজুড়ে।

বিশেষজ্ঞদের যুক্তি ও বক্তব্যকে উড়িয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি বরং তাদের অদক্ষ ও অকর্মণ্যের খাতায় নাম লেখানোর দায়ে দুষতে শুরু করেছেন। তবে সবার বক্তব্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্ট যদি দেশটির পাশাপাশি পুরো বিশ্বের মানুষের নিরাপত্তা ও ভালোর কথা চিন্তা না করেন, এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

সবচেয়ে ভয়ানক দিক হচ্ছে, কোনো প্রেসিডেন্ট নিজেই যখন সংশয়বাদকে আঁকড়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করেন, তখন সবকিছুকে তিনি নিরাপত্তার অজুহাতে নিজের মতো করে বদলে নিতে চাইবেন— সেটাই স্বাভাবিক। অন্তত অনৈতিক আচরণগুলো এ পর্যায়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকে নানা সমস্যা ও সংশয় নিয়ে কথা বলছেন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর শপথ অনুষ্ঠানেও ওই সমস্যাগুলো দূর করার জন্য সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিতে কী কী করণীয়, তা স্পষ্ট করতে বাদ রাখেননি।

ট্রাম্পের দলে যারা কাজ করছেন, তাদের অনেকেই পূর্ব অভিজ্ঞতার বিচারে একেবারেই নবিশ কিংবা যথাযথ যোগ্যতা না নিয়েই কাজ শুরু করেছেন। ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন অনেকেই। তার মধ্যে কেলিন কনওয়ে ট্রাম্পের আচরণ নিয়ে উত্তর দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ছিলেন, বর্তমানে হোয়াইট হাউজের কাউন্সিলর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। তার যুক্তি হচ্ছে— ট্রাম্প এখন প্রেসিডেন্ট, তাই তার আচরণ হবে একজন প্রেসিডেন্টের মতো। ট্রাম্পও তার কাউন্সিলরের সঙ্গে মিল রেখে জানিয়েছেন যে, তিনি নির্বাচনটা জিতেছেন।

রিপাবলিকানদের নিজেদের মধ্যেই অনেক ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা থাকে। সম্প্রতি নানা বিষয় নিয়ে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে আলোচনা হয়েছে বেশ। এখানে সবাই কথা বলতে চাইছেন সেই দশক আগের বিষয় নিয়ে। কেউ কেউ দ্রুত অতীত ভুলে গেছেন, কেউ আবার পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে তার ঝাঁজটা নিতে চাইছেন নতুন করে। এখানে কেউ কেউ ট্রাম্পের পক্ষে কথা বললেও অনেকে এখনো বলে যাচ্ছেন অনৈতিকতার প্রসঙ্গটা।

এর বাইরে সিনেট রিপাবলিকানদের অনেককেই ট্রাম্পের পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য ও হস্তক্ষেপের সুযোগ দিতে চাইছে। নির্বাচনের শুরু থেকে ভোট নিয়ে কারচুপি ও অর্থ লেনদেনের যে প্রশ্ন উঠছে, তা নিয়ে মুখ খুলছেন না কেউই।

উদ্ভূত সমস্যা থেকে উত্তরণে চাই উপযুক্ত বিকল্প। ট্রাম্প কোন কোন ব্যাপারে কথা বলেছেন, কী কী নীতির বরখেলাপ করেছেন, সেটা নিয়ে আপাতত কথা বলতে চাইছেন না কেউই। স্বাধীনতার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কী কী বদল এসেছে, সেটা নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখার পক্ষপাতী অনেকেই। ওয়াটার কেলেঙ্কারির কথা এখনো ভুলতে পারছেন না যুক্তরাষ্ট্রের সুধীজনরা। এ থেকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার ওপর যে কালিমা পড়েছিল, তা মুছতে পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। ট্রাম্পের সময়কালে নতুন করে কোনো বিদেশীর থেকে সুবিধা কিংবা উপঢৌকনের বিনিময়ে রাষ্ট্রের সর্বনাশ করা হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। এখানে মৃদু গুঞ্জন তুললেও বাস্তব পরিস্থিতি কিংবা পরিণতি নিয়ে বলতে নারাজ সবাই।

ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান নিয়ে যারা শঙ্কিত, তাদের পক্ষে বিষয়টা নতুন করে ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। অন্তত ক্ষমতায় আসার পর তারাই যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অভিভাবক। দেশটির আগামী দিনের কর্মকাণ্ড কীভাবে আবর্তিত হবে, সেটা ঠিক করে দেয়ার দায়িত্বও তাদের ওপরই বর্তায়। তারা কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, কীভাবে অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেবেন কিংবা দেবেন না, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির ভবিষ্যত্ রাজনীতি।

একটা যুক্তি সবাই দেখাতে পারেন, সেটা হচ্ছে ট্রাম্প আজীবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেননি। তিনি জনপ্রিয় বক্তব্যগুলোকে সামনে আনতে পারায় সহজেই তাদের ভোট বাগিয়ে নিতে পেরেছেন। এর ফলে তিনি ক্ষমতায় এলেও বাস্তব সত্যটা হচ্ছে— দেশের সব মানুষ তার সঙ্গে একমত নয়। যারা তার বিরোধিতা করেছেন কিংবা তাকে ভোট দেননি, তাদের কেউ অন্তত একজনও আমেরিকা ছেড়ে চলে যাননি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হেলথ কেয়ার পলিসি বাতিল করে দেয়ার পাশাপাশি আরো যেসব রদবদল দিয়ে কাজ শুরু করেছেন ট্রাম্প, সেগুলোর ভবিষ্যত্ কী হবে— তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন। ওবামা প্রশাসনের অনেক অজনপ্রিয় বিষয় সামনে এনে সেগুলোর সমালোচনা করে সফল হয়েছিলেন ট্রাম্প। জনপ্রিয় বিষয়গুলোয় ভর করে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন ঠিকই, কিন্তু এই জনপ্রিয়তা তিনি কত দিন ধরে রাখতে পারেন— বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে সেটাই।

সম্প্রতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে রদবদল ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার সুযোগ নিয়ে অনেকেই চাইবেন আখের গুছিয়ে নিতে। তবে এ সময় দেশের ভবিষ্যত্ কীভাবে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকবে— সেটা নিয়ে মুখ খোলার সময় এখনো হয়নি। রাষ্ট্র চালাতে গেলে তার নৈতিক মানদণ্ড কেমন হবে— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অনেক আগেই। তবে ট্রাম্প কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবেন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে বলতে দেখা যায়নি তেমন কাউকে।

রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বরা এখন সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করছেন, কীভাবে তারা বিদ্যমান সুযোগ কাজে লাগাবেন— যাতে একজন ব্যবসায়ীকে তাদের উপযুক্ত নেতা হিসেবে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অনেক গোপনীয় তথ্য জনসমক্ষে উঠে আসায় বিপাকে পড়তে হয়েছে অনেককে। এর পর সামনে আসে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে হয়ে যাওয়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠক। এখানে মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল— ‘রেসপন্সিবল অ্যান্ড রেসপন্সিভ লিডারশিপ’। এতে দ্রুত একটা সুযোগ তৈরি হয়েছিল কিছু বলার। এক্ষেত্রে সামনে থেকে যারা দায়িত্বটা পালন করবেন, তারাই ভালো বলতে পারেন আসলে কী হতে যাচ্ছে।

মার্কাস ভেঞ্চার কনসাল্টিংয়ের প্রধান নির্বাহী লুসি পি. মার্কাসের লেখা থেকে অনূদিত।

(Visited 22 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *