মিস্টিক মিসির আলি এবং হতচ্ছাড়া হিমু

নগরজীবনের একঘেয়ে আটপৌরে যাপনের বাতুলতায় যে ধারাবাহিক ইনসোমনিয়াবিলাস, মিসির আলি চরিত্রটির রূপায়ণ ঠিক তার বিপরীতে গিয়ে। যা হতাশা হাপিত্যেশে উদোম পায়ে হাঁটতে থাকা হলুদ পাঞ্জাবি পরা হতচ্ছাড়া হিমুর ঠিক উল্টো। বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের এ বৈচিত্র্যময় চরিত্রটিকে আমি বরাবরই বলি মিস্টিক মিসির আলি। বাংলা ভাষা সাহিত্যে হয়তো হুমায়ূন আহমেদই একমাত্র লেখক, আশৈশব ভক্তি-অভক্তি আর ভালো-মন্দ লাগার মিশেলে তার সব বইয়ের আদ্যোপান্ত পড়েছি। আর সেখানেই একদিন আবিষ্কার করি অদ্ভুতুড়ে এই মিসির আলিকে। বিচ্ছিন্নভাবে অনেক গল্প পড়ে ফেললেও মিসির আলিকে নতুন করে চেনার সুযোগ হয় ২০১২ সালের দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর বদল ঘটে পাঠাভ্যাসে, নানা দেশী অনুবাদ গল্প, উপন্যাস আর কবিতার স্থলে আস্তে আস্তে ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠতে থাকে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব। অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজের সহলেখক হিসেবে কাজ করছি একটি বই ‘ইতিহাস ও ঐতিহাসিক’-এর। এ সময় প্রতীক প্রকাশনা সংস্থায় গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করি, তারা বের করেছে ‘মিসির আলি অমনিবাস’। অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচা, এত দিনের মিস্টিক মিসির আলি; তার সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানার সুযোগ হবে তাহলে।

‘মিসির আলি অমনিবাস’ একটি সংকলন; উদ্ভাবনা, উচ্ছ্বাস, প্রথম পেপার ব্যাক বই প্রকাশ আর লেখকের চিরবিদায় মিলিয়ে প্রকাশকের কাছে হয়তো সেটাই একটা গল্প হতে পারে। তবে পাঠকের জন্য গল্পটা মিসির আলির, যেটা লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরের এক লং ড্রাইভে স্ত্রী গুলতেকিনকে নিয়ে চলতে গিয়ে স্থানীয় রেডিওতে শুনেছিলেন এক গানের কলি— ‘ক্লোজ ইওর আইজ অ্যান্ড ট্রাই টু সি’। তারা বলছে, ‘তোমার চোখ বন্ধ করে দেখতে চেষ্টা করো।’ আর লেখক ভাবলেন, মানুষ খোলা চোখেই যখন দেখে না, সে চোখ বন্ধ করে নতুন কিছু দেখার চেষ্টা করলে দোষ কি? এ ঘটনার অনেক দিন পর মিসির আলি নিয়ে প্রথম উপন্যাস দেবী লিখেছিলেন তিনি। তার পর যতগুলো লেখা, সেখানে লেখকের মিসির আলিকেন্দ্রিক চেষ্টা ছিল একটাই— ‘অতি সাধারণ মোড়কে একজন অসাধারণ মানুষ তৈরি করা।’ দেবী থেকে শুরু; একে নিশীথিনী, নিষাদ, অন্য ভুবন, বৃহন্নলা, ভয়, বিপদ, অনীশ, মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য, আমি এবং আমরা, তন্দ্রাবিলাস, হিমুর দ্বিতীয় প্রহর, আমিই মিসির আলি, বাঘবন্দি মিসির আলি, কহেন কবি কালিদাস, হরতন ইশকাপন, মিসির আলির চশমা, মিসির আলি আনসলভড, মিসির আলি আপনি কোথায়, পুফি কিংবা যখন নামবে আঁধার পড়ার পর মনে হবে লেখক তার উদ্দেশ্যে পুরোটাই সফল।

নিয়ম মেনে চলা মানুষ সমাজে তেমন জনপ্রিয়তা পান না। তাদের সফলতার পরিমাণ একটু বেশি হলেও নিজ নিজ পরিমণ্ডলে থাকেন অসন্তুষ্ট। আর প্রচলিত কথা হচ্ছে, যুক্তিবাদী মানুষ স্বভাবসিদ্ধ আবেগবর্জিত। তাদের কাছে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগ থেকে বিবেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক নিয়মে আবেগ ও বিবেকের দ্বৈরথ চিরন্তন হলেও হুমায়ূন আহমেদ চেষ্টা করেছেন যুক্তি এবং আবেগকে পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যেতে। লেখক নিজেই বলেছেন, ‘মিসির আলির ব্যাপারে একটু ব্যতিক্রমের চেষ্টা করলাম, যুক্তি ও আবেগকে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে দিলাম। দেখা যাক কী হয়?’ এতে করে কী হয়েছে, সেখানে হয়তো লেখকের আলাদা ভাবনা থাকতে পারে। তবে পাঠক হিসেবে যে কেউ এক বাক্যে, একটিমাত্র শব্দে বলবেন, অভাবনীয় কিংবা অসাধারণ।

একেবারে গোড়ার দিকে দেবী উপন্যাসে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে লেখকের নিবেদন একটু ভিন্নার্থজ্ঞাপক। ইনসোমনিয়াকে আপন না করে লেখক হাঁটতে চেয়েছেন ভিন্নপথে।

‘মাঝরাতের দিকে রানুর ঘুম ভেঙে গেল।

তার মনে হল ছাদে কে যেন হাঁটছে। সাধারণ মানুষের হাঁটা পা নয়, পা টেনে-টেনে হাঁটা। সে ভয়ার্ত গলায় ডাকল, ‘এই, এই।’ আনিসের ঘুম ভাঙল না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। অল্প-অল্প বাতাস। বাতাসে জামগাছের পাতায় অদ্ভুত এক রকমের শব্দ উঠছে। রানু আবার ডাকল, ‘এই, একটু ওঠ না। এই।’ এভাবেই হুমায়ূন সাহিত্যে মিসির আলির আবির্ভাব। আর সেখানে মিসির আলিকে পরিচয় করাতে গিয়ে লেখক এনেছেন এক ভুতুড়ে পরিবেশের কথা— ‘আনিস উঠে বসল। প্রবল বর্ষণ শুরু হল এই সময়। ঝমঝম করে বৃষ্টি। জানালার পর্দা বাতাসে পতপত করে উড়তে লাগল। রানু হঠাত্ দেখল, জানালার শিক ধরে খালিগায়ে একটি রোগামত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির দুটি হাতই অসম্ভব লম্বা’। এমনি ভুতুড়ে দৃশ্য দেখার পর স্বামী আনিস মনে করে, তার স্ত্রী অসুস্থ। তার পর কাঁঠালবাগানের বাসায় গিয়ে সাক্ষাত্ মেলে মিসির আলির সাথে। সেখানেও মিসির আলির সেই যুক্তি, আর কাঠখোট্টা কিছু প্রশ্ন বিব্রত করে বসে আনিসকে। তার সাথে মিসির আলির কথোপকথন ছিল অনেকটা এমন—

‘আচ্ছা আগে এক কাপ চা খান, তারপর কথা বলব। রুগীটি কে বললেন? আপনার স্ত্রী? বয়স কত? বলেন কী? আপনার বয়স তো চল্লিশের মতো, ঠিক না? আনিস শুকনো গলায় তার বয়স সাঁইত্রিশ জানাতেই ধমকে উঠেন মিসির আলি। ‘এ— রকম অল্পবয়সী মেয়ে বিয়ে করেছেন কেন? আর মিসির আলির চরিত্রকে একটু ধোঁয়াটে করে তুলতে লেখকই আবার বলেছেন ভদ্রলোকের নিজেরই মনে হয় মাথার ঠিক নেই। এক জন অপরিচিত মানুষকে কেউ এ— রকম কথা জিজ্ঞেস করে? বলতে গেলে এমনি নানা দ্বৈততায় এগিয়ে গেছে মিসির আলি চরিত্রটি।

 নানা ঘটনার ঘনঘটায়, কল্পকাহিনীর ছত্রে চিরপরিচিত মিসির আলি একজন ধূমপায়ী, যিনি অনেকবার সিগারেট ছাড়ার চেষ্টায় ব্যর্থ। নানা রোগে জর্জরিত শরীরে তার বাসা বেঁধেছে জটিলতা, লিভার প্রায় অকেজো, অগ্ন্যাশয় ঠিকমতো কাজ করে না, রক্তের উপাদানে মানা গরমিল আর হূিপণ্ডের ছন্দপতন বছরের অর্ধেক সময় কাবু করে রাখে তাকে। এমনই নানা জটিলতার বিপরীতে সাধারণ কোনো সর্দি-জ্বরেও তার অবস্থা হয়ে পড়ে যাচ্ছেতাই। তবে এ অসুস্থতা তাকে ফেরাতে পারেনি যুক্তি থেকে। রহস্যময় জগেক তিনি অস্বীকার করলেও দেখতে চেয়েছেন আপন ভুবনে, নিজের মতো করে। আর প্রয়োজন হলে তিনি যে কাউকে খুব সহজে খুঁজে নিতে পারেন। প্রকৃতির নানা ঘটনা তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলতে পারলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তির ওপর ভর করে তিনি দাবি করেন, প্রকৃতিতে রহস্য বলে কিছু নেই। অনেক বেশি সন্দেহবাদী হওয়া সত্ত্বেও মিসির আলি ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু মিসির আলি আপনি কোথায় বইটিতে অবাকভাবে তিনি অবিশ্বাসী।

নিঃসঙ্গ একজন মানুষ মিসির আলি ‘অন্য ভুবন’ উপন্যাসে জুটিয়ে ফেলেন জীবনসঙ্গীকে; যেটা লেখকের তেমন ভালো লাগেনি। তাই পরের লেখায় আবার তাকে নিঃসঙ্গ একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন লেখক। আর লেখক স্বয়ং অকপটে স্বীকারও করেছেন, এটা বড় রকমের ভুল ছিল। মিসির আলির যুক্তির বেড়াজালে চিন্তার আকাশটায় প্রাণপাখি ডানা মেলতে গিয়ে ঠিক যেখানে ব্যর্থ, সেখানেই নতুন করে হাওয়ায় ভেসেছে হিমুর খাপছাড়া জীবন নামের শূন্য সুতোর নাটাই থেকে গন্তব্যহীন ঘুড়িটা। বোহেমিয়ান হিমুজীবনের সেই খালি পা, শিশিরসিক্ত ভোর, কল্পলোকের ভ্রান্তিবিলাসে ভাবনার হলুদ রঙ আর ইচ্ছেডানার রুপালি রোদ্দুর লেখক হুমায়ূনের জন্য নিয়ে এসেছে আরেক শ্রেণীর অগণিত পাঠক।

ভবঘুরে হিমুজীবনের নানা দিক বেলা-অবেলায় মন্দ লাগেনি। তবে মন থেকে চেয়েছি সে থাক কল্পনায়, ভাবনার স্বর্গরাজ্যে। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের গল্পগুলো পড়ে যে কেউ আবেগে বলে উঠতে পারেন, ‘আমি অ্যালান কোয়ার্টারমেইন হতে চাই’ কিংবা মেয়েদের কেউ হুট করে নিজের মধ্যে ‘স্টেলা’, ‘ললীলা’ কিংবা ‘ক্লিওপেট্রা’কে খুঁজে ফিরবে, হিমু তেমনটি নয়। তবে আমার হিসাবে মিস্টিক মিসির আলি যা-ই হোক, হিমুর মাত্রাটা অন্য রকম, সে খাপছাড়া জীবনের এক হতচ্ছাড়া সত্তা। তাকে থাকতে দিতে চাইছি তার জগতে, লেখক হুমায়ূন তাকে ঠিক যেখানে রেখে গেছেন, সে থাক সেখানেই।

মিসির আলির মতো অত পুরনো না হলে হিমু চরিত্রটার শুরুও গত শতকের শেষ দশকে। ময়ূরাক্ষী থেকে পর পর দরজার ওপাশে, হিমু, পারাপার, এবং হিমু…, হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম, হিমুর দ্বিতীয় প্রহর, হিমুর রূপালী রাত্রি, একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা, তোমাদের এই নগরে প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাঠকশ্রেণী বুঝতে পারে, লেখক কী ধরণের একটি চরিত্রকে তাদের সামনে আনতে চাইছেন। আর সেখানে মিসির আলির সাথে এ চরিত্রের দ্বৈরথ উপন্যাসের উপজীব্যে কাহিনীগুলোকে বেশ উপভোগ্য করে তোলে পাঠকের কাছে। চলে যায় বসন্তের দিন, সে আসে ধীরে, আঙ্গুল কাটা জগলু, হলুদ হিমু কালো র্যাব, আজ হিমুর বিয়ে, হিমু রিমান্ডে, হিমুর মধ্যদুপুর, হিমুর নীল জোছনা, হিমুর আছে জল, হিমু এবং রাশিয়ান পরী, হিমু এবং হার্ভার্ড পিএইচডি বল্টু ভাই প্রকাশ হলে হিমু চরিত্রটি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পান পাঠক। প্রকৃতির কোলে নিজেকে সঁপে দেয়া এক ভবঘুরে সত্তা হিমু ধীরে ধীরে আর্থরাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিদেশী নানা চরিত্রের সাথে একাত্ম করে নিতে বাধ্য হয় তাকে। আর লেখকের কৃতিত্ব এখানেই। যেখানে যা প্রয়োজন, পাঠক যেটা পছন্দ করতে পারেন, পাঠক যেভাবে তাদের প্রিয় চরিত্র হিমুকে দেখতে চেয়েছেন, লেখক ঠিক সেটাই করেছেন। তাই অনেকটা আজগুবি মনে হলেও অনেক পাঠক নিজ কল্পনার মণিকোঠায় সাজিয়ে নিয়েছেন একজন হিমুকে। আর হিমুকে ঘিরেই তার কল্পলোকের ভ্রান্তিবিলাস, তার আজগুবি সব চিন্তার বাস সেখানেই।

হিমু চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে লেখক নানা উপমা ব্যবহার করেছেন, ঠাঁই নিয়েছেন বিভিন্ন ভাবালুতার। আর তাই তো লেখকের ভাষায়, ‘পৃথিবীতে অনেক ধরনের অত্যাচার আছে। ভালবাসার অত্যাচার হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ানক অত্যাচার। এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনো কিছু বলা যায় না, শুধু সহ্য করে নিতে হয়।’ কিংবা লেখক বলতে চাইছেন, ‘এই পৃথিবীতে প্রায় সবাই, তার থেকে বিপরীত স্বভাবের মানুষের সাথে প্রেমে পড়ে। তরুণী মেয়েদের হঠাত্ আসা আবেগ হঠাত্ চলে যায়। আবেগকে বাতাস না দিলেই হলো। আবেগ বায়বীয় ব্যাপার, বাতাস পেলেই তা বাড়ে। অন্য কিছুতে বাড়ে না।’ কিন্তু এমন উক্তি হিমু চরিত্রের বিপরীতে অবস্থান নিলে লেখক আবার সেটাকে বর্ণনা করেছেন একান্ত নিজের মতো করে, ‘সবাই তোমাকে কষ্ট দিবে, কিন্তু তোমাকে এমন একজনকে খুঁজে নিতে হবে, যার দেয়া কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে।’ যেখানে হুমায়ূনের উপলদ্ধি, ‘অধিকাংশ মানুষ কল্পনায় সুন্দর, অথবা সুন্দর দূর থেকে। কাছে এলেই আকর্ষণ কমে যায়। মানুষই একই। কারো সম্পর্কে যত কম জানা যায়, সে তত ভাল মানুষ। কাউকে প্রচণ্ডভাবে ভালবাসার মধ্যে এক ধরনের দুর্বলতা আছে। নিজেকে তখন তুচ্ছ এবং সামান্য মনে হয়। এই ব্যাপারটা নিজেকে ছোট করে দেয়।’

হিমু চরিত্রটিকে লেখক চিনিয়েছেন আপন ভুবন থেকে। সেখানে তার উপলদ্ধি, ‘যখন মানুষের খুব প্রিয় কেউ তাকে অপছন্দ, অবহেলা কিংবা ঘৃণা করে তখন প্রথম প্রথম মানুষ খুব কষ্ট পায় এবং চায় যে সব ঠিক হয়ে যাক। কিছুদিন পর সে সেই প্রিয় ব্যক্তিকে ছাড়া থাকতে শিখে যায়। আর অনেকদিন পরে সে আগের চেয়েও অনেক বেশী খুশি থাকে যখন সে বুঝতে পারে যে কারো ভালবাসায় জীবনে অনেক কিছুই আসে যায় কিন্তু কারো অবহেলায় সত্যিই কিছু আসে যায় না।’ এমন পটভূমির ওপর দাঁড়িয়েই লেখক হুমায়ূনের অমর সৃষ্টি হিমু চরিত্রটি। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের সব লেখার আগ্রহী একজন পাঠক হিসেবে হিমু চরিত্রের এমন হতচ্ছাড়া আচরণকে আমি শুরু থেকে শেষ অবধি মেনে নিতে পারিনি। দু-তিনবারের সাক্ষাতে সরাসরি হুমায়ূন আহমেদ স্যারকে বলে বসেছি, স্যার, এটা ভালো লাগে না। স্যার কথা আমলে না নিয়ে মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘পড়তে থাকো।’ আসলে স্যার তো ঠিকই বলেছিলেন, সবে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো একজন পুঁচকে ছোকরা এমন একটি জননন্দিত চরিত্র নিয়ে বইমেলায় কী মন্তব্য করল, তাতে কী আসে যায়? বিশেষ করে হিমুর মধ্যদুপুর বই বেরোলে ভিড় ঠেলে প্রথম দিনই বইটি সংগ্রহ করি এবং এক রাতেই শেষ। তিনদিন পর স্যারের সাথে দেখা বইমেলাতেই। বললাম, স্যার, কাহিনী মনোঃপূত হয়নি।

তখন মেলার ভিড়ভাট্টা কম, অন্য প্রকাশের স্টলের সামনে স্যার অনেকটা একাই। সময় নিয়েই বলেছিলেন কিছু কথা আর এত দিন পর সারমর্ম করলে যেটা দাঁড়ায় সেটা নিছক কাহিনীর বাস্তবতা, আর সে বাস্তবতাই এগিয়ে নেয় একটি চরিত্রকে। আর সাথে এটুকু আমার উপলদ্ধি যে জাত লেখক চরিত্রকে কাহিনীতে সঁপে দিতে ভালোবাসেন। তাদের কাছে একেকটি কাহিনী বিশাল মনের আকাশ, আর চরিত্রগুলো একেকটি শঙ্খচিল। ভাবনার ডানা মেলে তাদের কলমে উড়তে থাকে তারা নিজ ভুবনে। আর বেলা শেষে কাহিনীর অন্তিম পর্যায়ে লেখক যদি দাবি করেন, চরিত্রটির ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তবে নিছক বাড়িয়ে কোনো কিছু বলা হবে না। এমনকি এটাকে ভুলও দাবি করা যাবে না। অন্তত হিমুর মতো খাপছাড়া চরিত্রকে এগিয়ে নিতে গেলে লেখককেও খেয়ালি হতে হয়, প্রকৃতির বিরুদ্ধে না দিয়ে চরিত্রকে ডানা মেলতে দিতে হয় মুক্ত বিহঙ্গের মতো। এর সবকিছু মিলিয়েই মিস্টিক মিসির আলি, আর তার বিপরীতে চলেছে হতচ্ছাড়া হিমু চরিত্রটি।

এই ব্যস্ত নগরের অলিগলি ধরে কোনো এক জোছনা রাতে

হাঁটছিল সে নিয়ন আলোতে ক’টি নীলপদ্ম হাতে

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল ময়ূরাক্ষীর তীরে যেই

হঠাৎ  দেখে শূন্য সবই কোথাও কেউ নেই

রুপা একা জানালায় এখনও জানে না সে হায়

হিমু আর কোনদিন, কোনদিন আসবে না

সব যুক্তির মায়াজাল রহস্যের সব দেয়াল

মিসির আলী আর কোনদিন, কোনদিন ভাঙবে না

পেয়ে গেছে খবর সে, তাই প্রার্থনা নিরন্তর

তুমি শান্তিতে ঘুমাও গল্পের জাদুকর!

আর কোন ট্রেনে হবে না ফেরা তার গৌরীপুর জংশনে

বিশুদ্ধ মানুষ হতে পারবে কি শুভ্র প্রশ্ন রয়েই যাবে মনে

গৃহত্যাগী জোছনায় দরদী গলায় গাতক মতি মিয়া গাইবে না

হাওরের মাঝি আর করবে না পারাপার, ভাটির দেশের নাও বাইবে না

চিত্রা, বাদল, জরী, পারুল হারালো অচিনপুরেই

শেষে, অনন্ত নক্ষত্রবীথি ছাড়া আর কোথাও কেউ নেই

রুপা একা জানালায় এখনও জানে না সে হায় গল্পের জাদুকর

বিতর্কের জাল জানি রবে চিরকাল ঘিরে তোমারই চারিদিকে

তবু তুমি রবে বেঁচে তোমার সৃষ্টির মাঝে তোমারই এ নন্দিত নরকে

তোমারই সাথে কত অদ্ভুত পথে যে পথিক হেঁটে গেছে আলো আঁধারে

তুমি রবে বেঁচে সেই পথিকের বুকে ভালোবাসার শঙ্খনীল কারাগারে।’

— হুমায়ূনের শ্রদ্ধার্ঘ্যে চমক হাসান

(Visited 99 times, 1 visits today)

One thought on “মিস্টিক মিসির আলি এবং হতচ্ছাড়া হিমু

  1. ভাই আপনার কাছ থেকে, এডওয়ার্ড সাইদের- Representations of The Intellectual, Covering Islam,Culture and Imperialism এর একটা করে রিভিউ চাই। বলতে পারেন এটা একটা আবেদন। আর একটা তথ্য জানার ছিলো, বাংলাদেশে এই কাজগুলার পড়ার মতো অনুবাদ হয়েছে কিনা??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *