পরিবহন খাতের সংকট কাটছে না

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে যুক্ত হওয়া অনেকগুলো কার্যকর ফিচারের একটি মেমোরি শেয়ার করা। হঠাত্ আজ সকালে লগ ইন করে দেখি, গত বছরের ঠিক এই দিনে বণিক বার্তার মতামত পাতায় একটি লেখা লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম ‘গাড়িভর্তি রাজপথে গণপরিবহন কোথায়?’ শিরোনামে। বছর পেরিয়ে গেছে। এর পর নির্মাণ করা হয়েছে ফ্লাইওভার, প্রশস্ততা বেড়েছে অনেক রাস্তার, বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করা হয়েছে ঢের, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তার পরও বাঙালির ভাগ্য বদলায় সাধ্য কার? বছর পেরিয়েও ইতিহাসের পাতায় মসজিদের নগরী কিংবা বিদেশী পর্যটকদের চোখে রিকশার নগরী হিসেবে চিরপরিচিত রাজধানী ঢাকার চিত্র একটুও পাল্টে যায়নি। কিছু না হোক বরং চারদিক থেকে জেঁকে ধরা সমস্যায় নাকাল রাজধানীবাসীর জীবনে এখনো নিত্যসঙ্গী এখন অভিশপ্ত সেই স্থবিরতা, যাকে আভিধানিক শব্দবন্ধে সবাই যানজট বলেই জানেন।

বদলে গেছে আমাদের জিডিপির আকার, পরিসংখ্যানের ওপর ভর করে দাবি করা হচ্ছে, আমরা নাকি মধ্যম আয়ের দেশ। এতে কিছু এসে যায়নি। ঢাকা আছে ঠিক আগের মতোই, যানজট নামের সেই নির্মম স্থবিরতার কাছে হার মেনেছে শত সহস্রের কর্মচাঞ্চল্য, হারাতে বসেছে নগরজীবনের চিরচেনা প্রণোচ্ছলতা।

মিরপুর থেকে শান্তিনগর, গাবতলী থেকে মতিঝিল ঘুরে-ফিরে একই চিত্র। তাকালে চোখ ব্যথা হয়, মাথাটাও বুঝি ধরে আসে। তবু পিঁপড়ার মতো সারি ধরে থেমে থাকা যতগুলো গাড়ির দেখা মেলে, তাদের ধৈর্যের সীমা অবাক করে আমাদের। সাতজনমের স্থবিরতাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে এরা, ব্রতই যেন নগরজীবনকে পুরো অচল করে দেয়ার। সকাল থেকে দুপুর, বিকাল থেকে সন্ধ্যাকাল এরা থেমে আছে, নড়ার কোনো চেষ্টাই যেন নেই! নগরীর কর্মচাঞ্চল্যে শশব্যস্ত মানুষ চলছে দুর্দিনের প্রণতি সামনে রেখে, পায়ে হেঁটে কিংবা দৌড়ে। কখনো তাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে থেমে থাকা গাড়ির ফাঁকফোকর গলিয়ে খোদ রাজপথ ধরেই। আবার কেউ কেউ একটু কষ্ট করে নাকে রুমাল চেপে এগিয়ে যাচ্ছেন ফুটপাত ধরেই। প্রক্ষালণ কক্ষের অপ্রাপ্তিতে সোজা পদচল পথটিকেই যারা প্রাকৃতিক কর্মসাধনের একমাত্র অবলম্বন ভেবে দিনের পর দিন জলবিয়োগ করছেন, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছেন; তাদের অপকর্মের মতো থেমে নেই সেখানে যাতায়াতও। তাই এমনি করে বললে চলছে সবই, চলছে সবাই, থেমে নেই সবার প্রিয় নগর ঢাকা; তবে থমকে আছে জীবনের গতিময়তা।

কখন চলতি পথের গাড়ি আটকে দেয়া যায়— এমনি প্রতীতি নিয়ে মোড়ে মোড়ে যমদূতের মতো লালরঙা দণ্ড হাতে দণ্ডায়মান ট্রাফিক পুলিশ; যাত্রী-গাড়িচালক-হেলপারের ভয়— কখন বের হন কোনো ভিআইপি আর রাস্তাটা আটকে যায়। এমনই ঝক্কিঝামেলা পোহানোর পরও রাজপথে চলতে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে উঠতে পারে যে কারোরই। সেক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে যেটি, সেটি হলো এ গাড়িভরা রাজপথে আপনার বাহন কোথায়? থমকে থাকা গাড়ির সারিতে দৃষ্টি দিলে দৃষ্টিসীমা ক্লান্ত হয়ে ফিরবে দূরদিগন্ত থেকে, দেখবে সাদা-কালো-বেগুনি-লাল নানা গাড়ির সমারোহ। আর সেখানে সাধারণ কোনো মানুষের চড়ে বসার এখতিয়ার নেই। ব্যক্তিগত পরিবহন বলতে শুধু প্রাইভেট কারের কথা বলা ঠিক হবে না, তবে সিংহভাগ রাজপথ দখলে রেখেছে এটিই। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ঝুঁকছেন মোটরবাইক থেকে শুরু করে সরাসরি বাইসাইকেলের প্রতি। ত্যক্ত-বিরক্ত অনেক মানুষকে বহুগুণ বেশি ভাড়া গুনে রাজপথ দিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে রিকশায়ও। সব মিলিয়ে দিশেহারা রাজধানীবাসী দেখতে পাচ্ছে চিরপরিচিত যানজট নামের এ সংকট কাটছেই না, উপরন্তু দিনের পর দিন নিত্যনতুন জটিলতা নিয়ে হাজির হচ্ছে। যদি রাজধানীর এক নম্বর সমস্যা হয় জীবনের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার না পাওয়া, তাহলে তার প্রতিবন্ধক নিয়ামক হিসেবে তালিকার ঠিক উপরের দিকেই স্থান দিতে হবে এ যানজটকেই।

(Visited 17 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *