চা শিল্পে অচলাবস্থা কাটছে না

তৈরি পোশাক শিল্প ও চিংড়ি রফতানির পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল চা শিল্প। কিন্তু নানা জটিলতায় বিগত বছরগুলোয় যেন অধোগতিতে পড়েছে এ শিল্প। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত নিলামগুলোয় সম্প্রতি বাংলাদেশে উৎপাদিত চা বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমতে দেখা যায়। স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় অবিক্রীত চায়ের মজুদ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেশি হয়েছে। নানা জটিলতায় শ্রমিক অসন্তোষ বৃদ্ধির পাশাপাশি এ সংবাদে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে চা বাগান মালিকদের।

বাংলাদেশের বাগানগুলোয় উৎপাদিত চা বেচাকেনায় কিছু প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। তাদের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, এ ধরনের একেকটি নিলামে গড়ে ২০-৩০ শতাংশ চা অবিক্রীত থেকে যায়। এ চা পরেরবারের নিলামে আবার নতুন করে তোলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি অবিক্রীত চায়ের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত গত চারটি নিলামের প্রায় সব কয়টিতেই বিক্রির জন্য তোলা সিংহভাগ চা শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। তথ্যগত দিক বিচার করলে দেখা যায়, গত চারটি নিলামে যথাক্রমে সাড়ে ৫৬ শতাংশ, ৫৮, ৫৯ ও ৬২ শতাংশ চা শেষ পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থার মধ্য দিয়েই ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৪০তম নিলামে তোলা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ কেজির মতো বিক্রিযোগ্য চা। পূর্বতন আশঙ্কাকে বাস্তব প্রমাণ করে এর প্রায় সাড়ে ৬২ শতাংশ অর্থাৎ ২২ লাখ কেজি বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বেশির ভাগ বড় ক্রেতা এ নিলামের সময় নিষ্ক্রিয় থাকেন। তারা নিলামে দর দেয়ার চেয়ে পর্যবেক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় এ জটিলতা আরো বেড়ে গেছে। ফলে দেখা গেছে, নিলাম নিজস্ব রীতি মেনে শেষ হয়েছে, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরো বেড়ে গেছে অবিক্রীত চায়ের পরিমাণ। পাশাপাশি চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরে চা আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এ শিল্পের জন্য বয়ে এনেছে অশনিসংকেত। শুল্ক অবমুক্ত পরিবেশে বাইরের দেশগুলো থেকে চা আমদানি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি মৌসুমে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ কেজি চা আমদানি হয়েছে। একই সময়ে উৎপাদিত প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ কেজি চা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে চলতি মৌসুমে চায়ের মজুদ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪৫ লাখ কেজির মতো। চাহিদার চেয়ে মজুদ বহুলাংশে বেড়ে যাওয়ায় সংকটের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে চা বাগান মালিকদের ক্ষতি কমাতে নতুন করে নিলামের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ড। এক সূত্রে জানা গেছে, অবিক্রীত চা বিক্রির জন্য আগামী ২২ ও ২৯ এপ্রিল দুটি বাড়তি নিলাম ডাকা হবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত বাংলাদেশে চায়ের নিলাম বছরে ৪৭ দিন ডাকা হয়। এ বছর চলমান রাজনৈতিক সংকট রফতানি কমিয়ে আমদানি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাগান মালিক ও চা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের পরামর্শে আরো দুটি নিলামের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ চা বোর্ড। কিন্তু বড় কথা হচ্ছে, চলতি বাজেটে আমদানি শুল্ক ৪০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা চা শিল্পের জন্য মূর্তিমান বিভীষিকা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। বাড়তি দুটি নিলাম কেবল চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের সামান্য উপকার করবে মাত্র। কিন্তু আমদানি শুল্ক না বাড়ালে এ শিল্প ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়বে।

(Visited 24 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *