স্থবিরতা আর অলসতার অন্ধকূপ

বহুদিন আগের কথা। ডাকঘর আর ডাকহরকরা ঠাঁই পেয়েছিল তারাশঙ্করের উপন্যাসে। বাদ যায়নি কিশোর কবি সুকান্তের কবিতায়ও। তিনি বরং আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘রানার! রানার!/ এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?/ রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?/ ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,/ পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,/ রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,/ দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।’/ কিশোর কবির আকাঙ্ক্ষাকে সত্যি না করে প্রতিদিন ঠিকই ঠিকানায় পৌঁছে যেত রানার।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে গেছে সব। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার প্রেমিকার উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘প্রিয় তুমি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।’ হয়তো সেটা প্রযুক্তির অনেক আগের কথা। আর এখন এসেছে প্রযুক্তি, পাল্টে গেছে সব। পোস্ট অফিসটা ঠিক আগের মতোই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কর্মচারী-কর্মকর্তারা হাজিরা দিতে ঠিকই যান, তবে নেই আগের সে লোকসমাগম। ই-মেইল, ফেসবুক-সেলফোন-মেসেঞ্জারের যুগে চিঠি লেখার চল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে ডাক ব্যবস্থাকে যে কোরামিন ইনজেকশন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছিল, সেটা আর কিছু নয়, অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে। হঠাত্ করে এসে গেল মোবাইল ব্যাংকিং। তার পর সেটাও বন্ধ হয়ে বলতে গেলে ধুঁকছে বাংলাদেশের ডাক বিভাগ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ এলেও সেখানে একই ধরনের নাগরিক সেবা টিকিয়ে রাখার জন্য তা ডাকঘরের অধীনেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ সরকারও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সম্প্রতি বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে ফরিদপুর প্রধান ডাকঘরসহ অন্য ডাকঘরগুলোর আধুনিকায়নের কথা। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জেলার ডাক বিভাগের সেবার মান বাড়বে। পাশাপাশি সেবাপ্রত্যাশীদের শুধু মানি অর্ডার, সঞ্চয়পত্র কেনা, বন্ড কিংবা চিঠি আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে না। প্রয়োজনে সবাই ডাকঘরের মাধ্যমে মুহূর্তেই সেলফোনে টাকা স্থানান্তর এবং পোস্টাল ক্যাশ কার্ডে টাকা পাঠানো ও উত্তোলন করতে পারবেন। এরই মধ্যে কয়েকটি ডাকঘরে এ সেবা চালু হলেও এর মান নিয়ে গ্রাহক সন্তুষ্টি নেই বললে চলে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সেবার মান বাড়লে গ্রাহকের আকৃষ্ট হতে সময় লাগবে না।

আশার কথা, বাংলাদেশের ডাক বিভাগ চিঠি আদান-প্রদান কিংবা মানি অর্ডারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সেবা দিতে চেষ্টা করছে। উপযুক্ত ও দক্ষ জনশক্তি না থাকায় তারা যেমন বিপাকে পড়ছে, তেমনি পরিবহন সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। তবু মূল ও এজেন্সি সার্ভিস মিলিয়ে সাধারণ চিঠিপত্র, রেজিস্টার্ড চিঠিপত্র, জিইপি, ইএমএস, মানি অর্ডার, পার্সেল সার্ভিস, ভিপিপি, ভিপিএল, ডাকটিকিট বিক্রি, ডাকদ্রব্য গ্রহণ-প্রেরণ-বিতরণ, সেলফোন মানি অর্ডার ও পোস্টাল ক্যাশ কার্ডের পাশাপাশি ডাক জীবন বীমা, সঞ্চয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বিক্রয় ও ভাঙানো এবং প্রাইজবন্ডের মতো সেবা দিয়ে আসছে ডাক বিভাগ। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিটি সেবার মানোন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সংবাদ প্রেরণ, দাফতরিক নথি প্রেরণ, বুক পোস্ট, পণ্য ডাকযোগে দ্রুত প্রেরণের মতো সার্ভিসগুলো গ্রাহক চাহিদা মেটানোর উপযোগী করা গেলে হতাশার মেঘ কেটে গিয়ে ডাক বিভাগে আলো আসতেও পারে।

Related posts

Leave a Comment

Your Rating:05

Thanks for submitting your comment!