বঙ্গবন্ধু ও হেনরি কিসিঞ্জারের বাক্যালাপ

বিষয়: বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বাক্যালাপ।

স্থান: প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়, ঢাকা।

তারিখ: ৩০ অক্টোবর ১৯৭৪।
সময়: বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট।
অংশগ্রহণকারী:বাংলাদেশ
১. তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
২. পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন।
৩. পররাষ্ট্র সচিব ফখরুদ্দিন আহমেদ।
৪. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব রুহুল কুদ্দুস।
৫. প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অর্থ সচিব ড. মো. আবদুস সাত্তার।
৬. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আবদুল বারী।
যুক্তরাষ্ট্র

১. পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।

২. রাষ্ট্রদূত বোস্টার।

৩. অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আথারটন

৪. জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এনএসসি) রবার্ট ওকলে।

৫. রাষ্ট্রদূত বরার্ট অ্যান্ডারসন।

৬. ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি লেইনজেন।

অনেক হূদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে শুরু হয় এ আলোচনা। সেখানে দু’দেশের বেশ কয়েকজন ফটোগ্রাফারও উপস্থিত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: নানা ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে বাংলাদেশে আসায় আপনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞ।

কিসিঞ্জার: আপনি এখানে দাওয়াত করে আমাদের ধন্য করেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমি অনেক খুশি যে, আপনি এখানে উপস্থিত হয়ে আমাদের আতিথেয়তা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। মাঝে মধ্যে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

কিসিঞ্জার: আগে এখানকার একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, যা অনেক ভালো অভিজ্ঞতা বলে ধরে নেয়া যেতেই পারে। আর এবারের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করবে। আশা করছি, যে উষ্ণ অভিবাদন পেয়েছি, তা ভবিষ্যতে আরো দীর্ঘায়িত হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমরা আপনাকে তেমন স্বস্তি দিতে পারিনি।

কিসিঞ্জার: না না, সবকিছুই ঠিক আছে। আপনাদের গেস্ট হাউজটা বেশ আরামদায়ক, বেশ আছি সেখানে। আপনাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমি বিকালে বেশকিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। নানা সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হবে। আন্তর্জাতিক আরো নানা বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হবে। আমরা যা-ই করি, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চিন্তা অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি এ বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা মনে হয় জানেন। বিশেষ করে উপমহাদেশীয় পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।

কিসিঞ্জার: এটা আমার জন্য অনেক আগ্রহোদ্দীপক হবে আশা করছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমি অনেক বড় চুক্তিতে আগ্রহী নই। আপনি যদি আমাদের স্বাধীনতা-পূর্ব আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে চান, সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হবে। আপনার হয়তো জানা থাকার কথা, পাকিস্তান তার ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক আয় করত পূর্ব পাকিস্তান থেকে। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংসদে আমিও একজন সদস্য ছিলাম, আপনি হয়তো সে বিষয় জেনে থাকবেন।

কিসিঞ্জার: তখনকার জনসংখ্যা কেমন ছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: ১৯৪৭ সালের দিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় চার কোটি। যা-ই হোক, আমি নতুন করে সমস্যার আলোচনায় যেতে চাই না। তবে এটুকু বলব যে, ১৯৭১ সালের দিকে এসে দুর্ভোগে পড়া পূর্ব পাকিস্তানের চিত্র সবাই জানে, তখনকার দিনে সে পাকিস্তান ছিল না। ভুট্টো এ দেশে এলে সে চিত্র তাকে কিছুটা দেখাতে পেরেছিলাম। আমি তাকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে, জেনারেল ফরমান আলীর সেই হিংস্র উদ্ধৃতি ‘বাংলাদেশের সবুজ ভূখণ্ডকে পুরো রক্তিম করে দেয়া হবে’ কীভাবে দেশটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এটা সেনাবাহিনীর প্রতি তার সাধারণ আদেশ ছিল। আমার কাছে সেটা ছিল যা আমি ভুট্টোকে দেখিয়েছিলাম।

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, পাকিস্তানিরা চিন্তার দিক থেকে উদার হবে। কিন্তু আমি আপনার কাছে স্পষ্ট করতে চাই যে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক রেখেছিল, এর বাইরে আর কিছুই নয়। তারা আমাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারত; কিন্তু তা করেনি। উপরন্তু বিস্তার করেছে এক হিংস্র থাবা। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে নিজেদের অধিকার চাইতেই বেঁকে বসে তারা। আমরা পুরো সম্পদের দখলদারিত্ব চেয়েছিলাম, এমনটি নয়। তবু তারা আমাদের ন্যায্য অধিকার পর্যন্ত দিতে আগ্রহী ছিল না। এর পর যখন ভুট্টো এলেন, তিনি কোনো ধরনের বিনিময়ের আগ্রহ না দেখিয়ে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেন। আর শেষ পর্যন্ত দেখতেই পাচ্ছেন, আমি মাত্র সাড়ে সাত কোটি মানুষ পেয়েছি, যাদের কিছুই নেই। পাকিস্তান থেকে আমরা কিছুই পাইনি। তাদের বিমান, জাহাজ থেকে শুরু করে অর্থ সবই আছে।

কিসিঞ্জার: আমি এর আগে নানা বিষয় নিয়ে আজিজ আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি কিছু ব্যাপারে আপনার অনিচ্ছার কথা জানালেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমি সে ব্যাপারে দায়িত্ব নিয়েই কথা বলব। তবে আমাদের সম্পদের ন্যায্য হিস্যা কেন আমরা পাব না? সে ব্যাপারে আপনি কী বলেন? পাশাপাশি বিহারিদের প্রশ্নটা থেকেই যায়। এরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের জন্য লড়েছে, কিন্তু পাকিস্তান এখন এদের দায় নিতে চায় না। আমি জানি, করাচিতে তাদের ঠাঁই দিতে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে তাদের পাঞ্জাবেও ঠাঁই মিলবে না, এ কথা মেনে নেয়া যায় না। আমার দেশটায় এমনিতেই জমি সংকট, তার পর প্রায় সাড়ে সাত কোটির মতো মানুষ। বিহারিদের সমস্যা সমাধানে অন্য কেউ এগিয়ে না এলে আমাদের পক্ষে তাদের পুরো দায় নেয়া অনেকটা অসম্ভব হয়ে উঠছে।

কিসিঞ্জার: তারা কি এখনো ক্যাম্পেই আছে?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ! পরিস্থিতি অনেকটা তেমনই। তারা এখন ক্যাম্পে বাস করছে। আমরা তাদের রেশন দিচ্ছি। পাশাপাশি তাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশে মানিয়ে নিতে পারবে, তাদের আমি কাজ দেব।

কিসিঞ্জার: যদি বিহারিরা চায় আপনি কী তাদের এখানে থাকার অনুমতি দিচ্ছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, তাদের মধ্যে চার লাখের মতো মানুষ চাইছে এখানে থেকে যেতে। কিন্তু বাকি তিন লাখ এখনো পাকিস্তানে যেতে চাইছে। আমি শুধু তাদের কথা বলব। আমি হূদয়ে কোনো ঘৃণা চেপে রাখতে চাই না। আমি চাই না, এখানে কোনো ধরনের ঝগড়াঝাঁটি হোক। আমি চাই, সব দেশ একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকুক। পাশাপাশি আমি কখনো এও বলব না যে, কোনো দেশ আমাদের জন্য ভিক্ষার ঝুলি এগিয়ে দিক। আমি প্রায় ৫ হাজার ৩০৩টি খানা স্থাপন করেছি, যেখানে প্রায় লাখ মানুষের অন্নসংস্থান করা হয় প্রতিদিন। আমাদের সমস্যা এমনিতেই অনেক গুরুতর, সেই সঙ্গে এবারের বন্যা পরিস্থিতি আরো ক্ষতি করেছে।

কিসিঞ্জার: আপনি আলোচনার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এসেছেন। আমি বিকালে কথা বলব বিষয়গুলো নিয়ে। বন্যার ক্ষতি মোকাবেলায় কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় সেগুলো আলোচনায় উঠে আসবে বলে আশা করি। আপনি কি চান যে, এমন কিছু বিষয় নিয়ে আমি ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনা করি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: সেটা করার জন্য আপনাকে স্বাগত।

শুধু কথা বলা উচিত নয়; সহযোগিতা করাও উচিত! তাদের জানা উচিত এখানে মানুষ মরছে; তাদের প্রচুর জমি আছে। ফলে সহজেই তারা সাহায্য করতে পারে। এ মুহূর্তে বন্যা নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বন্যা নিয়ে ভুগছি। বড় নদী ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের ভারতের সঙ্গে যৌথ নদী কমিশন আছে।

কিসিঞ্জার: কোনটা প্লাবন ঘটায়— নদী না সমুদ্র?

কামাল হোসেন: এ সমস্যার দুটি দিক আছে। এ বছর নদীই বন্যার কারণ। কিন্তু ১৯৭০ সালে প্লাবণ হয়েছিল সমুদ্রবাহিত জলোচ্ছ্বাসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: বাঁধ ও ক্ষুদ্র প্রকল্পের মাধ্যমে কেবল নদী নিয়ন্ত্রণ বা শাসন করতে পারলে আমাদের জন্য উপকার হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা বিদ্যমান সম্পদ সংহত করতে পারলে খাদ্য সমস্যা মোকাবেলা করতে পারব। অবশ্য আমাদের জনসংখ্যা পরিকল্পনাও দরকার আছে।

কিসিঞ্জার: আপনি বঙ্গোপসাগরের ভূমি পুনর্দাবি করছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আগামী বছর মোট ২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি আমাদের হবে।

কিসিঞ্জার: আপনি কি সেখানে চাষ করার জন্য মানুষ নিয়ে যাবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের এটা করতে হবে। আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আপনারা ১ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য এরই মধ্যে দিয়েছেন এবং আরো এক লাখ টন দিচ্ছেন।

কিসিঞ্জার: বর্তমান অবস্থায় এটা আপনাদের জন্য খুবই দরকার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমাদের আরো এক-দুই বছর খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে আমার ব্যাপক সহযোগিতা দরকার। আমাদের শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহে সাহায্য প্রয়োজন। আবার পাটের ভালো দাম পাওয়াও জরুরি।

কিসিঞ্জার: মনে হয় আপনি বিভিন্ন দিক থেকে আক্রান্ত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা একটি সার কারখানা নির্মাণ করছি। জাপান থেকে এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ দল এসেছে। যুক্তরাজ্যও সার কারখানায় সাহায্য করতে চায়। বিশেষ করে যে কারখানাটি সম্প্রতি বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখছে। এর জন্য আমরা কাউকে দোষারোপ করি না। নিশ্চিতভাবে কেবল জাপানিরাই আমাদের বন্ধু নয়; ব্রিটিশরাও আমাদের বন্ধু বটে। সুতরাং যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরাও আমাদের সাহায্য করবে। তাদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্ফোরণের বিষয়গুলো বোঝা কঠিন।

ইউরিয়া উত্পাদনে আমরা স্বয়ংসর্ম্পূণ হতে পারি। আমরা ভারতের কাছ থেকেও সার কারখানা নির্মাণ-সংক্রান্ত কিছু সাহায্য পাচ্ছি।

রাষ্ট্রদূত বোস্টার: আশুগঞ্জ সার কারখানার জন্য ৩০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে আলোচ্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রও আপনাদের সাহায্য করছে।

কিসিঞ্জার: খাদ্য উত্পাদন সমস্যা মোকাবেলায় এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পন্থা। অন্যরা কিংবা আমরা সাহায্য করেত পারি বটে; কিন্তু সত্যিকার প্রচেষ্টা আসতে হবে আপনার দেশ থেকে, নিজেদের দিক থেকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমরা বসে নেই। নিজেদের জমিতেই আমরা খাদ্য উত্পাদন করছি। মজুদের জন্য আমাদের বাধ্যতামূলক সংগ্রহ বা ক্রয়াভিযান প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

কিসিঞ্জার: মজুদ বৃদ্ধির জন্য কি আপনি চেষ্টা করছেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জরুরি প্রয়োজনের জন্য আমাদের একটি বাফার তৈরি করতে হবে।

কামাল হোসেন: একই সঙ্গে মজুদবিরোধী পদক্ষেপও প্রয়োজন।

কিসিঞ্জার: পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আগেই বলেছি, পরবর্তী সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় বিশ্বখাদ্য সম্মেলনে একটি ভাষণ দিচ্ছি, যেখানে আমি খাদ্য সমস্যার সার্বিক বিষয়গুলো বর্ণনা করব। এর পর আমরা নিজ সরকারের মধ্যে বিষয়গুলোকে আরো ভালোভাবে সংহত করার চেষ্টা করব। আমাদের বোধ হয় প্রয়োজন নয় নিছকই খাদ্যসহায়তা দেয়া; বরং বেশি দরকার প্রযুক্তি ও সার দিয়ে সাহায্য করা, যাতে অন্য দেশগুলো অধিক খাদ্য উত্পাদন করতে পারে। আমার ভাষণের পর রাষ্ট্রদূত বোস্টার এ বিষয়ে আপনাদের বিস্তারিত জানাবেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা চীনের তরফ থেকে কোনো সহযোগিতা কিংবা স্বীকৃতি পাচ্ছি না।

কিসিঞ্জার: আমার বিশ্বাস, একই সঙ্গে সেটাও হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমরা অপেক্ষা করছি এবং ওই সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত আছি।

কিসিঞ্জার: হতে পারে আপনাদের সঙ্গে পাকিস্তান সম্পর্ক স্থাপন না করা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: এটা হতে পারে। তারা তো পরাশক্তি। সুতরাং তাদের দিক থেকেই হওয়াটা কাম্য।

দুর্ভাগ্যক্রমে প্রতিদিনই আমার দেশের লোকজন মারা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, পাকিস্তান আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।

পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভালো সম্পর্কে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। যে কেউ যে কারো বন্ধু হতে পারে। চীনও যা ইচ্ছা করতে পারে।

কিসিঞ্জার: দেশটির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপনে আপনার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি কি আমি চীনের কাছে তুলে ধরতে পারি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: অবশ্যই। আমি চৌ এন লাইকে চিনি। তিনি একবার ঢাকায় এসেছিলেন এবং আমিও ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে সেখানে (চীনে) গিয়েছিলাম। ১৯৫২ সালেও একবার গিয়েছিলাম। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৫৬ সালে। ওটা ছিল চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের টার্নিং পয়েন্ট।

কিসিঞ্জার: সেটা ছিল ঘটনার চমত্কার বাঁক বদল। আমি কখনো মনে করি না, সে সময় পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের এত ঘনিষ্ঠতা ছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: প্রথমবার চৌ এন লাই পাকিস্তান সফরে এলে তিনি ভালো সংবর্ধনা পেয়েছিলেন।

কিসিঞ্জার: আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আগেই বলেছি, আমি মনে করি, চীন আপনাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করবে। রাষ্ট্রপতি ফোর্ড ওয়াশিংটনে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আপনি তাকে বোকা বানিয়েছিলেন!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমি তাকে ব্যাপক পছন্দ করি। তিনি বেশ অকপট, স্পষ্টভাষী।

কিসিঞ্জার: এর পর বাংলাদেশে খাদ্যসহায়তা দেয়ার জন্য আর কী কী করা যায়, তা দেখার জন্য তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: দয়া করে তাকে আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাবেন। ভারতে যখন আসেন, তখন তিনি এখানেও ঘুরে যেতে পারেন।

কিসিঞ্জার: হ্যাঁ, ভারতে এলে অবশ্যই তিনি এখানেও আসবেন। অবশ্য আমরা মনে করি না, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আমাদের ভারতের অনুমতি নিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: এটা ঠিক আছে। যখনই বাংলাদেশের সঙ্গে আপনারা ডিল করবেন, তখন অবশ্যই আমাদের সঙ্গে করা উচিত, অন্য কারো মাধ্যমে নয়।

আমাদের স্থাপিত খাদ্য ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলে খুশি হব। ক্ষুধায় আমার লোক মারা যাচ্ছে। গবাদি পশুও মারা যাচ্ছে। আমার লোককে খাওয়াতে হবে এবং তাদের অবশ্যই কাজ দিতে হবে। আমাদের পুনর্বাসন প্রচেষ্টায় এটাই সবচেয়ে প্রাধিকার পাবে। আমরা ভয়াবহ সমস্যা মোকাবেলা করছি।

কিসিঞ্জার: আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা এখন খাদ্য উদ্বৃত্তে নেই। পাঁচ বছর আগে খাদ্য উদ্বৃত্তে ছিলাম, দীর্ঘমেয়াদে প্রাক্কলন করার মতো অবস্থায়ও ছিলাম। এখন প্রাক্কলন করার আগে আমাদের প্রতি বছরের শস্য উত্পাদনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমি জানি, এক্ষেত্রে আপনি মারাত্মক জটিলতায় পড়েছেন।

কিসিঞ্জার: আমরা বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: পাকিস্তান আমাদের কোনো সাহায্য দেয় না। তারা আমাদের সঙ্গে কোনো জাহাজ কিংবা রিজার্ভ বিনিময়ে প্রস্তুত নয়। তবু আমরা নিজেদের উদ্যোগে চেষ্টা করেছি।

কিসিঞ্জার: স্পষ্টত নিজেদের অবস্থান উন্নয়নে আপনাদের অনেক অগ্রগতি ঘটেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: তিন বছরে আমরা কিছু করেছি। আমরা যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেছি, রাস্তাঘাট মেরামত করেছি, সেতু পুনর্নির্মাণ করেছি এবং চাষাবাদ পুনরায় শুরু করেছি। নিশ্চয়ই আমরা কিছু করেছি!

কিসিঞ্জার: আমি জানি। এর মধ্যে বিশ্বমূল্যস্ফীতি প্রবণতা আপনাদের আরো বিপদে ফেলছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি চা-কলা খাবেন?

কিসিঞ্জার: আমি আসলে কম খাওয়ার চেষ্টা করছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: পাকিস্তানিরা আমার কলা গাছও ধ্বংস করেছে।

কিসিঞ্জার: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আপনার দেশে পড়েছে কী?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জানি না, কিন্তু এ গ্রীষ্মের বন্যায় মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ১৭টি জেলাই প্লাবিত হয়েছে। আমাদের দেশের ভূমি খুবই উর্বর এবং প্রচুর ধান-গম উত্পাদনে সমর্থ। এ বছর এরই মধ্যে আমরা চিনি উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি।

কিসিঞ্জার: সহায়তা বিষয়ে কংগ্রেসে আমাদের মধ্যে ঝামেলা বেধেছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অবশ্য অনুমান করি যে, কোনো দলই সংখ্যাধিক্য ভোটে জয়ী হবে, যেমনটা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আপনার দলের ক্ষেত্রে ঘটেছিল!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: এত সংখ্যক আসন পেয়েন না! আপনি দেখেছেন, আমি জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল। পাকিস্তানিরা এল, আমার দেশ ধ্বংস করল এবং আমাকে গ্রেফতার করল। আমার পাঁচ-বছরের ছেলে সেটা বুঝেছিল। সে পরে আমাকে বলেছিল, ‘আর কখনো নির্বাচনে দাঁড়াইও না!’ আমার দেশ জলোচ্ছ্বাস, গৃহযুদ্ধ, ঘূর্ণিঝড় ও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে বিধ্বস্ত হলো। আমি নির্বাচনী ফলাফল হিসেবে এটাই পেয়েছি!

কিসিঞ্জার: অনুমান করি, এর অর্থ এই নয় যে, তখন আপনি নির্বাচন উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন!

আমার নিজের এবং প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ সাহায্য করা। ১৯৭৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা নিশ্চিতভাবে আরো কিছু খাদ্য দিতে পারব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: দয়া করে বন্যা নিয়ন্ত্রণের মতো অন্যান্য বিষয় ভুলে যাবেন না, যাতে আমরা অধিক খাদ্য উত্পাদন করতে পারি।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের জন্য ভয়াবহ সমস্যা।

কিসিঞ্জার: সবখানে এটাই ঘটছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, তবে আপনাদের দেশের মানুষ শিক্ষিত। আমাদের জীবনে কোনো বৈচিত্র্য নেই। আমাদের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিকল্পনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং এটা আমাদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে।

এ মাসের ৫ তারিখে আমি চারদিনের জন্য মিসর সফরে যাব বলে প্রত্যাশা করছি।

কিসিঞ্জার: আলোচ্য সময়ে আমিও ওখানে থাকতে পারি। রাবাতে কী ঘটেছে, সেটা আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আপনি তো সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।

কিসিঞ্জার: আমি সাদাতকে পছন্দ করি। আপনি?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমিও।

কিসিঞ্জার: আসাদকে পছন্দ করেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, আমি তাকেও পছন্দ করি। তিনি একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।

কিসিঞ্জার: এর মানে এই নয় যে, বাংলাদেশের নেতারা বর্ণাঢ্য নয়!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে এবং আমরা অনেক বিপর্যকর সময় পার করেছি। পাকিস্তানিরা আমাকে দুবার খুন করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমি জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছি। আপনার সরকার অনেক সাহায্য করেছে।

কিসিঞ্জার: ভুট্টো কী বলেছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: তিনি চমকে গিয়েছিলেন এবং দেখেছিলেন যে, তার সব বন্ধুই এ কক্ষে বসা।

কিসিঞ্জার: আজিজ আহমেদ নিউইয়র্কে আমাকে বলেছিলেন, কেবল সম্পদ নয়, আপনি যেন অন্য দায়েরও দায়িত্ব নেন, সেটাই নাকি ভুট্টো চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: কিন্তু বাংলাদেশের সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে আমি তা-ই করেছিলেন। এমনকি পাকিস্তানের প্রকল্পের ক্ষেত্রেও।

কিসিঞ্জার: পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চাত্পদ রাখা কি পাকিস্তানের স্বেচ্ছামূলক নীতি ছিল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, ২৫ বছর ধরে আমরা ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হয়েছি! এর আগে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনও আমাদের ওপর ছিল।

কিসিঞ্জার: পাকিস্তান কি বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: সেনাবাহিনী আসে পাঞ্জাব থেকে। বেলুচদের পতন হোক, সেটা কখনো তারা চায় না। কিন্তু ভুট্টো রাজনীতিবিদ এবং তিনি সঠিক পথেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। আমি আশা করি, তিনি এর একটি রফা করবেনই।

আমি সব যুদ্ধবন্দির মুক্তির ব্যাপারে রাজি হয়েছি। কারণ আমি ভুট্টোকে

সাহায্য করতে চাই। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছি। আমি এটা না করলে পাকিস্তানে সেনাবাহিনী আবার ক্ষমতায় আসত।

কিসিঞ্জার: এটা ছিল আপনার দূরদৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: একজন নেতার অবশ্যই তার জনগণকে পরিচালনা করা উচিত; তাকে জনগণের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়।

সাহায্য নিয়ে আমি বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিণত করতে চাই। আমার গ্যাস ও চুনাপাথরের মজুদ আছে এবং আমরা বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। বঙ্গোপসাগরে তেল অনুসন্ধানে আমরা আমেরিকান কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করেছি।

কিসিঞ্জার: তেল পেলে আপনি ওপেকে যোগদান করবেন!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: এখন বিক্রি করার জন্য আমার প্রাকৃতিক গ্যাস আছে। আমরা সার তৈরি এবং অন্যান্য সম্পদ উন্নয়নে এটাকে ব্যবহার করতে পারি। এসব আমাদের আছে। এখন যে পরিমাণ খাদ্য রয়েছে, তার চেয়ে তিন গুণ বেশি আমরা খাদ্য উত্পাদন করতে পারব।

কিসিঞ্জার: কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: এজন্য আমার জনগণকে শিক্ষিত করতে হবে। আমরা এখনো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।

আবারো বলতে চাই যে, আপনি বাংলাদেশে আসার পর আমি খুব খুশি হয়েছি। রাষ্ট্রপতি যখন আসবেন, আপনি তার সঙ্গে আবার আসবেন বলে প্রত্যাশা। আমরা তাকে আন্তরিকভাবে অভিবাদন জানাব, তাকে আমরা বাংলার বাঘ দেখাতে পারব!

আমি সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চেয়েছি। এমনকি সেটা আমি বলেছি পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরই।

কিসিঞ্জার: আপনি বড় হৃদয়ের উদারতা দেখিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বিদ্বেষ নয়’— এ পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনের মধ্য দিয়েই সেটা প্রতিফলিত হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ডিক্লাসিফায়েড ফাইল থেকে ভাষান্তরিত

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!