সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন

আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া একটি নাম, অনেকগুলো অর্জন আজ কিংবদন্তীতূল্য। আমরা যারা এ প্রজন্মের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক তাঁদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শও তিনি। বিশেষ করে প্রত্নস্থান শনাক্তকরণ ও নথিভুক্তকরণের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্বচর্চায় যে অবদান রেখে গেছেন তার তুলনা নেই। শতবর্ষের কোটা ছুুঁই ছুঁই বয়সে শারিরীক অবস্থা বিশেষ ভালো নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে এখন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া। ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে জন্ম নেয়া এ বিদ্যানুরাগী মানুষটি কর্মক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হলেও প্রত্নতত্ত্ব চর্চাই ছিল তাঁর ধ্যান, জ্ঞান প্রেম।

শিক্ষাজীবনে ইংরেজি সাহিত্যের কৃতি ছাত্র হলেও শেষ পর্যন্ত ঝুঁকে পড়েন প্রত্নচর্চায়। তারপর বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্রের বস্তুনিষ্ঠ অনুবাদ, প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ, পুরো বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ ও তার বিবরণ  লিপিবদ্ধকরণেই জীবনের বেশিরভাগ সময় পার করেছেন তিনি। দৈনিক বণিক বার্তার একজন  কর্মী হিসেবে অসুস্থ স্যারকে আজ দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয় একজন সাংবাদিক হিসেবেই। কিন্তু মনেপ্রাণে একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের আকুতিকে আড়াল করা  সম্ভব হয়নি আমি, কিংবা  এর পক্ষে। অফিসে ফিরে রিপোর্ট লিখতে গিয়ে আমার পিএইচডি সুপার ভাইজার অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যারকে ফোন দিলাম। স্যার অনেকক্ষণ ধরে স্মৃতিচারণ করলেন এই মহান প্রত্নতাত্ত্বিকের। শাহনাওয়াজ স্যারের সাথে আমার যৌথ লেখা দ্বিতীয় বইটি ‘আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস’ উত্সর্গ করা হয়েছিল জাকারিয়া স্যারের প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক অক্লান্ত শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই। উত্সর্গপত্রে শাহনাওয়াজ স্যার লিখেছিলেন ‘আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারািয়া, যাঁর লেখার মধ্য দিয়ে এ দেশে প্রত্ন ঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে অনেকের।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষক হিসেবে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি এ বিষয়ে স্যারের অবদানকে। বিশেষ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হওয়ার অনেক আগে থেকেই স্যারের সাথে পরিচয় তাঁর প্রতিবেশী হিসেবে। দাদার মৃত্যু পরবর্তীকালে কলাবাগানস্থ ছোট ফুফুর বাসার বারান্দার গ্রিল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম। একদিন চোখ যায় একজন অশীতিপর বৃদ্ধ আনমনে কাজ করে যাচ্ছেন ছাদের বাগানে। তখনও আমি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হয়নি, তবে পরদিন গিয়ে কি মনে করে দেখা করি। প্রায় ঘন্টাখানেকের আলাপচারিতায় উনার মধ্যে বিরক্তির কোনো ছাপ দেখিনি, বরং বেশ কিছুটা উত্ফুল্লই মনে হয়েছে তাঁকে। এভাবে কয়েকদিন কথাবার্তা হওয়ার পর আমি কলাবাগান ছেড়ে যাই মিরপুর। আস্তে আস্তে স্মৃতির আস্তরে ধুলো জমে, তবে ভর্তি হই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ব বিভাগে। তবে এতোদিনে তাঁকে চিনতে পেরেছি কিছুটা হলেও। অন্তত বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে ইয়া পেল্লাই সাইজের দশাসই ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থটি দেখার পর তাঁর কর্মকাণ্ড আমার কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়।

তারপর অনেকদিন কথা হয়েছে স্যারের সাথে। দীর্ঘ সময় আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চার নানা দিক নিয়ে। এবারের ২০১৫ অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত আমার গ্রন্থ ‘প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ’ এর শেষ অধ্যায়ে স্যারের সাথে আলোচনার অনেক স্মৃতিচারণও করার চেষ্টা করেছি। তবে উনার মত একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের কর্মকাণ্ডকে এতো সহজে, একটি গ্রন্থের ফ্রেমে তুলে ধরার সাধ্য হয়ত আমাদের কারো নেই। আজ দেখা করতে গেলে আমরা যখন উঠতে যাই ঠিক তখনি তিনি বললেন তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলোকে এগিয়ে নেয়ার কথা। বললেন ‘There is no shortcut way for doing Archaeology’ । আমার পিএইচডি গবেষণার টপিক শুনে স্মরণ করিয়ে দিলেন অবশ্যই আরবি এবং ফারসি ভাষাটি শিখে নেয়ার কথা। হাসপাতাল থেকে  ফিরে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক হিসেবে কায়মনোবাক্যে মহান স্রষ্টা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এটুকুই যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন জাকারিয়া স্যার। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রত্নাতাত্ত্বিক গবেষকরা একজন পথ প্রদর্শক হিসেবে এখনও উনাকে সামনে রেখে তাদের কাজ এগিয়ে নিতে চায়।

(Visited 16 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *