উদ্যোক্তারা কেন অর্থনীতির জন্য গুরুত্ববহ

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মনে করা হয়, জাতির সম্পদ। তাই তাদের যতটা সম্ভব উৎসাহিত, প্রণোদিত ও পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়। আমরা যেভাবে বেঁচে আছি কিংবা যে ধরনের কাজ করি, তা বদলে দিতে পারেন কেবল উদ্যোক্তারাই। যদি তারা সফল হন, তবে আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে। সহজ করে বলতে গেলে, যদিও তারা নিজের মুনাফা অর্জনের প্রয়োজনেই কাজ করেন, কিন্তু তারা অনেক মানুষের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করেন; যা উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা কী ধরনের ভূমিকা রাখেন, তার বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বিষয় আজকের নিবন্ধে আলোচনা করা হলো।

উদ্যোক্তারা নতুন বাণিজ্য সৃষ্টি করেন: অনেকটা পথিকৃতের অবস্থান থেকে উদ্যোক্তারা নতুন পথের দিশা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে নতুন পণ্য কিংবা সেবা চালু করেন তারাই। এর প্রভাবে অর্থনীতির চাকা যেমন সচল হয়, তেমনি নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ আসে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে যে গতিসঞ্চার হয়, তা ব্যবসার ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা করে; যা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে করে ত্বরান্বিত। উদাহরণ হিসেবে ভারতের আইটি খাতের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে ১৯৯০ সালের দিকে অল্প কয়েকটি কোম্পানির উদ্যোগে ভারতের এ খাত ঘুরে দাঁড়ানোর পথ পায়। তবে দ্রুতই এ খাতে আশার আলো দেখা যায়; ধীরে ধীরে নানামুখী উন্নয়নের মধ্য দিয়ে গতিশীল হয়ে ওঠে আইটি ব্যবসা। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, অন্য খাতের কয়েক লাখ মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি ভিন্ন নিবন্ধে (টপ ইন্ডিয়ান বিলিনেয়ারস অ্যান্ড হাউ দে মেইড দেয়ার মানি) আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আইটি খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে কলসেন্টার অপারেশন, নেটওয়ার্ক মেইনটেন্যান্স কোম্পানি থেকে শুরু করে হার্ডওয়্যার প্রভাইডার পর্যন্ত স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে গতিশীলতা খুঁজে পায়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলো তাদের কর্মতালিকার মধ্যে আইটি কর্মীদের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়, যা তাদের জন্য উচ্চবেতনে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে। অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থা, এমনকি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আসে। তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনায় কর্মী বদল ও কর্মসংস্থান হাব ঠিক করে নিয়েছে। এর মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি থেকে শুরু করে আরো নানা ক্ষেত্রে উপকৃত হয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনেক দ্রুততার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্ষম পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের সুযোগ থাকতে হয়। এক্ষেত্রে একেবারে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনেক বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, যা একাধারে সক্ষম কর্মী ও কাঙ্ক্ষিত মূলধন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আর প্রতিটি ক্ষেত্রের কাজে একজন উদ্যোক্তা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, যা বৃহৎ পরিসরে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রণোদিত করে।

উদ্যোক্তারা জাতীয় আয় বাড়ান: উদ্যোগ নতুন সম্পদ তৈরি করে। এগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রচলিত ব্যবসায় নতুন সংযুক্তি ঘটে, যা আয় বৃদ্ধির সুযোগ বাড়িয়ে তোলে। উদ্যোক্তাদের তরফ থেকে নতুন উন্নত প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে পণ্য ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন নতুন বাজার তৈরির পথ করে দেয়। এর মাধ্যমেই সম্পদের পুনর্বিন্যাস ঘটে প্রবৃদ্ধির পথ পরিষ্কার হয়। এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে কর্মজীবীদের চাহিদা বেড়ে যায়। তাদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উপযুক্ত রাজস্ব আদায় প্রয়োজনমাফিক সরকারি ব্যয়ের পথ করে দেয়। এ রাজস্ব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সুযোগ সৃষ্টি থেকে শুরু করে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইকোনমিক টাইমসে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, অন্য সব খাতে সরকারি রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে যতটা কঠোরতা দৃশ্যমান, এক্ষেত্রে তার কোনোটাই নেই বললে ভুল হবে না।

উদ্যোক্তারা সামাজিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেন: যুগের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়, এমন সব পদ্ধতিগত বেড়াজাল ছিন্ন করে মানুষকে নতুন দিনের পথ দেখান উদ্যোক্তারা। নিত্যনতুন পণ্য ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি থেকে শুরু করে সেবা খাতের নানামুখী উন্নয়নে মানুষ আশাবাদী হয়। উদ্যোক্তা প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বয় করে অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনের পথে ধাবিত হওয়ার সুযোগ করে নেয় এর মাধ্যমেই। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত হয়, তেমনি তারা জীবনদর্শন এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নানা পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন স্থানে পানির সংকট থাকলে সেখানকার মানুষের ধর্মবিশ্বাস পানি প্রভাবিত হয়। এখানে মানুষ তাদের কাজের সময়ে পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানামুখী আরাধনায় লিপ্ত থাকে। এ ধরনের প্রবণতা তাদের বাণিজ্য, উৎপাদন, এমনকি আয়কে পর্যন্ত প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে তাদের সবার ঘরে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে— এমন একটি পানির পাম্প যদি বসানো সম্ভব হয়, তবে এর মাধ্যমে জীবনযাত্রা বদলে যেতে বাধ্য। এর কারণ একটাই, নতুন উৎস থেকে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে মানুষ তাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনে চলমান দুশ্চিন্তা এড়িয়ে নিজ নিজ কাজে মনোযোগ দিতে পারে। আর কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারলে সহজেই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যাবে।

সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে স্মার্টফোন এবং তাদের অ্যাপসগুলোর কথা। তারা বিশ্বব্যাপী এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, স্মার্টফোনগুলো শুধু ধনী দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং চীনের তৈরি সস্তা স্মার্টফোনগুলো সব দেশের সব আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকায় তা বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তাদের নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিয়েছে। বিশ্বায়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাদের উঠে আসা শুধু ধনী দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ধনী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তারা উন্নয়নশীল দেশ এবং অনুন্নত দেশেও বিকাশ লাভ করছেন। সেখানে স্বল্প পুঁজি কাজে লাগিয়ে সহজে বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ থাকায় তারা দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন। বিষয়গুলো নিয়ে চীনের স্মার্টফোন বিষয়ক নিবন্ধে (টাইম ফর চায়নাস স্মার্টফোন রেভুলেশন) বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।

কমিউনিটি উন্নয়ন: ব্যক্তিগত পর্যায়ের বাণিজ্য থেকে উদ্যোক্তারা অর্থনীতিকে প্রণোদিত করার সুযোগ বেশি পান তাদের উদ্যোগের মাধ্যমে। তারা বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি প্রজেক্টেও বিনিয়োগ করেন, যা স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন ও দাতব্য ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ বিষয়গুলো তাদের ব্যবসার বাইরেও অন্য ধরনের উন্নয়নকে প্রণোদিত করে। বিল গেটসের মতো অনেক বিখ্যাত উদ্যোক্তা তাদের অর্থ বিভিন্ন ধরনের আর্থসামাজিক উন্নয়ন যেমন— শিক্ষা বিস্তার ও জনস্বাস্থ্যে ব্যয় করেছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড একজন বিখ্যাত উদ্যোক্তা করে বসলে, তার দেখাদেখি অন্যরাও এমন উন্নয়নমূলক কাজে প্রণোদিত হন; যা সমন্বিত সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ করে দেয়।

উদ্যোক্তার অপর পিঠ: উদ্যোক্তা বা উদ্যোগ বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অপূর্ণতা রয়েছে কি? এক্ষেত্রে কোনো সমাজ ঠিক কতজন উদ্যোক্তার জন্য জায়গা করে দিতে পারবে? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। তবে এক্ষেত্রে উপযুক্ত উদাহরণ হিসেবে ইতালির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেখানে একটা বিশাল সংখ্যক স্বতঃপ্রণোদিত উদ্যোক্তা থাকার পরেও তারা অর্থনৈতিক বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, স্বকর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যাধিক্যের কারণেই ইতালিতে একটা সময় এসে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভাটা পড়েছিল। এক্ষেত্রে অনেক প্রাচীন একটি প্রবাদ প্রণিধানযোগ্য— ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’।

রাষ্ট্রের ভূমিকা: বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও আইন উদ্যোক্তা বিকাশের পথে কাঁটা হয়ে দেখা দিতে পারে। তবে পরিস্থিতিতে সামঞ্জস্য রাখার জন্য এ ধরনের আইন ও উপযুক্ত নীতিমালা থাকার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাজার জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক দৈন্য সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রণোদিত করতে পারে। ইউনাইটেড নেশনস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উদ্যোক্তা বিকাশের পথে সৃষ্ট নানা জটিলতা স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে ভিম নাউদে তর্ক উত্থাপন করেছেন যে, উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করলেও অবস্তুগত কল্যাণে তার কোনো ভূমিকা থাকে না বললেই চলে। সুখের বার্তা সবার মাঝে পৌঁছে দেয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত । অন্যদিকে উদ্যোক্তার উচ্চসংখ্যা অনর্থক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে, যা স্বতন্ত্র পর্যায়ে ক্যারিয়ার চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা হিসেবে উপস্থিত হবে। অনেক বেশি উদ্যোক্তার উদ্ভবে আকাঙ্ক্ষার পারদটা অনেক উপরে থাকবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোক্তার প্রতিযোগিতা একটা পর্যায়ে এসে আয়বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে, যা নাগরিকদের অনেক দিক থেকে অসুখী করে তুলতে পারে।

উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে চমত্কার মিথস্ক্রিয়া, তা নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সংস্থা, ব্যবসার মালিক, এজেন্ট থেকে শুরু করে চ্যারিটেবল ডোনারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে আমরা যদি এর সুফল ও কুফলকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারি, তবে তার মাধ্যমে উদ্যোগ বিকাশের একটি নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব, যা আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

অর্থনীতিবিদ শোভিত শেঠের লেখা, ইনভেস্টোপিডিয়া থেকে অনূদিত

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!